ব্লগ সংরক্ষাণাগার

বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

পবিত্র কালেমাই তাওহীদ ও রিসালাতের বাণী

  - ইমরান বিন বদরী


বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
নাহমাদুহু ওয়া নুসল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম
আম্মা বা’দ

সৃষ্টির আদিকাল থেকে যুগে যুগে একত্ববাদের প্রচারে সত্য ও রিসালতের বাণী নিয়ে প্রেরিত হয়েছেন অগণিত নবী ও রাসূল (আ:)। জগতের মহান প্রভু, রাব্বুল আলামীনের প্রতিনিধি বা খলীফা হয়ে বিশ্ব মানবতার মুক্তির জন্য এসেছিলেন তাঁরা। এঁদের মধ্যে কেউ ছিলেন নবী (আ:), আবার কেউ বা আল্লাহ তায়ালার প্রেরিত রাসুল (আ:)। আল্লাহ ও রাসূল নাম দু’টি, তাওহীদ ও রিসালতের একে অপরের পরিপূরক।

কোনো ঈমানদারের জন্যে যেমন আল্লাহর একত্ববাদের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা ফরয, তেমনি তাঁর প্রিয় রাসূল দো’জাহানের সরদার বিশ্ব মানবতার মুক্তির দিশারী সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিইয়ীন, হাবীবুল্লাহ নবী মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ঈমানের সহকারে শ্রদ্ধা প্রদর্শন ও তাঁর আনুগত্য করা সমভাবে অত্যাবশ্যক।

◩ সৃষ্টি জগতে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর প্রিয় হাবীবকে নিজেই মর্যাদা প্রদান করে বলেন -

وَرَفَعْنَا لَكَ ذِكْرَكَ

অর্থাৎ, এবং আমি আপনার জন্য আপনার স্মরণকে সমুন্নত করেছি।
(সূরা আল ইনশিরাহ:০৪)

◩ বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চরিত্রের উত্তম প্রশংসা করে আল্লাহ তাআলা আরো বলেন - وَإِنَّكَ لَعَلى خُلُقٍ عَظِيمٍ
অর্থাৎ, নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্র-বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত । (সূরা আল-কালাম: ০৪)

এই মানবজাতির জন্য তিনি (আল্লাহ) মানুষকে সৎপথে চালানোর উদ্দেশ্যে দিক-নির্দেশনায় অতি উত্তম ও সুন্দর চরিত্রের নবী-রাসূল হিসেবে পৃথিবীতে যাঁদের প্রেরণ করেছেন, তাঁদের মধ্যে যিনি সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী, তিনি-ই হলেন সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসুল ‘মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ্‌’ সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়া সাল্লাম।

যাঁর প্রশংসায় মহান আল্লাহ তা’আলা তাঁর নাম রেখেছেন আহমদ এবং মুহাম্মদ।
আহমদ হ’ল সর্বাধিক প্রশংসাকারী এবং মুহাম্মদ হ’ল প্রশংসিত।

➲ পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ্‌ তা’আলা তাঁর প্রিয়তম বন্ধুকে (মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর পথে আহ্বানকারীস্বরূপ, ভয় প্রদর্শনকারী এবং সু-সংবাদদানকারী হিসেবে ব্যাপক প্রশংসামূলক আলোচনা করেছেন।

◩  প্রিয়তম বন্ধুকে সৃষ্টি জগতের রহমত হিসেবে আল্লাহ তাআলা আরো বলেন -

وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ

“হে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)! আমি আপনাকে সমগ্র জগতের জন্য রহমতস্বরূপ পাঠিয়েছি।” (আম্বিয়া: ১০৭)

◩ আল্লাহ তাআলা তাঁর হাবীবকে রাসূল হিসেবে আরো বলেন -

قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا

“হে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) ঘোষণা করে দিন: ওহে মানবজাতি! আমি তোমাদের সকলের প্রতি মহান আল্লাহর রাসূল।” (সূরা আরাফ: ১৫৮)

◩ আল্লাহ তাআলা তাঁর হাবীব (দ:)-কে অনুসরণ করতে আরো বলেন -

قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

“হে নবী (দ:)! লোকদের বলে দিন: তোমরা যদি প্রকৃতই আল্লাহকে ভালোবাস, তবে আমাকে অনুসরণ করো, তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুণাহসমূহ মাফ করে দেবেন। তিনি বড় ক্ষমাশীল ও দয়ালু।” (সূরা আল-ইমরান: ৩১)

➲ মহান রাব্বুল আলামীন, তাঁর নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে যেমন প্রশংসা করেছেন, তেমনি মহান আল্লাহ তা’আলা তাঁর প্রেমিক এবং তাঁরই বান্দা ও রাসূল হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাধ্যমে নিজের পরিচয় এবং প্রশংসাও গ্রহণ করেছেন, যা সারা পবিত্র কুরআনে বিদ্যমান। এখানে সেই সব প্রশংসার কিছু আয়াত বিবৃত করতে সচেষ্ট হলাম।

◩ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে -

قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ
اللَّهُ الصَّمَدُ
لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ
وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ

“হে নবী! আপনি বলে দিন, আল্লাহ, তিনি এক। আল্লাহ, তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তিনিও কারো থেকে জন্ম নেননি। এবং তাঁর সমতুল্য কেউ-ই নেই।” (সূরা ইখলাস)

◩ আল্লাহ তাআলা আরো বলেন -

اللّهُ لاَ إِلَـهَ إِلاَّ هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ لاَ تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلاَ نَوْمٌ لَّهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الأَرْضِ

“তিনি আল্লাহ! তিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই (ইলাহ নেই)। তিনি চিরজীবী, চিরস্থায়ী। তাঁকে তন্দ্রা বা নিদ্রা স্পর্শ করে না। আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সমস্ত তাঁর-ই।” (সূরা বাকারা: ২৫৫)

◩ আরো ইরশাদ হচ্ছে -

وَهُوَ اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ لَهُ الْحَمْدُ فِي الْأُولَى وَالْآخِرَةِ وَلَهُ الْحُكْمُ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ

“তিনি আল্লাহ! তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই (উপাস্য নেই)। তাঁরই জন্যে সমস্ত প্রশংসা দুনিয়া ও আখিরাতে। শাসন কর্তৃৃত্ব ও সার্বভৌমত্ব কেবলমাত্র তাঁর-ই। এবং তোমরা তাঁর-ই কাছে ফিরে যাবে।” (সূরা কাছাছ: ৭০)

➲ আসলে বন্ধুরা, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর গুণাবলীর বর্ণনা একমাত্র আল্লাহর দ্বারাই শেষ হতে পারে, মানুষের দ্বারা সম্ভব নয়।

সৃষ্টি জগতে মহান রাব্বুল আলামীনের একত্ববাদের বিকাশ ও পরিচয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমেই হয়েছে। তাই আল্লাহ তায়ালার নামের পাশে তার রাসূলের নামের সংযোজন।

আল্লাহ তা‘আলার একত্ববাদের ওপর বিশ্বাস স্থাপনের সাথে সাথে তাঁর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামে রিসালতের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

তাই শোভা পাচ্ছে কালিমায়ে তাইয়্যিবায় লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ (لاَ اِلهَ إِلاَّ اللهُ) আর মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (مُحَمَّدٌ رَّسُوْلُ اللهِ) (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ)।

অর্থাৎ: আল্লাহ ভিন্ন কোনো মা’বুদ নাই, মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর রাসুল।

এক আল্লাহর একত্ববাদের পূর্ণ পরিচিতি কেবল নবী মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমেই পাওয়া সম্ভব। কালেমা ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসসম্বলিত কয়েকটি আরবি পংক্তির নাম। এর মাধ্যমেই ইসলামের প্রথম স্তম্ভ শাহাদাহ্‌ পূর্ণতা পায়।

لا اله الا الله محمد رسول الله

কালেমা শরীফের মূল শিক্ষা হচ্ছে আল্লাহ পাক রাব্বুল আ'লামীনকে ইলাহ বা মা'বুদ//স্রষ্টা হিসেবে মানা এবং তাঁর ওপর ঈমান আনা; সেই সাথে নুরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুজুরে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে আল্লাহ পাকের রাসূল সে বিষয়েও ঈমান আনা।

◩ এ প্রসংঙ্গে স্বয়ং আল্লাহ পাক আরো ইরশাদ করেন -

إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ

অর্থ: নিশ্চয়ই প্রকৃত মুমিন তো তারাই, যারা আল্লাহর ও রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে (সূরা নূর আয়াত: ৬২)

এই আয়াত থেকে বোঝা গেল, আল্লাহ পাক রাব্বুল আ'লামীনের সাথে সাথে তাঁর প্রিয় রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) প্রতি ঈমান আনাকে আল্লাহ শর্ত করে দিয়েছেন।

আর সে কারণেই মু'মিন মুসলমানদের ঈমান ও আক্বীদার মূল কালিমা হচ্ছে -

لا اله الا الله محمد رسول الله

কালেমা তাইয়্যেবা হচ্ছে আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন তাঁর প্রিয় রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উম্মতগণকে চির সুখময় জান্নাত প্রদানের জন্য যে বেশ কিছু পথ ও পাথেয় নির্ধারণ করে রেখেছেন এগুলোর অন্যতম।

◩ কালেমায়ে তাইয়্যেবার একটা অতুলনীয় উদাহরণ দিয়েছেন আল্লাহ তাআলা যেমন -

أَلَمْ تَرَ كَيْفَ ضَرَبَ اللّهُ مَثَلاً كَلِمَةً طَيِّبَةً كَشَجَرةٍ طَيِّبَةٍ أَصْلُهَا ثَابِتٌ وَفَرْعُهَا فِي السَّمَاء

তুমি কি লক্ষ্য করো না, আল্লাহ তা’আলা কেমন উপমা বর্ণনা করেছেন: পবিত্র বাক্য হলো পবিত্র বৃক্ষের মতো। তার শিকড় মজবুত এবং শাখা আকাশে উত্থিত।

تُؤْتِي أُكُلَهَا كُلَّ حِينٍ بِإِذْنِ رَبِّهَا وَيَضْرِبُ اللّهُ الأَمْثَالَ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ

সে পালনকর্তার নির্দেশে অহরহ ফল দান করে। আল্লাহ মানুষের জন্যে দৃষ্টান্ত বর্ণণা করেন, যাতে তারা চিন্তাভাবনা করে।

وَمَثلُ كَلِمَةٍ خَبِيثَةٍ كَشَجَرَةٍ خَبِيثَةٍ اجْتُثَّتْ مِن فَوْقِ الأَرْضِ مَا لَهَا مِن قَرَارٍ

এবং নোংরা বাক্যের উদাহরণ হলো নোংরা বৃক্ষ। একে মাটির ওপর থেকে উপড়ে নেয়া হয়েছে। এর কোনো স্থিতি নেই।

يُثَبِّتُ اللّهُ الَّذِينَ آمَنُواْ بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الآخِرَةِ وَيُضِلُّ اللّهُ الظَّالِمِينَ وَيَفْعَلُ اللّهُ مَا يَشَاء

আল্লাহ তা’আলা মু’মিনদেরকে মজবুত বাক্য দ্বারা মজবুত করেন। পার্থিবজীবনে এবং পরকালে। এবং আল্লাহ জালেমদেরকে পথভ্রষ্ট করেন। আল্লাহ যা ইচ্ছা, তা-ই করেন। (সূরা ইব্রাহীম: ২৪-২৭)

লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাঠ করে সে অনুযায়ী আমল করা প্রত্যেকের প্রতি ফরজ।

◩ প্রসিদ্ধ হাদীসে জিব্রাইলে হজরত জিব্রাইল (আ:) যখন সাহাবীদের মাঝে এসে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে বসে একের পর এক প্রশ্ন করে সাহাবীদের শিক্ষা দিচ্ছিলেন, তখন জিব্রাইল (আ:) ইসলাম সম্পর্কে জানতে চাইলে আল্লাহর হাবীব (দ:) বলেন -

فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه و سلم الْإِسْلَامُ

*** أَنْ تَشْهَدَ أَنْ لَا إلَهَ إلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ ***

"আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নাই এবং নিশ্চয় মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর রাসুল"

এটাই তো কালেমা।

সহীহ মুসলিম শরীফের ঈমান অধ্যায়ে বর্ণিত হাদিসটিতে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, আমাকে আমার পিতা উমর ইবনু খাত্তাব রাদিআল্লাহু আনহু হাদীসটি শুনিয়েছেন।

➲ উপরোক্ত হাদীসের মর্মার্থ-ই কালেমা তাইয়্যেবাকে অন্যান্য রোকন যথা নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাত এবং কিয়ামতের শিক্ষার চেয়ে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে; কালেমা তথা ইসলামের মূল বুনিয়াদের কথা এতে আলোচনা করা হয়েছে।

◩ মহান আল্লাহ পাক সূরাহ ফাতহ-এর ২৯ নং আয়াতটি শুরু করেছেন - مُّحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ
"মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ" বাক্যটি দ্বারা।

◩ এছাড়াও তাওহীদ ও রিসালাতের ঘোষণায় ইসলামের ৫টি ভিত্তির মধ্যে ১টির অন্তর্ভুক্ত কালেমা:

حَدَّثَنَا عُبَيْدُ اللَّهِ بْنُ مُوسَى، قَالَ أَخْبَرَنَا حَنْظَلَةُ بْنُ أَبِي سُفْيَانَ، عَنْ عِكْرِمَةَ بْنِ خَالِدٍ، عَنِ ابْنِ عُمَرَ ـ رضى الله عنهما ـ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " بُنِيَ الإِسْلاَمُ عَلَى خَمْسٍ شَهَادَةِ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، وَإِقَامِ الصَّلاَةِ، وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ، وَالْحَجِّ، وَصَوْمِ رَمَضَانَ

হজরত উবায়দুল্লাহ্ ইবনু মূসা (রা:) ইবনু উমর রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি:

১। لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ
আল্লাহ্ ছাড়া ইলাহ্ নেই এবং নিশ্চয় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম আল্লাহ্‌র রাসূল - এ কথার সাক্ষ্য দান।
২। সালাত (নামায/নামাজ) কায়েম করা
৩। যাকাত দেওয়া
৪। হাজ্জ (হজ্জ) করা, এবং
৫। রামাদান-এর সিয়াম পালন করা।
(সহীহ বুখারি/ঈমান)

◩ আবূ সালামা ইয়াহইয়া ইবনু খালাফ বাসরী (রহ:) আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত:

আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি কোনো ইলাহ নেই আল্লাহ্ ছাড়া, আর মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) তাঁর বান্দা ও তাঁর রাসূল।
(জামে তিরমিজী /কাফন-দাফন)

◩ ইসহাক ইবনু ইবরাহীম (রহ:) আনাস ইবনু মালিক রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত:

"যে কোনো বান্দা আন্তরিকতার সাথে এ সাক্ষ্য দেবে যে, ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর রাসূল’, তার জন্য আল্লাহ তা‘আলা জাহান্নাম হারাম করে দেবেন।
(সহীহ বুখারি (ইফা) ইলম বা জ্ঞান)

◩ আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহ:) আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত:

”আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ভিন্ন কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর রাসূল।”
(সহীহ বুখারি (ইফা)সালাত)

#হজরত মু’আয বিন জাবাল রাদিআল্লাহু আনহুর বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, তাবুক অভিযানের আগে আল্লাহর রাসূল (দ:) লোকদেরকে নিয়ে (রাত্রিকালীন সময়ে) বের হন; অতঃপর ভোর হলে তিনি ফজরের সালাত আদায় করেন। (সালাত শেষে) কাফেলার লোকজন আরোহণ করে অগ্রসর হতে থাকে। অতঃপর সূর্য উদিত হওয়ার পর (লোকজন রাত্রি সফরের ক্লান্তিবশতঃ) তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে; কিন্তু হযরত মু’আয রাদিআল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুসরণ থেকে মুহূর্তের জন্যও বিচ্যুত হননি (বরং
একনিষ্ঠভাবে তাঁর সংসর্গে থাকেন)। অথচ (ওই সময়) লোকজন তাদের পরিবাহী পশুদেরকে নিয়ে সমতল ও মসৃন রাস্তায় ও আশপাশে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন; তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল পশুদেরকে খাবার খাওয়ানো ও ভ্রমণ করা। এদিকে হযরত মু’আয রাদিআল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুসরণ অব্যাহত রাখেন। রাসূল (দ:)-এর উষ্ট্রী যখন ঘাস খাচ্ছিল এবং (আপনমনে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছিল), এমতাবস্থায় হযরত মু’আয রাদিআল্লাহু আনহু-এর উষ্ট্রীর পা (হঠাৎ) পিছলে যায়, আর  তিনি লাগাম ধরে টান দেন। এতে তাঁর উষ্ট্রী দ্রুত চলতে থাকে, ফলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উষ্ট্রীও (ভয়ে) কিছুটা দূরে সরে যায়। এই পর্যায়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাওদার পর্দা সরিয়ে বাইরের দিকে তাকান। তিনি দেখতে পেলেন সৈন্যদের মধ্যে মু’আয রাদিআল্লাহু আনহু-এর চেয়ে কাছে আর কেউই নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে ডাকলেন এই বলে, ওহে মু’আয (এদিকে আস)। মু’আয বললেন, আমি হাজির ইয়া রাসূলাল্লাহ (দ:)! তিনি বললেন, আরো কাছে আস। মু’আয কাছে এগিয়ে গেলেন, এমনকি তাঁদের বাহন দু’টি একটি অপরটির সাথে মিলিত হয়ে যায়। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি চিন্তাও করিনি (সেনাবাহিনীর) লোকজন (আমার কাছ থেকে) এতো দূরে অবস্থান করছে। মু’আয রাদিআল্লাহু আনহু বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! লেকজন তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল, এই সুযোগে তাদের বাহনগুলো তাদেরকে নিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং (আপন মনে) ঘাস খেয়ে বেড়াচ্ছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমিও তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম। (এবার মু’আয যখন রাসূলের চেহারার ঔজ্জ্বল্য দেখতে পেলেন এবং নির্জনতার সুযোগ পেলেন, তখন বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমাকে অনুমতি দিন, আমি আপনাকে এমন একটি প্রশ্ন করবো, যা আমাকে রুগ্ন, ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত ও চিন্তাযুক্ত করে ফেলেছে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যা খুশী প্রশ্ন করো। মু’আয রাদিআল্লাহু আনহু বললেন, আমাকে এমন একটি কাজের কথা বলুন যা আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে - এছাড়া আমি আপনার কাছে অন্য কোনো প্রশ্ন করবো না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, বাহ, বাহ, বাহ, নিশ্চয় তুমি অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন করেছ। কথাটি তিনি তিনবার বললেন, (জেনে রাখ), এ বিষয়টি আল্লাহ যার মঙ্গল চান তাঁর জন্য খুবই সহজ। এর পরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে যে কথাটি বলেছেন, তা তিনবার করে পুনরাবৃত্তি করেছেন, যেন কথাগুলোর গুরুত্ব অনুধাবন করে মু’আয রাদিআল্লাহু আনহু তা মহানবী (দ:) থেকে আত্মস্থ করে নেন। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, বিশ্বাস স্থাপন করো আল্লাহ ও শেষ দিবসের ওপর এবং সালাত কায়েম করো; ইবাদত করবে একমাত্র আল্লাহর, তাঁর সাথে কোনো কিছু শরীক করবে না, আর তোমার মৃত্যু পর্যন্ত তুমি এর ওপর অটল থাকবে। মু’আয রাদিআল্লাহু আনহু বললেন, আল্লাহর নবী, আপনি পুনরায় বলুন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথাগুলো তিনবার বলে দিলেন। এরপর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মু’আয তুমি চাইলে আমি তোমাকে সর্বোৎকৃষ্ট আমলের সার-সংক্ষেপ বলে দিতে পারি। মু’আয রাদিআল্লাহু আনহু বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ (দ:), অবশ্যই, আপনার তরে আমার মা-বাবা কুরবান হোক; আপনি বলুন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অতঃপর বললেন, সারকথা হচ্ছে: তুমি সাক্ষ্য প্রদান করবে যে আল্লাহ ভিন্ন কোনো ইলাহ নেই; তিনি এক, তাঁর কোনো শরীক-ও নেই;  আর মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। আর এ বিষয়ের মূলস্তম্ভ হচ্ছে সালাত কায়েম করা এবং যাকাত প্রদান করা। আর এর শীর্ষের বিষয় হচ্ছে জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ বা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা। আমাকে অবশ্য নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে যেন আমি কঠিন সাধনা করতে থাকি যতোক্ষণ পর্যন্ত না মানুষেরা সালাত কায়েম করে, যাকাত প্রদান করে, এবং এই সাক্ষ্য প্রদান করে যে একমাত্র আল্লাহ ভিন্ন কোনো উপাস্য নেই, তাঁর কোনো শরীক-ও নেই; আর মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) তাঁর বান্দা ও রাসূল। যদি তারা এসব মেনে নেয়, তবে তারা তাদের জীবন ও সম্পদ (এর অধিকার ব্যতিরেকে) নিরাপদ করে নিল এবং তাদের (প্রকৃত) হিসেব-নিকেশ আল্লাহরই দায়িত্বে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বললেন, মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)-এর জীবন যাঁর হাতে, সেই সত্তার শপথ, জান্নাতে উন্নততর মর্যাদা লাভের উদ্দেশ্যে যেসব ক্লেশময় আমলের জন্য মানুষের চেহারা মলিন হয় এবং পদধুলিময় হয়, সে সবের মধ্যে ফরয সালাতের পর আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের মতো অন্য আমল নেই এবং কোনো বান্দার মীযান (আখিরাতের মানদণ্ড)-কে এমন চতুষ্পদ জন্তুর চেয়ে অধিক ভারী আর কিছুই করতে পারে না, যাকে আল্লাহর রাস্তায় খরচ করা হয় অথবা আল্লাহর রাস্তায় তার ওপর আরোহণ করা হয়।

➲--- মুসনদে আহমদ

আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, আবদুল কায়েস (রা:)-এর প্রতিনিধিদল যখন মদিনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে আগমন করে, তখন তিনি জিজ্ঞেস করেন, কোন্ গোত্রের প্রতিনিধি দল (অথবা কোন্ সম্প্রদায়ের)? তারা বললেন, রাবীয়া (গোত্রের)। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, প্রতিনিধি দলকে স্বাগতম, অথবা বললেন, সম্প্রদায়কে যথাযোগ্য মর্যাদা ও সম্মান সহকারে স্বাগতম, তাঁরা যেন এতটুকু অপমানিত ও লজ্জিত না হন। তাঁরা বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমরা অনেক দুরাঞ্চল থেকে আপনার দরবারে হাযির হয়েছি, আপনি এবং আমাদের মাঝে মুদার গোত্রের কাফিরদের বাধার প্রাচীর রয়েছে। তাই আমরা ‘শাহরে হারাম’ বা পবিত্র মাস ছাড়া (অন্য কোনো সময়) আপনার দরবারে আসতে সক্ষম নই। সুতরাং আপনি (মেহেরবানী করে) আমাদেরকে এমন কিছু বিষয়ের কথা বলুন, যাতে আমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারি এবং আমাদের পেছনে যারা আছেন তাঁদের কাছেও সেই সংবাদ পৌঁছে দিতে পারি। প্রসঙ্গত তাঁরা পানীয় (ও পানীয় দ্রব্যের পাত্রাদি) সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদেরকে চারটি বিষয়ে আদেশ এবং চারটি বিষয়ে নিষেধ প্রদান করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদেরকে ‘ঈমান বিল্লাহ’-এর নির্দেশ দান করেন এবং বলেন, তোমরা কি আল্লাহর প্রতি ঈমান-এর তাৎপর্য জানো? তাঁরা বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল-ই উত্তম জ্ঞাত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সাক্ষ্য দেয়া এই মর্মে যে,
আল্লাহ ভিন্ন কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর রাসূল, সালাত কায়েম করা, যাকাত প্রদান করা, রমযানের সিয়াম পালন করা এবং তোমরা তোমাদের ‘গনীমত’ তথা যুদ্ধলব্ধ সম্পদ (অথবা প্রয়োজনাতিরিক্ত সম্পদ) থেকে এক-পঞ্চমাংশ দান করবে (আল্লাহর রাস্তায়)। এবং আল্লাহর রাসূল (দ:) তাদেরকে চারটি পানীয় পাত্রের ব্যবহার করতে নিষেধ করেন। পাত্রগুলো হচ্ছে, ‘দুব্বা’ (কদুর শুকনো খোলের তৈরি), ‘হান্তাম’ (সবুজ রংয়ের তেলযুক্ত কলস), ‘মুযাফফাত’ (নাক্বীর বৃক্ষের কাণ্ড থেকে তৈরি) ও ‘মুকায়্যার’ (ধুনা লাগানো পাত্র) [এ পাত্রগুলো তৎকালীন আরবে বিশেষ করে মদ তৈরি ও মদের পাত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো)। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ বিষয়গুলো যত্নসহকারে মনে রাখবে (পালন করবে) এবং এ বিষয়ে তোমাদের পেছনে যারা রয়েছে তাদেরকে জানিয়ে দেবে।

➲--মুসনদে আহমদ

✪ অতএব, এ কালেমা হতে আপনি সর্বপ্রথম জানতে পারেন যে আপনি আল্লাহর বান্দাহ, আর কারো বান্দাহ আপনি নন। আপনি আরো জানতে পারলেন যে আপনি যার বান্দাহ, দুনিয়ায় তাঁরই মর্জিমতো আপনাকে কাজ করতে হবে।

এ কালেমা আপনাকে আরো শিক্ষা দেয় যে, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসূল । এ কথা জেনে নেয়ার সাথে সাথে আপনি আরো জানতে পারলেন যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুনিয়াতে যে মিষ্ট ফুল এবং ফলের বাগান রচনা করার নিয়ম দেখিয়ে দিয়েছেন, আপনাকেও ঠিক সেই নিয়মেই কাজ করতে হবে। আপনি যদি সেই নিয়ম অনুসরণ করেন, তবে পরকালে ঠিকই আপনি ফসল তুলতে পারবেন।

**আল্লাহুম্মা ছাল্লি আলা মুহাম্মাদিঁও ওয়া আলা আলিহী ওয়া আস্‌হাবিহী ওয়া আহ্‌লিবাইতিহী আজমাঈন।

✪বন্ধুরা➲

আমরা প্রতিদিন
যাতে উক্ত কালেমা পাঠ করতে পারি, আসুন সেদিকে মনোযোগ নিবদ্ধ করি। পরম করুণাময় আল্লাহ আমাদের সবাইকে কালেমা শরীফ পাঠ করার তাওফীক দান করুন; মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন; মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ থেকে আমাদের উপকৃত হওয়ার তওফীক দান করুন, আমীন।

(সবাইকে অনুরোধ করছি আমার এই লেখাটিতে ভুল হলে আমাকে জানাতে ভুলবেন না প্লীজ, আপনার সঠিক মতামতে আমি উপকৃত হব)

মো’মেনবৃন্দের পরিচয় ও তাঁদের করণীয়

 -- ইমরান বিন বদরী


প্রত্যেক মুসলমান পরিপূর্ণ ঈমানদার হতে চান। তবে পরিপূর্ণ ঈমানদার হতে হলে কিছু বৈশিষ্ট্য থাকা প্রয়োজন, যা আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন তাঁর পবিত্র কালামে পাকে উল্লেখ করেছেন।

আসুন, সুরা হুজরাতের আয়াতগুলো আমরা এক্ষণে পড়ি। এখানে আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন মুমিনদেরকে বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ

ওহে মুমিনরা! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের (সামনে) অগ্রবর্তী হয়ো না এবং আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছু শুনেন ও জানেন। (আয়াত - ১)

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ وَلَا تَجْهَرُوا لَهُ بِالْقَوْلِ كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ أَن تَحْبَطَ أَعْمَالُكُمْ وَأَنتُمْ لَا تَشْعُرُونَ

ওহে মুমিনরা! তোমরা নবী (দ:)-এর কন্ঠস্বরের চেয়ে তোমাদের কন্ঠস্বরকে উঁচু করো না এবং তোমরা একে অপরের সাথে যে রকম উঁচুস্বরে কথা বল, তাঁর সাথে সে রকম উঁচুস্বরে কথা বলো না। এতে তোমাদের কর্ম নিষ্ফল হয়ে যাবে এবং তোমরা তা টেরও পাবে না। (আয়াত - ২)

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن جَاءكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَأٍ فَتَبَيَّنُوا أَن تُصِيبُوا قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوا عَلَى مَا فَعَلْتُمْ نَادِمِينَ

ওহে মুমিনরা! যদি কোন পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোন সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা পরীক্ষা করে দেখবে, যাতে অজ্ঞতাবশতঃ তোমরা কোন সম্প্রদায়ের ক্ষতিসাধনে প্রবৃত্ত না হও এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্যে অনুতপ্ত না হও। (আয়াত - ৬)

وَإِن طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا فَإِن بَغَتْ إِحْدَاهُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِيءَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ فَإِن فَاءتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ

যদি মুমিনদের দুই দল যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তবে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেবে। অতঃপর যদি তাদের একদল অপর দলের ওপর চড়াও হয়, তবে তোমরা আক্রমণকারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে, যে পর্যন্ত না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। যদি ফিরে আসে, তবে তোমরা তাদের মধ্যে ন্যায়ানুগ পন্থায় মীমাংসা করে দেবে এবং ইনসাফ করবে। নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফকারীদেরকে পছন্দ করেন। (আয়াত - ৯)

إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ

মুমিনরা তো পরস্পর ভাই-ভাই। অতএব, তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করবে এবং আল্লাহকে ভয় করবে, যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও। (আয়াত - ১০)

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَومٌ مِّن قَوْمٍ عَسَى أَن يَكُونُوا خَيْرًا مِّنْهُمْ وَلَا نِسَاء مِّن نِّسَاء عَسَى أَن يَكُنَّ خَيْرًا مِّنْهُنَّ وَلَا تَلْمِزُوا أَنفُسَكُمْ وَلَا تَنَابَزُوا بِالْأَلْقَابِ بِئْسَ الاِسْمُ الْفُسُوقُ بَعْدَ الْإِيمَانِ وَمَن لَّمْ يَتُبْ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

মুমিনরা কেউ যেন অপর কাউকে উপহাস না করে। কেননা, সে উপহাসকারী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে এবং কোন নারী অপর নারীকেও যেন উপহাস না করে। কেননা, সে উপহাসকারিণী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠা হতে পারে। তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করো না এবং একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না। কেউ বিশ্বাস স্থাপন করলে তাদের মন্দ নামে ডাকা গোনাহ। যারা এহেন কাজ থেকে তওবা না করে, তারাই যালেম। (আয়াত - ১১)

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَن يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ رَّحِيمٌ

ওহে মুমিনরা, তোমরা অনেক ধারণা থেকে বেঁচে থাক। নিশ্চয় কতেক ধারণা গোনাহ; এবং গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না। তোমাদের কেউ যেন কারও পশ্চাতে তার নিন্দা না করে। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের মাংস ভক্ষণ করা পছন্দ করবে? বস্তুতঃ তোমরা তো একে ঘৃণাই কর। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু। (আয়াত - ১২)

وَإِن تُطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ لَا يَلِتْكُم مِّنْ أَعْمَالِكُمْ شَيْئًا إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

যদি তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূল (দ:)-এর আনুগত্য কর, তবে তোমাদের কর্ম বিন্দুমাত্রও নিষ্ফল করা হবে না। নিশ্চয়, আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম মেহেরবান। (আয়াত - ১৪)

إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ ثُمَّ لَمْ يَرْتَابُوا وَجَاهَدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أُوْلَئِكَ هُمُ الصَّادِقُونَ

তারাই মুমিন, যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূল (দ:)-এর প্রতি ঈমান আনার পর সন্দেহ পোষণ করে না এবং আল্লাহর পথে প্রাণ ও ধন-সম্পদ দ্বারা জেহাদ করে। তারাই সত্যনিষ্ঠ। (আয়াত - ১৫)

ইয়া আল্লাহ, আপনি আমাদের সবাইকে পরিপূর্ণ ঈমানদার করে মৃত্যু দান করুন।
কাল কিয়ামতের দিন আপনার হাবীব সল্লাল্লাহু আলাইহে ওসাল্লামের প্রিয় উম্মত হয়ে আপনার-ই দরবারে উপস্থিত হবার তাওফিক দান করুন।
আমিন, ইয়া রাব্বাল আলামীন।

                                                    =সমাপ্ত=

তারাবীহ নামায ২০ রাকআতের দলিল

 লেখক: আলহাজ্জ্ব মুফতী এস, এম, সাকীউল কাউসার (কুমিল্লা)


২০ রাক’আত তারাবীহ’র ফয়সালা

প্রকাশ থাকে যে প্রতি রমজান মাসে এ’শার নামজের পর বিতির নামাজের পূর্বে ৪ রাকাত করে মোট ২০ রাকাত তারাবীহ’র নামাজ পড়া প্রত্যেক মুসলমান নর ও নারীর ক্ষেত্রে সূন্নতে মুয়াক্কাদাহ। অতএব, রমজান মাস ছাড়া তারাবীহ’র নামাজ নাই। তারাবীহ’র নামাজ পুরূষের জন্য জামাত সহকারে মসজিদে পড়া উত্তম। নামাজে পূর্ণ এক খতম কোরআন পড়া সূন্নাত। বেশি পড়া ভালো। ক্বদর রাত্রিতে এক খতম করা মুস্তাহাব। (সমূহ ফিকহা’র কিতাব)

কোরআন খতম করতে জামাতের লোকের কষ্ট হলে বা জামাতের লোক কমে গেলে ছোট ক্বেরাতে পড়া ভালো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ২০ রাকাআত তারাবীহ জামাত সহকারে পুরো রামাদান মাসে পড়েন নি, কারণ হিসেবে বলেছেন পুরো রামাদান মাসে জামাতে আমি তারাবীহ পড়লে তা ওয়াজিব হয়ে যাবে, এতে আমার উম্মতের কষ্ট হবে। সুবহানাল্লাহ! খোলাফায়ে রাশেদীন তথা হযরত ওমর (রা:)-এর যুগে ২০ রাকাআত তারাবীহ জামাতে পড়া নির্ধারিত হয় এবং তা ইজমায়ে উম্মত হিসেবে স্বীকৃত। যেহেতু হাদীস শরীফে বর্ণিত রয়েছে, ‘আ’লাইকুম বিস সূন্নাতি ওয়া সূন্নাতিল খোলাফায়ি রাশেদীনাল মাহদীয়ান’, অর্থাৎ, তোমরা আমার সূন্নাত ও আমার খোলাফায়ি রাশেদীনের সূন্নাত’কে আঁকড়ে ধরো।

তারাবীহ’র মর্মার্থ


তারাবীহ ২০ রাকাআত, ৮ রাকাআত নয়

তারাবীহ تراويح শব্দটি ترويح তারবীহা-এর বহুবচন, যার অর্থ হলো শরীরকে আরাম দেয়া। থেমে থেমে যে নামাজ তাকে তারাবীহ বলে। তারাবীহ’তে ৪ রাকাত পরপর থেমে তাসবীহ-দোয়া পড়া হয়। তারাবীহ’র নামাজে ৪ রাকাআত পরপর কিছু সময় বসে আরাম করা হয়। আর বসাটার নাম তারবীহা। এ জন্য এ নামাজকে তারাবীহ’র নামাজ বা আরামের সমষ্টি বলা হয়। আরবীতে বহুবচন হলো নিচে তিন উপরের কোনো সীমা নাই। যদি ৮ রাকাত তারাবীহ হয়, তাহলে তো এর মধ্যে মাত্র একবার তারবীহা পাওয়া যাচ্ছে এবং এর নাম তারাবীহ (বহুবচন) হতো না। তিন তারাবীহ’র জন্য কমপক্ষে ১৬ রাকাত তারাবীহ হওয়া দরকার; অর্থাৎ, প্রতি ৪ রাকআত পর এক তারবীহা। বিতিরের আগে কোনো তারবীহা বা বিশ্রাম নেই। অতএব, তারাবীহ-এর নামটি-ই প্রমাণ করে তারাবীহ ৮ রাকাআত নয়।

কোরআন শরীফ-ই প্রমাণ তারাবীহ ৮ রাকাআত নয়

পবিত্র কোরআন শরীফে সূরা, আয়াত ও রুকু রয়েছে। কোরআন শরীফে যে সব বিষয়বস্তুর নাম রয়েছে, সেগুলোকে সূরা বলে, আর যে সব বাক্যের ভিন্ন ভিন্ন নাম নেই, সেগুলোকে আয়াত বলা হয়। কিন্তু রূকু’কে রূকু কেন বলা হয় তা জানা দরকার। কেননা, সূরার অর্থ হলো কোনো বিষয়কে পরিবেষ্টন করা, আর আয়াত অর্থ হলো চিহ্ন, যেহেতু সূরা একটি বিষয়বস্তুকে অন্তর্ভুক্ত করে, যেমন সূরা বাক্বারা, সূরা বালাদ ইত্যাদি। আর আয়াত আল্লাহ’র কুদরতের চিহ্ন হিসেবে বিবেচ্য, তাই এ নামকরণ যথার্থ হয়েছে। কিন্তু কোরআনের রূকুকে রূকু কেন বলা হয় তা বিশ্লেষণ করে দেখা দরকার। রূকু অর্থ নত হওয়া। তাজবীদের কিতাবসমূহ দ্বারা জানা যায় যে, সর্ব-হযরত ওমর ও উছমান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা তারাবীহ’র নামাজে যে পরিমাণ কোরআন পাঠ করে রূকু’তে যেতেন, সে অংশের নাম ‘রূকু’ রাখা হয়েছে। তারাবীহ’র নামাজ ২০ রাকাআত এবং রামাদানের ২৭ তারিখে কোরআনের খতম হিসেব ধরলে, কোরআন পাকে মোট ৫৫৭ টি রূকু হওয়ার কথা। কিন্তু যেহেতু খতমের দিন কোনো কোনো রাকাআতে ছোট ছোট দু’তিন সূরা এক সাথে পড়ে ফেলা হতো, সে জন্য কোরআন শরীফে ৫৪০ টি রূকু রয়েছে। যদি ৮ রাকাআত তারাবীহ’র নামাজ হতো, তাহলে রূকুর সংখ্যা হতো ১১২ টি। সুতরাং কোরআনের রূকুর সংখ্যা-ই প্রমাণ করে তারাবীহ’র নামাজ ২০ রাকাত। কোনো আহলে হাদীস বা সালাফী-নজদী ৮ রাকাআত তারাবীহ’র সমর্থনে কোরআন শরীফের রূকুর কোনো ব্যাখ্যা কিয়ামত পর্যন্ত দিতে পারবে না। চ্যালেঞ্জ রইলো!!!

হাদীস শরীফের আলোকে

খোলাফায়ি রাশেদীনের ২য় খলীফা হযরত ওমর (রা:)-এর শাসনামলে তিনি বিশ রাকাআত তারাবীহ জামাত-সহ আদায়ের ব্যবস্থা করেন। এ ব্যাপারে সাহাবায়ে কিরাম রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম একমত ছিলেন।

১) ‘মুয়াত্তা ইমাম মালেক’ কিতাবে হযরত সায়েব ইবনে ইয়াযিদ (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন -
قال سنا نقوم فى عهد عمر بعشرين ركعةً ( رواه البيهقى فى الفرقة باسناد صحيح) অর্থাৎ, হযরত ওমর (রা:)-এর যুগে লোকেরা ২০ রাকাআত তারাবীহ’র নামাজ আরম্ভ করে, সহীহ সনদে বায়হাকী শরীফে তা বর্ণিত হয়েছে।

২) হযরত ইবনে মনি হযরত আবি ইবনে কা’ব (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন- فصلِىٍ بهم عشرين ركعة অর্থাৎ, তাঁরা (সাহাবাগণ) ২০ রাকাআত তারাবীহ’র নামাজ পড়তেন।

৩) বায়হাকী শরীফে বর্ণিত আছে- عن ابى الحسنات انً علىِ ابن ابى طالب امر رجلآ يصلىٍ بالناس خمس ترويخات عشرين ركعةً অর্থাৎ, আবিল হাসনাত হতে বর্ণিত আলী ইবনে আবি তালিব (রা:) বলেন, মানুষের জন্য ৫ ওয়াক্ত নামাজ ও ২০ রাকাআত তারাবীহ।

৪) ইবনে আবি শিবা, তিবরানী, কবীর, বায়হাকী, আবদ ইবনে হামিদ ও বগবী বর্ণনা করেছেন - عن ابى عباس انً النبىً صلى الله عليه وسلم كان يصلى فى رمضان عشرين ركعة سوى الوتر অর্থাৎ, হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণনা করেন নবী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম রমজান মাসে বিতির ছাড়া ২০ রাকাআত তারাবীহ’র নামাজ আদায় করেছেন।

এ হাদীস শরীফ দ্বারা প্রমাণিত হলো যে স্বয়ং হুজূর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ২০ রাকাআত তারাবীহ’র নামাজ পড়তেন।

