ব্লগ সংরক্ষাণাগার

রবিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৭

Is the term 'Mawlid' an innovation in Islam?

The Mawlid is an age-old custom or tradition that has been passed on to us by the Prophet (peace be upon him) himself. He regularly fasted on Mondays and when asked as to why he was fasting, he answered, "Feehi Ulidtu" meaning "I was born on this day (Monday)." This Hadeeth was related by Imam Muslim in his book 'Saheeh' [Book 6, Hadeeth 2606; and also 2603]. Tell me, did the Prophet (peace be upon him) not use the word 'Ulidtu,' the root of it being 'Wilaadat (meaning birth)?' The Arabic word 'Mawlid' is also derived from the same word. It, therefore, has a legal bearing in Islamic jurisprudence since the Prophet (peace be upon him) used it as a commemorative lexicon. It is in fact a Sunnah (Islamic tradition of the Prophet Alayhis-Salaam). And he has categorically declared, "Alaykum bi-Sunnatiyy" meaning "Upon you (O my people), my Sunnat is ordained." The narrators of this Hadeeth are Imam Ahmad bin Hanbal in his book "Musnad," 29:375, Hadeeth 17145, and Abu Dawud in his book 'Sunan,' 'Babu Fee Luzuumis-Sunnah, 4:200, Hadeeth 4607, and Ibn Hibban in his book 'Saheeh,' 1:178, Hadeeth 5, and Hakim in his book 'Al-Mustadrak,' 'Kitaabul 'Ilm,' 1:97, Hadeeth 332.

As we all know, there are three types of Sunnah: (1) Sunnat-i Qawli or the sayings of the Prophet (peace be upon him); (2) Sunnat-i Fi'li or his actions and deeds; and (3) Sunnat-i Taqreeri or the things that were done in front of him, but he did not object to. The Prophet's (peace be upon him) fasting on Mondays for commemorating his Mawlid is included in the second category above. Some people, however, deny the validity of Mawlidun-Nabi (sallallaahu alayhi wa sallam) by saying that he did not command us to commemorate it. Whereas, the Prophet (peace be upon him) did command us, in general terms, to obey his Sunnah. Therefore, observing holy Mawlidun-Nabi (sallallaahu alayhi wa sallam) is absolutely in accordance with his general command given in the aforesaid Hadeeth: "Alaykum bi-Sunnatiyy." Those who really want to learn our religion with an unbiased mind and a clear conscience, should read Shaykh Dr Tahirul Qadri's book "Mawlid Al-Nabi: Celebration and Permissibility" [English version]. They might also refer to Suffah Foundation's online article at the site provided below: http://www.suffahfoundation.com/index.php/articles/milad-un-nabi/377-did-the-prophet-pbuh-commemorate-his-mawlid

শনিবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

আমীরে মু’আবিয়া (রা:) প্রসঙ্গ ও ইমামে আলী (ক:)-এর প্রতি লা’নত প্রথা


['Muawiyah and Abusing Imam Ali' by Dr Haddad at sunnah.org]



মূল: ড: জি, এফ, হাদ্দাদ
অনুবাদ: কাজী সাইফুদ্দীন হোসেন
আরবী ও অনলাইন সেট-আপ: মুহাম্মদ রুবাইয়েৎ বিন মূসা

[al-islam@swbell.net কর্তৃক ইমেইলে প্রেরিত আপত্তির জবাব]

আপত্তি: মুআবিয়া যে ইমামে আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহুর সাথে যুদ্ধ করেছিলেন, তা এক সর্বজনস্বীকৃত ঐতিহাসিক সত্য।

জবাব: এটাও এক সর্বজনস্বীকৃত ঐতিহাসিক সত্য যে হযরত ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু আমীরে মুআবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথে শান্তি স্থাপন করেন এবং তাঁর প্রতি আনুগত্যের শপথ (বায়াত)-ও গ্রহণ করেন, যা আল-বুখারী রহমতুল্লাহি আলাইহি নিজ সহীহগ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।

সঠিক পথপ্রাপ্ত খলীফা উমর ইবনে আবদিল আযীয বলেন, “আল্লাহতালা যাঁদের (পবিত্র) রক্ত দ্বারা আমাদের হাত রঞ্জিত হতে দেননি, আমরা তা আমাদের জিহ্বা দ্বারা ভূলুণ্ঠিত হতে দেবো না।

