ব্লগ সংরক্ষাণাগার

মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

রাসূল-প্রেমিকদের হৃদয়ে চির অম্লান জশনে জুলুছে ঈদে মীলাদুন্নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)

 


-এডমিন

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম,
নাহমাদুহু ওয়া নুসল্লি আ’লা রাসূলিহিল কারীম,
আম্মা বা’আদ।


প্রথমেই বলে রাখা আবশ্যক যে, ১২ই রবিউল আউয়াল তারিখকে ঈদে মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পরিবর্তে “নবী দিবস” বলার কোনো অবকাশ নেই। কেননা, এর অর্থের সাথে রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বেলাদত তথা ধারাধামে শুভাগমনের কোনো সম্পর্কই নেই। তাঁর বেলাদত দিবস উদযাপনের অনুমতি তিনি স্বয়ং দিয়েছেন। যথা- মুসলিম শরীফ নামক হাদীস গ্রন্থ থেকে মেশকাত শরীফের রোযা অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সোমবার দিন রোজা রাখতেন। এর কারণ জিজ্ঞাসিত হওয়ার পর তিনি এরশাদ ফরমান, ”ওই দিন (সোমবার) আমি ধরণীতলে শুভাগমন করেছি এবং ওই দিন আমার কাছে ওহী এসেছে (আল হাদীস)। হাদীসটির আরবী ইবারত দেখলেই স্পষ্ট হয়ে যাবে। বলা হয়েছে - “ফীহি উলিদতু” (فِيْهِ وُلِدْتُ) - অর্থাৎ, এদিন আমার বেলাদত/মীলাদ হয়েছিলো [মুসলিম ১১৬২, তিরমিযী ৬৭৬, নাসায়ী ২৩৮২, আবূ দাউদ ২৪২৫, ইবনু মাজাহ ১৭১৩, আহমদ ২২০২৪]। যেহেতু তিনি বেলাদতের কথা সুস্পষ্ট উল্লেখ করেছেন ‘উলিদতু’ শব্দটি ব্যবহার করে, সেহেতু “নবী দিবস” বা “সীরাতুন্নবী” (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলে এ দিবসকে চালিয়ে দিতে চেষ্টা করা তাঁর সুন্নাতের খেলাফ বা পরিপন্থী। এখানে উল্লেখ্য যে, আরবী শব্দ ‘উইলাদাত’ (জন্ম) থেকেই মীলাদ, মওলিদ, মওলূদ ইত্যাদি শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘উলিদতু’ শব্দটি ব্যবহার করায় উৎপত্তি হওয়া উপরোক্ত শব্দগুলো সম্পূর্ণ বৈধ বলে সাব্যস্ত হয়। এগুলো বেদআত বা ধর্মের মধ্যে বর্জনীয় নতুন উদ্ভাবন নয়। আরও উল্লেখ্য যে, মীলাদুন্নবী (দ:)-এর বিরোধীরা প্রথমে এর উদযাপনকে ‘বর্জনীয় বেদআত’ বল্লেও উপরোল্লিখিত হাদীসখানি দেখানোর পর বলে যে শুধু সোমবার রোযা রেখে সুন্নাত অনুযায়ী হুযূর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জন্মদিন পালন করা জায়েয! তাদের কথা পরস্পরবিরোধী। বস্তুতঃ হাদীসটিতে প্রতিভাত হয়, নেক আমল পালন করে মীলাদ দিবস উদযাপন ছিল রাসূলে পাক (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উদ্দেশ্য, আর রোযা ছিল মাধ্যম। এর দ্বারা তিনি এই ধরায় তাঁকে রহমত হিসেবে প্রেরণের খোদায়ী ইচ্ছার প্রতি শোকরিয়া জ্ঞাপন করেছিলেন। অতএব, উপলক্ষ বা উদ্দেশ্য প্রধানতঃ তাঁরই ধরাধামে শুভাগমন। উপরন্তু, তিনি না এলে কুর’আন মজীদের নাজিল হওয়ার প্রশ্নই উঠতো না। উপলক্ষকে ধামাচাপা দেয়াটা মীলাদ-বিরোধীদের দোষ। সোমবার ওই একই উপলক্ষ, এবং ১২ রবীউল আউয়াল শরীফও তাই! এর সম্বন্ধ ‘বেলাদত দিবসের’ সাথে। সে মোতাবেকই এর উদযাপন! প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রোজা রেখে বুঝিয়েছেন সমস্ত নেক আমল তথা পুণ্যকর্ম বিহিত। স্রেফ রোজার মধ্যে তা সীমিতকরণ মীলাদ-বিরোধীদের আরেকটি ধাপ্পা ছাড়া কিছু নয়!