ওলামায়ে উম্মতের অভিমত

(১) তিরমীজি শরীফের ‘সওমের’ আলোচনায়- ما جاء فى قيام شهر رمضان নামক অধ্যায়ে বর্ণিত আছে -
و اكثر اهل العلم على ماروىَ عن علىٍ و عمر و غيرهما من اصحاب النبى صلى الله عليه وسلم عشرين ركعة و هو قول سفيان رالثورى وابن المبارك و الشافعى وقال الشافعى هكذا ادركت ببلد مكة يصلون عشرين ركعة –
অর্থাৎ, আহলে ইলমের আমল এটার উপর, যা সর্ব-হযরত আলী, ওমর ও অন্যান্য সাহাবায়ে কিরাম রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম থেকে বর্ণিত আছে; অর্থাৎ, ২০ রাকাআত। এটাই সর্ব-হযরত সুফীয়ান ছাওরী (রহ:), ইবনে মুবারক (রহ:), ইমাম শাফেঈ (রহ:) প্রমুখের অভিমত। ইমাম শাফেঈ (রহ:) স্বীয় শহর পবিত্র মক্কায় এই অনুশীলন দেখতে পান, অর্থাৎ, মুসলমানেরা ২০ রাকাআত তারাবীহ পড়তেন।

ওলামায়ে উম্মতের অভিমত


(২) روى محمد ابن نصر من طريق عطاء قال ادركتهم يصلون عشرين ركعة ؤثلث ركعات الوتر وفى الباب اثار كثيرة اخرجها ابن ابى شيبة وغيره وقال ابن قدامة وهذا كالاجماع – এতে বোঝা গেল বিশ রাকাআতের উপর মুসলমানদের ঐকমত্য হয়েছে।

(৩) উমদাতুল ক্বারী শরহে বুখারী ৫ম খণ্ডের ৩০৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, وروى الحارث ابن عبيد الرحمن ابن ابى ذياد عن السائب هلبن يزيد قال كان القيام على عهد عمر بثلثٍ و عشرين ركعة قال ابن عبد الله هذا محمول على ان الثلث للوتر - অতএব, এর থেকে জানা গেলো যে, সাহাবায়ে কিরাম (রা:)-এর যুগে ২০ রাকাআত তারাবীহ ও ৩ রাকাআত বিতির পড়া হতো।

(৪) উমদাতুল ক্বারী শরহে বুখারী’র ৫ম খণ্ডের ৩৫৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, قال ابن عبد البار وهو قول جمهور العلماء وهو الصحيح اعن أبى ابن كعب من غير خلاف من الصحبة - অর্থাৎ, হযরত ইবনে আব্দুল বির বলেছেন যে, ২০ রাকাআত তারাবীহের নামাজ হচ্ছে সাধারণ ওলামায়ে কেরামের অভিমত। কুফা’বাসী, ইমাম শাফেঈ (রহ:) ও অধিকাংশ ফকহীগণ এর সমর্থক এবং হযরত আবি ইবনে কা’ব (রা:) থেকে বর্ণিত আছে যে এ ব্যাপারে কোনো সাহাবীরই দ্বিমত নেই।

লা-মাযহাবী, আহলে হাদীস-সালাফীরা ৮ রাকাত তারাবী’র নামাজ জামাতে পড়ে এবং ২০ রাকাআতের বিরোধিতা করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনোই পুরো রামাদান মাসে জামাতের সাথে তারাবীহ পড়েননি, কারণ উম্মতের উপর তা ওয়াজিব হয়ে যেতে পারে। আমরা হযরত উমর (রা:) ও ইজমায়ে সাহাবা বা উম্মতের উপর আমল করে ২০ রাকাআত তারাবীহ’র নামাজ জামাতে পড়ি। কিন্তু আহলে খবিশ লা-মাযহাবীরা কোন্ হাদীছের ওপর ভিত্তি করে পুরো রমাদান মাসে ৮ রাকাআত তারাবীহ জামাতে পড়ে?
যে হাদীছের ওপর ভিত্তি করে তারা ৮ রাকাআত তারাবীহ দাবি করে, সেটা ছিল ‘তাহাজ্জুদের’ নামাজ। তারাবীহ’র নামাজ মূলতঃ সূন্নাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তা জামাতে পড়া ও ২০ রাকাআত পড়া, এই তিনটি সূন্নাত হযরত উমর ফারুক (রা:)-এর। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সব সময় ২০ রাকাআত পড়েন নি এবং সাহাবায়ে কিরাম (রা:)-কে জামাত সহকারে পড়ার নির্দেশও দেন নি। তারাবীহ যদি ৮ রাকাআত পড়া হয়, তাহলে সূন্নাতে ফারুকী ও সাহাবাদের ইজমা ২০ রাকাআত বাদ পড়ে যায়। আর যদি ২০ রাকাআত পড়া হয়, তাহলে সবার উপর আমল হয়ে যায়। কেননা ২০-এর মধ্যে ৮ আছে, কিন্তু ৮-এর মধে ২০ নাই। এতদসংক্রান্ত হাদীস আগেই পেশ করেছি, ‘আমার ও আমার খুলাফায়ে রাশেদীনের সূন্নাতের উপর আমল করো’। সালাফীরাও সব সময় জামাত সহকারে তারাবীহ’র নামাজ পড়ে থাকে। অথচ এ দু’টি বিষয় হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণ নেই, এ গুলো হচ্ছে সূন্নাতে ফারুকী, তাই একটি বাদ দিচ্ছে কেন ? ২০ রাকাআত-ই পড়ো।

বুখারী শরীফে বর্ণিত আছে, হযরত আবু সালমা হযরত আয়েশা (রা:)-এর কাছে জিজ্ঞেস করেছিলেন হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রামাদানের রাতে কত রাকাআত নামাজ পড়তেন? তিনি উত্তরে বলেছিলেন, (হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) রামাদান ও রামাদান ছাড়া অন্যান্য মাসে ৮ রাকাআতের বেশি নামাজ পড়তেন না। এটাই আহলে খবিশদের দলীল। এবার উত্তর শুনুন, উপরোক্ত হাদীসে তারাবীহ’র নামাজ নয়, তাহাজ্জুদের নামাজের কথা বলা হয়েছে। কেননা, হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা:) বলেছেন যে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রামাদানে ও গায়রে রামাদানে ৮ রাকাআতের অতিরিক্ত পড়তেন না। এতে বোঝা গেলো এটা সেই নামাজ, যা সব সময় পড়া হয়। তাই এটা তারাবীহ হতে পারে না, কারণ তারাবীহ কেবল রামাদান মাসেই পড়া হয়।

                                                  -- সমাপ্ত --

তাকলীদ

 মূল: আলা হযরত.নেট

অনুবাদ: কাজী সাইফুদ্দীন হোসেন

[পীর ও মুরশেদ আউলিয়াকুল শিরোমণি সৈয়দ মওলানা (আলহাজ্জ্ব) এ, জেড, এম, সেহাবউদ্দীন খালেদ আল-কাদেরী আল-চিশ্তী (রহ:)-এর পুণ্যস্মৃতিতে উৎসর্গিত]



তাকলীদ

তাকলীদের সংজ্ঞা দেয়া যেতে পারে এভাবে যে, কোনো মুজতাহিদের ফতোওয়া (সিদ্ধান্ত)-কে তাঁর রেফারেন্স বা দলিল ছাড়াই মেনে নেয়া বা গ্রহণ করা হচ্ছে তাকলীদ। [ইমাম নববী কৃত ‘তাহযীব’ ও কাযী শওকানী প্রণীত ‘এরশাদুল ফাহূল’]

শরীয়তের বিষয়গুলোতে চার মযহাবকে অনুসরণ করার ব্যাপারে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের মাঝে এজমা তথা ঐকমত্য হয়েছে। যথা -

* সে সকল বিষয়ে যেগুলোতে শরীয়তের উৎসগুলোতে দ্ব্যর্থহীন ও স্পষ্ট অর্থ ব্যক্ত হয় নি;
*সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-এর মাঝে কোনো বিষয়ে মতপার্থক্য বিরাজ করলে ইমাম সাহেবগণ তাঁদের মধ্যকার সাযুজ্য তুলে ধরেছেন;

আমরা তাকলীদ পালন করি শুধুমাত্র ফেকাহর ক্ষেত্রে, আমাদের আকীদার ক্ষেত্রে নয়। আল্লাহতা’লার একত্ব, মহানবী (দ:)-এর সর্বশেষ নবী হওয়ার বিষয়, শেষ বিচার দিবস ইত্যাদি হলো আকীদা-বিশ্বাসের ব্যাপার, আর তাই এগুলো তাকলীদের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়।

কেউ কেউ বলেন, এ ধরনের অন্য কারো তাকলীদ গ্রহণ আল্লাহর সাথে শেরক (অংশীবাদ)-এরই নামান্তর। উপরন্তু, কোনো এক নির্দিষ্ট ইমামকে অনুসরণ করা বেদআত। তাঁরা আরও বলেন, সকল ইমামের দলিলপত্র অধ্যয়ন করে বিচার-বিশ্লেষণ করা দরকার, যাতে শক্তিশালী দলিলগুলো গ্রহণ করা যায় এবং দুর্বলগুলো বাদ দেয়া সম্ভব হয়।

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের এতদসংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি হলো, কোনো সাধারণ মুসলমানের পক্ষে সরাসরি কুর’আন-সুন্নাহ থেকে আইন-কানুন বের করা অসম্ভব। এটি এই কারণে যে, ইসলামী জ্ঞানের এই উৎসগুলোর মধ্যে এমন অনেক বিষয় আছে যা অস্পষ্ট; ফলে এগুলোকে বোঝার জন্যে সহায়ক আরও অন্যান্য উৎস ও তাদের প্রয়োগ-পদ্ধতি সম্পর্কে ব্যাপক গবেষণা প্রয়োজন। এটি করতে হলে কোনো ব্যক্তির জন্যে ইসলাম সম্পর্কে সুগভীর ও ব্যাপক উভয় জ্ঞান অর্জন করাই জরুরি, যা একজন (সাধারণ) মুসলমানের পক্ষে অবাস্তব এবং অবশ্য কর্তব্যও নয়। আল্লাহতা’লা সকল মুসলমানকে বিদ্বান হতে দেখতে চান না, বরঞ্চ তিনি তাঁদেরকে জ্ঞানীদের পরামর্শ নিতে আদেশ করেছেন। নিচের আয়াতে করীমাটি বিবেচনা করুন:

”সুতরাং হে লোকেরা! জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞেস করো যদি তোমাদের জ্ঞান না থাকে” [সূরা নাহল, ৪৩ আয়াত]।

এ ছাড়া সূরা নিসায় এরশাদ হয়েছে:

“আর যদি সেক্ষেত্রে (তারা) সেটি (তাদের কাছে আগত প্রশান্তি বা শঙ্কার বার্তা) রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও নিজেদের ‘উলীল আমর’ (আদেশদাতা)-দের গোচরে আনতো, তবে নিশ্চয় তাঁদের কাছ থেকে ওর বাস্তবতা সম্পর্কে তারাই জানতে পারতো, যারা পরবর্তী (তথ্য অনুসন্ধানের জন্যে) সচেষ্ট” [আল-কুর’আন, ৪/৮৩]।

যে সকল আলেম-ব্যক্তির প্রয়োজনীয় পূর্বশর্ত পূরণের যোগ্যতা ছিল, অর্থাৎ, উলূম আল-কুরআন, আহাদীস ও সেগুলোর উসূল, আকায়েদ, ফেকাহর উসূল, তাফসীর ও তার উসূল এবং আজ-জারহু ওয়াত্ তা’দীল (হাদীস বর্ণনাকারী-বিষয়ক জ্ঞান) ইত্যাদি জ্ঞানের শাখায় যাঁরা পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন, শুধু তাঁদেরকেই শরীয়ত থেকে আহকাম তথা আদেশ-নিষেধ খুঁজে বের করার অনুমতি দেয়া হয়েছিল। এই ধরনের আলেমকে বলা হয় ‘মুজতাহিদ’। তবে এজতেহাদ (গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্ত) প্রয়োগ করার সামর্থ্যবান অনেক বড় বড় আলেম ইমামবৃন্দকে অনুসরণ করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, ইমাম কাজী আবূ ইঊসূফ, ইমাম মুহাম্মদ শায়বানী ও ইমাম যুফার (রহমতুল্লাহি আলাইহিম) প্রমুখ নিজেরাই এজতেহাদ প্রয়োগের যোগ্যতা রাখতেন, কিন্তু তবু তাঁরা ইমাম আবূ হানিফা (রহমতুল্লাহি আলাইহি)-এর অভিমত গ্রহণ করতেন।

হাদীসসমূহের অনেক প্রকারভেদ রয়েছে, যেমন মুতাওয়াতের (সর্বত্র জনশ্রুত), সহীহ (বিশুদ্ধ), অ-বিশুদ্ধ, দুর্বল (যয়ীফ) ও জাল (মওযু)। কিছু আছে মানসূখ, যার মানে প্রথমাবস্থায় অনুমতি ছিল, ‍কিন্তু পরে তা রহিত হয়ে যায়। যথা - আগে নামাযে কথা বলা যেতো, কিন্তু পরে তা অবৈধ ঘোষণা করা হয়। এই কারণে তাকলীদ একটি জরুরাত - উলেমাবৃন্দ ওপরের সব বিষয়কে বিবেচনায় নিয়েই এই সিদ্ধান্ত জারি করেন।

