ব্লগ সংরক্ষাণাগার

মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য 'মাওলা' শব্দ ব্যবহার করা কি শিরক?

[মুহাম্মদ জালালউদ্দীন নিয়াজের ফেসবুক পাতা হতে সংগৃহীত]
.
কুখ্যাত এজিদী লা-মাযহাবী আহলে খবীস মাওদূদীর চেলা চট্টগ্রাম আন্দরকিল্লা আযাদ লাইব্রেরীর মালিক আবুল কালাম আযাদ তার শিরক ও বিদআত পুস্তকে যা লিখেছে তার মূলকথা হলো...
.
'মাওলা' শব্দটি আল্লাহর জন্য খাছ। অন্য কারো জন্য ব্যবহার করা শিরক।
.
কুরআন হাদীসের কত বড় অপব্যাখ্যাকারী হলে এমন জগণ্য উক্তি করতে পারে!
.
অথচ দেখুন আল্লাহ পাক সুরা তাহরীমের ৪ নং আয়াতে সুস্পষ্টভাবে 'মাওলা' শব্দটি নিজেই অন্যদের জন্য ব্যবহার করেছেন। যেমন,আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেন -

অবশ্যই মহান আল্লাহ তাঁর [প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা'র] 'মাওলা'। হযরত জিব্রাঈল আলাইহিস সালামও তাঁর 'মাওলা' এবং নেককার ঈমানদারগণও তাঁর 'মাওলা'। এছাড়া ফিরিশতাগণও তাঁর সাহায্যকারী।
.
এই আয়াত শরীফ তাদের মুখেই চুনকালি মেখে দিয়েছে,যারা দাবি করে আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মাওলা নেই আর কোনো সাহায্যকারী-ও নেই!
.
হাদীস শরীফেও রয়েছে,রাসুলুল্লাহ আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ওয়া কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু এর ফযিলত বর্ণানা করতে গিয়ে ইরশাদ করেছেন,আমি যার 'মাওলা' আলীও তার 'মাওলা'।
.আমার তো মনে হচ্ছে এই খবীসটা আল্লাহ ও তাঁর প্রিয় হাবীবের ওপরেই শিরকের ফতোয়া আরোপ করেছে!। কারণ,আল্লাহ ও তাঁর প্রিয় রাসুলই তো সর্বপ্রথম মাওলা শব্দটি অন্যের জন্য ব্যবহার করেছেন।
.
এই বেয়াদবটা এটাও বলেছে, আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা সায়্যিদিনা ওয়া মাওলানা মুহাম্মাদিন, এভাবে দুরুদ পড়া শিরক। কারণ, এখানেও প্রিয় রাসুলের জন্য মাওলা শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে! নাউযুবিল্লাহ! ক­াউকে অমুক মাওলানা তমুক মাওলানা বলা যাবে না। নাউযুবিল্লাহ!
.
আল্লাহ পাক আমাদের সকলকে এইসব দাজ্জাল কাযযাবদের কালো থাবা থেকে বাঁচিয়ে রাখুন, আমীন!

রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০১৫

শাওয়াল মাসের ৬ রোযার ফযীলত


[মোহাম্মদ হাসান আত্তারীর ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত]


হজরত রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ ফরমান, 'যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখল, অতঃপর তার সঙ্গে সঙ্গে শাওয়াল মাসের ছয়টি রোজা রাখল, সে যেন পূর্ণ বছরই রোজা রাখল।' (সহিহ মুসলিম: ১১৬৪)

এ হাদিসকে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অন্য বাণী দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন; তিনি বলেন: “যে ব্যক্তি ঈদুল ফিতরের পরে ছয়দিন রোজা রাখবে, সে যেন গোটা বছর রোজা রাখল; যে ব্যক্তি একটি নেকি করবে, সে দশগুণ সওয়াব পাবে।” অন্য বর্ণনাতে আছে - “আল্লাহ এক নেকিকে দশগুণ করেন। সুতরাং এক মাসের রোজা দশ মাসের রোজার সমান। বাকি ছয়দিন রোজা রাখলে এক বছর হয়ে গেল।” [সুনানে নাসায়ী,সুনানে ইবনে মাজাহ]

 এ হাদিসটি সহিহ আত-তারগীব ও তারহীব (১/৪২১) গ্রন্থেও রয়েছে। সহিহ ইবনে খুজাইমাতে হাদিসটি এসেছে এ ভাষায় - “রমজান মাসের রোজা হচ্ছে দশ মাসের সমান। আর ছয়দিনের রোজা হচ্ছে দুই মাসের সমান। এভাবে এক বছরের রোজা হয়ে গেল।” হাম্বলি মাযহাব ও শাফেয়ি মাযহাবের ফিকাহবিদগণ স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন যে, রমজান মাসের পর শাওয়াল মাসে ছয়দিন রোজা রাখা একবছর ফরজ রোজা পালনের সমান; অন্যথায় সাধারণ নফল
রোজার ক্ষেত্রেও সওয়াব বহুগুণ হওয়া সাব্যস্ত। কেননা, এক নেকিতে দশ নেকি দেয়া হয়। অন্য এক বর্ণনায় আছে, 'যে
ব্যক্তি রমজানের রোজা শেষ করে ছয় দিন রোজা রাখবে, সেটা তার জন্য পুরো বছর রোজা রাখার সমতুল্য।' (আহমাদ: ৫/২৮০,দারেমি: ১৭৫৫)


সংগৃহীত: মোহাম্মদ জিশান
ইন'শা আল্লাহ আমরা ৬ রোজা রাখার চেষ্টা করবো, আমীন।

শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০১৫

ইসলামের নামে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ



ড: আব্দুল বাতেন মিয়াজী
 [ধারাবাহিক ভাবে বেশ কিছু পর্বে জংগী দমনে এবং সুন্নিয়ত প্রচার ও প্রসারে করণীয় প্রস্তাবনাগুলো প্রকাশ করা হবে, ইনশা আল্লাহ! ফেসবুক পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে কপি করে আপনার টাইমলাইনে পোস্ট করুন। ধন্যবাদ।]

মুসলিম প্রধান দেশে মুসলিমদের হাল-হকীকত

সকালে ঘুম ভেঙেছে, কিন্তু চোখ বন্ধ রেখে বিছানায় শুয়ে আছি। কেন জানি প্রথমেই মনে পড়লো ৭১ চ্যানেলে দেয়া মিতা হকের ইসলাম আর পর্দা-বিরোধী বক্তব্যগুলো। ওই মহিলার ইসলাম আর মুসলমানদের বিরুদ্ধে নির্লজ্জ কথাগুলো আমার মনে এতটাই প্রভাব ফেলেছে যে ঘুম ভাংতেই সেগুলোর প্রতিধ্বনি শুনতে পাচ্ছিলাম। তার মতে বাঙালি হতে হলে মেয়েদের পর্দা করা যাবে না। কাঁধ, ভুরি, বাহু খোলা রেখে শাড়ি পরতে হবে। কপালে থাকতে হবে হিন্দুয়ানী টিপ। মাথায় স্কার্ফ বা কিছু রাখা হবে অবাঙালীর বৈশিষ্ট্য। শরীর পুরোপুরি ঢাকে এমন কোন পোশাক পরিধান মানেই বাঙালিত্ব পরিহার করা। অর্থাৎ পরপুরুষের মনোরঞ্জনে বাঁধা আসে এমন কিছু পরিধান করাই অবাঙ্গালিত্বের বৈশিষ্ট্য। অর্ধ নগ্ন, কামোদ্দীপক পোশাকেই নাকি পুরোপুরি বাঙালিত্ব ফুটে উঠে। পুরুষের বেলায়ও নাকি দাড়ি কাটা, পাঞ্জাবী বা শার্ট পরিধান বাঙালিত্বের অপরিহার্য ভূষণ। মহিলা ইসলামকে কটাক্ষ করে বেশ কিছু সস্তা আর অযৌক্তিক কথা বলল যা কোন রুচিবান মানুষের পক্ষে শোভনীয় হতে পারেনা। কিন্তু মঞ্চে উপবিষ্ট কিছু অর্বাচীন (মামুনুর রশীদ এবং আরো একজন) কিছুই বলল না। মনে হল, এরাও ভয় পেয়েছে, পাছে সত্য বলতে গিয়ে আবার নিজের বাঙালী পরিচয়টুকু জলাঞ্জলি দিতে হয়!

চোখ বন্ধ অবস্থাতেই ভাবছলাম, কেন এমন ধারণা একজন শিক্ষিত মহিলার? সে শুধু একা নয়। আমাদের বাংলাদেশের বেশির ভাগ উচ্চ শিক্ষিত আধুনিকমনা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এমন ধারণা পোষণ করেন। তাদের কাছে ইসলাম মানে সেকেলে, পিছিয়ে পরা, গতানুগতিক কিছু ব্যাপার। যা সর্বতোভাবে পরিহার্য। তাদের চোখে মুসলমান মানেই দাড়ি-টুপী ওয়ালা চরিত্রহীন, লম্পট, ঠক, দেশদ্রোহী কিছু মানুষ। মামুনুর রশীদ কিংবা আব্দুল্লাহ আল-মামুনের মতো কিছু লেখক-নাট্যকার স্বাধীনতা উত্তোর লেখনীতে এমনটিই ফুটিয়ে তুলেছেন।

কেন তারা এমনটি করেছেন? গ্রামের ধার্মিক মাতাব্বর মানেই কেন দাড়ি-টুপী ওয়ালা, পাঞ্জাবী-পরা একজন অমানুষ? এর কারণ হয়তো অনেকেই জানেন না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে জামাত-ই-ইসলামী আর মুসলিম লীগের বিরোধিতা এবং এদের নানা অসামাজিক কার্যকলাপ, মানবতা বিবর্জিত কার্যক্রম, ইসলামের নামে হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন মানুষের মননে ইসলাম এবং মুসলমান সম্পর্কে এক ধরণের লোমহর্ষক, নিষ্ঠুর, অমানবিক, লম্পট, অধার্মিক চিত্র এঁকে দিয়েছে। সর্বশেষ স্বাধীনতার মাত্র দুদিন পূর্বে বুদ্ধিজীবী-হত্যা মানুষের মনে চিরস্থায়ী ইসলাম-বিদ্বেষ রোপণ করেছে। এদেশের বেশির ভাগ উচ্চ শিক্ষিত মানুষ ইসলামকে জানে জামাত-ই-ইসলামীকে দেখে। উচ্চ শিক্ষিত মানুষদের খুব কমই কুরআন কিংবা হাদিস পড়ে বুঝতে পারে। মুক্তিযদ্ধকালীন জামাতের ভুমিকা এবং স্বাধীনতা পরবর্তী জামাতের ধ্বংসাত্মক রাজনীতি মানুষের মনে ইসলাম-বিদ্বেষ ভাবকে আরো পাকাপোক্ত ও প্রকট করে তোলে। ফলে জন্ম নেয় উচ্চ শিক্ষিত মুক্তমনা নাস্তিক গোষ্ঠী। একদিনে এদের এই মনোভাব পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। এর জন্য সুষ্ঠু এবং নিয়মতান্ত্রিক ভাবে কাজ করে যেতে হবে। জামাত, আহলে হাদিস কিংবা লা-মাজহাবীরা আর্থিক সাহায্য পেয়ে থাকে মধ্য প্রাচ্যের ওহাবী-প্রভাবিত দেশগুলো থেকে। তৈরি হচ্ছে জংগী, ইসলামের নামে সন্ত্রাস। কলঙ্কিত করা হচ্ছে ইসলামকে। আর সাধারণ মুসলমানের মুখে কালিমা লেপন করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্বে রয়েছে আল-কায়েদা, তালিবান, আল-শাবাব, বুকো হারাম, নুসরা ফ্রন্ট, দায়েশ, ইসলামী খিলাফত, হিজবুল্লাহ, হামাসসহ বাংলাদেশের অসংখ্য জংগী সংগঠন যাদের তৈরিতে সরাসরি হাত রয়েছে সৌদি ওহাবী, পশ্চিমা ইহুদি আর খৃষ্টানদের। লক্ষ্য করুণ এদের সবার আক্বীদা হলো সৌদি ওহাবী আক্বীদা। তথা ইসলামকে বিনাশ করার সব নীলনক্সা। অপরদিকে সুন্নীদের সেরকম কোন দাতা নেই। ফলে সঠিক আক্বীদা আর সুন্নীয়ত প্রচার এবং প্রসারের পথ খুবই কণ্টকাকীর্ণ।

আমাদের প্রিয় বাংলাদেশে একদিকে রয়েছে ভুঁইফোঁড়ের মতো বুর্জোয়া ধর্ম-সন্ত্রাসী জামাত, সহীহ হাদিসের নামে ধর্মীয় ত্রাস আহলে হাদিস কিংবা লা-মাজহাবী, অন্য দিকে রয়েছে আধুনিক শিক্ষা বিবর্জিত কওমী তথা খারেজী গোষ্ঠী। এদের বিপরীতে রয়েছে উচ্চ শিক্ষিত নাস্তিক গোষ্ঠী। আর এ সকল গোষ্ঠীর উল্টোদিকে অবস্থানে আছে আহলে হক্ক বা সঠিক পথের দিশারী নবী-ওলী-সলফে সালেহীনদের পদাংক অনুসরণকারী আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত। কিন্তু সঠিক এই দলটির অবস্থান এতই নড়বড়ে যে উপরের বর্ণিত কোন পক্ষেরই ধাক্কাই সামলানোর মতো কোন অর্থবল, লোকবল, কৌশল এদের নেই। তবে এদের রয়েছে জ্ঞানের ভাণ্ডার আর ঈমানী জজবা। এদের রয়েছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি অগাদ ভালোবাসা। রয়েছে সলফে সালেহীন, ইমাম, মুজতাহীদ, মুফাসসসীর, মুহাদ্দীসীনে কেরাম এবং আল্লাহর ওলীগণের প্রতি ভালোবাসা এবং অকুণ্ঠ ভক্তি-শ্রদ্ধা। এই হুসাইনী সৈনিকদের রাসুল (দঃ) এর প্রেমের পাশাপাশি প্রয়োজন সঠিক দিকনির্দেশনা, জ্ঞান চর্চা, সঠিক কর্মপন্থা এবং কৌশল। ইনশা আল্লাহ, ধীরে ধীরে সেসব বর্ণনা করা হবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সত্য ও সঠিক আক্বীদা বোঝার ও এর উপর স্থির থাকার তৌফিক দান করুন, আমীন!