জশন্ শব্দের অর্থ খুশি (লোগাতে কিশওয়ারী)। জুলুস ‘জলসা’ শব্দের বহু বচন। জলসা অর্থ হলো বসা বা উপবেশন করা (গিয়াসুল লোগাত)। নামায হলো আল্লাহর যিকিরের জলসা যা একই স্থানে বসে সম্পন্ন করা হয়। হজ্ব হচ্ছে আল্লাহর যিকিরের জুলুস যা এক বৈঠকে সম্পন্ন করা যায় না, বরং বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ফিরে সম্পন্ন করতে হয়। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র বেলাদতের সময় কী ঘটেছিল তা বর্ণনা করতে গিয়ে মা আমেনা (রা:) বলেন- “রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বেলাদতের সময় আমার ঘরে ফেরেশতাগণ মিছিল সহকারে অবতীর্ণ হন এবং তাঁরা উচ্চস্বরে রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি সালাত-সালাম পাঠ করছিলেন” (ইমাম সেহাবউদ্দীন আহমদ ইবনে হাজর হায়তামী শাফেয়ী আল মক্কী কৃত ”আন্ নে’মাতুল কুবরা আ’লাল আ’লম ফী মওলিদে সাইয়্যেদে ওয়ালাদে আদম”, ৬৬ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য)। উদ্ধৃতিটিতে পরিস্ফুট হয় যে, ফেরেশতাগণও জুলুস করেছিলেন।

ঈদ অর্থ খুশি এবং মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অর্থ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শুভাগমন উপলক্ষে মিছিল সহকারে খুশি প্রকাশ করা। এটা তাঁর প্রতি মুহাব্বত ও ভক্তি শ্রদ্ধার একটি সুন্দর বহিঃপ্রকাশ।

মহান আল্লাহ্তা’লা পবিত্র কুরআন মজিদে এরশাদ ফরমান-“আল্লাহর দিবসগুলো তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিন” (সুরা ইব্রাহীম, ৫ আয়াত)।

আমরা জানি যে, সমস্ত দিন-রাত্রির স্রষ্টা একমাত্র আল্লাহ্ তা’লাই। তাহলে এখানে স্মরণ করার জন্যে কোন্ বিশেষ দিনসমূহের কথা বলা হয়েছে? অতএব, এ আয়াতটি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তাফছীরকারদের শিরোমণি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:), হযরত উবাই ইবনে কায়াব (রা:), হযরত মোজাহিদ (রা:), হযরদ কাতাদা (রা:) প্রমুখ বুযূর্গানে দ্বীন অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে আয়াতোক্ত “আল্লাহর দিবসসমূহ” বলতে সেই সব দিবসকে বোঝায়, যে সব দিবসে আল্লাহ পাক তাঁর বান্দাদেরকে বিশেষভাবে পুরস্কৃত করেছে (তাফসীরে ইবনে জরির তাবারী, তাফসীরে খাযায়ীন ও তাফসীরে মাদারেক)। যেহেতু আল্লাহ তা’লা কুরআন মজীদে ঘোষণা করেছেন যে রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হলেন বিশ্ব-জগতের জন্যে তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ করুণা, সেহেতু তাঁর বেলাদত দিবস নিঃসন্দেহে আয়াতোক্ত একটি স্মরণীয় আল্লাহর দিবস। সুতরাং এ দিবসটি ঈদ হিসেবে উদযাপন করা আল্লাহ্ তা’লার বিধানের সাথে সঙ্গতি পূর্ণ।

মহান আল্লাহ্ পাক কুরআন মজীদে এরশাদ ফরমান- “হে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা করুনঃ আল্লাহর অনুগ্রহ ও করুণাপ্রাপ্তিতে মানব জাতির উচিৎ খুশি উদযাপন করা” (সুরা ইউনুস, ৫৮ আয়াত)। এ আয়াতে “ফাল্ ইয়াফরাহু” (খুশি উদযাপন করা উচিৎ) শব্দটি একটি আদেশসূচক ক্রিয়া এবং এর অর্থ হলো মানব জাতির খুশি উদযাপন করা উচিৎ। এটা খোদায়ী আদেশ। আর “বি ফাদলিহী” ও “বি রাহমাতিহী” শব্দগুলোর অর্থ হলো আল্লাহর অনুগ্রহ ও করুণা হলেন তাঁরই প্রিয় হাবীব (বন্ধু) হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর পবিত্র বেলাদত বা ধরাধামে শুভাগমন দিবস। আল্লাহ্ তা’লা কুরআন মজীদে উপরোক্ত অনুগ্রহের ঘোষণা দিয়েছেন- “নিশ্চয়ই আল্লাহতা’লা মোমেন বান্দাদের প্রতি এক মহা অনুগ্রহ করেছেন যে, তিনি তাদের মধ্য থেকে তাদের কল্যাণের জন্যে একজন রাসূল (হুজূর পাক-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে প্রেরণ করেছেন” (সূরা আলে ইমরান, ১৬৪ আয়াত)। সুরা আম্বিয়ার মধ্যে আল্লাহ্ তা’লা তাঁর করুণার ঘোষণা দিয়েছেন- “হে প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি আপনাকের সমগ্র বিশ্ব-জগৎ তথা সৃষ্টিকুলের জন্য আমার করুণাস্বরূপ প্রেরণ করেছি” (১০৭ আয়াত)। তাই যে দিনটিতে রাব্বুল আলামীনের এ সর্বশ্রেষ্ঠ রহমত আমাদের প্রতি বর্ষিত হলো, সেই ঈদে মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দিনটি উদযাপন করা এবং তাতে খুশি প্রকাশ করা আল্লাহ্ তা’লার বিধানের আলোকে সিদ্ধ প্রমাণিত হয়েছে।