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ ফরমান:
لَا يُبَلِّغُنِي أَحَدٌ مِنْ أَصْحَابِي عَنْ أَحَدٍ شَيْئًا، فَإِنِّي أُحِبُّ أَنْ أَخْرُجَ إِلَيْكُمْ وَأَنَا سَلِيمُ الصَّدْرِ.
-          আমার সাহাবাদের ব্যাপারে নেতিবাচক (মন্দ) কোনো কিছু নিয়ে আমার কাছে তোমাদের আসা উচিত নয়, কেননা আমি তোমাদের সামনে পরিষ্কার (মানে নির্ভার) অন্তর ছাড়া যেতে চাই না।[১]

এই হাদীস সর্ব-ইমাম আবূ দাউদ রহমতুল্লাহি আলাইহি, আল-তিরমিযী রহমতুল্লাহি আলাইহি ও আহমদ রহমতুল্লাহি আলাইহি বর্ণনা করেন। যেসব লোক এই ফিতনা নিয়ে মিন মিন করে, তারা যে হাদীসগুলো শুনতে অপছন্দ করে থাকে, এই হাদীসটি সেগুলোর একটি।

আমি (ড: হাদ্দাদ) আমার শায়খের মুখে শুনেছি এ কথা, “সিংহরা যখন লড়ে, রাস্তার কুকুরেরা তখন চুপ হয়ে যায়।

আপত্তি: সহীহ মুসলিম শরীফে হযরত সাআদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, মুআবিয়া ইবনে আবী সুফিয়ান তাঁকে (সাআদকে) নির্দেশ দেন এবং বলেন,

قَالَ: أَمَّرَ مُعَاوِيَةُ بْنُ أَبِي سُفْيَانَ سَعْدًا، فَقَالَ: مَا يَمْنَعُكَ أَنْ تَسُبَّ أَبَا تُرَابٍ، قَالَ: أَمَّا مَاذَكَرْتَ ثَلاَثًا قَالَهُنَّ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَلَنْ أَسُبَّهُ.

-          আবূ তোরাব (হযরত আলীর ডাকনাম)-কে লানত/অভিসম্পাত দান হতে কী জিনিস তোমাকে বিরত রাখছে?” সাআদ উত্তর দেন, “আপনার কি স্মরণে নেই যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহুর তিনটি গুণের কথা উল্লেখ করেছিলেন? এমতাবস্থায় আমি কখনো হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহুএর প্রতি অভিসম্পাত দেবো না! [২]

জবাব: আপনার পেশকৃত সুন্নী রেফারেন্সবা উদ্ধৃতিগুলো সবসময়-ই অর্ধ-সত্য, কেননা আপনি কখনো সেগুলো সম্পর্কে সুন্নী উলামাদের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ বা তাঁদের উপলব্ধিও উল্লেখ করেন না।
ইমাম নববী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন:

قَالَ الْعُلَمَاءُ الْأَحَادِيثُ الْوَارِدَةُ الَّتِي فِي ظَاهِرِهَا دَخَلٌ عَلَى صَحَابِيٍّ يَجِبُ تَأْوِيلُهَا قَالُوا وَلَا يَقَعُ فِي رِوَايَاتِ الثِّقَاتِ إِلَّا مَا يُمْكِنُ تَأْوِيلُهُ فَقَوْلُ مُعَاوِيَةَ هَذَا لَيْسَ فِيهِ تَصْرِيحٌ بِأَنَّهُ أَمَرَ سَعْدًا بِسَبِّهِ وَإِنَّمَا سَأَلَهُ عَنِ السَّبَبِ الْمَانِعِ لَهُ مِنَ السَّبِّ كَأَنَّهُ يَقُولُ هَلِ امْتَنَعْتَ تَوَرُّعًا أَوْ خَوْفًا أَوْ غَيْرَ ذَلِكَ فَإِنْ كَانَ تَوَرُّعًا وَإِجْلَالًا لَهُ عَنِ السَّبِ فَأَنْتَ مُصِيبٌ مُحْسِنٌ وَإِنْ كَانَ غَيْرُ ذَلِكَ فَلَهُ جَوَابٌ آخَرُ ولَعَلَّ سَعْدًا قَدْ كَانَ فِي طَائِفَةٍ يَسُبُّونَ فَلَمْ يَسُبَّ مَعَهُمْ وَعَجَزَ عَنِ الْإِنْكَارِ وَأَنْكَرَ عَلَيْهِمْ فَسَأَلَهُ هَذَا السُّؤَالَ قَالُوا وَيَحْتَمِلُ تَأْوِيلًا آخَرَ أَنَّ مَعْنَاهُ.