ওহাবী/সালাফী নামধারী কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলোর অপতৎপরতায় আর ইহুদী-খৃষ্টান চক্রের কৌশলগত এবং সামরিক সহায়তায় সমগ্র বিশ্বব্যাপী এখন চলছে ইসলামের নামে সন্ত্রাসবাদ। এর দায়ভার এসে পড়ছে সাধারণ মুসলমানের উপর। কলঙ্কিত হচ্ছে আল্লাহর মনোনীত ধর্ম ইসলাম। উইকিলিকস আর পশ্চিমা দেশের বিভিন্ন গোয়েন্দা রিপোর্টেই এখন জানা যাচ্ছে কিভাবে তারা নিজেদের স্বার্থে কট্টর মুসলিমদের মধ্য থেকে নিজেদের পছন্দ মত দল তৈরি করে মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছে। ইরাকে ১৫ লক্ষ মুসলমান হত্যা করে এরা ক্লান্ত। আফগানিস্তানে কত লক্ষ মুসলমান হত্যা করা হয়েছে তার পরিসংখ্যান এখনো জানা যায়নি। সৌদি সরকারের সরাসরি আহ্বান এবং আর্থিক সহায়তার আশ্বাসেও পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ায় নিজেদেরকে প্রত্যক্ষভাবে জড়াতে চায়নি। পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্র আর ইজরাইলের পরামর্শ, প্রশিক্ষণ আর সামরিক সরঞ্জামাদি যোগানের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে "দায়েশ" আর "ইসলামী খেলাফত"-এর মতো এযাবৎকালের সবচে' ধনী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। পশ্চিমাদের ত্রিমাতৃক সহায়তার পাশাপাশি রয়েছে সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার আর জর্ডানের আর্থিক সহায়তা। ফলে আমরা দেখতে পাচ্ছি সালাফী ইসলামের নামে সন্ত্রাসবাদের একটি মহীরুহ - বিষবৃক্ষ।

এই বিষবৃক্ষ ইসলামের নামে ধ্বংস করে চলেছে শহর, বন্দর, নগর, ঐতিহাসিক স্থাপনা, ঐতিহ্য, দখল করছে নতুন নতুন অঞ্চল আর জবাই করছে মুসলমান, খৃষ্টান, উপজাতি - যাদেরকেই তাদের কাছে হুমকি মনে হচ্ছে - তাদেরকে। এদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি নবী (আলাইহিমুস সালাম) দের পবিত্র মাজার শরীফ, সাহাবা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম), তাবেঈ এবং আল্লাহর ওলীগণের (রাহিমাহুল্লাহু আজমাঈন) মাজার এবং মাজার সংলগ্ন মসজিদসমূহ। সৌদি আরব যেভাবে ইসলামী সব ঐতিহ্য ধংস করে তৈরি করছে ৫-স্টার হোটেল আর শপিং-মল; আল-কায়েদা, তালিবান, আল-শাবাব, বুকো হারাম, নুসরা ফ্রন্ট, দায়েশ, ইসলামী খিলাফত - এসব দল ও গোষ্ঠীও ধংস করে চলেছে ইসলামের ইতিহাস ও ঐতিহ্য। এদের ধ্বংসলীলা দেখে বোঝা যাচ্ছে এদের নাম ভিন্ন ভিন্ন হলেও এদের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য একই। অর্থাৎ ইসলামকে ইতিহাস শূন্য করা। যাতে খুব সহজেই মুসলমানের মেরুদণ্ড ভেঙ্গে ফেলা যায়। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে, এরা এদের এই লক্ষ্যে অনেকটাই সফল হয়ে গেছে।

উল্লেখ্য, মুসলমানদের ঈমানী জজবা বিনষ্ট করার জন্য সম্প্রতি এরা এদের অনুগত কিছু লোককে নিয়োগ দিয়েছে সমকামী ইমাম হিসেবে। আসলে মুসলমানদের ছদ্মবেশে এরা হল ইহুদী-খৃষ্টানদের এজেন্ট। কারণ কোন মুসলমান সমকামিতাকে প্রশ্রয় দেয়া দূরে থাক সমর্থনও করতে পারেনা। সমকামিতার কারণে আল্লাহ পাক একটি নগরী ধংস করে দিয়েছেন। এদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশের কারণে একজন নবী (লুত আঃ) এর স্ত্রীকে পর্যন্ত শুকনো পাথরে পরিণত করে দিয়েছেন। আর এরা ইসলামের নামে চালু করছে সমকামী মসজিদ। আস্তাগফিরুল্লাহ! নাউজুবিল্লাহি মিন জালিক!

লক্ষ্য করুন, ইহুদী-খৃষ্টান চক্র অতি সুকৌশলে মুসলমানদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে মুসলমানদেরকে সব দিক দিয়ে দুর্বল করে দিচ্ছে। আমাদের মনে থাকার কথা এই ব্রিটিশরা কীভাবে "Divide and Rule", অর্থাৎ, "বিভাজন এবং শাসন" নীতি গ্রহণ করে পুরো মুসলিম ভারতকে প্রায় ২০০ বছর শাসন করেছে। গত কয়েক দশক আগে মিথ্যা মারণাস্ত্রের অজুহাতে এরা ধ্বংস করেছে ইরাক, তাদের গৃহপালিত ওসামা বিন লাদেনকে ধরার নামে ধ্বংস করেছে আফগানিস্তান। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে একে একে অকেজো করেছে মিশর, আলজেরিয়া, ইয়েমেন, লিবিয়া, তিউনিসিয়া। আর সিরিয়াকেও তো পুরো ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। ইরানকে শত চেষ্টার পরও তেমন কাবু করতে পারেনি। সবচে' আতংকের বিষয় হচ্ছে এই বিষবৃক্ষ এখন বুমেরাং হয়ে ফিরে আসছে খোদ আরব মুল্লুকে, যেমন সৌদি আরব আর কুয়েতে। ইতোমধ্যেই এরা সৌদি আরব ও কুয়েতে বেশ কিছু হামলাও পরিচালনা করেছে। সবচে' অবাক করার বিষয় হচ্ছে এরা এখন মিশরের সিনাই উপত্যকায় মিশরীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ছে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে এদের শক্তি এবং সামর্থ্য এতই বৃদ্ধি পেয়েছে যে এখন এরা শক্তিশালী মুসলিম দেশগুলোতেও হামলা করতে ভ্রূক্ষেপ করছে না।

লিবিয়াতে পশ্চিমাদের আমৃত্যু শত্রু গাদ্দাফীর পতনের পর এরা এদের পছন্দের বিদ্রোহী দলগুলোকে হটিয়ে এখন আবার পথ করে দিচ্ছে ইসলামী খিলাফতের। ইসলামী খেলাফত এখন তাণ্ডব চালাচ্ছে খোদ রাজধানী ত্রিপলিতে। এভাবে একের পর এক মুসলিম রাষ্ট্র ধ্বংসের পর মুসলমানদেরকে নিজেদের অনুগত দাসে পরিণত করতে আর কোন বাঁধা থাকবে না। যেমন ইতোমধ্যেই সৌদি আরবসহ আরব বিশ্বের অনেক দেশই পশ্চিমা খৃষ্টানদের আর ইহুদী রাষ্ট্র ইজরাইলের আনুগত্য করে চলেছে। সৌদি তেল কোম্পানি ARAMCO- এর লভ্যাংশের অর্ধেক নিয়ে যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সৌদি আরব তাদের সৌদি রাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখার স্বার্থে সব সয়ে যাচ্ছে।

মুসলমান যাতে মাথা তুলে দাড়াতে না পারে সেজন্য এরা মুসলমানদের মধ্য থেকে তৈরি করছে কট্টরপন্থী সালাফী/আহলে হাদিস কিংবা লা-মাজহাবীদের মতো গ্রুপ। এরা বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে সংগঠিত হলেও এদের আদর্শ, ধর্মীয় মতবাদ এবং ধ্বংসযজ্ঞের চেহারা একই রকম। এদের লক্ষ্য হলো একদিকে ইসলামের নামে সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা করা, অন্য দিকে অধিকৃত অঞ্চলে ইসলামী সব ঐতিহ্য ধ্বংসের মাধ্যমে ইসলামকে ইতিহাস-শূন্য করা।

বুধবার, ১৭ জুন, ২০১৫

মহানবী (দ:)-এর দরবারে জিবরীল (আ:)-এর হাজিরা

[Bengali translation of www.ziaislamic.com's article "Jibreel in the presence of the Holy Prophet Muhammad (Sallallahu alaihi wa sallam)"; translator: Kazi Saifuddin Hosain]

মূল: জিয়া-ইসলামিক-ডট-কম
অনুবাদ: কাজী সাইফুদ্দীন হোসেন

[উৎসর্গ: পীর ও মোর্শেদ সৈয়দ মওলানা এ, জেড, এম, সেহাবউদ্দীন খালেদ আল-কাদেরী আল-চিশ্তী (রহ:)-এর পুণ্যস্মৃতিতে...]

আল্লাহ পাক তাঁর প্রিয়নবী (দ:)-কে অন্যান্য সকল নবী (আ:)-এর চেয়ে মাহাত্ম্য, গুণাবলী, মো’জেযা (অলৌকিকত্ব) ও আধ্যাত্মিক মকাম তথা মর্যাদার ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। তিনি এরশাদ ফরমান:

“এঁরা রাসূল, আমি তাঁদের মধ্যে এককে অপরের ওপর শ্রেষ্ঠ করেছি। তাঁদের মধ্যে কারো সাথে আল্লাহ কথা বলেছেন এবং কেউ এমনও আছেন যাঁকে (অর্থাৎ, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামকে) সবার ওপর মর্যাদাসমূহে উন্নীত করেছি। আর আমি মরিয়ম-তনয় ঈসাকে স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ প্রদান করেছি; এবং পবিত্র রূহ দ্বারা তাঁকে সাহায্য করেছি; আর আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদের পরবর্তীরা পরস্পর যুদ্ধ করতো না তাদের কাছে স্পষ্ট নিদর্শনগুলো আসার পর; কিন্তু তারা তো পরস্পর বিরোধকারী হয়ে গিয়েছে (নিজেদের স্বাধীন ইচ্ছা যা তাদেরকে দান করা হয়েছিল এবং যার জন্যে তাদেরকে জবাবদিহি করতে হবে, তারই বশবর্তী হয়ে)। তাদের মধ্যে কেউ ঈমানের ওপর (প্রতিষ্ঠিত) রইলো এবং কেউ কাফের হয়ে গেল; আর আল্লাহ ইচ্ছা করলে তারা যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত হতো না; কিন্তু আল্রাহ যা চান করে থাকেন।” [সুরা বাকারা: ২৫৩ আয়াত; মুফতী আহমদ এয়ার খান (রহ:) কৃত ‘নূরুল এরফান’]

ফেরেশতাকুল-সহ সকল সৃষ্টি-ই মহানবী (দ:)-এর উম্মত

আমাদের ঈমান ও আকীদা-বিশ্বাসের অনস্বীকার্য দিক হলো অন্তরে এই প্রত্যয় পোষণ করা যে, মহানবী (দ:)-ই বিশ্বজগত ও এর তাবৎ বস্তু সৃষ্টির মূল উপলক্ষ এবং এগুলোর অস্তিত্বের (একমাত্র) কারণ। সমস্ত সৃষ্টিজগত, যা’তে অন্তর্ভুক্ত ফেরেশতাকুল-ও, তাঁরই উম্মত বলে সহীহ মুসলিম শরীফে বর্ণিত হয়েছে; রাসূলুল্লাহ (দ:) এরশাদ ফরমান:

“আর আমি সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্যে এবং নবুওয়্যতের ক্রমধারা উপলক্ষে প্রেরিত হয়েছি।” [সহীহ মুসলিম, ১ম খণ্ড, হাদীস নং ৫২৩; মুসনদ-এ-ইমাম আহমদ হাম্বল, হাদীস নং ৮৯৬৯]

মোল্লা আলী কারী এই হাদীসের ব্যাখ্যায় তাঁর কৃত ‘মেরকাত শরহে মেশকাত’ গ্রন্থে লেখেন: অর্থাৎ, আমি সমগ্র বিশ্বজগত, জ্বিন-ইনসান, ফেরেশতা, পশুপাখি ও জড় পদার্থের জন্যে রাসূল হিসেবে প্রেরিত হয়েছি। [মিরকা‘তুল মাফাতীহ, ৫ম খণ্ড, ১৬৩ পৃষ্ঠা]

আল্লাহতা’লা তাঁর প্রিয়নবী (দ:)-এর মহিমা ও উচ্চ মকাম/মর্যাদা বর্ণনা করেছেন এবং উম্মতে মোহাম্মদীকে আদেশ করেছেন বিশ্বনবী (দ:)-কে শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন করতে, যেমনটি এরশাদ হয়েছে সূরা ফাতাহ’তে -

“যাতে ওহে লোকেরা! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (দ:)-এর প্রতি ঈমান আনো এবং রাসূল (দ:)-এর মহত্ত্ব বর্ণনা ও (তাঁর প্রতি) সম্মান প্রদর্শন করো, আর সকাল-সন্ধ্যা আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করো।” [৪৮:০৯]

পুণ্যাত্মা জ্বিন ও ইনসান, ফেরেশতা ও সকল সৃষ্টি মহানবী (দ:)-কে সম্মান প্রদর্শন করে থাকেন। এ কথা ধারণাও করা যায় না যে ফেরেশতাকুল, বিশেষ করে তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় জিবরীল আমীন (আ:) কোনোভাবেই হুযূর পূর নূর (দ:)-এর প্রতি অশ্রদ্ধাশীল হবেন।

আল্লাহতা’লা সূরা তাহরীমে এরশাদ ফরমান:

“হে ঈমানদারবর্গ! নিজেদেরকে ও নিজেদের পরিবারবর্গকে ওই আগুন থেকে রক্ষা করো যার ইন্ধন হচ্ছে মানুষ ও পাথর, যার ওপর শক্তিশালী ও কঠোর ফেরেশতাবৃন্দ নিয়োজিত রয়েছেন, যারা আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করেন না এবং যা তাদের প্রতি আদেশ হয়, তা-ই করেন।” [৬৬:০৬]

আল্লাহতা’লা জিবরীল আমীন (আ:)-কে মহানবী (দ:)-এর সেবক/খেদমতগার বানিয়েছিলেন। তাঁকে সৃষ্টি-ই করা হয়েছিল শুধুমাত্র প্রিয়নবী (দ:)-এর খেদমত করার উদ্দেশ্যে। ইমাম ইউসূফ বিন ইসমাঈল নাবহানী (রহ:) শায়খ আবদুল আযীয দাব্বাগ (রহ:)-কে উদ্ধৃত করে লেখেন:

হযরত জিবরীল আমীন (আ:)-কে যা যা উচ্চ মকাম বা মর্যাদা (খোদাতা’লার পক্ষ থেকে) মঞ্জুর করা হয়েছিল, তার সবই মহানবী (দ:)-এর সাথে তাঁর সংশ্লিষ্টতা বা সম্পর্ক এবং হুযূর পাক (দ:)-এর প্রতি তাঁর খেদমতের কারণেই মঞ্জুর করা হয়েছিল। জিবরীল (আ:) যদি মহানবী (দ:)-এর খেদমত না করে সারা জীবন কাটিয়ে দিতেন এবং আপন শক্তি ব্যয়ে ওই সব উচ্চ আধ্যাত্মিক মকামগুলো অর্জনের সর্বাত্মক চেষ্টা করতেন, তবু নিজ হতে তিনি ওগুলোর একটি মকাম-ও অর্জন করতে সক্ষম হতেন না। তিনি মহানবী (দ:)-এর কাছ থেকে যা যা (খোদায়ী) আশীর্বাদ প্রাপ্ত হয়েছেন, সেগুলো সম্পর্কে শুধু তিনি-ই জানেন, আর জানেন সেসব পুণ্যাত্মা, যাঁদের জন্যে খোদাতা’লা তাঁর মা’রেফতের (তথা খোদার ভেদের রহস্যপূর্ণ জ্ঞানের) দরজাগুলো খুলে দিয়েছেন।

হযরত আবদুল আযীয দাব্বাগ (রহ:) আরও বলেন: জিবরীল আমীন (আ:)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে শুধু রাসূলুল্লাহ (দ:)-কে সেবা করার জন্যে, আর তাই তিনি তাঁর গোটা সত্তা দ্বারা মহানবী (দ:)-এর প্রতি সমর্থন যুগিয়েছেন।