আল্লাহ্ তা’লা এরশাদ ফরমান-“হে প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনারই খাতিরে আপনার যিকির তথা স্মরণকে আমি উচ্চ মর্যাদা দিয়েছি” (সূরা এনশারাআ)। এ আয়াতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ্ তা’লা তাঁর বান্দাদেরকে তাঁরই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যিকির করতে দেখতে চান। এটা তাঁর ঐশী বিধান যে বান্দাগণ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যিকির করবেন। তাই বান্দাগণের উচিৎ ঈদে মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দিনদিতে তাঁর স্মরণার্থে মীলাদ কেয়াম, জশনে জুলুছ ইত্যাদি যিকির পালন করে তাঁকে সারা বিশ্বে স্মরণীয় করে তোলা।

মুসলমানগণ রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ফযল (অনুগ্রহ) ও রহমতপ্রাপ্তির ফলে তাঁর শান-মান প্রকাশার্থে ও তাঁর স্মরণে যে খুশিসূচক জুলুছ বা মিছিলের আয়োজন করেন তা অত্যন্ত বরকতময়। এ আমল সাহাবায়ে কেরাম (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম) হতে প্রাপ্ত। যথা-বুখারী শরীফে বর্ণিত আছে যে, হুজুর পূর নূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মদীনা মোনাওয়ারায় হিজরত করেন, তখন মদীনাবাসী আনসার সাহাবীগণ (রা.) তাঁকে ইসতেকবাল (অভ্যর্থনা) জানাতে মদীনার উপকণ্ঠে সানিয়াতুল বিদা নামক স্থানে জুলুস (মিছিল) করে গিয়েছিলেন। মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে যে, হযরত বরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত- হিজরতের সময় মদীনা নগরীর নারী পুরুষগণ ঘরের ছাদগুলোতে আরোহণ করেন। ছোট ছোট ছেলে ও গোলামগণ মদীনা শরীফের অলিতে গলিতে ছড়িয়ে পড়েন এবং সকলেই স্লোগান দিতে থাকেন-“হে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম” (মুসলিম শরীফ ২য় জিলদের হাদীসুল হিজরত অধ্যায় দ্রষ্টব্য)। সাহাবায়ে কেরাম (রা.) হিজরতের সময় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে তাঁদের মাঝে পাওয়ার খুশিতে জুলুছ করেছিলেন, আর আমরা তাঁকে আমাদের মাঝে আল্লাহ্ তা’লার সর্বশ্রেষ্ঠ করুণা হিসেবে পাওয়ার খুশিতে জুলুস করছি। যেহেতু সাহাবায়ে কেরাম (রা:) থেকে জুলুছ প্রমাণিত হয়েছে, সেহেতু এটা মন্দ হতে পারে না।

ঈদে মীলাদুন্নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উদযাপন সম্পর্কে ইসলামের চার খলীফার (রা.) বাণীও আমরা এ প্রসঙ্গে উদ্ধৃত করবো। এই খলীফাদের (রা.) সম্পর্কে হুজুর করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, “তোমাদের প্রতি পালনীয় কর্তব্য করা হলো আমার খলীফাগণের সুন্নাত (রীতি-নীতি)” (বুখারী শরীফ)। অতএব, তাঁদের বাণী আমাদের জন্যে শরীয়তের দলিল, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) বলেন- “যে ব্যক্তি মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাঠ তথা যিকর পালনে একটি দিরহাম ব্যয় করেন, তিনি বেহেস্তে আমার বন্ধু হবেন” (ইমাম সেহাবউদ্দীন আহমদ ইবনে হাজর হায়তামী শাফেয়ী আল মক্কী কৃত আন্ নে’মাতুল কুবরা, ৭ম পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য)।

হযরত উমর ফারুক (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) বলেন- “যে ব্যক্তি মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে সম্মান করেন, নিশ্চয় তিনি দ্বীন ইসলামকে হায়াত দান করেন” (প্রাগুক্ত আন্ নে’মাতুল কুবরা, ৭ম পৃষ্ঠা)।

হযরত উসমান যিন্নুরাইন (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) বলেন- “যে ব্যক্তি মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যিকিরে এক দিরহাম ব্যয় করেন, তিনি বদর ও হুনাইনের জেহাদে শরীক হওয়ার মর্যাদা লাভ করেন” (প্রাগুক্ত আন্ নে’মাতুল কুবরা, ৭/৮ পৃষ্ঠা)।

হযরত আলী (কার্রাম-আল্লাহু ওয়াজহাহু) বলেন- “যে ব্যক্তি মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে শ্রদ্ধা করেন, তাঁর জন্যে মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যিকর পৃথিবী হতে ঈমান সহকারে প্রাণ ত্যাগ ও বিনা জবাবদিহিতায় বেহেশতে প্রবেশের কারণ হয়ে দাঁড়ায়” (প্রাগুক্ত আন্ নে’মাতুল কুবরা, ৮ পৃষ্ঠা)।