-          উলামাবৃন্দের দৃষ্টিতে সাহাবা-মণ্ডলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর মধ্যকার বিভেদ সম্পর্কে দৃশ্যতঃ যেসব রওয়ায়াত (বর্ণনা) উল্লেখ করেছে বলে মনে হয়, সেগুলোকে রূপক বা আলঙ্কারিক অর্থে ব্যাখ্যা করতে হবে। আলোচ্য রওয়ায়াতের কোথাও একথা উল্লেখিত হয়নি যে হযরত আমীরে মুআবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু প্রকৃতই হযরত সাআদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-কে হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহুএর প্রতি অভিসম্পাত দিতে আদেশ করেছিলেন। বরঞ্চ তিনি হযরত সাআদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-কে স্রেফ জিজ্ঞেস করেছিলেন কোন্ কারণটি তাঁকে ওই অভিসম্পাত দান হতে বিরত রেখেছিলো? তা কি খোদাভীরুতা? তা যদি হয়ে থাকে, তাহলে উত্তম! নাকি ভয় কাজ করছিলো? ইত্যাকার সব প্রশ্ন। এ-ও হতে পারে হযরত সাআদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-কে এমন কোনো দলের মাঝে দেখা গিয়েছিলো যারা হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহুকে লানত দিয়েছিলো, আর তিনি ওই দলটিকে তিরস্কার করতে না পারলেও নিজে তা থেকে বিরত ছিলেন। অতঃপর তাদেরকে তিরস্কার করা হলে পরে আমীরে মুআবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হযরত সাআদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-কে ওই প্রশ্নটি করেন। আরেকটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হতে পারে এই: হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহুকে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ও এজতেহাদে ভুল প্রমাণিত করার বেলায় এবং মানুষের সামনে আমাদের অবস্থান ও এজতেহাদের নির্ভুলতা তুলে ধরার ক্ষেত্রে কী বিষয়টি তোমাকে বাধাগ্রস্ত করেছে?” [৩]

আপত্তি: ইমামে আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহুকে লানত দেয়ার সুন্নাহ (রীতি/প্রথা) সম্পর্কে সহীহ মুসলিমের আরো উদ্ধৃতি নিচে দেয়া হলো, যাতে প্রমাণ করা যায় যে সর্বসমক্ষে হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহুর প্রতি অভিসম্পাত প্রদানের জন্যে মানুষদের ওপর বলপ্রয়োগ করা হতো। নতুবা তাদেরকে শাস্তির খেসারত পোহাতে হতো।আবূ হাযেম হতে বর্ণিত আছে যে,

عَنْ أَبِي حَازِمٍ، عَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ، قَالَ: اسْتُعْمِلَ عَلَى الْمَدِينَةِ رَجُلٌ مِنْ آلِ مَرْوَانَ قَالَ: فَدَعَا سَهْلَ بْنَ سَعْدٍ، فَأَمَرَهُ أَنْ يَشْتِمَ عَلِيًّا قَالَ: فَأَبَى سَهْلٌ فَقَالَ لَهُ: أَمَّا إِذْ أَبَيْتَ فَقُلْ: لَعَنَ اللهُ أَبَا التُّرَابِ فَقَالَ سَهْلٌ: مَا كَانَ لِعَلِيٍّ اسْمٌ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ أَبِي التُّرَابِ.
-          মদীনার প্রাদেশিক শাসনকর্তা যিনি মারওয়ানের আত্মীয়দের মধ্যে একজন ছিলেন, তিনি হযরত সাহল ইবনে সাআদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-কে ডেকে হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহুর প্রতি লানত দিতে বলেন। কিন্তু সাহল রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু তা করতে অস্বীকার করেন। এমতাবস্থায় প্রাদেশিক শাসনকর্তা বলেন, “আপনি হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহুকে (নাম ধরে) লানত দিতে না চাইলে শুধু বলুন - আল্লাহ আবূ তোরাব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-কে লানত দিন।হযরত সাহল রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু উত্তরে বলেন, “হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু নিজের জন্যে আবূ তোরাব নামটির চেয়ে অন্য কোনো নাম বেশি পছন্দ করেননি। আর কেউ ওই নামে (আবূ তোরাব) ডাকলে তিনি খুব খুশি হয়ে যেতেন। [৪]