রাসূলে পাক (দ:)-এর রহমত (করুণাধারা) হতে জিবরীল (আ:) লাভবান 

ইমাম কাজী আয়ায (রহ:)-এর প্রধান রচনা-কর্ম ‘শেফা শরীফ’ গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে তিনি লেখেন:

বর্ণিত আছে যে মহানবী (দ:) জিবরীল আমীন (আ:)-কে বলেছিলেন, আমার বিশেষ রহমত হতে আপনি কি কোনো কিছু প্রাপ্ত হয়েছেন? জবাবে জিবরীল (আ:) বলেন, জ্বি হ্যাঁ, আমি আমার ভাগ্য (পরিণতি) সম্পর্কে শংকিত ছিলাম। কিন্তু আমি এখন নিশ্চিন্ত। কেননা, আপনার কারণেই আল্লাহ আমার ব্যাপারে বলেন:

“যে (সত্তা তথা জিবরীল) শক্তিশালী (সত্যের প্রতি আহ্বানে, খোদার বাণী পৌঁছে দেয়ার বেলায় এবং আধ্যাত্মিক যোগ্যতায়), আরশ অধিপতির দরবারে সম্মানিত (গৌরব ও মহিমায়), সেখানে তার আদেশ পালন করা হয়, (যে) আমানতদার।” [সূরা তাকভীর, ২০ আয়াত]

আধ্যাত্মিক জগতে জিবরীল (আ:) মহানবী (দ:)-এর উজির 

আল্লাহ পাক হযরত জিবরীল (আ:)-কে মহানবী (দ:)-এর সেবক-ই কেবল বানান নি, বরং আধ্যাত্মিক জগতে তাঁকে তাঁর উজির-ও বানিয়েছেন। ইমাম হাকীম নিশাপুরী (রহ:) নিজ ‘মোস্তাদরাক’ কেতাবে এই প্রসঙ্গে ইমাম বোখারী (রহ:) ও ইমাম মুসলিম (রহ:)-এর সূত্রে একখানা হাদীস বর্ণনা করেন:

হযরত আবূ সায়ীদ খুদরী (রা:)-এর সূত্রে বর্ণনা করা হয়েছে যে রাসূলুল্লাহ (দ:) এরশাদ করেছেন, নিশ্চয় আধ্যাত্মিক জগতে আমার দু’জন উজির এবং এই দুনিয়ায় দু’জন উজির আছেন। আধ্যাত্মিক জগতে দু’জন হলেন জিবরীল (আ:) ও মিকাইল; অার দুনিয়ায় দু’জন হলেন আবূ বকর (রা:) ও উমর (রা:)।

এই হাদীসটি শব্দচয়নে সামান্য পরিবর্তনসহ অন্যান্য হাদীসের গ্রন্থে উদ্ধৃত হয়েছে। ইমাম হাকীম (রহ:) নিজ ‘মোস্তাদরাক’ গ্রন্থের ২টি জায়গায় এর উল্লেখ করেন; আরও উল্লেখ করেন ইমাম তিরমিযী (রহ:) নিজ ‘জামেউ তিরমিযী’ পুস্তকের এক জায়গায়, ইমাম সৈয়ুতী (রহ:) তাঁর ‘জামেউল আহাদীস ওয়াল মারাসীল’ গ্রন্থের পাঁচ স্থানে, ‘কানযুল উম্মাল’ কেতাবের চার জায়গায় এবং ইমাম নাসাঈ (রহ:) নিজ ‘ফাযাইলে সাহাবা’ পুস্তকের এক স্থানে।

হযরত শায়খুল ইসলাম ইমাম মোহাম্মদ আনওয়ারুল্লাহ ফারূকী (রহ:) এই হাদীসের ব্যাখ্যায় লেখেন: ফেরেশতাকুলের মধ্যে জিবরীল (আ:) ও মিকাইলের মতো দু’জন উজির আসমানে, আর দু’জন উজির জমিনে থাকলে এই বিষয়ে কি কোনো সন্দেহ আছে যে মহানবী (দ:) আসমানী জগত ও পার্থিব জগতের (অবিসংবাদিত) সুলতান তথা সম্রাট? 

মহানবী (দ:)-এর শিক্ষক আল্লাহতা’লা, কোনোভাবেই জিবরীল (আ:) নন

বিশ্বনবী (দ:) হলেন সৃষ্টিকুলের মাঝে (আল্লাহতা’লার) সর্বপ্রথম সৃষ্টি। বিশ্বজগতের স্রষ্টা যা ঘটে গিয়েছে এবং যা ঘটবে, এসব বিষয় সম্পর্কে সমস্ত জ্ঞান তাঁকে শিক্ষা দিয়েছেন এবং তাঁকে সমগ্র বিশ্বজগতের শিক্ষক বানিয়েছেন।

মহানবী (দ:) এই জগতের কারো কাছ থেকে কখনোই কোনো কিছু শেখেননি। স্বয়ং আল্লাহতা’লা-ই তাঁকে সর্বপ্রকারের জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন। আল্লাহতা’লা কুরআন মজীদের সূরা আর-রহমানের মধ্যে এরশাদ ফরমান:

“পরম দয়ালু (আল্লাহ), যিনি আপন মাহবূব (দ:)-কে কোরআন শিক্ষা দিয়েছেন। মানবতার প্রাণ মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)-কে সৃষ্টি করেছেন; যা সৃষ্ট হয়েছে এবং যা সৃষ্টি করা হবে সব কিছুর (মা কানা ওয়া মা এয়াকূনু) সুস্পষ্ট বিবরণ তাঁকে শিক্ষা দিয়েছেন।” [৫৫:১-৪]

বিশ্বনবী (দ:)-এর শিক্ষক হলেন খোদ খোদাতা’লা-ই। হযরত জিবরীল আমীন (আ:) আল্লাহর যে সমস্ত বাণী হুযূর পূর নূর (দ:)-এর দরবারে নিয়ে এসেছিলেন, তা তিনি একজন সেবক ও প্রতিনিধি হিসেবেই এনেছিলেন। জিবরীল (আ:)-এর কাজ ছিল আল্লাহর বাণী পৌঁছে দেয়া। কিন্তু এর অর্থ, অন্তর্নিহিত মর্ম এবং গুরুত্ব ও তাৎপর্য স্বয়ং আল্লাহ পাক-ই মহানবী (দ:)-কে শিখিয়েছিলেন। অতএব, জিবরীল (আ:)-এর প্রতি ‘শিক্ষা’ শব্দটি যেখানে আরোপ করা হয়েছে, সেখানে এর মানে এই নয় যে তিনি মহানবী (দ:)-কে শিক্ষা দিয়েছেন, বরং এর মানে তিনি আল্লাহর কালাম (বাণী) পৌঁছে দিয়েছেন। পক্ষান্তরে, এর আক্ষরিক অর্থে যদি একে বিশ্বাস করা হয়, তাহলে জিবরীল (আ:)-কেই ’প্রকৃত শিক্ষক’ বলে স্বীকার করে নিতে হবে; কিন্তু স্রষ্টা ও সৃষ্টি উভয় তো একই সময়ে প্রকৃত শিক্ষক হতে পারেন না। আল্লাহ পাক (ওপরোক্ত আয়াতে করীমায়) প্রকৃত শিক্ষক হওয়ার বিষয়টি নিজের প্রতি আরোপ করে এই ব্যাপারে চূড়ান্ত ফয়সালা দিয়েছেন। তিনি আরও এরশাদ করেন:

“নিশ্চয় সেটি (কুরআন মজীদ) সংরক্ষিত করা (আপনার পবিত্র বক্ষে) এবং পাঠ করা (আপনার পবিত্র জিহ্বায়) আমারই দায়িত্বে।” [সূরা কেয়ামাহ, ১৭ আয়াত]

একই (কেয়ামাহ) সূরায় আরও এরশাদ হয়েছে, “অতঃপর নিশ্চয় এর সূক্ষ্ম বিষয়াদি আপনার কাছে প্রকাশ করা আমার দায়িত্ব।” [৭৫:১৯]

সূরা আল-আ’লায় আল্লাহ পাক এরশাদ ফরমান, “হে হাবীব (দ:), এক্ষণে আমি আপনাকে পড়াবো (শেখাবো এমন পন্থায়), যার ফলে আপনি (কখনো) ভুলবেন না।” [৮৭:০৬]

রাসূলে কারীম (দ:) এই শিক্ষার দিকে ইঙ্গিত করে হাদীস শরীফে এরশাদ ফরমান: “নিশ্চয় আল্লাহতা’লা আমাকে শিক্ষা দিয়েছেন এবং গড়ে তুলেছেন এবং তা তিনি সর্বোত্তম পন্থায়-ই করেছেন।” [আল-মাওয়াহিব আল-লাদুন্নিয়া, ৫ম খণ্ড, ২৯৭ পৃষ্ঠা]

তাফসীরে রূহুল বয়ানে বলা হয়, “একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে জিবরীল (আ:) যখন সূরা মরিয়মের ‘কা....ফ, হা..., ইয়া..., আঈ...ন, সোয়া...দ’ আয়াতটি (১৯:০১) নিয়ে আসেন এবং তেলাওয়াত করেন, তখন হুযূর পূর নূর (দ:) বলেন, ‘আমি এর অর্থ ও উদ্দেশ্য জানি।’ জিবরীল (আ:) বলেন, ‘কা..ফ’; এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (দ:) বলেন, ‘আমি এর অর্থ ও উদ্দেশ্য জানি।’ জিবরীল (আ:) বলেন, ‘হা..’, আর নবীয়্যে মকবূল (দ:) বলেন, ‘আমি এর অর্থ ও উদ্দেশ্য জানি।’ জিবরীল (আ:) আবার বলেন, ‘ইয়া...’, এবারও বিশ্বনবী (দ:) বলেন, ‘আমি এর অর্থ ও উদ্দেশ্য জানি।’ অতঃপর জিবরীল(আ:) বলেন, ‘আঈ..ন’, মহানবী (দ:) জবাব দেন, ‘আমি এর অর্থ ও উদ্দেশ্য জানি।’ জিবরীল (আ:) এরপর বলেন, ‘সোয়া..দ’, এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (দ:) বলেন, ‘আমি এর অর্থ ও উদ্দেশ্য জানি।’

“জিবরীল আমীন (আ:) আরয করেন, ‘এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:)! এই কী মহিমা আপনার! আমি নিজেই এর অর্থ জানি না, অথচ আপনি তা জানেন’!” [তাফসীরে রূহুল বয়ান, সূরা মরিয়ম, ০১ আয়াতের ব্যখ্যায়]

ওপরের উদ্ধৃতিতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে জিবরীল আমীন (আ:) কোনোভাবেই মহানবী (দ:)-এর শিক্ষক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন ওহী (ঐশী বাণী)-এর বাহক ও (খোদাতা’লার) প্রতিনিধি এবং বিশ্বনবী (দ:)-এর  সেবক ও উজির।

মহানবী (দ:)-এর দরবারে জিবরীল (আ:) ৪২০০০০ বার হাজিরা দেন 

ইমাম মোহাম্মদ ফাসী (রহ:) নিজ ‘মাতালি’উল মাসসাররাত’ পুস্তকের ৩২২ পৃষ্ঠায় শায়খ আবূ আব্দুল্লাহ রচিত ‘লাফযুদ্ দুররি বি-আমলিল কাফফ’ গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে লেখেন: “এর মানে হচ্ছে হযরত জিবরীল আমীন (আ:) ৪২০,০০০ বার বিশ্বনবী (দ:)-এর দরবারে হাজিরা দিয়েছেন। প্রতিবারই তিনি যথাযথ আদবের সাথে হাজির হন এবং হুযূর পূর নূর (দ:)-এর খেদমতে অবস্থান করেন।”

মহানবী (দ:)-এর দরবারে হাজিরার জন্যে তাঁর কাছে জিবরীল (অা:)-এর অনুমতি প্রার্থনা 

জিবরীল আমীন (আ:) মহানবী (দ:)-এর দরবারে যতোবার হাজির হয়েছেন, তিনি রাসূল (দ:)-এর প্রতি ভক্তি ও সম্মান প্রদর্শনের মূর্ত প্রতীক হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেছেন। সম্মানার্থে তিনি কখনো হঠাৎ করে হুযূর পাক (দ:)-এর কাছে আসতেন না, বরং তিনি বারবার তাঁর কাছে অনুমতি প্রার্থনা করতেন। মহানবী (দ:) অনুমতি দিলেই কেবল তিনি তাঁর কাছে এসে হাঁটুর সামনে হাঁটু রেখে সমান্তরালভাবে বসতেন।

বস্তুতঃ এই ধরনের বর্ণনাসম্বলিত অনেক হাদীস ‘সিহাহ’, ‘সুনান’ জাতীয় বিভিন্ন হাদীসগ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে। নমুনাস্বরূপ এ ধরনের একখানা হাদীস নিচে উদ্ধৃত হলো:

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা:)-এর সূত্রে বর্ণিত; তিনি বলেন, একবার আমরা মহানবী (দ:)-এর খেদমতে উপস্থিত ছিলাম। হঠাৎ তাঁর দরবারে সুন্দর চেহারাবিশিষ্ট, সুগন্ধিময় দেহসৌষ্ঠবসম্পন্ন ও পরিষ্কারপরিচ্ছন্ন বস্ত্র পরিধানরত এক ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটে। তিনি এসে আরয করেন, আস্ সালামু আলাইকুম, এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:)! আমি কি কাছে আসতে পারি? হুযূর পাক (দ:) বলেন, কাছে আসুন। ওই ব্যক্তি কিছুটা কাছে আসেন। এভাবে তিনি বারংবার কাছে আসার অনুমতি চাইতে থাকেন এবং মহানবী (দ:)-এর আরও কাছে এসে বসেন।

’মুসনদে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল’ গ্রন্থে এই হাদীসটির শব্দচয়নে সামান্য রদবদল আছে:

জিবরীল (আ:) বলেন, আস্ সালামু আলাইকুম, এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:)! হুযূর পূর নূর (দ:) জবাব দেন, ওয়া আলাইকুম আস্ সালাম। অতঃপর জিবরীল (আ:) আরয করেন, এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:), আমি কি কাছে আসতে পারি? নবী পাক (দ:) বলেন, কাছে আসুন।

’কানযুল উম্মাল’ গ্রন্থে কথাগুলো এভাবে লেখা হয়েছে:

জিবরীল (আ:) আরয করেন, এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:), আমি কি কাছে আসতে পারি? বিশ্বনবী (দ:) বলেন, আমার কাছে আসুন।

‘সুনানে নাসাঈ’ কেতাবে বর্ণনা লিপিবদ্ধ আছে এভাবে:

জিবরীল (আ:) মেঝের ওপর বিছানো ফরাশের প্রান্তসীমায় এসে আরয করেন, হে সকল প্রশংসার যোগ্য অধিকারী (অর্থাৎ, তাঁর নাম মোবারককেও প্রশংসার আকারে উল্লেখ করা হয়েছে এখানে)! আস্ সালামু আলাইকুম। মহানবী (দ:) এই সালামের প্রত্যুত্তর দিলে জিবরীল (আ:) বলেন, এয়া মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম), আমি কি আপনার কাছে আসতে পারি? হুযূর পাক (দ:) বলেন, কাছে আসুন। জিবরীল (অা:) বারংবার কাছে আসার অনুরোধ করতে থাকেন, আর মহানবী (দ:)-ও তা বারংবার মঞ্জুর করতে থাকেন।

’মুসনাদে ইমাম আহমদ বিন হাম্বল’ ও ’সুনানে বায়হাকী’ গ্রন্থগুলোতে তা বর্ণিত হয়েছে এভাবে:

হে আল্লাহর রাসূল (দ:)! আমি কি আপনার দরবারে প্রবেশ করতে পারি?