আমরা আগেই বলেছি যে, ঈদে মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-তে পালিত ’যিকরে রাসুল’ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তথা জশনে জুলুছ, মীলাদ-কেরাম ইত্যাদি দেখে এক শ্রেণীর বদ আকীদা-সম্পন্ন মওলবীর গাত্রদাহ শুরু হয়েছে। তারা অপযুক্তি খাড়া করছে এই মর্মে যে, ঈদে মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দিবসটি শুধুমাত্র নবী পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বেলাদতেরই নয়, এই দিনে তো তাঁর বেসাল (পরলোকে খোদার সাথে মিলনপ্রাপ্তি) শরীফও সংঘটিত হয়। তাহলে শোক পালন করা হচ্ছে না কেন? জাতীয় প্রচার মাধ্যমগুলো ওই সকল বাতিলপন্থী মওলবীর কথানুযায়ী প্রচার করছে যে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বেসালের স্মৃতি বিজড়িত দিবস পবিত্র ঈদে মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! ঈদে মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শব্দটির সাথে কী অসঙ্গতিপূর্ণ বক্তব্য! আমরা সকলের জাতার্থে জানাতে চাই যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হলেন হায়াতুন্নবী। অর্থাৎ, তাঁর যাহেরী (প্রকাশ্য) জিন্দেগী ও বেসাল শরীফের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তিনি এরশাদ করেছেন-“আমার যাহেরী জিন্দেগী তোমাদের জন্য উপকারী এবং আমার বেসালপ্রাপ্তিও তদনুরূপ” (হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বাযযায রহমতুল্লাহি আলাইহি কৃত ফতোওয়া গ্রন্থ)। হাদীসটি অপযুক্তি পেশকারীদের বক্তব্যকে সমূলে উৎপাটিত করেছে এবং প্রতিভাত করেছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বেসালপ্রাপ্তিতে শোক পালনের কোনো অবকাশই নেই।

নবীদ্রোহী গোষ্ঠী বলে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং অনাড়ম্বর জীবন যাপন করেছিলেন, কিন্তু বর্তমানের সুন্নীরা তাঁর বেলাদত দিবসে জৌলুসপূর্ণ তোরণ নির্মাণ, গাড়ীর মিছিল, কাংগালী ভোজ ইত্যাদি করছে। তাদের মতে এতে নাকি খাতামুন নাবিয়্যিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রূহ মোবারক শোকে ক্রন্দন করছেন। কতো বড় কাশফ-ওয়ালা মওলভী! হুজুর পূর নূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হালত নাকি জেনে গিয়েছেন! মূর্খ আর কাকে বলে! তাদের জেনে রাখা আবশ্যক যে, কোনো ব্যক্তির নিজের জন্যে জৌলুসপূর্ণ ব্যয় ইসলামে নিষিদ্ধ হলেও দ্বীনের জন্যে জৌলুসপূর্ণ ব্যয় হারাম নয়। ঈদে মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে ঈমানী চেতনার উৎস, তা চার খলীফার (রা.) বাণী থেকেও প্রমাণিত হয়েছে। এমতাবস্থায় যারা এর উদযাপন থেকে মুসলিম সমাজকে দূরে সরিয়ে রাখতে চায়, তারা অবশ্যঅবশ্যই শয়তানের দোসর। তাদের বিরুদ্ধে মুসলমান সমাজের রুখে দাঁড়ানো জরুরি।

*সমাপ্ত*

শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬

The High Status of the Prophet and the Heresy of Mawdoodi and Jama'at Henchmen

 

রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬

ইমাম গাজ্জালী নাকি গাজালী (রহ.)?

লেখক: শফীক্ব আল-মুজাদ্দেদী 

(ফেসবুক বন্ধু)


হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম আবু হামিদ মুহাম্মদ ইবন মুহাম্মদ আল-গাজ্জালী (রহ.)-এঁর নামের সঙ্গে যুক্ত নিসবা "الغزالي " বাংলা ভাষায় সাধারণত দুটি রূপে লেখা হয়, গাজ্জালী এবং গাজালী। কোনটি অধিক শুদ্ধ ও ঐতিহাসিকভাবে গ্রহণযোগ্য; এ বিষয়ে প্রাচীন জীবনীকার ও ইতিহাসবিদদের মধ্যে দুটি প্রসিদ্ধ মত পাওয়া যায়।