জবাব: এই আদেশ যে লোক দিয়েছিলো, সে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোনো সাহাবী ছিলো না, আর এটা আপনার কথিত হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহুকে লানত দেয়ার সুন্নাহ’-ও ছিলো না, বরং ওই লোক ছিলো ফিতনাবাজ এমন একটি দলের সদস্য, যাদের সম্পর্কে হযরত আবূ হোরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন,

وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَيُوشِكُ أَنْ يَأْتِيَ عَلَى النَّاسِ زَمَانٌ تَكُونُ الثَّلَّةُ  مِنَ الْغَنَمِ أَحَبَّ إِلَى صَاحِبِهَا مِنْ دَارِ مَرْوَانَ.
-          আল্লাহর শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, মানুষের সামনে এমন এক সময় শিগগির আসবে, যখন ভেড়ার পালের মালিকের কাছে তার ভেড়ার পাল মারওয়ানের জ্ঞাতিগোষ্ঠী হতে প্রিয় হবে। [৫]

এই রওয়ায়াত ইমাম মালেক রহমতুল্লাহি আলাইহি নিজমুওয়াত্তাগ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। হযরত আবূ হুরায়রাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে একই ধরনের আরো বেশ কিছু বক্তব্য আছে, যা আমি তাঁর সম্পর্কে আগামীতে আমার ধারাবাহিক লেখায় বিস্তারিত ব্যাখ্যা করবো, ইনশাআল্লাহ। 

-- জি, এফ, হাদ্দাদ ক্বাসিউন @cyberia.net.lb

তথ্যসূত্র :
 [১] আবু দাউদ : আস সুনান, ৪:২৬৫ হাদীস নং ৪৮৬০।
(ক) তিরমিযী : আস সুনান, ৬:১৯৩ হাদীস নং ৩৮৯৬।
(খ) আহমদ : আল মুসনাদ, ২:৬৮০ হাদীস নং ৩৮৯৬।
(গ) বায়হাকী : শু‘য়াবুল ঈমান, ৮:২৮৮ হাদীস নং ১৬৬৭৫।
(ঘ) বাগাবী : শরহুস সুন্নাহ, ১৩:১৪৮ হাদীস  নং ৩৫৭১।
(ঙ) বাযযার : আল মুসনাদ, ৫:৪০৬।
(চ) আবু ইয়ালা : আল মুসনাদ, ৯:২৬৬ হাদীস নং ৫৩৮৮।
[২] মুসলিম : আস সহীহ, ৪:১৮৭৪ হাদীসনং ২৪০৯।
(ক) তিরমিযী : আস সুনান, ৬:৮৩ হাদীস নং ৩৭২৪।
[৩]  নবুবী : শরহু মুসলিম, বাবু মিন ফাদ্বায়িলি আলী ইবনে আবী তালিব, ১৫:১৭৫
[৪] মুসলিম : আস সহীহ, ৪:১৮৭৪ হাদীসনং ২৪০৯।
[৫] মালেক : মুয়াত্তা, বাবু মা জাআ ফিত ত্বআম ওয়াশ শিরাব ৫:১৩৬৬ হাদীস নং ৩৪৪৪
(ক) বুখারী : আদাবুল মুফরাদ, ১:১৩৩।

              *সমাপ্ত*

সাহাবী আমীরে মু’আবিয়া (রা:)

[Dr. G.F. Haddad's response to a question posed to him regarding 'Sahabi Mu'awiya' (Ra:) at www.eshaykh.com]