’মুসনদে ইমাম আদহাম’ গ্রন্থের ভাষ্যকার এটি ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে:

জিবরীল অামীন (আ:) মহানবী (দ:)-এর দরবারে আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার জন্যে এ উপায়ে অনুমতি চেয়েছেন, কেননা তিনি শংকিত ছিলেন যে হঠাৎ কাছে এলে তা রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর প্রতি বেআদবি হতে পারে।

মহানবী (দ:)-এর দরবারে জিবরীল (আ:) কীভাবে শ্রদ্ধা ও সম্মান সহকারে হাজিরা দিতেন, তা এই ঘটনায় আমরা দেখতে পাই। একইভাবে হুযূর পূর নূর (দ:)-এর দরবার ত্যাগের আগে জিবরীল (অা:) যাতে তাঁর অনুমতি নেন, অনুমতি ও সম্মতি না নিয়ে যেন চলে না আসেন, সে ব্যাপারেও আল্লাহতা’লা ফেরেশতাকে নির্দেশ দিতেন।

‘হাবীব (দ:) অনুমতি না দিলে ফেরত এসো না’  

সর্ব-হযরত ইবনে সাঅাদ ও আবূ শায়খ হতে হযরত কাজী সানাউল্লাহ পানিপথী নকশবন্দী (রহ:) একখানা হাদীস বর্ণনা করেন, যা’তে বিবৃত হয়:

নবী করীম (দ:) বদরের জ্বেহাদ শেষ করলে পরে জিবরীল আমীন (আ:) একটি লাল ঘোড়ায় চড়ে বর্শা হাতে এবং বর্ম পরিহিত অবস্থায় তাঁর দরবারে আসেন; তিনি আরয করেন: হে মহা প্রশংসিত জন! এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:)! আল্লাহ পাক আপনার দরবারে আমাকে পাঠিয়েছেন এবং অাদেশ করেছেন আপনি রাজি না হওয়া পর্যন্ত আমি যেন আর (খোদার কাছে) ফেরত না যাই। প্রিয়নবী (দ:) কি আমার প্রতি রাজি আছেন? মহানবী (দ:) জবাবে বলেন, হ্যাঁ, আমি আপনার প্রতি খুশি আছি। অতঃপর জিবরীল (আ:) [আল্লাহর কাছে] ফিরে যান।

বিশ্বনবী (দ:)-এর দরবারে জিবরীল (আ:)-এর খেদমত

হযরত জিবরীল (আ:) হলেন মহানবী (দ:)-এর বিশেষ একজন খাদেম ও দ্বাররক্ষী। তিনি হুযূর পূর নূর (দ:)-এর সওয়ারের লাগাম ধরতেন, যেমনটি ইমাম তাবারানী (রহ:) নিজ ‘মুসনদ-এ-শামিয়্যীন’ গ্রন্থের ১ম খণ্ডের ৬০৩ পৃষ্ঠায় বর্ণনা করেন:

হযরত আনাস (রা:) হতে বর্ণিত; তিনি বলেন, কোনো এক যুদ্ধে আমরা রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর সাথে ছিলাম। ওই সময় একটি উপত্যকার দিকে এগিয়ে চলেছিলাম আমরা। (উপত্যকার পাহাড়ে) আরোহণ আরম্ভ করার সময় হুযূর পূর নূর (দ:) ‘তাকবীর’ (আল্লাহু আকবর) বলেন এবং আমাদের দিকে তাকিয়ে (স্মিত) হাসেন, অতঃপর অগ্রসর হতে থাকেন। উপত্যকার মাঝামাঝি পৌঁছুলে পরে মহানবী (দ:) আবারও ‘তাকবীর’ বলেন এবং আমাদের দিকে তাকিয়ে (স্মিত) হাসেন, অতঃপর আবারও অগ্রসর হতে থাকেন। আমরা গোটা উপত্যকা যখন পার হয়ে যাই, তখন রাসূলুল্লাহ (দ:) পুনরায় তাকবীর বলেন, আমাদের দিকে তাকিয়ে (স্মিত) হাসেন এবং থেমে যান। আমরা তাঁর চারপাশে জড়ো হলে তিনি আমাদের জিজ্ঞেস করেন, আমি কেন তাকবীর বলেছি এবং তোমাদের দিকে তাকিয়ে (স্মিত) হেসেছি, তা কি তোমরা জানো? আমরা আরয করি, আল্লাহতা’লা ও তাঁর রাসূল (দ:)-ই আমাদের চেয়ে ভাল জানেন।

মহানবী (দ:) এমতাবস্থায় এরশাদ ফরমান, আমরা যখন উপত্যকায় আরোহণ করছিলাম, তখন জিবরীল (আ:) আমার ঘোড়ার লাগাম তাঁর হাতে ধরে রেখেছিলেন। তিনি আরয করেন, এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:)! আপনি আপনার উম্মতকে এই খোশ-খবরী দিন, কেউ যদি সাক্ষ্য দেয় আল্লাহ ছাড়া কোনো মা’বূদ বা উপাস্য নেই এবং মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম তাঁর হাবীব ও রাসূল, আর এই সাক্ষ্যের ওপরই যদি তার ইন্তেকাল হয়, তবে আল্লাহতা’লা তাকে অবশ্যই জান্নাত দান করবেন। আমি (এ কথা শুনে) তাকবীর বলি এবং তোমাদের দিকে ফিরে (স্মিত) হাসি। জিবরীল (আ:) লাগাম হাতে নিয়ে হাঁটতে থাকেন। কিছু সময় পরে জিবরীল (আ:) আবার আরয করেন, এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:)! অনুগ্রহ করে এই খোশ-খবরী গ্রহণ করুন এবং আপনার উম্মতকে জানান, যে ব্যক্তি সাক্ষ্য দেয় আল্লাহ ভিন্ন কোনো মা’বূদ বা উপাস্য নেই এবং মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম হলেন তাঁর প্রেরিত রাসূল, তবে আল্লাহতা’লা তাকে জান্নাতে দাখিল করবেন। আমি (একথা শুনে) তাকবীর বলি এবং তোমাদের দিকে তাকিয়ে (স্মিত) হাসি। জিবরীল (আ:) ওই সময় হাঁটতে থাকেন। আমরা গোটা উপত্যকা পার হয়ে সমতল ভূমিতে এসে পড়লে তিনি আরয করেন, এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:)! অনুগ্রহ করে এই খোশ-খবরী গ্রহণ করুন এবং আপনার উম্মতকে জানান, যে ব্যক্তি সাক্ষ্য দেয় আল্লাহ ছাড়া কোনো মা’বূদ বা উপাস্য নেই এবং হযরত মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) হলেন তাঁর প্রেরিত রাসূল, আর এই সাক্ষ্যের ওপরই যদি তার ইন্তেকাল হয়, তবে আল্লাহ পাক তার জন্যে জাহান্নাম নিষিদ্ধ করে দেবেন।

আল্লাহতা’লা মহানবী (দ:)-এর কাছে জিবরীল (আ:)-কে প্রেরণ করেন তাঁকে সম্মান করার উদ্দেশ্যে  

প্রিয়নবী (দ:)-এর বেসাল তথা আল্লাহর সাথে পরলোকে মিলিত হওয়ার কিছুদিন আগে হযরত জিবরীল (আ:) হুযূর পাক (দ:)-এর দরবারে হাজির হন। আত্ তাবারানী (রহ:) ও আল-মাওয়াহিব আল-লাদুন্নিয়া গ্রন্থগুলোতে এতদসংক্রান্ত বর্ণনা লিপিবদ্ধ আছে, যা নিম্নরূপ:

হযরত আলী ইবনে হুসাইন (রহ:)-এর সূত্রে বর্ণিত; তিনি তাঁর পিতা হতে শুনেছেন যে মহানবী (দ:)-এর বেসালের তিনদিন আগে জিবরীল আমীন (আ:) তাঁর দরবারে হাজির হয়ে আরয করেন, এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:)! আল্লাহ পাক আপনার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে এবং আপনারই খেদমত করতে আমাকে বিশেষভাবে পাঠিয়েছেন। এ কথা বলার পর জিবরীল (অা:) রাসূল (দ:)-এর অসুখের ব্যাপারে খোঁজখবর নেন। আজরাইল ফেরেশতা হুযূর পাক (দ;)-এর দরবারে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করেন। এ সময় হযরত জিবরীল (আ:) বলেন, ইনি আজরাঈল ফেরেশতা, জান কবজকারী; আপনার সামনে হাজির হওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করছেন। ইতিপূর্বে তিনি কোনো নবী (আ:)-এর কাছে এই অনুমতি প্রার্থনা করেননি, আর ভবিষ্যতেও তিনি কোনো মানবের কাছে এ রকম অনুমতি চাইবেন না। এ কথা শুনে মহানবী (দ:) বলেন, তাঁকে অনুমতি দিন।

আজরাঈল ফেরেশতা রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর দরবারে প্রবেশ করে পরম শ্রদ্ধাভরে দণ্ডায়মান হন এবং আরয করেন, নিশ্চয় আল্লাহ পাক আমাকে আপনার কাছে প্রেরণ করেছেন এবং আপনার যে কোনো হুকুম তা’মিল করার জন্যে আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন। আপনি যদি আপনার পবিত্র রূহ মোবারককে গ্রহণ করার জন্যে আমায় আদেশ করেন, আমি তা করবো। আর যদি তা করতে আপনি আমায় বারণ করেন, তাহলে তা করা থেকে আমি বিরত হবো।

এমতাবস্থায় জিবরীল আমীন (আ:) বলেন, এয়া রাসূলাল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)! নিশ্চয় আল্লাহতা’লা আপনার সাক্ষাৎ চান। অতঃপর মহানবী (দ:) বলেন, ওহে জান কবজকারী ফেরেশতা! তোমাকে যে কাজ করার আদেশ দেয়া হয়েছে, তা সম্পন্ন করো। জিবরীল (অা:) ওই সময় বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (দ:)! এই বারই পৃথিবীতে আপনার কাছে আমার শেষবার ওহী নিয়ে আসা। এই পৃথিবীতে আপনি-ই শুধু আমার ....... এবং ......। [মো’জাম কবীর তাবারানী; হাদীস নং ২৮২১; আল-মাতালিব-উল-আ’লিয়্যা লি ইবনে হাজর আসকালানী, হাদীস নং ৪৪৪৯] {অনুবাদকের জ্ঞাতব্য: ওপরের উদ্ধৃতিতে বাক্য মিসিং আছে। পাওয়া গেলে শূন্যস্থানে বসানো হবে। }

জিবরীল (আ:) কর্তৃক মহানবী (দ:)-এর হাত মোবারক চুম্বন

যোবদাতুল মোহাদ্দেসীন হযরত আবূল হাসানা’ত সাঈদ আবদুল্লাহ শাহ সাহেব নকশবন্দী মোজাদ্দেদী কাদেরী (রহ:) নিজ ‘মীলাদনামা’ পুস্তকের ১৬২ পৃষ্ঠায় একখানা হাদীস উদ্ধৃত করেন:

একবার হযরত জিবরীল আমীন (আ:) খুব উৎফুল্ল ছিলেন। তিনি মহানবী (দ:)-এর দু’হাত মোবারক চুম্বন করছিলেন; আর তাঁর জুব্বা মোবারকের (আস্তিনে) মুখ ঘষছিলেন। রাসূলুল্লাহ (দ:) তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, ওহে জিবরীল, এটি কী? তিনি জবাবে বলেন, এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:)! অনুগ্রহ করে মিকাঈল ফেরেশতাকে জিজ্ঞেস করুন। এমতাবস্থায় মিকাঈল (আ:) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (দ:)! আপনার দরবারে হাজিরা দেয়ার আদেশ যখন আমাদের দেয়া না হয়, তখন আমরা অস্থির হয়ে যাই। আজ আমরা আল্লাহর কাছে হাজার হাজার বার প্রার্থনা করি (হাজিরার অনুমতি চেয়ে)। আমাদের এই বিনীত প্রার্থনা দেখে অন্যান্য ফেরেশতারা আমাদের প্রশ্ন করেন, ওহে জিবরীল ও মিকাঈল, কেন এই অস্থিরতা? আমরা জবাবে বলি, মহানবী (দ:)-এর সৌন্দর্যমণ্ডিত চেহারা মোবারক না দেখলে আমরা সন্তুষ্ট হতে পারি না। আমরা কী করতে পারি? যেহেতু আজ আমরা সহস্র সহস্র আরজি পেশ করার পর আপনার দরবারে হাজিরা দেয়ার অনুমতি পেয়েছি, সেহেতু আমাদের এই উৎফুল্ল চিত্ত।

জিবরীল (আ:) কর্তৃক মহানবী (দ:)-এর পায়ের গোড়ালি চুম্বন

প্রিয়নবী (দ:)-এর প্রতি পেশকৃত হযরত জিবরীল আমীন (আ:)-এর ভক্তিশ্রদ্ধার সেরা নিদর্শন আমরা মে’রাজ রাতে ঊর্ধ্বাকাশ ভ্রমণের সময় দেখতে পাই।

মোল্লা মোহাম্মদ মুঈন কাশফী হারাভী (রহ:) মে’রাজ সম্পর্কে একটি হাদীস শরীফ বর্ণনা করেন:

দ্বিতীয় বিবরণটি জিবরীল (আ:) হতে; তিনি বলেন, আল্লাহতা’লার ওহী থেকে আমি জানতে পেরেছিলাম যে আমার দেহ জান্নাতের কর্পূর হতে সৃষ্টি করা হয়েছিল। কিন্তু আমি এর কারণ জানতাম না। মে’রাজ রাতেই (এর কারণ) আমি উপলব্ধি করতে সক্ষম হই। আমার নির্মলতা ও সূক্ষ্মতা সত্ত্বেও আমি মহানবী (দ:)-কে ঘুম থেকে জাগাতে ইতস্ততঃ করছিলাম; কীভাবে জাগাবো তা নিয়ে আমি ছিলাম উদ্বিগ্ন। হুযূর পূর নূর (দ:)-এর মোবারক পা ‍যুগলের গোড়ালিতে আমার মুখ ঘষতে আমায় অাদেশ করা হয়। আমি তা করলে কর্পূরের শীতল পরশ (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের কদম মোবারকের) উষ্ণতার সাথে মিশে এবং তিনি সহজে ঘুম থেকে জেগে ওঠেন। ওই সময়-ই আমি অনুধাবন করতে পারি কেন আমাকে কর্পূর দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছিল। (মা’আরিজুন্ নুবুওয়াহ, ৬০১ পৃষ্ঠা)

মহানবী (দ:)-এর দরবারে জিবরীল (আ:) ২১০০০০ ফেরেশতাসহ হাজির হন

মে’রাজ রাতে জিবরীল (আ:) মহানবী (দ:)-এর খেদমত করার সৌভাগ্য লাভ করেন। এ বিষয়ে তাফসীরে রূহুল বয়ান পুস্তকের ৫ম খণ্ড, ১০৯ পৃষ্ঠায় লিপিবদ্ধ আছে:

মে’রাজ রাতে জিবরীল (আ:), মিকাঈল, ইসরাফিল ও আজরাঈল ফেরেশতা হুযূর পাক (দ;)-এর দরবারে হাজির হন। তাঁদের প্রত্যেকের সাথে ছিলেন ৭০০০০ ফেরেশতা। রাসূলুল্লাহ (দ:) বোরাকে আরোহণ করলে জিবরীল (অা:) লাগাম হাতে ধরেন, মিকাঈল ধরেন রেকাব, আর ইসরাফিল ধরেন জিন।