প্রথম মত: পৈতৃক পেশার দিকে নিসবা করে "গাজ্জালী"
অধিকাংশ ঐতিহাসিক ও তাবাকাতবিদের মতে, ইমাম গাজ্জালীর পূর্বপুরুষ পশম বা উল কেটে সুতা (غزل) প্রস্তুত ও বয়নের পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। আরবি "غزال " অর্থ পশম বা উল থেকে সুতা প্রস্তুতকারী। সেই পেশার সঙ্গে সম্পর্কিত নিসবা হিসেবেই তাঁদের পরিবার (পারিবারিক পেশাগত উপাধি) "আল-গাযযালী" (الغزالي) নামে পরিচিতি লাভ করে।
যেমন:
১. ইমাম ইবনুল আছীর (রহ:) [৫৫৫-৬৩০ হি./১১৬০-১২৩৩ খ্রি.]:
তিনি বলেন, "আল-গাযযালী" শব্দটি গাইন (غ) -এর পর শাদ্দাযুক্ত যাই ( ّز) সহ উচ্চারিত হয়। তাঁর মতে, এটি "গাযযাল" অর্থাৎ সুতা প্রস্তুতকারীর পেশাগত পরিচয় থেকে উদ্ভূত। তিনি আরও বলেন, খাওয়ারিজম ও জুরজান অঞ্চলের ভাষাগত রীতিতে পেশাভিত্তিক নিসবা প্রচলিত ছিল। যেমন, আল-আসসার থেকে আল-আসসারী। একইভাবে আল-গাযযালী-ও একটি পেশাভিত্তিক নিসবা।
তিনি আরও বলেন, কেউ কেউ এটিকে শাদ্দাহবিহীন "গাযালী" উচ্চারণ করে থাকেন, যা তুসের নিকটবর্তী তাঁর জন্মস্থান গাযালা গ্রামের দিকে নিসবা করে। কিন্তু তাঁর মতে, এই মতটি প্রসিদ্ধ অভিমতের পরিপন্থী'।
২. ইবনু খাল্লিকান (৬০৮-৬৮১ হি./১২১১-১২৮২ খ্রি.):
তিনি স্পষ্টভাবে বলেন যে, আল-গাযযালী (الغزالی) উচ্চারণই প্রসিদ্ধ ও অধিক গ্রহণযোগ্য। এটি গাযযাল (الغزال) অর্থাৎ সুতা প্রস্তুতকারীর পেশাগত পরিচয় থেকে উদ্ভূত নিসবা। তিনি উদাহরণ দেন, আল-কাসসার থেকে আল-কাসসারী এবং আল-আত্তার থেকে আল-আত্তারী-এর মতো।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, শাদ্দাহবিহীন গাযালী উচ্চারণের একটি মত থাকলেও তা তুলনামূলকভাবে কম প্রসিদ্ধ। তাঁর মতে:
والمشهور بتشديد الزاي نسبة إلى غزال، وهو الذي يغزل الصوف.
অর্থাৎ,
"প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ উচ্চারণ হলো যাই-এ শাদ্দাসহ (গাযযালী)। এটি 'গাযযাল' অর্থাৎ পশম কেটে সুতা প্রস্তুতকারীর প্রতি নিসবা।"
৩. ইমাম যাহাবী (৬৭৩-৭৪৮ হি./১২৭৪-১৩৪৮ খ্রি.):
ইমাম যাহাবী (রহ:) বলেন, আল-গাযযালী, আল-আত্তারী এবং আল-খাব্বাযী প্রভৃতি উপাধি মূলত বিভিন্ন পেশা বা বৃত্তির প্রতি নিসবা নির্দেশ করে। ফারসি ভাষায় প্রচলিত পেশাবাচক শব্দের সঙ্গে আরবি নিসবা-সূচক "ইয়া" যুক্ত করেই এসব উপাধি গঠিত হয়েছে।
৪. তাজউদ্দীন আস-সুবকী (৭২৭-৭৭১ হি./১৩২৭-১৩৭০ খ্রি.):
তিনি উল্লেখ করেন যে, ইমাম গাজ্জালীর পিতা ছিলেন একজন গাযযাল, অর্থাৎ পশম কেটে সুতা প্রস্তুতকারক। তিনি তুসে নিজের দোকানে সুতা বিক্রি করতেন। এ কারণেই "গাজ্জালী" নিসবাটি অধিক প্রসিদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য হয়েছে।
৫. ইমাম জালালুদ্দীন আস-সুয়ূতী (৮৪৯-৯১১ হি./১৪৪৫-১৫০৫ খ্রি.):
তিনি উভয় মত উল্লেখ করলেও স্পষ্টভাবে বলেন, প্রসিদ্ধ ও অধিক গ্রহণযোগ্য মত হলো গাযযাল পেশার দিকে নিসবা করে গাজ্জালী উচ্চারণ।
৬. ইমাম মুরতাদা আয-যাবিদী (১১৪৫-১২০৫ হি./১৭৩২-১৭৯০ খ্রি.):
তিনি উল্লেখ করেন যে, গাযালা তুসের একটি গ্রামের নাম। কোনো কোনো আলিম এই গ্রামের প্রতি নিসবা করে গাযালী উচ্চারণ করেছেন। তবে তিনি ইবনুল আছীরের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেন, প্রসিদ্ধ ও অধিক গ্রহণযোগ্য মত হলো গাযযালী, যা পেশাভিত্তিক নিসবা'।
দ্বিতীয় মত: জন্মস্থানের দিকে নিসবা করে "গাজালী"
অন্য একটি মত অনুযায়ী, ইমাম গাজ্জালীর নিসবা তাঁর জন্মস্থান তুসের নিকটবর্তী গাযালা (غزالة) গ্রামের প্রতি। এ মত অনুসারে তাঁর নাম "আল-গাযালী" (الغزالي) হবে, যেখানে যাই (ز)-এ শাদ্দাহ থাকবে না।
১. ইমাম নববী (৬৩১-৬৭৬ হি./১২৩৩-১২৭৭ খ্রি.):
তিনি উল্লেখ করেন যে, যদিও সাধারণভাবে তাঁকে গাজ্জালী বলা হয়, তবু একটি বর্ণনায় ইমাম গাজ্জালী নিজেই বলেছেন:
"আমি গাজ্জালী নই; বরং গাজালী। কারণ আমার নিসবা তুসের নিকটবর্তী গাযালা গ্রামের প্রতি'।" অর্থাৎ এখানে তিনি বংশীয় পেশাগত উপাধি থেকে জন্মস্থানের নিসবা গ্রহণকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
২. সালাহুদ্দীন সাফাদী (৬৯৬-৭৬৪ হি./১২৯৬-১৩৬৩ খ্রি.)
তিনি একই ধরনের একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করেন। সেখানে বলা হয়েছে: "লোকেরা আমাকে গাযযালের (পেশাগত নিসবা) সঙ্গে সম্পর্কিত মনে করে। অথচ আমি গাযালী; কারণ আমার নিসবা গাযালা নামক গ্রামের প্রতি।"
সারসংক্ষেপ:
ঐতিহাসিক ও তাবাকাত গ্রন্থসমূহ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, "গাজ্জালী" উচ্চারণ ও বানানই অধিক প্রসিদ্ধ এবং অধিকাংশ জীবনীকার, ভাষাবিদ ও ইতিহাসবিদের নিকট অধিক গ্রহণযোগ্য। সিরিয়ার আরবি একাডেমির গবেষক মুহাম্মদ ইবন আবু শানাব শাদ্দাসহ "গাজ্জালী" বানানকেই ভাষাগতভাবে অধিক সঠিক বলে মত প্রকাশ করেছেন। যার প্রধান ভিত্তি হলো ইমাম গাজ্জালীর পারিবারিক পেশা, অর্থাৎ গাযযাল (পশম কেটে সুতা প্রস্তুতকারী)।
অন্যদিকে, "গাজালী" উচ্চারণের পক্ষে যে বর্ণনা ইমাম নববী (রহ.) ও সাফাদী (রহ.) উদ্ধৃত করেছেন, তার সনদ শক্তিশালী নয়। ফলে এটিকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা কঠিন। এ কারণে অধিকাংশ মুহাক্কিকের নিকট গাযযাল পেশা থেকে উদ্ভূত "গাজ্জালী" নিসবাটিই অধিকতর শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য বলে প্রতীয়মান হয়।
তবে এটাও সঠিক যে, "গাজালী" মতটি প্রাচীন গ্রন্থসমূহে উল্লেখিত একটি ঐতিহাসিক মত। তাই একে সম্পূর্ণ অশুদ্ধ বলা যাবে না। গবেষণার আলোকে বলা যায়, "গাজ্জালী" অধিক প্রসিদ্ধ ও অধিক গ্রহণযোগ্য হলেও "গাজালী"-ও একটি স্বীকৃত, ঐতিহাসিক উচ্চারণ ও বানান।
মোদ্দা কথা: কেউ যদি উনার পেশাগত উপাধির দিকে নিসবা করেন তবে গাজ্জালী এবং জন্মস্থানের দিকে নিসবা করলে গাজালী। দুটোই শুদ্ধ। কোনটাকেই ভুল বলা যাবে না। তবে অধিক গ্রহণযোগ্য ও প্রসিদ্ধ হচ্ছে ❝গাযযালী❞।
শুধু ইমাম গাজ্জালী (রহ:) এঁর ক্ষেত্রে নয় বরং প্রায় শতাধিক ব্যক্তিদের নামের উপাধিতে এমন তারতম্য পরিলক্ষিত হয়। সেগুলো উল্লেখ করলে লেখার কলেবর বৃদ্ধি পেয়ে পাঠকদের ধৈর্য চ্যুতি হতে পারে বিধায় সংক্ষেপ করা। আর এগুলো উনাদের নাম নয় বরং নামের পরিচিত (উপাধি) বা নিসবা।