তাকলীদের প্রত্যাখ্যানকারী

হাফেয ইবনে তাইমিয়ার মতো যে সব লোক তাকলীদকে প্রত্যাখ্যান করার অপচেষ্টা করেছিলেন, তাঁরা ব্যর্থ হন। তিনি অবশ্য সাধারণ মুসলমানদের মতো ’মুকাল্লিদ’ (তাকলীদকারী) ছিলেন না। তাঁর লেখনীতে হাম্বলী মযহাবের প্রভাব বিদ্যমান। তিনি তাঁর ফতোওয়াগুলোকে ইমাম আহমদ হাম্বল (রহমতুল্লাহি আলাইহি)-এর ফতোওয়ার চেয়ে অগ্রাধিকার দিতে পছন্দ করতেন। তাঁর অনুসারীরা দাবি করে থাকেন যে তাঁরা মুকাল্লিদ নন এবং তাকলীদ হলো বেদআত। কিন্তু তাঁরা সব সময়ই হাফেয ইবনে তাইমিয়ার তাকলীদ করে থাকেন এবং তাঁর বই থেকেই ফতোওয়াসমূহ উদ্ধৃত করেন। এ ধরনের একটি উদাহরণ নিচে দেয়া হলো:

শায়খ বিন বা’আয (প্রয়াত সউদী সরকারি মোল্লা) মীলাদুন্নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বিরুদ্ধে একটি এবং মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর রওযা শরীফ  সফর করে যেয়ারত করার বিরুদ্ধে আরেকটি ফতোওয়া জারি করেছিলেন। তিনি লিখেন, মীলাদুন্নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উদযাপন বেদআত, কেননা হাফেয ইবনে তাইমিয়ার গবেষণায় একে বিদআত বলা হয়েছে। অনুরূপভাবে, তিনি মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর রওযা শরীফ যেয়ারতকে অনুমতিপ্রাপ্ত নয় বলেছেন, যেহেতু এটি ইবনে তাইমিয়ার অভিমত। [শায়খ বিন বা’আয কৃত মীলাদুন্নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও যেয়ারতে রওযা শরীফ]

অতএব, আমরা দেখতে পাচ্ছি যে সউদী শায়খ অন্ধভাবে হাফেয ইবনে তাইমিয়ার তাকলীদ করেছেন এবং এর পাশাপাশি তিনি হাফেয ইবনে কাইয়্যেম আল-জাওযিয়্যা, হাফেয ইবনে কাসীর, ইবনুল হাদী, শওকানী ও নাসির আলবানীরও তাকলীদ করেছেন।

এটি সত্যি হতভম্ব হবার মতো ব্যাপার! এ সকল লোকেরা তাঁদের ইমামদেরকে অনুসরণ করেন, অথচ দাবি করেন যে তাঁরা অন্ধ অনুসারী নন; অপর দিকে তাঁরা আয়েম্মা-এ-মযাহীব (চার মযহাবের ইমামবৃন্দ)-এর অনুসারীদেরকে অন্ধ অনুসারী বলে সম্বোধন করেন। বাস্তবে সবাই কোনো না কোনোভাবে তাকলীদ করে থাকেন। কেউ অনুসরণ করেন ইমাম আবূ হানিফা (রহমতুল্লাহি আলাইহি)-কে, আর কেউ অনুসরণ করেন হাফেয ইবনে তাইমিয়াকে। অধিকন্তু, তাঁদেরকে যখন বলা হয় কোনো একটি হাদীস দুর্বল, বিশুদ্ধ কিংবা জাল, তখন তাঁরা নিজেরা গবেষণা না করেই তা গ্রহণ করে নেন। ফলে তাঁরা ইমাম বুখারী, ইবনে আবি হাতেম, হাফেয মিযাঈ, হাফেয আসকালানী, হাফেয যাহাবী এবং হাফেয মাকদাসী (রহমতুল্লাহি আলাইহিম) প্রমুখকে অন্ধভাবে অনুসরণ করে থাকেন। প্রকৃত ঘটনা হলো, এই সব লোকেরা নিজেদের গবেষণা নিজেরা করেন না, বরং তাঁদের আলেমদের গবেষণাকেই ‘অন্ধভাবে’ অনুসরণ করেন।

তাকলীদের প্রত্যাখ্যানকারীরা যখন কোনো হাদীসকে সহীহ, যয়ীফ বা মওযু বলে আখ্যা দেন, তখন আসলে তাঁরা সে সকল মুহাদ্দেসীন (হাদীসবেত্তাবৃন্দ)-কেই অনুকরণ করেন, যাঁরা ইতিপূর্বে আহাদীসগুলোকে ওপরের শ্রেণীভুক্ত করেছিলেন। উপরন্তু, বিভিন্ন শ্রেণীর আহাদীসকে বর্ণনা করতে প্রাথমিক যুগের উলেমাবৃন্দ যে সব সংজ্ঞা ব্যবহার করেন, যেমন মুরসাল, মু’যাল, শাদ, মোয়াল্লাল, আযীয ও গরীব, তা কুর’আন ও সুন্নাহ’র কোথাও উল্লেখিত হয় নি। এই সব সংজ্ঞার সদ্ব্যবহারও এক ধরনের তাকলীদ। অনুরূপভাবে, হাদীস ও তাফসীরের উসূল (মৌলনীতি)-কে গ্রহণ করা এবং কুর’আন ও সুন্নাহকে এই মৌলনীতির আলোকে ব্যাখ্যা করা আর কিছু নয়, যে সকল ইমাম এগুলো প্রণয়ন করেছেন তাঁদেরকেই অনুসরণ করা মাত্র। যে সব মানুষ ইমামদেরকে অনুসরণ করেন না, তাঁদের উচিৎ সরাসরি কোনো হাদীসের নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করা; এতে কোনো ইমামের শরণাপন্ন তাঁরা হতে পারবেন না। এছাড়াও তাঁদের উচিৎ হাদীসের সংজ্ঞা হিসেবে মুরসাল, শায়ায ইত্যাদির মতো নতুন কোনো সংজ্ঞা খুঁজে বের করা। তাঁদের উচিৎ হাদীস ও তাফসীরের উসূলের মতো নতুন উসূল প্রণয়ন করা এবং তারপর সেই উসূলের আলোকে কুর’আন ও সুন্নাহ অধ্যয়ন করা। তবেই তাঁরা (তাঁদের মতানুযায়ী) শেরক ও বেদআত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারবেন!

তাকলীদের প্রতি আপত্তিকারীদের উত্থাপিত সন্দেহ   

তাকলীদের বিরোধিতাকারীরা যুক্তি দিয়ে থাকেন যে কোনো নির্দিষ্ট ইমামকে অনুসরণ করার প্রয়োজন নেই। তাঁরা নিজেদের ব্যক্তিগত গবেষণা দ্বারা আশা করেন যে তাঁরা সর্বাপেক্ষা সঠিক মত পোষণকারী ইমামের দেখা পেয়ে যাবেন। তাঁরা যদি মনে করেন যে কোনো ইমামের মত সঠিক নয়, তবে তাঁরা অপর ইমামের শরণাপন্ন হন। এভাবে তাঁরা শেষমেশ চারজন ইমামেরই দ্বারস্থ হন এবং সবাইকেই অনুসরণ করেন। আমরা বলি, এটি সম্ভব নয়। কেননা, ইমামবৃন্দ ইসলামী জ্ঞানের উৎসসমূহের ব্যাপারে ইতোমধ্যেই ব্যাপক গবেষণা করেছেন এবং সঠিক মতটি বের করতে নিজেদের মৌলনীতির সদ্ব্যবহার করেছেন। তাই আপনাদেরকে কেবল একজন ইমামেরই মৌলনীতি অনুসরণ করতে হবে। অন্যথায়, আপনারা নিজেদের উসূল প্রয়োগ করতে চেষ্টারত হবেন, আর তা হবে আপনাদেরই খায়েশের অধীন, যা (আপনাদের পক্ষে) সহজে প্রয়োগযোগ্য।

নিচে কিছু উদাহরণ পেশ করা হলো: ইমাম শাফেয়ী (রহমতুল্লাহি আলাইহি)-এর মতে, কোনো মহিলার স্পর্শ লাগলে ওযু ভেঙ্গে যায়; অথচ ইমাম আবূ হানিফা (রহমতুল্লাহি আলাইহি)-এর মতানুযায়ী তাতে ওযু ভাঙ্গে না। অধিকন্তু, ইমাম আবূ হানিফা (রহমতুল্লাহি আলাইহি)-এর ব্যতিক্রমস্বরূপ ইমাম শাফেয়ী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) ’মুরসাল’ হাদীসকে গ্রহণ করেন নি (তাঁর গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্তে)। মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কওল (বাণী)-সম্বলিত হাদীস ও তাঁর ফে’ল (ক্রিয়া)-সম্বলিত হাদীসের মতো দুটো দলিল যেখানে বিদ্যমান, সেখানে ইমাম আবূ হানিফা (রহমতুল্লাহি আলাইহি) বাণীসম্বলিত হাদীসটিকে কর্তৃত্বমূলক বিবেচনা করেছেন। অথচ ইমাম শাফেয়ী (রহমতুল্লাহি আলাইহি)-এর মতে আচরিত প্রথার কর্তৃ্ত্ব এ ক্ষেত্রে বেশি। এ সব নজির থেকে আমরা জানতে পেরেছি যে উভয় ইমামকে অনুসরণ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। অতএব, এক সাথে চার বা ততোধিক ইমামকে কীভাবে অনুসরণ করা যায়?

হাফেয ইবনে তাইমিয়া বলেন, কোনো ব্যক্তি যদি একজন নির্দিষ্ট ইমামকে অনুসরণ করার মাঝখানে অপর কোনো ইমামের অনুসরণ করেন, তবে তিনি প্রকৃতপক্ষে নিজের (নফসানী) খায়েশকেই (ইচ্ছাকেই) অনুসরণ করেন, অপর ইমামকে নয়; আর এটি (ইসলামে) হারাম। মহান উলামাবৃন্দ কখনো ইমাম শাফেয়ী (রহমতুল্লাহি আলাইহি)-এর ফেকাহ, আবার (সুবিধামতো) কখনো ইমাম আবূ হানিফা (রহমতুল্লাহি আলাইহি)-এর ফেকাহকে অনুসরণ করতে বারণ করেছেন। [ফতোওয়া-এ-ইবনে তাইমিয়া, ২০তম খণ্ড, তাকলীদ অধ্যায়]

হাফেয ইবনে তাইমিয়ার ফতোওয়া থেকে আমরা বুঝতে পারলাম যে কেবল একজন ইমামেরই তাকলীদ করা যায় এবং তাকলীদ পালন করা অত্যাবশ্যক।

কতিপয় আপত্তি

চার মযহাবের ইমামবৃন্দ যেখানে আমাদের বলেন নি তাঁদেরকে অনুসরণ করতে, সেখানে কেন আমরা তাঁদেরকে অনুসরণ করবো?

আইম্মা-এ-মযাহীব (চার মযহাবের ইমামমণ্ডলী)-কে অনুসরণ করার সমর্থনসূচক কোনো হাদীস যেখানে অনুপস্থিত, সেখানে আমরা কেন তাঁদেরকে অনুসরণ করবো?

জবাব

আমরা কুর’আন মজীদ তেলাওয়াত করি সাত ‘কুররাআ’-এর পদ্ধতিতে; তারা আমাদের বলে নি ‘আমাদের অনুসরণ করো’। আহাদীসগুলোও আমাদের আদেশ দেয় নি তাদেরকে অনুসরণ করতে হবে। মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কি বলেছেন শুধু বুখারী ও মুসলিম (রহমতুল্লাহি আলাইহিমা)-কেই অনুসরণ করতে হবে? তিনি কি বলেছেন কুর’আন মজীদের পরে বুখারী শরীফ হচ্ছে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ইসলামী জ্ঞানের উৎস?

’আমাদের অনুসরণ কোরো না’ - এ কথার দ্বারা চার মযহাবের ইমামবৃন্দ যা বুঝিয়েছেন তা হলো, ‘আমাদের বাণীর অনুসরণ কোরো না।’ আমরা মুসলমানরা তাঁদের বাণীর অনুসরণ করি না, বরং কুর’আন-সুন্নাহ থেকে কঠিন পরিশ্রমের মাধ্যমে বের করা তাঁদের ফতোওয়ার (গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্ত) অনুসরণ করে থাকি। এই কথা বলে তাঁরা আমাদেরকে তাঁদের রায় মান্য করার ক্ষেত্রে উৎসাহ জুগিয়েছেন, যে রায় নিঃসন্দেহে কুর’আন ও সুন্নাহ থেকে বের করা হয়েছে। এমন কি ইমাম মুসলিম এবং ইমাম বুখারী  (রহমতুল্লাহি আলাইহিমা)-ও আমাদের নির্দেশ দেন নি এই মর্মে যে তাঁদেরকে অনুসরণ করতে হবে। তাঁরা আমাদের কখনোই বলেন নি শুধু তাঁদের বইতে উদ্ধৃত আহাদীসগুলো গ্রহণ করতে হবে।

আপত্তি: সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-এর সময় কি চার মযহাবের ইমামবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন?