হযরতে আমীরে মু’আবিয়া (রা:) সম্পর্কে ড: জি, এফ, হাদ্দাদের ভাষ্য

প্রশ্ন: সালামুন আলাইকুম, হে শায়খ হাদ্দাদ! আল্লাহতা’লা আপনার মঙ্গল করুন। হযরতে আমীরে মু’আবিয়া (রা:)-এর নাম উল্লেখের পরে ‘রাহিমাহুল্লাহ’ বলার যথার্থতা কতোটুকু, বিশেষ করে ’তারাদ্দি’র (ধর্মত্যাগের) বিষয়টিকে বিবেচনায় নিয়ে, যেহেতু তাঁর কিছু কাজের ব্যাপারে নারাজি আছে (যেমন - মিম্বরে ইমামে আলী কার্রামাল্লাহু ওয়াজহাহূ’র প্রতি লা’নত তথা অভিসম্পাত প্রথার প্রচলন), আবার যেহেতু এর পাশাপাশি কোনো সাহাবী (রা:)-কে অভিসম্পাত দেয়া ও হেয় করার বিরুদ্ধে উচ্চারিত সতর্কবাণীর বিষয়বস্তুতে পরিণত হওয়াকে এড়াতেও (আমরা) ইচ্ছুক? আরেক কথায়, তাঁকে ‘রাহিমাহুল্লাহ’ বলে একটা মধ্যম রাস্তা ধরা কেমন হবে? এই আপত্তির প্রতি কীভাবে উত্তর দেয়া যায়, যা’তে বিবৃত হয়: “হ্যাঁ, কোনো সাহাবী (রা:)-কে অবজ্ঞা করা বা হেয় প্রতিপন্ন করা হারাম বটে, কিন্তু তাহলে আমীরে মু’আবিয়া (রা:) কেন হযরত আলী (ক:)-এর সাথে এরকম (আচরণ) করেছিলেন? নিম্নের বিষয়গুলো কি সত্য? ১/ আমীরে মু’আবিয়া (রা:) হযরত ইমাম হাসান (রা:)-এর জনৈকা স্ত্রীকে প্রণোদিত করেছিলেন ইমাম সাহেব (রা:)-কে বিষ প্রয়োগের জন্যে, কিংবা তাঁর বেসালপ্রাপ্তিতে তিনি খুশি হয়েছিলেন? ২/ তিনি রিবা (সুদ)-এর কারবার করতেন, যার কারণে কথিত আছে যে হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রা:)-এর মতো সাহাবাবৃন্দ (রা:) সিরিয়ায় বসবাস করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন? এবং ৩/ যেখানে কোনো সাহাবী (রা:)-কে অভিসম্পাত দেয়াই যানদাক্বা (ধর্মের প্রতি অন্তর্ঘাতমূলক শত্রুতা) সেখানে সাহাবাবৃন্দ (রা:)-এর কেউ কেউ কেন সার্বিকভাবে একে অপরের বিরুদ্ধে ‘তালা’উন’ (অভিসম্পাত দান) পর্যন্ত চর্চা করেছিলেন? অধিকন্তু, কেউ যদি বলেন যে হযরত আলী (ক:) হযরত উসমান (রা:) হতেও আধ্যাত্মিকভাবে উচ্চপর্যায়ের (তবে সর্ব-হযরত আবূ বকর বা উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা হতে নন), তাহলে তা কি সুন্নীয়তের গণ্ডিভুক্ত থাকবে, না গোমরাহী হবে? অথবা, যদি প্রশ্ন করা হয় হযরত উসমান (রা:) যে হযরত আলী (ক:)-এর চেয়ে আধ্যাত্মিকভাবে উচ্চ-মক্বামের, তার কী প্রমাণ বিদ্যমান? এমতাবস্থায় আশা করি এসব প্রশ্নের যুক্তিগ্রাহ্য উত্তর দিয়ে বাধিত করবেন। কতিপয় সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-এর কিছু কাজ সম্পর্কে (বইয়ে) পড়ে সত্যি বলতে কী, আমরা অশান্তি বোধ করছি। যেমন - পরস্পর পরস্পরকে লা’নত দান এবং যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া। আল্লাহ তাঁদের সবার প্রতি রাজি হোন, আমীন। ওয়া সাল্লাল্লাহু ’আলা সাইয়্যেদিনা মুহাম্মদ ওয়া সাল্লাম।