ফেরেশতাবৃন্দ নিজেদের এবাদতের বদলে মহানবী (দ:)-এর খেদমতের সুযোগ পান

যোবদাতুল মোহাদ্দেসীন হযরত আবূল হাসানাত শাহ নকশবন্দী কাদেরী (রহ:) তাঁর ’মীলাদনামা’ পুস্তকে লেখেন:

রাসূলুল্লাহ (দ:) এরশাদ ফরমান, আমি তাঁদের (ফেরেশতাদের) সেবায় বিব্রত বোধ করছিলাম, তাই তা বন্ধ করে দেই। ফেরেশতামণ্ডলী অারয করেন, এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:)! আমরা এই খেদমতের দায়িত্ব নিয়েছি হাজার হাজার বছেরের এবাদত-বন্দেগীর বদলে। একদিন আল্লাহতা’লা আমাদের জিজ্ঞেস করেন, তোমরা এই এবাদত-বন্দেগীর পুরস্কার হিসেবে কী পেতে চাও? আমরা আরয করি, আরশে আপনার পবিত্র নামের পাশে যাঁর নাম মোবারক লেখা আছে, তাঁর খেদমত করার তৌফিক দিন। আল্লাহতা’লা এরপর এরশাদ ফরমান, তিনি (হুযূর পাক) ধরাধামে শুভাগমন করলে আমি তাঁকে মক্কা মোয়াযযমা থেকে বায়তুল মোকাদ্দেস পর্যন্ত নিয়ে যাবো। ওই ভ্রমণের সময় তোমাদেরকে তাঁর খেদমত করার অনুমতি দেবো আমি। ফেরেশতাকুল বলেন, এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:), আমরা এভাবেই এ খেদমতের সৌভাগ্য অর্জন করেছি।

মহানবী (দ:) হলেন জিবরীল (আ:)-এর জন্যে ‘ওয়াসতায়ে উযমা’

জিবরীল (আ:) সবসময়ই কীভাবে মহানবী (দ:)-কে সন্তুষ্ট করবেন, তা নিয়ে চিন্তা করতেন। এই সূত্রেই শেষ বিচার দিবসে তিনি পুল-সিরাতের ওপর তাঁর ডানা বিছিয়ে দেয়ার অনুমতি প্রার্থনা করেন। তাঁর এই ইচ্ছা তিনি রাসূলুল্লাহ (দ;)-এর মাধ্যমে আল্লাহর দরবারে পেশ করেন।

মে’রাজ রাতে ঊর্ধ্বাকাশ ভ্রমণকালে প্রিয়নবী (দ:) বলেন, কোনো বন্ধু কি তাঁর বন্ধুকে এ রকম এক জায়গায় পরিত্যাগ করতে পারেন? জিবরীল (আ:) জবাবে বলেন, এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:)! আমি যদি আরেক কদম সামনে অগ্রসর হই, তবে আল্লাহতা’লার নূরের তাজাল্লীতে ভস্মিভূত হবো। অপর এক হাদীস শরীফে তা এভাবে বর্ণিত হয়েছে, যদি আমি এক আঙ্গুলের তালু পরিমাণ জায়গা অগ্রসর হই, তাহলে পুড়ে ছাই হয়ে যাবো। এমতাবস্থায় মহানবী (দ:) বলেন, আপনার কি কোনো প্রার্থনা আছে যা আপনি আল্লাহর কাছে পেশ করতে ইচ্ছুক? জিবরীল (আ:) উত্তর দেন, হে আল্লাহর নবী (দ:)! আপনি আল্লাহর কাছে আমার এই আরজি পেশ করুন যে পুল-সিরাতে আমি যেন আমার ডানা বিছিয়ে দেয়ার অনুমতি পাই, যাতে আপনার উম্মত সহজে তা পার হতে পারেন।

হযরত ইবরাহিম খলীলউল্লাহ (আ:)-এর প্রতি খেদমতের পুরস্কার মহানবী (দ:) করলেন দান 

ইমাম যুরকানী মালেকী (রহ:) নিজ ‘শরহে মাওয়াহিবে লাদুন্নিয়া’ পুস্তকে একটি অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক হাদীস বর্ণনা করেছেন যা নিম্নরূপ:

হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) হতে বর্ণিত; হযরত আলী (ক:) বলেন, আমাকে জিজ্ঞেস করো (এবং শেখো), আমি তোমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে যাবার আগেই। আমাকে জিজ্ঞেস করো সেই জ্ঞান সম্পর্কে যার খবর না জিবরীল (আ:)-এর কাছে আছে, না মিকাঈলের। আল্লাহতা’লা মে’রাজ রাতে মহানবী (দ:)-কে যে সব জ্ঞান শিখিয়েছিলেন, তা থেকে হুযূর পূর নূর (দ:) আমাকে শিখিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (দ:) বলেন, আমার প্রভু খোদাতা’লা আমাকে বিভিন্ন জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন। হযরত আলী (ক:) অতঃপর বলেন, প্রিয়নবী (দ:) আমাকে এ কথা জানান এবং তিনি আরও বলেন, আমি ছিলাম হযরত ইবরাহিম (আ:)-এর মোবারক দেহের পিঠে অবস্থিত এক নূর (জ্যোতি)। নমরুদ যখন তাঁকে আগুনে ছুঁড়ে ফেলার উপক্রম, ঠিক তখন-ই জিবরীল (আ:) তাঁর কাছে আসেন এবং বলেন, ওহে খলীলউল্লাহ (আল্লাহর বন্ধু), আপনার কি কোনো (সাহায্যের) প্রয়োজন আছে? তিনি উত্তর দেন, ওহে জিবরীল (আ:), আপনার কোনো প্রয়োজন নেই আমার। জিবরীল (আ:) দ্বিতীয়বার আবার আসেন। এবার তাঁর সাথে মিকাঈল-ও ছিলেন। ইবরাহিম (আ:) বলেন, আপনার বা মিকাঈলের কারোরই প্রয়োজন নেই আমার। জিবরীল (আ:) তৃতীয়বার আবার এসে বলেন, আপনার প্রভু খোদাতা’লার কাছে কি আপনার কোনো গুজারিশ আছে? ইবরাহীম (আ:) বলেন, ভাই জিবরীল (আ:), বন্ধুর নিদর্শন হচ্ছে তাঁর বন্ধুর ইচ্ছা অমান্য না করা। এমতাবস্থায় আল্লাহ পাক আমার (মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের) জবান (মোবারক) খুলে দেন এবং আমি বলি, আমি যখন ধরাধামে আবির্ভূত হবো, আর আল্লাহ পাক আমাকে রেসালাতের উচ্চমর্যাদায় অধিষ্ঠিত করবেন, আর সকল আম্বিয়া (আ:)-এর ওপর আমাকে মহা সম্মানিত করবেন, তখন আমি আমার পিতা (পূর্বপুরুষ) ইবরাহীম (আ:)-এর প্রতি খেদমতের প্রতিদানস্বরূপ জিবরীল (আ:)-কে পুরস্কৃত করবো। অতঃপর আমাকে আল্লাহতা’লা দুনিয়াতে পয়গম্বর হিসেবে প্রেরণের পর মে’রাজ রাত এলো। জিবরীল (অা:) অামার দরবারে হাজির হলেন এবং আমার সাথে অবস্থান করলেন, যতোক্ষণ না এক বিশেষ স্থানে আমরা পৌঁছুলাম। সেখানেই তিনি থেমে গেলেন। আমি জিবরীল (আ:)-কে জিজ্ঞেস করলাম, এ রকম জায়গায় কি কোনো বন্ধু তাঁর বন্ধুকে পরিত্যাগ করেন? জিবরীল (আ:) উত্তরে বল্লেন, আমি যদি এ জায়গা হতে আরও অগ্রসর হই, তবে আল্লাহতা’লার নূরের তাজাল্লী আমাকে পুড়িয়ে খাক করে দেবে। অতঃপর মহানবী (দ:) বল্লেন, ওহে জিবরীল (অা:), আল্লাহতা’লার কাছে আপনার কি কোনো আবেদন আছে পৌঁছে দেয়ার? জিবরীল (আ:) জবাব দিলেন, এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:)! অনুগ্রহ করে আল্লাহর দরবারে সুপারিশ করুন যেন আমি আখেরাতে পুল-সিরাতের ওপর আমার ডানা মেলে ধরতে পারি, যাতে আপনার উম্মত সহজেই তা পার হয়ে যেতে পারেন।

মহানবী (দ:)-এর আশীর্বাদপ্রার্থী জিবরীল (আ:)  

হযরত জিবরীল (আ:) যেভাবে মহানবী (দ:)-এর দরবারে হাজিরা দেয়ার সময় আদব বজায় রাখার বিষয়টি (সবসময়) বিবেচনা করেছেন, ঠিক তেমনিভাবে হুযূর পূর নূর (দ:)-এর ‘সিদরাতুল মোনতাহা’য় অধিষ্ঠানকেও তিনি তাঁর নিজের জন্যে অাশীর্বাদ লাভের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেন।

মোল্লা মুঈন কাশফী হারাভী (রহ:) তাঁর কৃত ‘মা’আরিজ-উন্-নবুওয়াহ’ পুস্তকে (এতদসংক্রান্ত) একটি হাদীসের উল্লেখ করেন:

হযরত জিবরীল (আ:) বলেন, হে রাসূলে খোদা (দ:)! আমার একটি অারজি আছে। মহানবী (দ:) বলেন, আমায় বলুন তা কী। জিবরীল (আ:) বলেন, আমার (একান্ত) অনুরোধ, আপনি এখানে দু’রাক’আত নামায পড়ুন, যাতে আমার আবাসস্থল আপনার পবিত্র পায়ের ধুলো দ্বারা আশীর্বাদধন্য হয়। (মা’আরিজ-উন্-নবুওয়াহ, ৯৩১ পৃষ্ঠা)

মহানবী (দ:)-এর কাছে সুরক্ষা চাইতে জিবরীল (আ:) আদিষ্ট  

নুযহাতুল মাজালিস গ্রন্থে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে যা নিম্নরূপ:

আল্লাহতা’লা জিবরীল (আ:)-কে আদেশ করেন, ওহে জিবরীল (আ:)! হেদায়াতের নিশান তথা পতাকা, কল্যাণের বোররাক, মহাসম্মানের পোশাক, নবুওয়্যতের আলখেল্লা ও (অাধ্যাত্মিক) রাজসিকতার পাগড়ী (এমামা) নিয়ে ৭০০০০ ফেরেশতার মিছিলসহ মহানবী (দ:)-এর দরবারে হাজির হও! তাঁর দ্বারে দাঁড়িয়ে তাঁরই সুরক্ষা প্রার্থনা করো। এ রাতে তোমাকে তাঁর ঘোড়ার লাগাম ধরতে হবে। ওহে মিকাঈল! তুমি (খোদায়ী) রেযামন্দির ঝাণ্ডা নিয়ে ৭০০০০ ফেরেশতার মিছিলসহ মহানবী (দ:)-এর দরবারে হাজির হও! ওহে ইসরাফিল ও আজরাঈল! তোমরা দু’জন-ও প্রিয়নবী (দ:)-এর প্রতি একই রকম খেদমত পেশ করো। [নুযহাতুল মাজালিস]

ইমাম সৈয়ুতী (রহ:)-এর প্রণীত ‘খাসাইসুল্ কুবরা’ গ্রন্থে এবং ইমাম তাবারানী (রহ:)-এর কৃত ‘মো’জাম-এ-আওসাত’ ও ‘মজমাউয্ যাওয়াইদ’ পুস্তকগুলোতে একখানা হাদীস উদ্ধৃত হয়েছে যা বিবৃত করে:

উম্মুল মো’মেনীন হযরত আয়েশা (রা:) বর্ণনা করেন যে মহানবী (দ:) জিবরীল (আ:)-এর কথা উদ্ধৃত করেন, যিনি বলেন, আমি পূর্বদিক হতে পশ্চিমদিক পর্যন্ত চষে বেরিয়েছি, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর মতো এতো বড় (সেরা) মহাত্মা কাউকেই খুঁজে পাইনি। [ইমাম তাবারানী রচিত মো’জাম আল-কবীর, হাদীস নং ৬৪৬৮; মজমাউয্ যাওয়াইদ, ৮ম খণ্ড, ২১৭ পৃষ্ঠা; ইমাম সৈয়ুতী লিখিত ‘খাসাইসুল্ কুবরা’, ১ম খণ্ড, ৩১৮ পৃষ্ঠা]

’ফাহামাযানী বি কাদামিহী’ বাক্যটি সম্পর্কে গবেষণা

মে’রাজ রাতে জিবরীল আমীন (আ:)-এর আসমান থেকে অবতরণ করে মহানবী (দ:)-এর কাছে আসা পর্যন্ত এবং পুরো ভ্রমণকাল যাবত তিনি ছিলেন হুযূর পাক (দ:)-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মূর্ত প্রতীক। তিনি হুযূর (দ:)-এর ঘোড়ার লাগাম ধরে রাখেন। শ্রদ্ধা প্রদর্শনে সামান্যতম গাফিলতি-ও তাঁর তরফ থেকে হয়নি।

মহানবী (দ:)-এর দরবারে জিবরীল (অা:) আসেন আলতোভাবে পা ফেলে এবং তিনি হুযূর পূর নূর (দ:)-এর পবিত্র পায়ের গোড়ালিতে নিজ গণ্ড ঘর্ষণ করেন। এখানে উল্লেখ্য যে ’সীরাতে ইবনে হিশামের’ মতো কিছু সীরাহ (জীবনী) পুস্তকে ’ফাহামাযানী বি কাদামিহী’ বাক্যটি ব্যবহৃত হয়েছে। কিছু লোক এটিকে অনুবাদ করেছে এভাবে - ‘জিবরীল (অা:) আমাকে (ঘুম থেকে) জাগাতে আমাকে লাথি মেরেছিলেন।’ এই অনুবাদ সম্পূর্ণ ভুল এবং যুক্তিপরিপন্থী; আর আমাদের কাছে যা নির্ভরযোগ্য রেওয়ায়াত দ্বারা বর্ণিত হয়েছে তারও পরিপন্থী এটি। কোনো মুসলমান-ই এভাবে চিন্তা করতে পারেন না। কেননা, এটি মহানবী (দ:)-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের একদম খেলাফ। আর এটি জিবরীল (আ:)-এর মতো মহান ফেরেশতার প্রতি মিথ্যা অপবাদ-ও বটে। এ কারণেই এই বাক্যের ভাষাতত্ত্বগত গবেষণার অবতারণা করা হলো নিচে।

প্রথমে যে বিষয়টি জানা দরকার তা হলো, আম্বিয়ায়ে কেরাম (আ:)-দেরকে এমন-ই আধ্যাত্মিক ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, যা দ্বারা জিবরীল (আ:) যখন ’সিদরাহ’ থেকে অবতরণের প্রস্তুতি নেন, তখন এই দুনিয়াতে থেকেই তাঁরা তাঁর গন্ধ শুঁকতে পান এবং বুঝতে পারেন যে জিবরীল (আ:) অবতরণ করতে যাচ্ছেন। আল্লামা শেহাবউদ্দীন খাফফাজী নিজ ‘নাসীম আল-রিয়ায’ পুস্তকে লেখেন:

সার কথা হলো, আম্বিয়া কেরাম (আ:)-বৃন্দের অন্তর (আধ্যাত্মিকতা) ও তাঁদের বোধশক্তি ফেরেশতাসদৃশ। এ কারণেই তাঁরা দুনিয়ার শেষ সময় পর্যন্ত যা যা ঘটবে তা তা (দিব্যদৃষ্টিতে) দেখতে পান, আসমানের ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ শুনতে পান এবং জিবরীল (আ:) আসমান থেকে অবতরণের সিদ্ধান্ত নিলে তাঁরা তাঁর গন্ধ শুঁকতে পান।  [‘নাসীম আল-রেয়ায’, ৩য় খণ্ড, ৫৪৫ পৃষ্ঠা]

একই পুস্তকে কুরআন মজীদের বিভিন্ন আয়াত, হাদীস শরীফ এবং ইমামবৃন্দের ও সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-মণ্ডলীর বাণী ও শরয়ী সিদ্ধান্ত দ্বারা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা হয়েছে যে জিবরীল (আ:) মহানবী (দ:)-এর পছন্দকৃত একজন সেবক। তাঁকে আল্লাহ পাক-ই রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর খেদমতে নিয়োগ করেছেন। তিনি এক চুল পরিমাণ-ও হুযূর পাক (দ:)-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন হতে বিচ্যুত হন না। অতএব, রাসূলে করীম (দ:)-কে ঘুম থেকে জাগাতে এ রকম অশিষ্ট আচরণ তিনি করতে পারেন বলে কি কখনো ধারণাও করা যায়? ইসলাম হলো এমন এক ধর্ম, যেটি সভ্যতা-ভব্যতা শিক্ষা দেয়। একজন সাধারণ মুসলমানকেও এভাবে ঘুম থেকে জাগানো ইসলামী শিষ্টাচারের খেলাফ।

আলোচ্য বাক্যটি সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ

আরবী ‘হামাযা’ শব্দটির একাধিক অর্থ আছে। সেগুলোর মধ্যে ‘হিমস্’ একটি, যার মানে হলো মৃদু বা আলতো পায়ে হাঁটা, হালকা কদম ফেলে এগোনো, ধীরে ধীরে কথা বলা, অন্তরে উদ্রেক হওয়া, কোনো কিছু অপসারণ করা, চাপ দেয়া, কারো আড়ালে গিয়ে তার সমালোচনা করা ইত্যাদি।

আল্লামা ইবনে মনযূর কর্তৃক বর্ণিত উক্ত শব্দের এতোগুলো অর্থের মধ্যে হাল্কা বা মৃদু পায়ে হাঁটা একটি।  [‘লিসানুল আরব’, হারফুয যা, হা মীম যা]

এই শব্দটির ব্যাপারে আরবী ভাষাতত্ত্ব বিষয়ক ইমাম আল্লামা যোহরী নিজ ‘সিহাহ’ পুস্তকে, আল্লামা ইবনে ফারাস তাঁর ‘মাকায়ীস-উল-লোগাত’ বইতে লিখেছেন এবং ’মোখতার আস্ সিহাহ লিল্ রাযী’ গ্রন্থেও লেখা আছে যে এর অর্থ মৃদু পায়ে হাঁটা। ‘আল-মোনজিদ’, ’মো’জাম আল-ওয়াসীত’ বইগুলোও একই কথা লিখেছে।

সবগুলো অভিধান যেখানে ওই শব্দটিকে মৃদু পায়ে হাঁটা হিসেবে বর্ণনা করেছে, সেখানে সমস্ত তথ্যকে অবজ্ঞা করে তাকে ‘লাথি’ হিসেবে অনুবাদ করা কতো-ই না বড় ভুল কাজ! এটি ভাষা-সাহিত্যের পাশাপাশি শরীয়ত হতেও বিচ্যুতি বৈ কী! বস্তুতঃ হাদীসে ব্যবহৃত শব্দাবলী সব সময়-ই মহানবী (দ:)-এর প্রাপ্য সম্মান ও শোভনতা-শালীনতা বজায় রেখে বুঝতে হবে এবং সেভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে। তাই ‘ফাহামাযানী বি-কাদামিহী’ বাক্যটির অর্থ হচ্ছে ‘জিবরীল (আ:) আমার কাছে আসেন মৃদু পায়ে হেঁটে।’

এই শব্দের আরেকটি মানে হলো অন্তরে উদ্রেক হওয়া। ফলে রূপকার্থে এর অর্থ দাঁড়ায়, ‘আমি তাঁর আগমন নিজ অন্তরে অনুভব করেছিলাম।’

কোনো সেবক তার মনিবের দরবারে পরম শ্রদ্ধা ছাড়া অার অন্য কোনোভাবে হাজির হন না। কাউকে লাথি মারা কোনো জাতি কিংবা সমাজেই গৃহীত বা গ্রহণযোগ্য নয়; আর এটি বেআদবি বা অসম্মানসূচক আচরণ হিসেবেই বিবেচিত।

মহানবী (দ:)-এর ক্ষেত্রে সৎ উদ্দেশ্যে হলেও দ্ব্যর্থবোধক শব্দের ব্যবহার পরিহার্য  

কুরআন মজীদে একটি আয়াতে করীমা আছে, যার ব্যাখ্যায় শায়খুল ইসলাম ইমাম মোহাম্মদ আনওয়ারউল্লাহ ফারূকী লেখেন:

সার কথা হলো, সাহাবা-এ-কেরাম (রা:) এই শব্দটি (’রায়িনা’) মহানবী (দ:)-এর ক্ষেত্রে অত্যন্ত নেক উদ্দেশ্য নিয়ে ও যথাযথ ভক্তি সহকারে উচ্চারণ করতেন, কিন্তু তা আরেক ভাষায় শ্লেষাত্মক হওয়ার কারণে আল্লাহতা’লা তার ব্যবহার নিষিদ্ধ করেন। সবাই এখানে বুঝতে সক্ষম, যে শব্দটি কোনো রকম অসম্মানের ইঙ্গিত-ও বহন করেনি, অন্য আরেকটি ভাষায় হেয়করণে ব্যবহৃত হওয়ায় তা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এমতাবস্থায় যে সব শব্দের উদ্দেশ্য অসম্মানসূচক, সেগুলোকে কীভাবে ব্যবহারের অনুমতি দেয়া যায়? কেউ যদি বলে, ওই নিষেধাজ্ঞা শুধু ইহুদীদের প্রতি আরোপিত হয়েছিল এই মর্মে যে তারা তা ব্যবহার করতে পারবে না, তাহলে আমি বলবো, হয়তো তা হতে পারে; কিন্তু এ-ও তো অস্বীকার করার জো নেই যে ওই নিষেধাজ্ঞা মুসলমানদের প্রতি-ও ছিল, যাঁরা শব্দটিকে সম্মানার্থে ব্যবহার করতেন। এখানে (আয়াতে) ইহুদী ও তাদের ভাষার কোনো উল্লেখ-ই নেই। যদি তা-ই উদ্দেশ্য হতো, তাহলে ইহুদীদের অন্যান্য বদমাইশির মতো এটিরও উল্লেখ থাকতো। মুসলমানদেরকে সম্বোধন করায় বোঝা যায় যে সৎ উদ্দেশ্যেও এই ধরনের শব্দ ব্যবহারের অনুমতি নেই। [আনওয়ার-এ-আহমদী, ২২২ পৃষ্ঠা]

পবিত্র কুরআন মজীদ ও হাদীস শরীফে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে মহানবী (দ:)-এর প্রতি সামান্যতম অসম্মান প্রদর্শন বা অশ্রদ্ধা জ্ঞাপনও কারো ঈমান ধ্বংস করতে পারে; আর ওই ব্যক্তি তা বুঝতেও পারবে না। এরশাদ হয়েছে -

হে ঈমানদার মুসলমান! নিজেদের কণ্ঠস্বরকে উঁচু করো না ওই অদৃশ্যের সংবাদদাতা (নবী)-এর কণ্ঠস্বরের ওপর এবং তাঁর সামনে চিৎকার করে কথা বলো না, যেভাবে তোমরা একে অপরের সামনে করে থাকো, যেন কখনো তোমাদের কর্মসমূহ নিষ্ফল না হয়ে যায়, আর (এতে) তোমাদের খবরও থাকবে না। [সূরা হুজুরা-ত, ২য় আয়াত; মুফতী আহমদ এয়ার খান কৃত ‘নূরুল এরফান’]

এই আয়াতে মহানবী (দ:)-এর শানে পূর্ণ শ্রদ্ধাজ্ঞাপক শুধুমাত্র যে সব বাক্য ব্যবহার করা যাবে, সেগুলোর ব্যাপারেই আল্লাহ পাক নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি আরও এরশাদ ফরমান:

(ওহে মুসলমান)! রাসূল (দ:)-এর আহ্বানকে তোমাদের পরস্পরের মধ্যে তেমনি স্থির করো না, যেমনটি তোমরা একে অপরকে ডেকে থাকো। নিশ্চয় আল্লাহ জানেন যারা তোমাদের মধ্যে চুপে চুপে বের হয়ে যায়, কোনো কিছুর আড়াল গ্রহণ করে। সুতরাং যারা রাসূল (দ:)-এর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, তারা যেন ভয় করে (এই মর্মে) যে কোনো বিপর্যয় তাদেরকে পেয়ে বসবে, অথবা তাদের প্রতি (আখেরাতে) বেদনাদায়ক শাস্তি পতিত হবে। [সূরা নূর, ৬৩ আয়াত; মুফতী আহমদ এয়ার খান কৃত ‘নূরুল এরফান’]

যদি মহানবী (দ:)-কে আহ্বান করা আমাদের পরস্পরের মাঝে ডাকাডাকি তথা সম্বোধনের মতো না হয়, তাহলে তাঁর ব্যক্তিত্ব কীভাবে আমাদের, অর্থাৎ, সাধারণ মানুষের ব্যক্তিত্বের মতো হতে পারে? তাঁর সামনে সামান্য একটু উচ্চস্বরে কথা বল্লেও ঈমানহারা ও আমল বরবাদ হবার সম্ভাবনা রয়েছে বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এতেও স্পষ্ট হয় যে হযরত জিবরীল আমীন (আ:) প্রিয়নবী (দ:)-এর একজন অনুসারী, সেবক ও উজির ছিলেন। এই কারণেই তিনি হুযূর পূর নূর (দ:)-এর দরবারে হাজিরা দেয়ার সময় হয়েছিলেন শ্রদ্ধা প্রদর্শনের মূর্ত প্রতীক। তিনি (সর্বদা) দরুদ-সালাম প্রেরণ করে তাঁর দরবারে প্রবেশের অনুমতি চাইতেন। বোখারী ও মুসলিম শরীফে এতদসংক্রান্ত একখানি সর্বসম্মত হাদীস বর্ণিত হয়েছে, যা’তে বিবৃত হয়:

একবার হযরত জিবরীল (আ:) রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর দরবারে হাজির হন; তিনি মহানবী (দ:)-এর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে তাঁর হাত দুটো নিজ পায়ের উপরিভাগে স্থাপন করেন। অতঃপর তিনি হুযূর পাক (দ:)-কে ঈমান, ইসলাম, এহসান, কেয়ামত ও কেয়ামতের নিদর্শন সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। রাসূলে খোদা (দ:) তাঁকে সেসব প্রশ্নের উত্তর দ্বারা পুরস্কৃত করেন। তিনি চলে যাওয়ার পর মহানবী (দ:) সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-কে বলেন, ইনি জিবরীল (আ:)। তিনি তোমাদেরকে তোমাদের ধর্ম শেখাতে এসেছিলেন।

মহানবী (দ:) বলেছেন জিবরীল (আ:) আমাদেরকে আমাদের ধর্ম শেখাতে এসেছিলেন। প্রশ্ন হলো, এখানে ধর্ম তথা দ্বীন শিক্ষা দেয়ার কথা বলে কী বোঝানো হয়েছে? জিবরীল (অা:) তো সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-কে ইসলাম ধর্মের বিধিনিষেধ কোনো কিছুই শেখাননি। খোদ মহানবী (দ:)-ই এগুলো জিজ্ঞাসিত হওয়ার পর নিজে নিজে ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাহলে জিবরীল আমিন (আ:) কী শেখালেন? এর উত্তর পরিষ্কার। জিবরীল (আ:) মহানবী (দ:)-এর দরবারে পরম ভক্তিভরে হাজিরা দিয়েছেন এবং নিজের আরজি তাঁর বরাবরে পেশ করেছেন। তিনি গোটা উম্মতে মোহাম্মদীকে শিক্ষা দিয়েছেন কীভাবে রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর দরবারে হাজিরা দিতে হয় এবং কীভাবে তাঁর কাছে ফরিয়াদ করতে হয়। এই সম্মান প্রদর্শন ও আদবশীলতাকেই মহানবী (দ:) ‘দ্বীন’ বা ধর্ম হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন এবং তাঁর সাহাবা (রা:)-কে বলেছেন: ইনি জিবরীল (আ:)। তিনি তোমাদেরকে তোমাদের ধর্ম শেখাতে এসেছিলেন।

আল্লাহ পাক তাঁর প্রিয়নবী (দ:)-এর অসীলায় মুসলমান সমাজকে হুযূর পাক (দ:)-এর প্রতি তা’যিম তথা সম্মান প্রদর্শনের দিকনির্দেশনা দিন এবং ইসলামী বিধিবিধান মানারও তৌফিক দিন, আমীন।

                                                             *সমাপ্ত*   

 





 





    



           





  


  



    







 

 
 

 

সোমবার, ১৫ জুন, ২০১৫

ইন্টারনেট ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক আইন


আজ ‘প্রথম আলো’ পত্রিকায় শিরোনাম সংবাদ ছিল সরকার ইন্টারনেট ব্যবহারে কঠোর আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছেন। তবে সংবাদের কিসিম তথা ধরন দেখে বোঝা যায়, বেশির ভাগই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এতে নিহিত। মৌলিক ইস্যূগুলোর সমাধান হবে কি না জানি না।

আমরা জানি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো ব্যবহার করে থাকেন সর্বসাধারণ। তাঁরা অ-পেশাদারী সাংবাদিকতা চর্চা করে থাকেন এগুলোতে। মতপার্থক্যের চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রচুর গালিগালাজও করেন তাঁরা। তবু এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো জনগণের মনের ভাব প্রকাশের এক ধরনের বাতায়ন। আমরা একে উম্মুক্ত থাকতে দেখতে চাই। সরকারি ও বিরোধী দলীয় পাল্টাপাল্টি রাজনীতির মারপ্যাঁচ যেন এই বাতায়নকে রুদ্ধ করতে না পারে।

তবে হ্যাঁ, মতামত প্রকাশের নামে, ‘মুক্তবুদ্ধি চর্চা‘,’বিজ্ঞানমনস্কতা’র ছদ্মাবরণে কেউ যেন ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত হেনে বা উস্কানি দিয়ে দেশে সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে না পারে, সেদিকে সরকারি সংস্থাগুলোর নজরদারি একান্ত আবশ্যক। একই ভাবে ধর্মের ছদ্মাবরণে উগ্রপন্থীরা যাতে ইন্টারনেটকে তাদের গোষ্ঠীগত স্বার্থে অপব্যবহার করতে না পারে, তাও নিশ্চিত করতে হবে।