জবাব: আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের এই চার ইমাম ইসলামের প্রথম প্রজন্ম সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-এর সময়ে উপস্থিত ছিলেন না, যেমনিভাবে ছিলেন না আল-বুখারী এবং ইমাম মুসলিম (রহমতুল্লাহি আলাইহিমা)-ও। তবে ওই প্রাথমিক যুগে এমন কয়েকজন সাহাবী (রা:) ছিলেন, যাঁরা গভীর ধর্মীয় জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন; তাই তাঁদেরকে উলেমা বা ইমাম বলা যেতে পারে। ইসলামী বিষয়াদিতে মুসলমান সমাজ তাঁদের কাছে পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা চাইতেন। সর্বাগ্রে যে উলেমাবৃন্দ ছিলেন, তাঁদের সংখ্যা ছিল চার, যা নিচে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অবশ্য তাঁদেরকে সেরা প্রথম তিন প্রজন্মের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ সম্পর্কে বলেন, “আমার এবং সাহাবীদের জমানা-ই সেরা; অতঃপর সেরা তাদের যুগ যারা আমাদের পরে আসবে; এরপর সেরা হলো ওর পরবর্তী প্রজন্মের সময়কাল।”

হাফেয ইবনে কাইয়্যেম আল-জাওযিয়্যা লিখেছেন যে সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-এর যুগে চারজন ইমাম ছিলেন। তিনি লিখেন, “মক্কা মোযাযযমায় ছিলেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু), মদীনা মোনাওয়ারায় হযরত যায়দ বিন সাবেত (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু), বসরা নগরীতে হযরত আনাস বিন মালেক (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) এবং কুফা শহরে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)। তাঁদের বেসালের (পরলোকে আল্লাহর সাথে মিলিত হওয়ার) পরে তাবেঈনদের মধ্যেও ছিলেন বিখ্যাত চার ইমাম। এরা হলেন মদীনা মোনাওয়ারায় হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (রহমতুল্লাহি আলাইহি), মক্কা মোয়াযযমায় হযরত আতা ইবনে রাব’আ (রহমতুল্লাহি আলাইহি)), ইয়েমেনে হযরত তাউস্ (রহমতুল্লাহি আলাইহি) এবং কুফায় হযরত ইবরাহীম (রহমতুল্লাহি আলাইহি)। এছাড়াও অনেক ইমাম ছিলেন, তবে ওই চারজনই ছিলেন সর্বাধিক প্রসিদ্ধ।” [হাফেয ইবনে কাইয়্যেম কৃত ‘আলা’ম-উল-মোওয়াকিয়ীন’, ১০ পৃষ্ঠা]

এটি স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের চার ইমামের আগে সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-এর জমানায়ও ইমাম ছিলেন, যাঁরা ধর্মীয় জ্ঞানের উৎস বা আধার ছিলেন। এ সব ফতোওয়া বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ আছে ‘কিতাব-এ-মোসান্নেফ-এ-আব্দির্ রাযযাক’ এবং ‘মোসান্নেফ-এ-ইবনে আবি শায়বা’ গ্রন্থগুলোতে।

হাফেয ইবনে কাইয়্যেম আরও বলেন যে ওই সময় অনেক সাহাবী (রা:) থাকলেও সর্ব-হযরত যায়দ বিন সাবেত, আনাস বিন মালেক, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ এবং আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম) ছিলেন সবচেয়ে বিখ্যাত এবং তাঁরা প্রচুর ফতোওয়া জারি করতেন। [ইবনে কাইয়্যেম প্রণীত ‘আলা’ম-উল-মোওয়াকিয়ীন’, কেয়াস অধ্যায়]

ঐতিহ্যবাহী চার মযহাবের ইমামবৃন্দের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা; এঁরা হলেন সর্ব-ইমাম আবূ হানিফা, মালেক, শাফেঈ এবং আহমদ ইবনে হাম্বল (রহমতুল্লাহি আলাইহিম)। তাঁদের সময়েও অনেক মুহাদ্দেসীন ও উলেমা ছিলেন, কিন্তু চার মযহাবের ইমামবৃন্দ-ই ছিলেন সর্বাধিক প্রসিদ্ধ; গভীর ধর্মীয় জ্ঞানসম্পন্ন ও আস্থাভাজন হওয়ার দরুন মানুষেরা তাঁদেরই শরণাপন্ন হতেন।

আপত্তি: এই চার মযহাবের ইমামদের মধ্যেও অনেক মতপার্থক্য ছিল; এমতাবস্থায় আমরা কেন তাঁদেরকে অনুসরণ করবো?

জবাব: ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম (রহমতুল্লাহি আলাইহিমা)-এর মধ্যেও দ্বিমত ছিল। মুসলিম শরীফের প্রথম খণ্ডে ইমাম মুসলিম (রহ.) ইমাম বুখারী (রহ:)-এর সমালোচনা করেছেন। সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-এর মাঝেও অনেক বিষয়ে মতপার্থক্য ছিল। তাঁদের নিজেদের মধ্যকার মতপার্থক্য থাকার কারণে আমরা কি এতে করে হযরতে সাহাবা-এ-কেরাম (রা:), সর্ব-ইমাম বুখারী ও মুসলিম (রহমতুল্লাহি আলাইহিমা)-কে অনুসরণ বন্ধ করে দেবো?

আপত্তি: আল-বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত আহাদীস (হাদীসসমূহ) অনুসরণ করলেই তো চলে; চার মযহাবের ইমামবৃন্দের অনুসরণ বন্ধ করবো না কেন?

জবাব:

১/ - যদি আমরা আল-বুখারী ও মুসলিম শরীফের ওপরই কেবল নির্ভর করি এবং চার মযহাবের ইমামবৃন্দের অনুসরণ বাদ দেই, তাহলে ওই দুই হাদীসবেত্তা কেন ইমাম শাফেঈ (রহমতুল্লাহি আলাইহি)-এর মযহাব অনুসরণ করেছিলেন?

ইমাম ইবনে আসীর (রহমতুল্লাহি আলাইহি) লিখেছেন যে ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম (রহমতুল্লাহি আলাইহিমা) শাফেয়ী ছিলেন। [ইবনে আসীর (রহ.) কৃত ‘জামেউল উসূল’, উভয় মুহাদ্দেসের জীবনী]

ইমাম তাজউদ্দীন সুবকী (ইমাম তকীউদ্দীন সুবকী রহমতুল্লাহি আলাইহির পুত্র) ইমাম বুখারী (রহমতুল্লাহি আলাইহি)-এর নাম শাফেয়ী মযহাবের তালিকায় উল্লেখ করেছেন। [ইমাম ২য় সুবকী (রহ.) কৃত ‘তাবাকাত আশ-শাফেঈ’]

নওয়াব সিদ্দীক হাসান খানও ইমাম বুখারী (রহমতুল্লাহি আলাইহি)-এর নাম শাফেয়ী উলেমাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেন।  [নওয়াব রচিত ‘আবজাদ-উল-উলূম]

উল্লেখিত দুই হাদীসবেত্তার জন্যে যদি বুখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফ নামের হাদীসগ্রন্থ দুটো যথেষ্ট না হয়, তাহলে সাধারণ মুসলমানদের জন্যে সেগুলো যথেষ্ট বা পর্যাপ্ত হবে কী করে?

২/ - ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম (রহমতুল্লাহি আলাইহি) সমস্ত সহীহ হাদীস তাঁদের দুই বইয়ে সংকলন করেন নি। বহু সহীহ হাদীস বাদ পড়ে গিয়েছিল।

ইমাম বুখারী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) এ প্রসঙ্গে বলেন, “আমি বুখারী শরীফে অনেক সহীহ হাদীস সংকলন করি নি। কেননা, এতে বইটি বিশালাকৃতি ধারণ করতো।” [হাফেয ইবনে হাজর আসকালানী (রহমতুল্লাহি আলাইহি প্রণীত ‘মুকাদ্দামাহ ফাতহুল বারী, ৯ পৃষ্ঠা]

হাফেয ইবনে কাসীর বলেন যে ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম (রহমতুল্লাহি আলাইহিমা) সমস্ত সহীহ আহাদীস সংকলন করেন নি (তাঁদের বই দুটোতে)। বাদ পড়া কিছু কিছু রওয়ায়াত (বর্ণনা) তিরমিযী শরীফ, ইবনে মাজাহ শরীফ, নাসাঈ শরীফ ও আবূ দাউদ শরীফ নামের হাদীস-গ্রন্থগুলোতে বর্তমানে বিরাজমান। উপরন্তু, ইমাম বুখারী (রহমতুল্লাহি আলাইহি ) স্বয়ং বলেন যে তিনি এমন আরও দুই লক্ষাধিক হাদীস সম্পর্কে জানেন যেগুলো মুসনাদ (সনদবিশিষ্ট তথা সহীহ)। [ইবনে কাসীর রচিত ‘উলূমে আহাদীস’ এবং ‘তারীখে ইবনে কাসীর’, ইমাম বুখারী (রহ.)-এর জীবনী]

৩/ - বুখারী ও মুসলিম শরীফ অনুসরণ করার বেলায় মোটেও অতো সহজ কোনো বই নয়, যেহেতু হাফেয আসকালানী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) আল-বুখারীর ওপর ১৭ খণ্ডবিশিষ্ট ব্যাখ্যামূলক গ্রন্থ রচনা করেছেন, আর মুসলিম শরীফের ওপর ইমাম বদরুদ্দীন আইনী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) লেখেন অনুরূপ ২৫ খণ্ডবিশিষ্ট বই। তথাপিও এই মহান ব্যাখ্যাকারী দুই আলেম বেশ কিছু হাদীসের অর্থ বুঝতে পারেন নি। এমতাবস্থায় আমরা কীভাবে বুখারী ও মুসলিম শরীফ সরাসরি অনুসরণের জন্যে মুসলমান সর্বসাধারণকে উৎসাহ দিতে পারি?

৪/ - আমাদেরকে শুধু বুখারী ও মুসলিম শরীফ অনুসরণ করলেই চলবে না; নতুবা আমরা সে বইগুলোর অন্ধ অনুসারীতে পরিণত হবো এবং শত শত হাদীসগ্রন্থের অবজ্ঞাকারী হবো, যে হাদীসগ্রন্থগুলো লেখার সময় এমন কি ইমাম বুখারী এবং ইমাম মুসলিম (রহমতুল্লাহি আলাইহিমা)-ও জন্মগ্রহণ করেন নি!  

৫/ - শুধু সর্ব-ইমাম বুখারী ও মুসলিম (রহমতুল্লাহি আলাইহিমা))-কে অনুসরণ করাই যদি জরুরি হতো, তবে ইমাম বুখারী (রহ:) কেন নিজেই নিজের বর্ণিত হাদীসের অনুসরণ করেন নি?

(ক) হাফেয ইবনে হাজর আসকালানী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) লিখেন এবং ইবনে কাসীরও লিখেছেন যে মানুষেরা যখন ইমাম বুখারী (রহমতুল্লাহি আলাইহি)-কে কষ্ট দিচ্ছিল তখন তিনি দোয়া করেন যেন আল্লাহতা’লা তাঁর জীবনাবসান করেন [ইমাম আসকালানী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) কৃত ‘তাহযিব আত্ তাহযিব’ এবং ইবনে কাসীর রচিত ‘তারীখে ইবনে কাসীর’, ইমাম বুখারীর জীবনী]। অথচ তিনি-ই রাসূলে করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর একটি হাদীস বর্ণনা করেন যা’তে এরশাদ হয়েছে কোনো মুসলমান যেন আল্লাহর কাছে নিজের জীবনাবসান কামনা না করেন। [বুখারী শরীফ, আল-মারদা]

(খ) সর্বজনজ্ঞাত ঘটনা এই যে ইমাম বুখারী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) রমযান মাসের এক রাতেই পুরো কুরআন খতম করেন। অথচ, তাঁরই সংকলিত এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে কুরআন মজীদ ৫-৭ দিনে খতম করতে হবে। [বুখারী শরীফ, ’ফযায়েলে কুরআন’ অধ্যায়]

আপত্তি: চার মযহাবের ইমাম সাহেবগণ কি বলেন নি “তোমরা যদি আমাদের কথার পরিপন্থী কোনো সহীহ হাদীস পাও, তবে আমাদের কথা না মেনে তার অনুসরণ করো?”

জবাব: এ বিষয়টি সঠিক যে, কোনো ইমাম সাহেব সহীহ হাদীসের পরিপন্থী কথা বল্লে আমাদেরকে তা বাদ দিয়ে ওই হাদীস অনুসরণ করতে হবে। কিন্তু ‘সহীহ হাদীস’ বলতে আসলে এখানে কী বোঝানো হয়েছে? এটি কি সেই হাদীস যা কেবল বুখারী ও মুসলিম শরীফে লিপিবদ্ধ আছে? নাকি তা এমন এক হাদীস যা সহীহ হাদীসের মাপকাঠি পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে? নাকি এমন এক হাদীস যাকে মুহাদ্দেসীন (হাদীসবেত্তাবৃন্দ) সহীহ বলেছেন? [বঙ্নুগানুবাদকের নোট: মুজতাহিদবৃন্দের এই নির্দেশ ছিল তাঁদের শিষ্যবৃন্দের প্রতি যাঁরা নিজেরাও মুজতাহিদ ছিলেন। এটি আমাদের মতো সর্বসাধারণের জন্যে নয়]

যদি আমরা বিশ্বাস করি যে সহীহ হাদীস শুধু সেগুলোই যা বুখারী ও মুসলিম শরীফে লিপিবদ্ধ আছে, তবে আমরা সর্ব-ইমাম বুখারী ও মুসলিম (রহমতুল্লাহি আলাইহিমা)-এর অন্ধ অনুসারীতে রূপান্তরিত হবো। আমরা যদি বলি, সহীহ হাদীস হলো সে সমস্ত হাদীস যেগুলো হাদীসের উসূল বা মূলনীতিমালার শর্তসমূহ পূরণ করতে সক্ষম, তবে ওই শর্ত যে সকল উলেমা আরোপ করেছেন, আমরা তাঁদেরকেই অন্ধভাবে অনুসরণ করবো বটে। উপরন্তু, আমরা যদি বলি যে সহীহ হাদীস হচ্ছে সে সমস্ত হাদীস যেগুলোকে মুহাদ্দেসীনবৃন্দ সহীহ বলে দাবি করেছেন, তাহলেও আমরা তাঁদেরকে ‘অন্ধভাবে’ অনুসরণ করবো।

শেষমেশ এই সিদ্ধান্ত নেয়া যায়, ওপরের যে কোনো একটি মত পোষণ করলেই আমরা কারো না কারো তাকলীদ করছি।

হাফেয ইবনে তাইমিয়া লিখেন, ইমামবৃন্দের মধ্যে এমন কেউ ছিলেন না যিনি ইচ্ছাকৃতভাবে সুন্নাহর বিরোধিতা করেছিলেন। আমরা যখন কোনো ইমামের এমন কথা পাই যা সুন্নাহ’র পরিপন্থী, তখন (সিদ্ধান্ত নেই) ওই ইমামের আরোপিত সহীহ হবার শর্ত পূরণে আলোচ্য হাদীসটি অপারগ। কেননা, প্রত্যেক ইমামেরই নিজস্ব নীতিমালা ছিল যা দ্বারা কোনো হাদীস সহীহ না যয়ীফ তা তিনি নির্ধারণ করতেন। তাই এক ইমামের কাছে যে হাদীস সহীহ হিসেবে গৃহীত, সেটি অপর ইমামের কাছে সহীহ না-ও হতে পারে। [হাফেয ইবনে তাইমিয়া কৃত ‘রাফ’উল মালা’ম’, ১৫-১৬ পৃষ্ঠা]