উত্তর: আলাইকুম আস্ সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। আল্লাহ আপনারও মঙ্গল করুন। প্রথমতঃ আমরা আম্বিয়াবৃন্দ বা সাহাবা-মণ্ডলীর নাম উল্লেখ করার পর ‘রাহিমাহুল্লাহ’ বলি না, বরং যথাক্রমে ‘সাল্লাল্লাহু’ বা ’রাদ্বিয়াল্লাহু’ বলে থাকি। এটা কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে থাকলে তা তারই ক্ষতি। ক্ষীণস্বরে প্রশংসা এখানে ‘মধ্যম রাস্তা’ নয়, বরঞ্চ তা ছদ্মাবরণে অবজ্ঞা প্রদর্শন-ই, যা ধর্ম/ঈমানদারির ঘাটতি প্রকাশক। দ্বিতীয়তঃ কোনো সাহাবী (রা:)-এর ব্যাপারে ‘তাঁর কিছু কাজে নারাজি’ প্রকাশ করার কোনো অনুমতি-ই নেই। বরঞ্চ প্রত্যেকেরই নিজ নিজ কাজের ব্যাপারে মনোযোগ দেয়া উচিত, যেটা কোনো সাহাবী (রা:)-এর জীবনের সামান্য একটি মুহূর্তের সমকক্ষ-ও নয়। তৃতীয়তঃ ‘কোনো সাহাবী (রা:)-কে অবজ্ঞা/হেয় প্রতিপন্ন করা হারাম হলে মু’আবিয়া (রা:) কেন হযরত আলী (ক:)-এর সাথে এরকম আচরণ করেছিলেন?’ - এই প্রশ্নের জবাবে আমরা আমাদের মুর্শীদ মওলানা শায়খ নাযিমউদ্দীন হাক্কানী (রহ:)-এর কথা উদ্ধৃত করবো, যেটা এক দশক আগেও আমরা উদ্ধৃত করেছিলাম; তিনি বলেন: “সিংহরা যখন পরস্পর লড়াই করে, তখন রাস্তার কুকুর চুপ থাকে।” উপরন্তু, ইমাম হাসান (রা:) তাঁর পিতার প্রতি আমীরে মু’আবিয়া (রা:)-এর অভিযোগ সম্পর্কে ওই ধরনের দশ লাখ আপত্তি উত্থাপনকারীর চেয়ে ঢের বেশি জানতেন, তবু তিনি তাঁর সাথে শান্তি স্থাপন করেন এবং তাঁর কাছে বায়া’ত/আনুগত্যের শপথ নেন, যা খোদ রাসূলুল্লাহ (দ:) ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন এবং প্রশংসাও করেছিলেন। যে ব্যক্তি এর প্রতি আপত্তি করে, সে শ্রদ্ধা (ও এশক্ব-মহব্বতে)’র ছদ্মাবরণে ফিতনাবাজিতে লিপ্ত। চতুর্থতঃ হযরতে আমীরে মু’আবিয়া (রা:)-এর প্রতি যতো সীমা লঙ্ঘনের দোষারোপই করা হোক না কেন, আল্লাহতা’লা তাঁর প্রতি রাজি; কেননা মহানবী (দ:) স্বয়ং ঘোষণা করেছেন যে বদর ও হুনায়নের জ্বেহাদে অংশগ্রহণকারী সাহাবাবৃন্দ (রা:) সবাই বেহেশতী, আর হযরতে আমীরে মু’আবিয়া (রা:) হুনায়নের যুদ্ধে মুজাহিদ ছিলেন। পঞ্চমতঃ সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-এর একে অপরের প্রতি প্রয়োগকৃত ভাষার ব্যাপারটিতে মানুষের পক্ষে ওর প্রসঙ্গ বা প্রেক্ষিত বোঝার কোনো উপায়-ই নেই; আর যদি তারা বুঝতেও পারে, তবুও তাঁদের সমকক্ষ পর্যায়ে নিজেদের ভাবার মতো যোগ্যতাও তাদের নেই। অতএব, সাহাবাবৃন্দ (রা:)-কে কেউ বিচার করার চেষ্টা করাটা নিজস্ব ওয়াসওয়াসা (কুমন্ত্রণা) ছাড়া কিছু নয়। সর্বোপরি, আল্লাহতা’লা তাঁর প্রিয়নবী (দ:)-এর জন্যে সাথী হিসেবে সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-কে পছন্দ করেন। আর তাঁরা প্রত্যেকেই হলেন এই উম্মতের প্রথম আউলিয়াবৃন্দ। তাঁদের কারো সম্মানহানির অপচেষ্টা প্রকৃতপ্রস্তাবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (দ:)-এরই প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন বটে। এ কারণেই আহলে সুন্নাত তথা সুন্নী উলামায়ে কেরামের উপদেশ এক্ষেত্রে অমূল্য, আর তাঁরা সবাই বলেছেন: এই বিষয়টি হতে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে নিজের ধর্মকে আপনারা হেফাযত করুন।

- আলহাজ্জ্ব জিবরীল হাদ্দাদ


শনিবার, ১২ আগস্ট, ২০১৭

হযরত আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর মাধ্যমে হযরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর তাওয়াসসুল