[বি: দ্র: আসলে গাজ্জালী (যা উনার পূর্বপুরুষদের পেশা থেকে আগত) এবং গাজালী (যা উনার জন্মস্থান থেকে আগত) একই ব্যক্তির উপাধি, তবে এক নয় বরং প্রেক্ষাপট ভিন্ন। দু'টো শব্দের মিল থাকায় কিছুটা বিভ্রান্তি দেখা দেয়। যদি উনার জন্মভূমি গাজালা না হতো, তবে হয়তো এই সংশয় সৃষ্টি হতো না। কাজেই এটা স্পষ্ট যে, গাজ্জালী ও গাজালী দুটোই সঠিক। তবে গাজ্জালী বহুল ব্যবহৃত এবং মশহুর। - লেখক]
Note:

1. ইবনুল আছির, আবুল হাসান আলী ইবন আবীল কারম মুহাম্মদ ইবন মুহাম্মদ ইবন আব্দুল করিম ইবন আব্দুল ওয়াহেদ, আল লুবাব ফী তাহরীরিল আনসাব, (বৈরুত: দারু সাদির), খ. ২, পৃ. ৩৭৯।
2. ইবনে খাল্লিকান, আবুল আব্বাস শামসুদ্দীন আহমদ ইবন মুহাম্মদ ইবন ইব্রাহীম ইবন আবু বকর, (বৈরুত: দারু সাদির), খ. ১, পৃ. ৯৮।
3. ইমাম যাহাবী, সামসুদ্দীন আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবন আহমদ ইবন উসমান, সিয়ারু আলামিন নুবালা, (বৈরুত: মুয়াসসাতুর রিসালাহ, ৩য় মুদ্রণ, ১৯৮৫), খ. ১৯, পৃ. ৩৪৩।
4. সুবকী, তাজ উদ্দীন আব্দুল ওহাব ইবন তাকী উদ্দীন সুবকী, তাবাকাতুশ শাফেয়িয়্যাহ আল-কুবরা, (কায়রো: দারুল হিজর, ২য় মুদ্রণ, ১৪১৩হি.), খ. ৬, পৃ. ১৯৩।
5. ইমাম সুয়ূতী, আব্দুর রহমান ইবন আবু বকর জালালুদ্দীন, লুব্বুল লুবাব ফী তাহরীরিল আনসাব, (বৈরুত: দারু সাদির), পৃ. ১৮৬।
6. যাবিদী, মুহাম্মদ ইবন মুহাম্মদ ইবন আব্দুর রাজ্জাক হুসাইনী, তাজুল আরুস মিন জাওয়াহিরুল কামুস, বৈরুত: দারুল হিদায়াহ, খ.৩০, পৃ. ৯৭।
7. নববী, আবু যাকারিয়া মুহি উদ্দীন ইয়াহিয়া ইবন শারাফ, আত তিবইয়ান ফী আদাবি হামালাতিল কুরআন, (বৈরুত: দারু ইবন আল-হাযম, ৩য় মুদ্রণ, ১৯৯৪), পৃ. ২১৫।
8. সাফাদী, সালাহ উদ্দীন খলিল ইবন আইবেক ইবন আব্দুল্লাহ, আল-ওয়াফী বিল ওফায়াত, (বৈরুত: দারু ইহইয়াউত তুরাস, ২০০০), খ. ১, পৃ. ২১৩।