কতিপয় ব্লগার ‘বিজ্ঞানমনস্কতা’ ও ’মুক্তবুদ্ধি চর্চা’র ধুয়া তুলে ইসলাম ও মহানবী (দ:)-এর চরম আবমাননামূলক বেশ কিছু লেখা ইন্টারনেটে ছেড়েছেন, যা দুঃখজনক হলেও সত্য যে জ্ঞানের লেশচিহ্ন-ও বহন করে না, বরং মনের বিদ্বেষভাব-ই প্রকাশ করে। এগুলো ইতিহাসবিদদের ইতিহাস বিশ্লেষণ নয়। ইসলাম ও মুসলিমবিদ্বেষী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চক্রের কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা মাত্র। উদাহরণস্বরূপ, পশ্চিমা দেশগুলোতে মহানবী (দ:)-এর বিরুদ্ধে এ সব চক্র কার্টুন প্রতিযোগিতার আয়োজন করছে। তারা এগুলোকে মুক্তচিন্তা, চিন্তার ম্বাধীনতা বলে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এগুলো যে মুসলমানদেরকে খোঁচা মারার উদ্দেশ্যে করা হয় তা সহজেই বোধগম্য। তারই ধারাবাহিকতায় ওই সব চক্রের এ দেশীয় পদলেহী দালালরা মহানবী (দ:)-এর শানে গোস্তাখিমূলক অপপ্রচারে নিয়োজিত রয়েছে।

যেমন ধরুন, এক ব্লগার লিখেছেন যে মহানবী (দ:) লম্পট প্রকৃতির ছিলেন (নাউযুবিল্লাহ)। তিনি না-কি তাঁর চাচাতো বোন উম্মে হানীকে ইতিপূর্বে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু বিয়ে করতে না পেরে তাঁর বাড়িতে রাত কাটাতেন। যাঁকে মক্কার কাফের মুশরিকরা পর্যন্ত ’আল-আমিন’ (বিশ্বাসভাজন) জানতো, তাঁর প্রতি ঐতিহাসিক দলিল ছাড়া এভাবে মিথ্যে অপবাদ দেয়া হচ্ছে। মনে রাখা দরকার যে, ওই সময় সব ছিল যৌথ পরিবার। আমাদের কৈশোর জীবনেও অনুরূপ যৌথ পরিবার আমরা দেখেছি। আজকের দিনের ‘বিজ্ঞানমনস্ক’, ‘আধুনিকতাবাদী’ পরকীয়া প্রেমাসক্ত লোকদের মতো বউ ফেলে রেখে বাড়ির বাইরে নিজস্ব আলীশান কোনো ফ্ল্যাটে পরনারীর সান্নিধ্যে রাত কাটানোর প্রচলন তখন ছিল না। আরবীয়রা মন চাইলেই একাধিক বিয়ে করতো। কোনো রাখঢাক ছিল না। সব সত্য তারা অকপটে বলে ফেলতো। আত্মাতে তারা আজকের দিনের মানুষের মতো এতো জটিল ছিল না।

দ্বিতীয়তঃ মহানবী (দ:) যদি লম্পট হতেন (আল্লাহ আমাদের মাফ করুন এ কথা খণ্ডন করার উদ্দেশ্যে বলার জন্যে), তাহলে লক্ষ লক্ষ আরবীয়কে একটি আদর্শে উদ্বুদ্ধ করতে পারতেন না। আপনারা জানেন, লম্পট কখনোই অন্যদের জন্যে আদর্শ স্থাপন করতে পারে না। অথচ ভিন্ন ধর্মাবলম্বী পণ্ডিত এইচ, এ, আর, গিব বলেন, মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)-এর সংস্কার সার্বিকভাবে নারীদের মর্যাদা বৃদ্ধি করে যা সর্বজনস্বীকৃত [Mohammedanism, লন্ডন, ১৯৫৩, ৩৩ পৃষ্ঠা]। এ সমাজ সংস্কার নারীলোভী কারো দ্বারা কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। রাসূল (দ:)-এর একাধিক বিয়ে করার কারণ সম্পর্কে সুন্দর ও যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন মরহুম কবি গোলাম মোস্তফা তাঁর অনবদ্য ‘বিশ্বনবী (দ:)’ বইটিতে। তরুণ প্রজন্মের ওই বইটি ভালভাবে অধ্যয়ন করা উচিত।

ভিন্ন ধর্মাবলম্বী অন্যান্য বিদ্বান ব্যক্তির প্রশংসাসূচক মন্তব্য আমরা পরবর্তী লেখাগুলোতে একে একে অনুবাদ করবো ইনশা’আল্লাহ। আজ শুধু এতোটুকু-ই বলবো, বাক্ স্বাধীনতার নামে যা ইচ্ছা তা-ই লেখা যায় না। বিশেষ করে হিংসা-বিদ্বেষ প্রচার করা তো উচিত-ই নয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে সর্বসাধারণের মনের ভাব প্রকাশ অব্যাহত থাকুক, কিন্তু গালিগালাজ বন্ধ হোক।

বুধবার, ১৩ মে, ২০১৫

খোদাতা’লার অস্তিত্ব

[Bengali translation of Elijah Daniels' article 'God's Existence' shared on Google+]

অনুবাদ: কাজী সাইফুদ্দীন হোসেন

পার্থিব জগৎ তথা পদার্থের এই মহাবিশ্বের অস্তিত্ব অবশ্যই কারো (অর্থাৎ, স্রষ্টার) সদাসর্বদা অস্তিত্বশীলতার ওপর নির্ভরশীল। কেননা, পদার্থবিজ্ঞান যাঁরা ভালো বোঝেন, তাঁরা উপলব্ধি করেন যে এই বিশ্বজগৎ শক্তিশালী এক নিয়মের বন্ধনে আবদ্ধ এবং এর সূচনা নিশ্চয়ই যথাযথভাবে হয়েছিল। এর ডিজাইন বা নকশা কোনো নকশাবিদের অস্তিত্ব-ই প্রমাণ করে।

কতিপয় বিজ্ঞানী যে আমাদের এই মহাবিশ্বের নিয়মবদ্ধতার কারণে খোদাতা’লার অস্তিত্বে বিশ্বাসের কথা স্বীকার করেছেন, সে বিষয়টি আমার কাছে কৌতূহলোদ্দীপক মনে হয়েছে। আমাদের এই গ্রহকে এবং এতে প্রাণের অস্তিত্বকে যথাযথ ও যুৎসইভাবে টিকিয়ে রাখার মতো স্থির প্রাকৃতিক নিয়ম এবং ক্রমাগত ঘটনাবলী এতে বিদ্যমান।

উদাহরণস্বরূপ, চারটি মৌলিক প্রাকৃতিক শক্তির (যথা - ইলেকট্রোম্যাগনেটিজম, মধ্যাকর্ষণ, স্ট্রং নিউক্লিয়ার ফোর্স ও উইক নিউক্লিয়ার ফোর্স) যথাযথ বিন্যস্তকরণ মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তুকেই প্রভাবিত করে রেখেছে। এগুলোকে এমন নিখুঁত ভারসাম্যে বিন্যস্ত করা হয়েছে যে এমন কি সামান্যতম পরিবর্তনেও এই মহাবিশ্ব প্রাণশূন্য হয়ে যেতে পারে।

অতএব, যদি এ বিষয়টি প্রমাণও করা যায় যে মহাবিশ্বে পদার্থ ও শক্তি নিজে নিজেই অস্তিত্বশীল হওয়াটা সম্ভব, তবুও মহাবিশ্বের নকশা এতোই জটিল যে তা দৈব ঘটনাক্রমে (random chance) মহাবিশ্বের সূচনার ধারণাকে সম্পূর্ণভাবে নাকচ করে দেয়। যাঁরা সত্যিকার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় নির্ভর করেন, তাঁরা তাঁদের সিদ্ধান্ত দৈবঘটনার ভিত্তিতে নেন না।

উদাহরণস্বরূপ, বিবেচনা করুন অসংখ্য রসায়নিক প্রতিক্রিয়া যা ডিএনএ’র গঠনে নিখুঁত পর্যায়ক্রমিক হতে হবে।

বিষয়টির সঠিক মূল্যায়নে নিবেদন এই যে, সম্ভাবনা তত্ত্বের কর্তৃত্বশীল ড: এমিল বোরেল বলেন যে ১ সংখ্যা+৫০টি শূন্যবিশিষ্ট সংখ্যার ১ভাগের চেয়েও যদি কোনো একটি বিষয়ের ঘটার সম্ভাবনা কম থাকে, তাহলে তা কখনোই ঘটবে না, তাকে সময় যতোই দেয়া হোক না কেন।

তাই আমেরিকার ইউটা স্টেট ইউনিভারসিটির ড: ফ্র্যাংক সলসবারী প্রাণের আবির্ভাবের জন্যে প্রয়োজনীয় স্বতঃস্ফূর্ত মৌলিক ডিএনএ অণু গঠনের সম্ভাবনা হিসেব করার সময় দেখতে পান এটি এতোই সামান্য (১ সংখ্যা+৪১৫টি শূন্যবিশিষ্ট সংখ্যার ১ভাগ!) যে তা গাণিতিকভাবে অসম্ভব বলে বিবেচিত।

আসলে প্রাকৃতিক বিবর্তনের সম্ভাবনা এতোই অবিশ্বাস্যভাবে ক্ষীণ যে এমন কি বিখ্যাত বিবর্তনবিজ্ঞানীরাও স্বীকার করেন এটি কার্যত অসম্ভব; কিন্তু তাঁরা তবুও তাতে বিশ্বাস করেন। কেননা, তার একমাত্র বিকল্প (স্রষ্টার সৃষ্টি) ধারণাটি যে তাঁদের কাছে অপছন্দনীয়।

উদাহরণস্বরূপ, নোবেল পুরস্কার বিজয়ী জীববিজ্ঞানী ড: জর্জ ওয়াল্ড স্বীকার করেন:

“জীবসত্তার/প্রাণির স্বতঃস্ফূর্ত (মানে আপনাআপনি) জন্মলাভের ধারণাটি যে অসম্ভব, তা স্বীকার করে নেয়ার বিশাল বিষয়টি-ই কাউকে স্রেফ ভাবিয়ে তুলবে। তবু আমাদের অস্তিত্ব স্বতঃস্ফূর্ত জন্মলাভের মাধম্যেই হয়েছে বলে আমি বিশ্বাস করি।”

বিবর্তনবিজ্ঞানীদের এই অসম্ভবে বিশ্বাসটি মূলতঃ এই কারণে যে তাঁরা বিকল্পটি (অর্থাৎ, খোদার অস্তিত্বে) বিশ্বাস করতে চান না।

[এই অনুবাদ বিজ্ঞানবিষয়ক হওয়ায় এতে ভুল হতে পারে। আমি এর জন্যে ক্ষমাপ্রার্থী। কেউ ’টার্ম’গুলোর সঠিক বাংলা জানলে আমাকে জানাবেন। আমি প্রয়োজনীয় সংশোধন করে নেবো। ধন্যবাদ।]  


মিরাজ : এক বিস্ময়কর ভ্রমণ!



ইমরান বিন বদরী

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
নাহমাদুহু ওয়া নুসল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম,আম্মা বা’দ।

সমস্ত প্রশংসা পরম করুণাময় রাব্বুল আলামীন আল্লাহ তায়ালার জন্য; আর সালাত (দুরূদ) ও সালাম আমাদের নবী সায়্যাদুল মুরসালীন প্রিয় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি।

سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلاً مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ البَصِيرُ

পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি আপন বান্দাকে রাতারাতি নিয়ে গেছেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত, যার আশেপাশে আমি বরকত রেখেছি, যাতে আমি তাঁকে আপন মহান নিদর্শনসমূহ দেখাই; নিশ্চয় তিনি শোনেন, দেখেন। (সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত ১)

❋ মিরাজ!
═════➲ সুবহান আল্লাহ!
 
এটি এমন এক বিশ্ময়কর ঘটনা যার বর্ণনা দিতে গিয়ে স্বয়ং আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীনও
(سُبْحٰنٰ )''সুবহান'' শব্দটি উল্লেখ করেছেন (যা শুধু আশ্চর্যজনক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়)। শব্দটির অর্থ হচ্ছে পবিত্র ও মহিমাময়। এ বিশেষণ কেবল আল্লাহ পাকের জন্যই নির্দিষ্ট (খাস্)। তাই এ কথা সহজেই বোঝা যায় যে, মিরাজের ঘটনার পরিকল্পনাকারী ও সংঘটনকারী ছিলেন স্বয়ং আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মু’জিযা বা অলৌকিক ঘটনাগুলোর একটি এই মি’রাজ। মানবজাতির ইতিহাসে এটি একটি বিরল ঘটনা, যার গুরত্ব মানব ইতিহাসে বিশেষ করে মুসলিম ইতিহাসে খুবই গুরত্বপূর্ণ । নবী (আ:)-মণ্ডলীর মুজেজার মাঝে আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এই মুজেজা মানব ইতিহাসে অকল্পনীয় একটি অলৌকিক ঘটনা, যার বর্ণনা বা আলোচনা করার সেই সাহস আমাদের নেই। সত্যিকার অর্থে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আঙ্গুলের ইশারায় চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত হওয়ার কোনো ব্যাখাও কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান দিতে পারবে না। মূলতঃ নবী রাসূল (আ:)-বৃন্দের মুজেজা তো তাকেই বলা হয় যা মানুষের চিন্তা-কল্পনার বাইরে। মিরাজের বর্ণনা ব্যাপক। স্বল্পজ্ঞানে সংক্ষেপে যতোটুকু বুঝেছি, তাই আলোচনা করার চেষ্টা করেছি। ভুল হলে আশা করি ক্ষমা করবেন।


══(المعراج) মিরাজ শব্দের অর্থ উর্ধ্বে গমন, কেননা আল্লাহ্পাক তার হাবীবকে ওই দিনে মহাকাশ ভ্রমণ করিয়ে ছিলেন । হাদিস শরীফে মিরাজ শব্দটি উল্লেখ করা হলেও কিন্তু আল্লাহ্পাক পবিত্র কুরআনে করিমে (اَسْراى) 'আসরা' শব্দ উল্লেখ করেছেন, আর আসরা শব্দের অর্থ সফর করা বা কাউকে রাতের বেলায় নিয়ে যাওয়া, কেননা মিরাজ হয়েছিল রাতের বেলায় ।

➲ মিরাজের তারিখ নিয়ে একাধিক মত থাকলেও গৃহীত মত হচ্ছে আল্লাহর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’এর নবুওতের দশম বছর মক্কি জীবনের শেষলগ্নে পিতৃব্য আবু তালিব ও উম্মুল মুমেনীন হযরত খাদিজাতুল খুবরা রাদিয়াল্লাহু আনহা ইহ-জগৎ ত্যাগ করার পরে এবং হিজরতের আগে যখন আরবের কাফির মূনাফিকরা মুসলমানদের প্রতি 
বেশি বেশি অত্যাচার-অবিচার শুরু করে দিলো, তখনি আল্লাহ তাঁর হাবীব (দ:)-কে মিরাজের এই সফর করিয়ে ছিলেন। মিরাজের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তাঁর বন্ধুকে নিজের সান্নিধ্যে ডেকে এনে সান্ত্বনা দিয়ে সমাজ সংস্কারের একটি পরিপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। হাদিস শরীফের বিভিন্ন বর্ণনাতে দেখা যায়, মক্কা থেকে আল্লাহর হাবিব (দ:)-কে জিব্রাইল (আ:) বায়তুল মুকাদ্দাস্ নিয়ে যান, সেখানে সমস্ত আম্বিয়ায়ে কেরাম (আ:)-গণের সাথে ২ রাকাত সালাতের ইমামতি করে ঊর্ধ্বগমনে যান। এভাবে প্রথম, দ্বিতীয় ,তৃতীয় আসমান অতিক্রম করে ''বায়তুল মামুরে'' একত্ববাদের পরিচয় দানকারি নবী হজরত ইব্রাহীম (আ:)-এর সাথে সাক্ষাত হয় । এরপর 'সিদ্রাতুল মুনতাহা' থেকে আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’কে মহান রাব্বুল আলামীন তাঁর কুদরতের সাক্ষাতে নিয়ে যান।