ইমাম আবূ হানিফা (রহমতুল্লাহি আলাইহি) তাঁর শিক্ষক সাহাবা-এ-কেরাম (রা:) ও তাবেঈন (রহ:)-দের কাছ থেকে যে আহাদীস পেয়েছেন, সেগুলোর দিকে লক্ষ্য করে একটি উদাহরণ পেশ করা যায়। যেহেতু এই আহাদীস সরাসরি তাঁর শিক্ষক সাহাবা-এ-কেরাম (রা:) ও তাবেঈন (রহ:)-দের থেকে তাঁর কাছে এসেছে, সেহেতু এগুলোর সহীহ হবার ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা যায় না। কিন্তু যখন এই একই আহাদীস পরবর্তী প্রজন্মের উলেমাবৃন্দের কাছে অন্য বর্ণনাকারীদের সূত্রে পৌঁছেছে, তখন তাতে অ-নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীর এসনাদ বা সূত্র থাকতে পারে। কেউ এমন অ-নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীর বর্ণিত হাদীস অধ্যয়ন করে যদি বলে যে ইমাম আবূ হানিফা (রহমতুল্লাহি আলাইহি)-এর কোনো একটি ফতোওয়া এই অ-নির্ভরযোগ্য হাদীসের ওপর ভিত্তিশীল হওয়ার কারণে সুন্নাহ’র পরিপন্থী, তাহলে তার এই সিদ্ধান্ত অন্যায্য।

দ্বিতীয়তঃ চার মযহাবের ইমাম সাহেববৃন্দ যা বলেছেন তা চূড়ান্ত। তাঁরা তাঁদের সারা জীবন যে নতুন নতুন তথ্য-উপাত্ত পেয়েছেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে নিজেদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছেন। অধিকন্তু, তাঁরা বেসালপ্রাপ্ত তথা পরলোকে খোদাতা’লার সাথে মিলিত হবার পর তাঁদের শিষ্যবৃন্দ নিজ নিজ ইমামের কাজগুলো যাচাই-বাছাই ও সংস্কার করেছেন নতুন তথ্যাদি সন্নিবেশের উদ্দেশ্যে। পরবর্তীকালে তাঁদের শিষ্যরাও এই একই পদ্ধতি বজায় রাখেন। এটি-ই ফেকাহ’র ‘মযহাব’ নামে পরিচিত।

কোনো নির্দিষ্ট মযহাবের একটি ফতোওয়া বুখারী ও মুসলিম শরীফের কোনো সহীহ হাদীসের সাথে সাংঘর্ষিক হলে এর মানে এই নয় যে ফতোওয়াটি সুন্নাহ-বিরোধী; কেননা, ওই মযহাব অন্য কোনো সহীহ হাদীসকে অনুসরণ করেই ফতোওয়া জারি করেছে, আর তাই তা সুন্নাহ-বিরোধী নয়।

অন্ধ অনুসরণের দু’টি নমুনা

১/ - নাসিরুদ্দীন আলবানী লিখেছেন, মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি আরোপিত হাদীস, যা’তে বর্ণিত হয়েছে যে হযরত ঈসা (আলাইহিস্ সালাম) ও ইমাম মাহদী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) একই ব্যক্তি, তা একেবারেই অসত্য। যদিও সর্ব-ইমাম ইবনে মাজাহ, হাকিম, আবদুল বার্র (রহমতুল্লাহি আলাইহিম) এবং অন্যান্য ইসলামী উলেমা এই হাদীসটি নিজেদের বইপত্রে উল্লেখ করেছেন, তথাপি এটি জাল হবার কারণ এই যে, সর্ব-ইমাম ইবনে হাজর হায়তামী মক্কী ও বায়হাকী (রহমতুল্লাহি আলাইহিমা) উভয়েই লিখেছেন এর বর্ণনাকারী (রাবী) মুহাম্মদ বিন খালেদ অপরিচিত ব্যক্তি। অধিকন্তু, ইমাম যাহাবী (রহ.)-ও এই হাদীসকে মওযু (জাল) মনে করেন। ইমাম সাগানী (রহ.) বলেন যে এটি বানোয়াট। ইমাম সৈয়ুতী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) বলেন যে মানুষেরা এটি বানিয়েছিল। ইমাম কুরতুবী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) এই বর্ণনাকে দুর্বল বিবেচনা করেন। [ নাসিরুদ্দীন আলবানী কৃত ’সিলসিলা-এ-আহাদীস যয়ীফা’, ৭৭ নং হাদীস]

ওপরের বক্তব্যে লক্ষ্য করা যায় কীভাবে আলবানী উল্লেখিত ইমামবৃন্দের রায়কে দলিল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। উপরন্তু, ইমাম যাহাবী (রহ.) হাদীসটিকে জাল বলায় তিনিও তাকে জাল বলেছেন। কাযী শওকানী এটিকে বানোয়াট বলায় তিনিও বানোয়াট বলেছেন। আলবানীর এই গবেষণা সম্পর্কে কী বলা যায়? তিনি কি কুর’আন ও সুন্নাহকে অনুসরণ করছেন, নাকি ইমামবৃন্দকে? কেউ তাঁর বইপত্র পড়লে দেখবেন, তিনি প্রতিনিয়ত ইমামদেরকেই অনুসরণ করেছেন। আলবানী যদি তাকলীদ এড়াতে না পারেন, তাহলে সাধারণ মুসলমানদের জন্যে আইম্মায়ে মযাহীব (মযহাবের চার ইমাম)-এর মধ্যে কারো একজনের তাকলীদ মানা অবশ্য কর্তব্য।

আলবানী যখন ইবনে তাইমিয়া, ইবনে কাসীর, শওকানী, যাহাবী, ইমাম আসকালানী (রহ:) কিংবা ইবনে আবি হাতেম (রহ.)-কে ইমাম মেনে অনুসরণ করেন, তখন তাঁকে একজন বড় মাপের পণ্ডিত ও জ্ঞানী ব্যক্তি বিবেচনা করা হয়। অথচ যখন মানুষেরা ইমাম আবূ হানীফা (রহমতুল্লাহি আলাইহি)-কে অথবা বাকি তিন ইমামের কাউকে অনুসরণ করেন, তখন তাঁদেরকে অজ্ঞ-মূর্খ বেদআতী (নতুন প্রথা প্রবর্তনকারী) বিবেচনা করা হয়। অতএব, এতদ্দর্শনে সিদ্ধান্ত নিতে আমরা বাধ্য যে, এক দল লোকের জন্যে এক ধরনের নীতি, এবং অপর দলের জন্যে আরেক ধরনের নীতি গ্রহণ করা হয়েছে (অর্থাৎ, দ্বৈত নীতি - double standards)।

২/ - নাসিরুদ্দীন আলবানী ইমাম দারিমী (রহমতুল্লাহি আলাইহি)-এর একটি রওয়ায়াতকে উদ্ধৃত করেন, যা’তে বর্ণিত হয়েছে যে মদীনা মনোওয়ারায় একবার দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়; মানুষেরা হযরত মা আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা)-এর কাছে আরযি দেন এ থেকে পরিত্রাণের জন্যে। তিনি তাঁদেরকে বলেন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর রওযা শরীফের ছাদে একটি ছিদ্র করতে। তাঁরা এ কাজ করার পরে বৃষ্টি নামে। এতে ফলে-ফসলে মাঠ-প্রান্তর ভরে ওঠে এবং উট হৃষ্টপুষ্ট হয়। মানুষেরা ওই বছরটিকে ‘ফসলের বছর’ নামে আখ্যায়িত করে। আলবানী বলেন, “এই বর্ণনা ভুয়া, কেননা এর বর্ণনাকারীদের মধ্যে সাঈদ ইবনে যায়ীদ দুর্বল। ইমাম ইবনে হাজর হায়তামী মক্কী (রহমতুল্লাহি আলাইহি)-এর মতে এই রওয়ায়াত সহীহ নয়। ইমাম যাহাবী-ও সাঈদ ইবনে যায়ীদের বর্ণনাকে দুর্বল বলেছেন। ইমাম সা’আদী তাঁকে নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী হিসেবে বিবেচনা করেন নি। ইমাম নাসাঈ (রহমতুল্লাহি আলাইহি) বলেন যে সাঈদের জ্ঞান কম; তবে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহমতুল্লাহি আলাইহি) তাকে গ্রহণযোগ্য বলেছেন, আর এই রওয়ায়াতের অপর বর্ণনাকারী মুহাম্মদ বিন ফযল-ও নির্ভরযোগ্য বলে সর্বজনবিদিত। কিন্তু, ইবনে ফযল জীবনের শেষাংশে স্মৃতিবিলোপ রোগে ভুগেছিলেন। আমরা জানি না ইমাম দারিমী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) এই রওয়ায়াত (বর্ণনা) তাঁর স্মৃতি বিলুপ্ত হবার আগে না পরে তাঁর কাছ থেকে নিয়েছিলেন। তাই আমরা এই বর্ণনাকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করতে পারি না; আর হাফেয ইবনে তাইমিয়া-ও ওপরোক্ত এই বর্ণনাকে অস্বীকার করেছেন। ইবনে তাইমিয়া নিজ ‘আল-রাদ আল-বাকারী পুস্তকে লিখেছেন যে হুযূর পাক (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর রওযার ছাদে বাতায়ন হযরত আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা)-এর হায়াতে জিন্দেগীর সময়কালে অস্তিত্বশীল ছিল না। এই বাতায়ন খলীফা ওয়ালীদ বিন আব্দিল মালেকের (উমাইয়া) শাসনামলে অস্তিত্ব পায়। আর তাই এই বর্ণনাটি মিথ্যে। হযরত আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) যে মানুষদেরকে রওযা শরীফের ছাদে ফুটো করতে বলেছিলেন তা তাঁর ব্যক্তিগত মত; এ কারণে তা গ্রহণযোগ্য নয়।” [নাসিরুদ্দীন আলবানী প্রণীত ‘আত্ তাওয়াসসুল ১ম খণ্ড, ১৬২ পৃষ্ঠা]

ওপরের এই উদ্ধৃতিতে আবারো পরিলক্ষিত হলো যে আলবানী ইমামদের ওপর নির্ভরশীল এবং তিনি কতোটুকু অন্ধভাবে হাফেয ইবনে তাইমিয়াকে অনুসরণ করেন। ওই সব লোক, যাঁরা আমাদেরকে ইমাম আবূ হানীফা বা ইমাম শাফেয়ী (রহমতুল্লাহি আলাইহিমা)-এর তাকলীদ মানার অভিযোগে অভিযুক্ত করেন, এখন আমরা তাঁদেরকে জিজ্ঞেস করতে পারি যে কেন নাসির আলবানী শুধুমাত্র ইমাম যাহাবী, ইমাম আসকালানী (রহ:), হাফেয ইবনে তাইমিয়া ও শওকানীকে অনুসরণ করেন? আলবানীর দ্বারা যদি ইমামদের অনুসরণ গ্রহণযোগ্য হতে পারে, তবে আইম্মা-এ-মযাহীবের কোনো একজনের অনুসরণ কেন দূষণীয় হবে?

ইমাম দারিমী (রহমতুল্লাহি আলাইহি)-এর ওপরোক্ত রওয়ায়াতের ব্যাপারে নাসির আলবানীর চারটি বিষয় নিয়ে গবেষণাকে আমরা এক্ষণে যাচাই করবো।

আলবানীর গবেষণার প্রথম জবাব হলো এই যে, তিনি শুধু ওই সকল উলেমার উদ্ধৃতি দিয়েছেন যাঁরা বর্ণনাকারী হিসেবে সাঈদ ইবনে যায়ীদকে অ-নির্ভরযোগ্য বিবেচনা করেছেন। এর কারণ হলো, যদি তিনি ওই বর্ণনাকারীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ অন্যান্য সকল উলেমার উদ্ধৃতি দিতেন, তবে তাঁকে তাঁদের বর্ণনা স্বীকার করে নিতে হতো। এটি আলবানীর নিজের এবং তাঁর ইমাম ইবনে তাইমিয়ার ধ্যান-ধারণার খেলাফ ছিল। সাঈদ ইবনে যায়ীদ সম্পর্কে এক্ষণে আমরা অন্যান্য উলেমাদের মতামত বিবেচনায় নেবো।

ইমাম বুখারী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) সাঈদ ইবনে যায়ীদকে সত্যবাদী ও হাদীসশাস্ত্রে জ্ঞানী ব্যক্তি বলে অভিহিত করেন। [ইমাম বুখারী (রহ.) কৃত ‘তারিখ আল-কবীর’, সাঈদ ইবনে যায়ীদের জীবনী]

হাফেয ইবনে তাইমিয়া ও ইবনে কাসীর একমত যে ইমাম বুখারী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) সারা দুনিয়ায় সর্বশ্রেষ্ঠ হাদীসশাস্ত্রজ্ঞ ও রওয়ায়াত-বিশারদ। [ইবনে তাইমিয়া রচিত ‘ফাতাওয়া-এ-ইবনে তাইমিয়া, ৩য় খণ্ড, ২০০ পৃষ্ঠা এবং ইবনে কাসীর কৃত ইমাম বুখারী (রহ.)-এর জীবনী]

ইমাম ইবনে হাতেম (রহমতুল্লাহি আলাইহি) বলেন, ইমাম আবূ যুহরা (রহমতুল্লাহি আলাইহি)-এর মতে সাঈদ ইবনে যায়ীদ (রহ.) একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তি। [ইবনে হাতেম (রহ.) প্রণীত ‘জারহু ওয়া’ তায়াদিল’, সাঈদ ইবনে যায়ীদের জীবনী]