[এডমিনের ভাষ্য: এ লেখাটিতে সমস্ত গবেষণাই লেখকের। এডমিন এতে জড়িত নই, আর সম্পাদনাও করা হয়নি।]

সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬

কারবালার ঘটনায় সাহাবা ও তাবিঈ জড়িত মর্মে শিয়া অপযুক্তির জবাব

লেখক: মওলানা মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন

হাটহাজারী, চট্টগ্রাম
(৪-৮-২০২৩)

[গবেষণামূলক লেখাটি লেখকের নিজস্ব। এডমিন এ লেখার সাথে যুক্ত নন। তবে সম্পাদনা করা হয়েছে - এডমিন।]


 #ডক্টর_তাহিরুল কাদেরির একনিষ্ঠ অনুসারী শিয়াপন্থী #বাতেন ও হঠাৎ করে গজিয়ে উঠা #শিয়াল পণ্ডিতের ইজতিহাদ তথা ফাসাদাত দেখে সুন্নি ভাইদের আক্কেলগুড়ুম। তাবিয়ি শব্দের সঠিক সংজ্ঞা ও প্রয়োগ যে সমস্ত বদ-আকল ও কম-সমঝদার লোকের নাই তারা সন্মানিত সাহাবি ও তাবিয়িনদের সন্মানহানি করবে, এটাই স্বাভাবিক। কারণ তারা তাদের রুহানি পূর্বপুরুষ কুফার মেকি মহব্বতকারী কুফিদের কাছ থেকে ওয়ারিসসূত্রে "সাহাবা বিদ্বেষ"-এর মত জঘন্য ‘নেয়ামত’ লাভ করেছে। তাই তাদের প্রতিটি কথা, লেখা ও বক্তব্যে আপনি সাহাবায়ে কিরামের শানে কোন না কোনভাবে গোস্তাখি দেখতে পাবেন।