➲ আবদুল আযীয ইবনুূু আবদিল্লাহ (রহ:) হজরত আনাস ইবনুূু মালিক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে এতো উর্ধ্বে আরোহণ করানো হলো, যা সম্পর্কে আল্লাহ ছাড়া আর কেউই জানে না। অবশেষে তিনি সিদরাতুল মুনতাহায় আগমন করলেন। এখানে প্রবল পরাক্রমশালী আল্লাহ তাঁর নিকটবর্তী হলেন। অতি নিকটবর্তীর ফলে তাঁদের মধ্যে দু’ধনূকের ব্যবধান রইল, অথবা তারও কম (বুখারী ৭০০৯ ই,ফা)। সেখান থেকে ফিরে আসার সময় উম্মতে মুহাম্মদীর জন্যে ৫ ওয়াক্ত সালাত নিয়ে আসেন । সেখানে আল্লাহ তাঁর নিদর্শনগুলো তাঁরই হাবীব (দ:)-কে দেখিয়েছেন, যেগুলো একমাত্র আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ই দেখেছেন। আগের নবীবৃন্দ (আ:) যে আল্লাহর কথা প্রচার করেছেন, তা সমাপ্ত করেছেন শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ মুস্তফা সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আল্লাহর আয়াত তথা নিদর্শনের একমাত্র সাক্ষী হলেন আমাদেরই নবী রাহমাতুল্লিল আলামীন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

➲ মিরাজের আরো বিস্তারিত জানার জন্যে সূরা আন নাজাম’এর প্রথম ১ থেকে ১৮ আয়াতগুলো দেখুন; এখানে আরো বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন -
وَالنَّجْمِ إِذَا هَوَى ═ ওই প্রিয় উজ্জ্বল নক্ষত্র মুহাম্মদের কসম, যখন তিনি মি’রাজ থেকে অবতরণ করেন।
مَا ضَلَّ صَاحِبُكُمْ وَمَا غَوَى ═ তোমাদের ‘সাহিব’ না পথভ্রষ্ট হয়েছেন, না বিপথে চলেছেন।
وَمَا يَنطِقُ عَنِ الْهَوَى ═ এবং তিনি কোনো কথা নিজ প্রবৃত্তি থেকে বলেন না।
إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى ═ তা তো ওহীই, যা তাঁর প্রতি (নাযিল) করা হয়।
عَلَّمَهُ شَدِيدُ الْقُوَى ═ তাঁকে শিক্ষা দিয়েছেন প্রবল শক্তিসমূহের অধিকারী (আল্লাহ),
ذُو مِرَّةٍ فَاسْتَوَى ═ শক্তিমান। অতঃপর ওই জ্যোতি ইচ্ছা করলেন; 
وَهُوَ بِالْأُفُقِ الْأَعْلَى ═ আর তিনি উচ্চাকাশের সর্বোচ্চ দিগন্তে ছিলেন,
ثُمَّ دَنَا فَتَدَلَّى ═ অতঃপর ওই জ্যোতি নিকটবর্তী হলো। অতঃপর খুব নেমে আসলো।
فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَى ═ অতঃপর ওই জ্যোতি ও এ মাহবূবের মধ্যে দু’হাতের ব্যবধান রইলো; বরং তদপেক্ষা কম।
فَأَوْحَى إِلَى عَبْدِهِ مَا أَوْحَى ═ তখন (আল্লাহ) ওহী করলেন আপন বান্দার প্রতি যা ওহী করার ছিলো।
مَا كَذَبَ الْفُؤَادُ مَا رَأَى ═ (রসূলের) অন্তর মিথ্যা বলেননি যা (তিনি) দেখেছেন।
أَفَتُمَارُونَهُ عَلَى مَا يَرَى ═ তবে কি তোমরা তাঁর সাথে তিনি যা দেখেছেন তাতে বিতর্ক করছো? 
وَلَقَدْ رَآهُ نَزْلَةً أُخْرَى ═ এবং তিনি তো ওই জ্যোতি দু’বার দেখেছেন;
عِندَ سِدْرَةِ الْمُنْتَهَى ═ সিদরাতুল মুন্তাহার নিকটে,
عِندَهَا جَنَّةُ الْمَأْوَى ═ সেটার নিকট রয়েছে ‘জান্নাতুল মা’ওয়া’।
إِذْ يَغْشَى السِّدْرَةَ مَا يَغْشَى ═ যখন সিদরার উপর আচ্ছন্ন করছিলো যা আচ্ছন্ন করছিলো;
مَا زَاغَ الْبَصَرُ وَمَا طَغَى ═ (তাঁর) চক্ষু না কোনো দিকে ফিরেছে, না সীমাতিক্রম করেছে।
لَقَدْ رَأَى مِنْ آيَاتِ رَبِّهِ الْكُبْرَى ═ নিশ্চয় (তিনি) আপন রবের বহু বড় নিদর্শনাদি দেখেছেন। [নূরুল ইরফান]
উপরোল্লিখিত আয়াতসমূহের দ্বারা মিরাজের অনেক কিছুই নিশ্চিত করে জানা যায়।

এ প্রসঙ্গে সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফের বিভিন্ন হাদীসেও মি’রাজের ঘটনা বিস্তারিত বর্ণনা পরিলক্ষিত হয়। যেমন:

❋═➲ হজরত আবূ যার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত যে, রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন: আমি মক্কাতে ছিলাম। আমার ঘরের ছাদ ফাঁক করা হলো। তখন জিবরাঈল (আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অবতরণ করলেন। তিনি আমার বক্ষ বিদীর্ণ করলেন। এরপর তা যমযমের পানি দিয়ে ধৌত করলেন। তারপর হিকমত ও ঈমানে পরিপূর্ণ একটি পাত্র আনা হলো এবং এতে তা রাখা হলো; পুনরায় তা আমার বক্ষে ঢেলে বক্ষ বন্ধ করে দিলেনা এরপর আমার হাত ধরলেন এবং ঊর্ধ্বাকাশে যাত্রা করলেন। আমরা যখন প্রথম আসমানে গিয়ে পৌছলাম, তখন জিবরাঈল (আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এ আসমানের দ্বাররক্ষীকে বললেন, দরজা খুলুন ! তিনি বললেন, কে? জবাবে বললেন, জিবরাঈল। দ্বাররক্ষী বললেন, আপনার সাথে কি অন্য কেউ আছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমার সাথে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) আছেন। দ্বাররক্ষী বললেন, তাঁর কাছে আপনাকে পাঠানো হয়েছিল কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ। এরপর দরজা খুলে দেওয়া হলো। আমরা প্রবেশ করে দেখি, এক ব্যাক্তি, তাঁর ডানে একদল মানুষ এবং বাঁয়ে একদল মানুষ। যখন তিনি ডানদিকে তাকান তখন হাসেন, আর যখন বাঁ দিকে তাকান তখন কাঁদেন। তিনি আমাকে বললেন, মারহাবা হে সুযোগ্য নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম , হে সুযোগ্য সন্তান। রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: আমি জিবরাঈলকে বললাম, ইনি কে? তিনি বললেন, ইনি হযরত আদম (আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আর ডানে ও বাঁয়ের এ লোকগুলো তাঁরই বংশধর। ডান পার্শ্বস্থরা হচ্ছে জান্নাতবাসী আর বাম পার্শ্বস্থরা হচ্ছে জাহান্নামবাসী। আর এ কারণেই তিনি ডান দিকে তাকালে হাসেন এবং বাঁ দিকে তাকালে কাঁদেন। তারপর জিবরাঈল (আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে নিয়ে আরও ঊর্ধ্বে আরোহণ করলেন এবং দ্বিতীয় আসমানে পৌঁছলেন এবং এর দ্বাররক্ষীকে বললেন, দরজা খুলুন। তিনি প্রথম আসমানের দ্বাররক্ষীর মতো প্রশ্নোত্তর করে দরজা খুলে দিলেন। আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, এরপর রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন যে, তিনি আসমানসমূহে হযরত আদম, ইদরীস, মূসা ও ইবরাহীম (আলাইহিম আস্ সালাম)-এর সাথে সাক্ষাৎ লাভ করেছেন। আদম (আলাইহিস্ সালাম) প্রথম আসমানে এবং ইবরাহীম (আলাইহিস্ সালাম) ষষ্ঠ আসমানে। এছাড়া, অন্যান্য নবীর অবস্হান সম্পর্কে এ রেওয়ায়েতে কিছু উল্লেখ নেই। আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, যখন রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও হযরত জিবরাঈল (আলাইহিস্ সালাম) হযরত ইদরীস (আলাইহিস্ সালাম)-এর নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন, মারহাবা, হে সুযোগ্য নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ! সুযোগ্য ভ্রাতা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইনি কে? জিবরাঈল (আলাইহিস্ সাসাম) উত্তর দিলেন; ইনি ইদরীস (আলাইহিস্ সালাম)। তারপর আমরা হযরত মূসা (আলাইহিস্ সালাম)-এর নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম। তিনিও বললেন, মারহাবা হে সুযোগ্য নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম , সুযোগ্য ভ্রাতা। জিজ্ঞেস করলাম, ইনি কে? তিনি জবাব দিলেন, ইনি মূসা (আলাইহিস্ সালাম)। তারপর আমরা ঈসা (আলাইহিস্ সালাম)-এর নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম, তিনিও বললেন, মারহাবা হে সুযোগ্য নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম , সুযোগ্য ভ্রাতা ! জিজ্ঞেস করলাম ইনি কে? তিনি বললেন, ইনি হযরত ঈসা (আলাইহিস্ সালাম)। তারপর আমরা হযরত ইবরাহীম (আলাইহিস্ সালাম)-এর নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম, তিনিও বললেন, মারহাবা হে সুযোগ্য নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম , সুযোগ্য সন্তান! জিজ্ঞেস করলাম, ইনি কে? তিনি বললেন, ইনি হযরত ইবরাহিম (আলাইহিস্ সালাম)। ইবনু শিহাব, ইবনু হাযম, ইবনু আব্বাস ও আবূ হাব্বা আনসারী থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন তারপর জিবরাঈল (আলাইহিস্ সালাম) আমাকে নিয়ে আরো ঊর্ধ্বে চললেন। আমরা এমন এক স্তরে পৌঁছলাম যে তথায় আমি কলম-এর খশখশ (লেখার) শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। ইবনু হাযম ও আনাস ইবনু মালিক বর্ণনা করেন; রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: তখন আল্লাহ তা’আলা আমার ওপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত (নামাজ) ফরয করেন। আমি এ নিয়ে প্রত্যাবর্তন করার পথে হযরত মূসা (আলাইহিস্ সালাম)-এর সাথে সাক্ষাৎ হয়। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার প্রতিপালক আপনার উম্মতের ওপর কী ফরয করেছেন? আমি উত্তরে বললাম, তাদের উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত (নামাজ) ফরয করা হয়েছে। হযরত মূসা (আলাইহিস্ সালাম) আমাকে বললেন, আপনি আপনার রবের কাছে ফিরে যান, কেননা আপনার উম্মাত তা আদায় করতে সক্ষম হবে না। তাই আমি আল্লাহর দরবারে ফিরে গেলাম। তখন আল্লাহ এর অর্ধেক কমিয়ে দিলেন। আমি আবার ফিরে এসে হযরত মূসা (আলাইহিস্ সালাম)-কে জানালে তিনি বললেন, না, আপনি পুনরায় ফিরে যান, কেননা আপনার উম্মাত এতেও সক্ষম হবে না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: তারপর আমি আল্লাহর দরবারে ফিরে গেলে তিনি বললেন, এ নির্দেশ পাঁচ, আর পাঁচ-ই পঞ্চাশের সমান করে দিলাম, আমার কথার কোনো রদবদল নেই। এরপর আমি হযরত মূসা (আলাইহিস্ সালাম)-এর কাছে ফিরে আসি। তিনি তখনো বললেন, আপনি ফিরে যান আল্লাহর দরবারে। আমি বললাম, আমার লজ্জাবোধ করছি। তারপর জিবরাঈল (আলাইহিস্ সালাম) আমাকে ছিদরাতুল মুনতাহা’য় নিয়ে চললেন; আমরা সেখানে পৌঁছলাম। তা এতো বিচিত্র রংয়ে আবৃত যে, আমি বুঝতে পারছি না আসলে তা কী। তারপর আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হল। সেখানে ছিল মুক্তার গম্বুজ আর তার মাটি ছিল মিশকের। (কিতাবুল ঈমান,সহীহ মুসলিম)

❋═➲ জাবির ইবনুূু আবদিল্লাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত; তিনি রসূলাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন: যখন (মিরাজের ব্যাপারে) কুরাইশরা আমাকে অস্বীকার করল, তখন আমি কা’বা শরীফের হিজর অংশে দাঁড়ালাম। আল্লাহ তাআলা তখন আমার সম্মুখে বায়তুল মুকাদ্দাসকে প্রকাশ করে দিলেন, যার ফলে আমি দেখে দেখে বায়তুল মুকাদ্দাসের সমস্ত নিদর্শন তাদের কাছে বর্ণনা করছিলাম। বায়তুল্লাহ শরিফের মিযাবে রহমতের নিচে যে অংশটি পাথর দিয়ে ঘেরা তাকে হিজর বলা হয়। [আম্বিয়া কিরাম (আঃ),সহীহ বুখারি]

❖ রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লা ‘এর মিরাজ সম্পর্কে অকাট্য প্রমাণাদি রয়েছে। এজন্যে কোনো মুসলমানের পক্ষে তা অস্বীকার করা কিংবা এ ব্যাপারে সংশয় বোধ করা উচিত নয়। এমনকি একজন খাঁটি মুসলমানের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে মিরাজের সত্যতা প্রমাণের অপেক্ষা না করে এ বিষয়ে মনেপ্রাণে বিশ্বাস স্থাপন করা ঈমানি কর্তব্য। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিরাজ থেকে ফিরে আসার পর সর্বসাধারণকে তিনি যখন তা অবহিত করলেন তখন অনেকেই মিরাজ অবিশ্বাস্য বলে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে উড়িয়ে দিলো। এতো কম সময়ের মধ্যে কীভাবে তা সম্ভব বলে সন্দিহান হলো তো বটেই, একে মোক্ষম সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করলো মক্কার কাফের-মুশরিকরা। তাদের অপপ্রচারে দুর্বল ঈমানের মুসলমানদের মনেও সন্দেহ হলো। ঠিক তখনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’এর মিরাজে যাওয়ার ঘটনা একজন অবিশ্বাসীর মুখে শুনে হজরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু তৎক্ষণাৎ বিশ্বাস করেছিলেন বলেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনাকে ‘সিদ্দিক’বা সত্যবাদী উপাধি দিয়েছিলেন। এজন্যে মিরাজের শিক্ষার বাস্তব প্রতিফলন ঘটানোই একজন আদর্শ উম্মত তথা মুসলমানের কাজ।

➲ আমি চেষ্টা করেছি মাত্র আর সেই চেষ্টা সার্থক হবে তখনি, যখন লেখাটি পাঠকমণ্ডলীর বুঝতে সহজ হবে।