হাফেয ইবনে হাজর আসকালানী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) লিখেন, ইয়াহইয়া বিন মুঈনের (রহ.) মতে সাঈদ ইবনে যায়ীদ (রহ.) নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি। এছাড়া, ইমাম আজল, ইমাম আবূ যাহরাহ বলেন যে তিনি আস্থাভাজন। ইমাম নাবায়ান বিন হিলাল বলেন যে সাঈদ ছিলেন হাদীসশাস্ত্রজ্ঞ। কিন্তু ইমাম দারু কুতনী তাঁকে দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত করেন। [হাফেয ইবনে হাজর আসকালানী (রহ:) রচিত ‘তাহযিব আত্ তাহযিব’, সাঈদ ইবনে যায়ীদের জীবনী]

সাঈদ ইবনে যায়ীদ সম্পর্কে ওপরোক্ত উলেমা-এ-কেরামের দৃষ্টিভঙ্গি কেন আলবানী প্রত্যাখ্যান করেছেন তা দেখে আমরা আশ্চর্য হই। এর কারণ হতে পারে এই যে, ইমাম বুখারী ও ইয়াহইয়া বিন মুঈন (রহমতুল্লাহি আলাইহিমা) কর্তৃক প্রদত্ত সাঈদের নির্ভরযোগ্যতার স্বীকৃতিকে মেনে নিলে সাঈদ এবং ওই হাদীসের গ্রহণযোগ্যতাকেও আলবানীর মেনে নেয়া ছাড়া আর গত্যন্তর থাকে না। স্মর্তব্য যে, তাঁর দুই ইমাম ইবনে তাইমিয়া ও ইবনে কাসীর উভয়েই হাদীসশাস্ত্রজ্ঞ হিসেবে ইমাম বুখারী (রহ:)-এর বিশ্বসেরা হবার বিষয়টি সম্পর্কে ঐকমত্য পোষণ করেছেন।

এই বর্ণনাটি সম্পর্কে আলবানীর দ্বিতীয় যে আপত্তি তা হলো, হাদীসটির বর্ণনাকারী মুহাম্মদ বিন ফযল জীবনের শেষদিকে স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছিলেন। ইমাম দারিমী (রহ:) তাঁর কাছ থেকে হাদীসটি তাঁর স্মৃতি হারাবার আগে না পরে সংগ্রহ করেন তা জানা যায় না। তাই আলবানী এই রওয়ায়াত মেনে নিতে নারাজ।

ওপরের আপত্তির প্রতি জবাব হলো, মুহাম্মদ ইবনে ফযল (রহ.) ইমাম বুখারী (রহ:) ও ইমাম মুসলিম উভয়েরই শিক্ষক। ইমাম বুখারী (রহ:) তাঁর থেকে বহু হাদীস সংগ্রহ করেন। আমাদের কাছে নির্ভরযোগ্য অভিমত আছে যে ইমাম সাহেব তাঁর কাছ থেকে হাদীস সংকলন করেন তাঁরই অসুখের আগে। অধিকন্তু, ইমাম দারিমী (রহ:)-ও ইমাম বুখারী (রহ:)-এর মতোই একজন হাদীসশাস্ত্রজ্ঞ ছিলেন এবং তিনি বুঝতে ও বিচার-বিবেচনা করতে সক্ষম ছিলেন কখন কোনো হাদীস বর্ণনাকারীর কাছ থেকে রওয়ায়াত গ্রহণ করতে হবে।

স্মৃতি বিলুপ্ত হওয়া রাবী (বর্ণনাকারী)-দের কাছ থেকে হাদীস সংগ্রহের অভ্যেস ইমাম দারিমী (রহ:)-এর মধ্যে ছিল এমন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে আলবানীর অভিযোগ সত্য বলে বিবেচিত হতো। কিন্তু এর পক্ষে কোনো প্রমাণ-ই নেই।

আলবানী যদি এই দাবিতে অনড় থাকেন যে ইমাম দারিমী (রহ:) মুহাম্মদ বিন ফযলের স্মৃতি বিলুপ্ত হওয়ার পরে তাঁর কাছ থেকে হাদীস সংকলন করেছেন, তাহলে অপরাপর যে কেউ এই দাবিও উত্থাপন করতে পারেন যে ইমাম বুখারী (রহ:)-ও তাঁর কাছ থেকে একইভাবে তাঁর স্মৃতি বিলুপ্ত হওয়ার পরে হাদীস সংগ্রহ করেছেন। কেননা, তিনি কবে থেকে স্মৃতি হারিয়েছিলেন তার কোনো ঐতিহাসিক তথ্য-উপাত্ত নেই।

হাফেয ইবনে হাজর আসকালানী (রহ:) স্বরচিত ‘ফাতহুল বারী’ গ্রন্থের মুখবন্ধে লিখেন যে ইমাম বুখারী (রহ:) মুহাম্মদ ইবনে ফযল থেকে হাদীস সংগ্রহ করেন তাঁর স্মৃতি বিলুপ্ত হওয়ার আগেই। তবে হাফেয ইবনে হাজর (রহ:) স্মৃতি-বিলোপের সময়কাল উল্লেখ করেন নি; অথবা তিনি এও বলেন নি ইমাম বুখারী (রহ:) যে ইবনে ফযল থেকে হাদীস সংগ্রহ করতেন তা তিনি (ইবনে হাজর) কীভাবে জেনেছিলেন। এমতাবস্থায় আমরা হতবাক হয়েছি এটি দেখে যে কীভাবে আলবানী ইমাম দারিমী (রহ:)-কে এই রওয়ায়াতের ব্যাপারে সন্দেহ করেছেন। এতে অন্যরাও ইমাম বুখারী (রহ:)-এর ব্যাপারে সন্দিহান হয়ে পড়তে পারে।

৩/ - এই বর্ণনাটির প্রতি আলবানীর তৃতীয় আপত্তি হলো, উমাইয়া খলীফা ওয়ালীদ বিন মালেকের শাসনামলে হযরত আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা)-এর ঘর, যা’তে মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে দাফন করা হয়, তা পুনর্নির্মাণ করা হয় এবং তাতে একটি বাতায়নও স্থাপন করা হয়। এতে প্রতীয়মান হয় যে বাতায়নটি হযরত আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা)-এর নির্দেশে করা হয় নি। অতএব, আলবানীর মতে, হযরত আয়েশা (রা:)-এর বাতায়ন নির্মাণের আদেশসম্বলিত বর্ণনাটি বানোয়াট।

তবে খলীফা ওয়ালীদ যখন হযরত আয়েশা (রা:)-এর ঘর পুনর্নির্মাণ করেন, তখন ওই বাতায়নও ‍পুনরায় নির্মাণ করা হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা নিশ্চিত নই যে ওই ঘর পুনঃনির্মাণের আগে বাতায়নটির অনস্তিত্ব ছিল।

ইমাম ইবনে জারীর তাবারী (রহমতুল্লাহি আলাইহ) নিজ ‘তারীখ’ গ্রন্থে লিখেন এবং হাফেয ইবনে কাসীরও তাঁর ‘তারীখ’ পুস্তকে লিখেন যে খলীফা ওয়ালীদের শাসনামলে মসজিদে নববীর সম্প্রসারণ করা হয় এবং এই সময় হযরত আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা)-এর ঘরটি (রওযা মোবারক) মসজিদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু বইগুলো কোনো বাতায়নের কথা উল্লেখ করে নি। অতএব, বাতায়ন-সম্পর্কিত এই রওয়ায়াত সহীহ নয়, এমন কথা কীভাবে বলা যায়?

নাসির আলবানী বলেন ইবনে তাইমিয়া কখনােই এই বর্ণনাকে স্বীকার করেন নি। অথচ হাফেয ইবনে তাইমিয়া অন্যত্র এটিকে স্বীকার করে নিয়েছেন।

হাফেয ইবনে তাইমিয়া লিখেন যে হযরত আয়েশা (রা:)-এর জীবদ্দশায় মদীনা মুনাওয়ারায় একবার দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় এবং তিনি তাঁর ঘর, যেখানে মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর রওযা বিদ্যমান, সেটির ছাদ উম্মুক্ত করেন। এটি এ কারণে করা হয় যে বৃষ্টি হলো আল্লাহতা’লার নেয়ামত (আশীর্বাদ), আর তা রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর রওযার ওপর বর্ষিত হবে। [হাফেয ইবনে তাইমিয়া কৃত ‘একতেদা আস্ সেরাত আল-মোস্তাকীম’, ৩৩৮ পৃষ্ঠা]

এই বর্ণনা সহীহ না হলে হাফেয ইবনে তাইমিয়া এটি প্রত্যাখ্যান করতেন। কিন্তু তিনি তা করেন নি। তাই এই সহীহ রওয়ায়াত গ্রহণযোগ্য।

৪/ - আলবানী দাবি করেন যে এটি হযরত আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা)-এর ব্যক্তিগত অভিমত।

এর জবাব হলো এই বাস্তবতা যে, ওই সময় হযরতে সাহাবা-এ-কেরাম (রা:) সবাই হায়াতে জিন্দেগীতে ছিলেন এবং তাঁরা হযরত আয়েশা (রা:)-এর কাজে বাদ সাধেন নি। অতএব, তিনি এবং সাহাবাবৃন্দ (রা:) এ ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেছিলেন। এটি-ই গোটা উম্মতের জন্যে প্রামাণ্য দলিল, ব্যতিক্রম শুধু আলবানী।

পরিশেষে বলবো, আলবানীর যদি সর্ব-ইমাম যাহাবী, আসকালানী (রহ:), আবূ হাতেম, ইবনে আদী, হাফেয ইবনে তাইমিয়া ও শওকানীর ‘তাকলীদ’ প্রয়োজন হয়, তবে মুসলমান সর্বসাধারণের পক্ষে চার মযহাবের সর্ব-ইমাম আবূ হানিফা (রহ:), মালেক (রহ:), শাফেঈ (রহ:) ও আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ:) সাহেববৃন্দের ‘তাকলীদ’ মানা জরুরি।

দ্বিতীয়তঃ আলবানীর গবেষণা নির্ভরযোগ্য নয়, কেননা তিনি যে সব মতের সাথে দ্বিমত পোষণ করেন সেগুলোকে উপেক্ষা করেন।

এই লেখককে যে কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনা সাহায্য করেছিল -

একবার এক তরুণ আমার কাছে এসে আমায় বলে কেন আমি কেবল বুখারী ও মুসলিম মানি না; সে আমায় কোনো ইমামকে না মেনে শুধু বই দুটো অনুসরণের তাকিদ দেয়। আর ’বেদআতী’ হতে মানা (বারণ) করে।

আমি তার জবাবে দুটো হাদীস প্রদর্শন করি এবং তাকে বলি সে এই দুটোর অর্থ কী বোঝে। একটি হাদীস বুখারীর, অপরটি মুসলিমের। ওই তরুণ দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ ছিল সে এটি প্রমাণ করবে যে তার ব্যাখ্যা সর্ব-ইমাম আবূ হানীফা (রা:) ও মালেক (রহ:)-এর চেয়ে শ্রেয়তর। কেননা, তাঁদের জমানায় কোনো কম্পিউটার ছিল না যে তাঁরা আহাদীসের ডাটাবেজ তৈরি করবেন!

ওই দুটো হাদীস হলো:

১/ - ইমাম বুখারী (রহ:) বর্ণনা করেন, হযরত আমর বিন মায়মূন (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) বলেছেন: আমি একটি বানরকে দেখলাম যেটি সদ্য অপর এক বানরীর সাথে সহবাস করেছে, আর অন্যান্য বানরগুলো তাদেরকে পাথর মারছে; এমতাবস্থায় আমিও তাদেরকে পাথর মারা আরম্ভ করলাম। [বুখারী শরীফ, ‘আইয়ামুল জাহেলীয়্যাহ’ অধ্যায়]

২/ - হযরত আনাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হযরত আলী (কার্রামাল্লাহু ওয়াজহাহু)-কে আদেশ করেন এক মুসলমান-ব্যক্তিকে হত্যা করতে, যার বিরুদ্ধে মানুষেরা এক দাসীর সাথে অবৈধ যৌনাচারের অভিযোগ এনেছিল। হযরত আলী (ক:) তাকে একটি হৃদে গোসল করতে দেখেন। তিনি তাকে কাছে ডাকলে সে উঠে আসে, তবে তার পরণে কোনো কাপড় ছিল না। হযরত আলী (ক:) তাকে ছেড়ে দেন, কারণ তিনি দেখতে পান যে এই লোক খোজা হওয়ার দরুন যেনা করতে অক্ষম। [মুসলিম শরীফ, ‘তওবা’ অধ্যায়]

ওই তরুণ এই দু’টি হাদীসের ব্যাখ্যায় বলে:

আল-বুখারীর এই রওয়ায়াত দ্বারা পরিষ্কার যে, ইসলামী বিধান মোতাবেক জন্তু-জানোয়ারের মধ্যে বিয়ে-শাদী দেয়া উচিৎ; আর যদি তারা অবৈধ যৌনাচারে লিপ্ত হয়, তাহলে তাদের জীবনকে আরও সভ্য করার জন্যে মানুষের মতোই শাস্তির বিধান করা চাই। উপরন্তু, দ্বিতীয় হাদীসটির বেলায় বলা যায়, কেউ কোনো নারীর সাথে অবৈধ যৌনাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত হলে তাকে মেরে ফেলা উচিত; তবে মারার আগে পরীক্ষা করতে হবে, সে খোজা কি-না।

যে সব লোক ইমামবৃন্দের তাকলীদ বাদ দিয়ে বুখারী ও মুসলিম শরীফের শরণাপন্ন হবার পরামর্শ দেয়, তাদের দ্বারা প্রয়োগকৃত ‘এজতেহাদের’ একটি নমুনা এটি।

                                      ---সমাপ্ত---