এবার আসুন স্ক্রিনশটে দুই গোস্তাখে সাহাবা-তাবিয়িনের কথার পর্যালোচনায়:
-----
#মিনহাজি বাতেনের দাবি- আটজন সাহাবি সাইয়্যিদুনা হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর হত্যায় জড়িত ছিলেন। বাতেনের জন্য কিয়ামত পর্যন্ত চ্যালেঞ্জ থাকলো যে, সে যেন সহিহ সনদের মাধ্যমে আটজন সাহাবির হযরত হুসাইন হত্যায় জড়িত থাকার প্রমাণ মুসলিম ঐতিহাসিকদের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ থেকে প্রমাণ করে।
#শিয়াল পণ্ডিত বাতেনের দ্বিতীয় দাবি হলো- মালউন ইয়াযিদের সৈন্যবাহিনীতে ২২ হাজার সেনা তাবিয়ি ছিল। এতবড় গর্দভ মার্কা কথা এই পর্যন্ত কোন ইরানি শিয়াও বলেছে বলে আমাদের জানা নেই। বিগত চৌদ্দশত বৎসরের ইসলামের ইতিহাসে তো থাকার প্রশ্নই আসে না। অথচ হাজারো ইমাম, মুজতাহিদ ও ঐতিহাসিক কারবালার ঘটনা কমবেশি নিজেদের গ্রন্থে তুলে ধরছেন-কেউ কখনো এই ধরনের মস্তিষ্কবিকৃত দাবি করেন নি। তাবিয়ির সংজ্ঞা কি- এই কথা কি ইমাম, মুজতাহিদ ও ঐতিহাসিকগণ এই সমস্ত বদ আকিদাধারী জাহেলদের চেয়ে কম জানতেন?
#যদি মালউন ইয়াযিদের সেনারা তাবিয়ি হয়, তাহলে শিয়াল পণ্ডিতদের উসূল মুতাবিক মালউন ইয়াযিদ বড় তাবিয়ি। অথচ আহলে সুন্নাতের অধিকাংশ ইয়াযিদকে তাবিয়ি হিসেবে স্বীকৃতি দেননি। বরং আহলে সুন্নাতের একটি উল্লেখ্যযোগ্য অংশ ইয়াযিদ ও তার সহযোগীদের লানত দিয়েছেন। যদি তারা তাবেয়ির সংজ্ঞার আওতায় হতো, তাহলে কোন ইমামের সেই দুঃসাহস কি ছিলো যে তাঁরা ওই সন্মানিত তাবিয়ি রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমকে লানত করবেন, সহিহ হাদিস শরীফে আল্লাহর হাবিব ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম যাঁদেরকে জাহান্নাম স্পর্শ করবেনা বলে সুসংবাদ দিয়েছিলেন?
#আজ এই সাহাবি বিদ্বেষী জাহিলদের রুহানি আব্বা বেঈমান কুফিদের কিতাব থেকেই প্রমাণ করবো- মালউন ইয়াযিদের হুকুমে দুনিয়া লাভের জন্য বিক্রি হওয়া মেকি মহব্বতকারী কুফি শিয়ারাই সাইয়্যিদুনা হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুকে শহিদ করেছে।
------
💥শিয়াদের খাতেমুল মুহাদ্দিসিন, মুল্লা বাকের মজলিসি লিখেন-
"وکان جمیع من حضر مقتل حسین من العساکر وحاربه وتولی قتله من اھل الکوفة خاصة لم یحضرھم شامی۔"
[کتاب بحار الانوار ج ۱۰ ص ۲۳۱]
-ঐ সমস্ত লোক যারা হযরত হুসাইনের শাহাদতে অংশ নিয়েছে, উনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, তাঁকে শহিদ করেছে, তারা সবাই কুফার অধিবাসী ছিল।শামের (মানে সিরিয়ার) কোন লোক ঐ হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না। [ বিহারুল আনওয়ার]
💥শিয়াদের মুহাদ্দিসে আযম, ঐতিহাসিক মাসউদি লিখেন-
"وتولی قتله من اھل الکوفة خاصة لم یحضرھم شامی۔"
[ مروج الذھب ]
- হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুকে একমাত্র কুফিরা (শিয়ারা) হত্যা করেছে। ওখানে কোন শামবাসী উপস্থিত ছিল না।
[মুরাওওয়াজুয যাহাব]
💥শিয়া মুজতাহিদ আলি বিন হাদি বলেন-
"لیس فیھم شامی ولا حجازی بل جمیعھم من اھل الکوفة۔"
[خلاصة المصائب ص ۲۰۱]
- হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর হত্যাকারীদের মধ্যে শাম ও হিজাযের কেউ ছিলেন না, বরং সবাই কুফার অধিবাসী ছিলো।
[খুলাসাতুল মাসায়িব]
💥কারবালা থেকে যখন ইমাম যায়নুল আবেদিন রাদিয়াল্লাহু আনহুউসহ পরিবারের অবশিষ্টদের কুফায় আনা হলো, তখন আহলে বাইতের সন্মানিত সদস্যদের দেখে কুফার মহিলারা ঘর থেকে বের হয়ে এসে কাঁদতে লাগলো। এই দৃশ্য দেখে ইমাম যায়নুল আবেদিন রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন-
"لما دخل علی بن الحسین الکوفة رای نساءھا یبکین ویصرخن فقال! ھٰؤلاء یبکین علینا فمن قتلنا؟ ای من قتلنا غیرھم م!
[تاریخ یعقوبی ج ۱ ص ۲۳۵]
- এরা যদি আমাদের জন্য কান্না করে, তাহলে আমাদেরকে শহিদ করলো কারা??
[তারিখে ইয়াকুবি- শিয়া মুজতাহিদ ও ঐতিহাসিক আহমদ বিন ইয়াকুব]
💥শিয়াদের ষষ্ঠ হিজরির সবচেয়ে বড় মুহাদ্দিস, আবু মনসুর আহমদ কুফি- কুফায় আহলে বাইতকে দেখে মহিলা ও পুরুষদের কান্না, মাতম ইত্যাদির কথা লিখে ইমাম যায়নুল আবেদিনের বক্তব্য উল্লেখ করেন। ইমাম বলেন- " এই কুফার লোকেরা কান্না করছে। কিন্তু তারা ছাড়া আমাদেরকে কারা হত্যা করেছে??
[احتجاج طبرسی ص ۱۵۸]
[ইহতিজাজে তাবরিসি]
#উপরোক্ত কথাগুলো কিছু শব্দের ভিন্নতায় শিয়াদের আরো গ্রন্থে উল্লেখ আছে, যা ইমাম যায়নুল আবেদিন রাদিয়াল্লাহু আনহু বেঈমান কুফাবাসীকে উদ্দেশ্যে করে বলেছিলেন। মানে আমাদেরকে কুফার শিয়ারাই শহিদ করেছে। যেমন-
👉 জালাউল উয়ুন, বাকের মজলিসি
-বিহারুল আনওয়ার- বাকের মজলিসি খন্ড ৫৫, পৃষ্ঠা৩৪
👉 ইহতিজাজে তাবরিসি- আবু মনসুর আহমদ, পৃষ্ঠা১৫৯।
💢সাইয়্যিদুনা হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর আপন বোন সাইয়্যিদাহ যায়নাব বিনতে আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুমা, সাইয়্যিদুনা ইমাম বাকির রাদিয়াল্লাহু আনহু, সাইয়্যিদাহ উম্মে কুলসূম রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা ও সাইয়্যিদুনা হুসাইনের মেয়ে সাইয়্যিদাহ ফাতেমা বিনতে হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহাও মায়াকান্নাকারী কুফার বেঈমান কুফিদের উদ্দেশ্যে একই ধরনের কথা বলেন। তথ্য জানার জন্য দেখুন-
👉 মুল্লা বাকির মজলিসির জালাউল উয়ুন, পৃষ্ঠা ৫০৩, ৩২৬
👉 নাসিখুত তাওয়ারিখ- মির্জা মুহাম্মদ তক্বি সিপেহর, পৃষ্ঠা ৩০১।
-----------