মূল: ড: জিএফহাদ্দাদ


অনুবাদ: কাজী সাইফুদ্দিন হোসেন
আরবী ও অনলাইন সেট-আপ: মুহাম্মদ রুবাইয়েত বিন মূসা
সহীহ্ আল্ বুখারী নামের হাদীসের গ্রন্থে একটি বর্ণনা পাওয়া যায়, যেখানে খলীফা উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু আমাদের মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রওযা পাকে মুসলিম উম্মাহর পক্ষে বৃষ্টি প্রার্থনা না করে বরং তাঁরই চাচা হযরত আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর মাধ্যমে (তাওয়াসসুল) আল্লাহর দরবারে বৃষ্টি প্রার্থনা করেছিলেন। খলীফা দোয়ার মধ্যে বলেন যে তাঁরা ইতিপূর্বে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মধ্যস্থতায় বৃষ্টি প্রার্থনা করতেন, কিন্তু এখন তাঁর চাচার অসিলায় তা চাইছেন। এই বিশুদ্ধ বর্ণনাটি  হানাফী  উলামায়ে কেরাম কীভাবে ব্যাখ্যা করে থাকেন, তা আমরা এখন জানতে চেষ্টা করবো।
এই বিষয়টি ও এতদসংক্রান্ত প্রশ্ন সাপেক্ষ যুক্তিগুলোর দিকে মনোযোগ দেয়ার আগে কিছু প্রাথমিক মন্তব্য এখানে লিপিবদ্ধ করা প্রাসঙ্গিক হবে।
প্রথমতঃ হযরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হযরত আব্বাস ইবনে আব্দিল মুত্তালিব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর তাওয়াসসুল করেছিলেন, তাঁর পুত্র হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর তাওয়াসসুল করেন নি। কিছু দিন আগে ‘হাম্বলী ফোরামে’ এ ব্যাপারে যা বলা হয়েছে তা সঠিক নয়।
দ্বিতীয়তঃ খলীফা উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর বক্তব্য ছিল নিম্নরূপ:

أَنَّ عُمَرَ بْنَ الخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، كَانَ إِذَا قَحَطُوا اسْتَسْقَى بِالعَبَّاسِ بْنِ عَبْدِ المُطَّلِبِ، فَقَالَ: اللَّهُمَّ إِنَّا كُنَّا نَتَوَسَّلُ إِلَيْكَ بِنَبِيِّنَا فَتَسْقِينَا، وَإِنَّا نَتَوَسَّلُ إِلَيْكَ بِعَمِّ نَبِيِّنَا فَاسْقِنَا ، قَالَ: فَيُسْقَوْنَ.
– “হে আল্লাহ! আমরা আপনার কাছে প্রার্থনা করার সময় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অসিলা (মাধ্যম) হিসেবে পেশ করতাম, আর আপনি বৃষ্টি দিতেন; এখন আমরা তাঁর চাচা হযরত আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-কে অসিলা হিসেবে পেশ করছি, অতএব অনুগ্রহ করে বৃষ্টি দিন।”[১]
এই বর্ণনাটি হযরত আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে আল্ বুখারী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর সহীহ্ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন। ইমাম আল্ মালেকী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “যে ব্যক্তি এই বর্ণনা থেকে এ কথা বুঝে নেয় যে হযরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হযরত আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-কে অসিলা করেছেন এবং বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে করেন নি, কেননা হযরত আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু জীবিত এবং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘মৃত’, তবে ওই ব্যক্তির উপলব্ধি ক্ষমতা-ই মৃত।”
ইমাম সৈয়ুতী রহমতুল্লাহি আলাইহি নিজ ‘তারিখে খুলাফা’ (বৈরুত ১৯৯২, আহমদ ফারেস সম্পাদিত, পৃষ্ঠা ১৪০) গ্রন্থে এই ঘটনার পটভূমি বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেন:
وَفِيْ سَنَةِ سَبْعِ عَشَرَةَ زَادَ عُمَرُ فِيْ المَسْجِدِ النَّبْوِّيِ، وَفِيْهَا كَانَ الْقَحَطُ بِالْحِجَازِ، وَسُمِّيَ عَامُ الرَّمَادَةِ وَاسْتَقَىَ عُمَرُ لِلْنَّاسِ بِالْعَبَّاسِ. أَخْرَجَ ابْنُ سَعَدٍ، عَنْ نَيَارِ الأَسْلَمِيُّ: أَنَّ عُمَرَ لمَاَّ خَرَجَ يَسْتَسْقَي خَرَجَ وَعَلَيْهِ بَرْدُ الرَّسُوْلِ صَلَّىَ اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ. وَأَخْرَجَ عَنْ اِبْنِ عَوْنٍ قَالَ: أَخَذَ عُمَرُ بِيَدِ الْعَبَّاس ِثُمَّ رَفَعَهَا، وَقَالَ: اللَّهُمَّ إِنَّا نَتَوَسَّلُ إِلَيْكَ بِعَمِ نَّبِيِّكَ أَنْ تَذْهَبَ عَنَّا المْحَلَ، وَأَنْ تَسْقِيْنَا الغَيْثَ، فَلَمْ يَبْرِحُوْا حَتَّى سَقُوا، فَأطَبَقَتِ السَّمَاءُ عَلَيْهِمْ أَيَّامًا.
– “১৭ হিজরী সালে হযরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু মসজিদে নব্বী সম্প্রসারণ করেন। ওই বছর হেজায অঞ্চলে খরা দেখা দেয়। সালটিকে ‘অঙ্গারের বছর’ আখ্যা দেয়া হয় (আম আল্ রামাদা)। হযরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু মানুষের উপকারে বৃষ্টির জন্যে প্রার্থনার সময় হযরত আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর অসিলা গ্রহণ করেন। হযরত ইবনে সা’দ রহমতুল্লাহি আলাইহি (সাহাবী) হযরত নিয়্যার আল্ আসলামী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন যে হযরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু যখন বৃষ্টির জন্যে খোদার দরবারে প্রার্থনা করতে বেরিয়ে আসেন, ওই সময় তিনি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জুব্বা (বুরদ্) মোবারক পরেছিলেন। হযরত ইবনে আওন (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন যে খলীফা উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হযরত আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা-এর হস্ত মোবারক ওপরে তুলে ধরেন এবং বলেন, ‘হে আল্লাহ্!  আমরা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মানিত চাচার মধ্যস্থতায় (অসিলায়) আপনার দরবারে প্রার্থনা করছি যাতে আপনি এই খরা আমাদের কাছ থেকে দূর করে দেন এবং বৃষ্টি মঞ্জুর করেন।”[২]
এ ঘটনায় নিচের বিষয়গুলো পরিস্ফুট হয়:
(১) এই বর্ণনায় এমন কোনো ইঙ্গিত নেই যে হযরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর যমানায় কখনোই বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তাওয়াসসুল করা হয় নি। ওই ধরনের অভিমত কেউ নিয়ে থাকলে তা মনগড়া এবং সুস্পষ্ট দলিলের ওপর ভিত্তিশীল নয়।
(২) পক্ষান্তরে, হযরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ওই সময়ই হযরত রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তাওয়াসসুল করার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, যখন তিনি বৃষ্টির জন্যে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করার উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জুব্বা মোবারক পরে বেরিয়ে এসেছিলেন, যা হযরত ইবনে সা’দ বর্ণনা করেছেন। সহীহ্ মুসলিম শরীফ গ্রন্থে হযরত আসমা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা বলেন যে তিনি তাঁর বোন হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আলখেল্লাটি পেয়েছিলেন এবং তাঁরা সেটি দ্বারা মানুষের রোগ নিরাময় করার উপায় খুঁজতেন।
(৩) হুজুর পূর নূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচার মধ্যস্থতা পরিস্ফুট করে যে তাওয়াসসুল মূলতঃ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামেরই! কেননা, হযরত আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর গুরুত্ব কেবল মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে তাঁর (রক্তের) সম্পর্কের কারণেই হয়েছে, যা হযরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর ভাষায় নিম্নরূপ:
“আপনার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচা” (আল্ বুখারীতে উদ্ধৃত)। আল্ লালিকার সংস্করণে তা এভাবে উদ্ধৃত “আপনার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সম্পর্কে হযরত আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর মর্যাদা”। হযরত আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এ উপলক্ষে বলেন,
وَقَدْ بَيَّنَ الزُّبَيْرُ بْنُ بَكَّارٍ فِي الْأَنْسَابِ صِفَةَ مَا دَعَا بِهِ الْعَبَّاسُ فِي هَذِهِ الْوَاقِعَةِ وَالْوَقْتَ الَّذِي وَقَعَ فِيهِ ذَلِكَ فَأَخْرَجَ بِإِسْنَادٍ لَهُ أَنَّ الْعَبَّاسَ لَمَّا اسْتَسْقَى بِهِ عُمَرُ قَالَ اللَّهُمَّ إِنَّهُ لَمْ يَنْزِلْ بَلَاءٌ إِلَّا بِذَنْبٍ وَلَمْ يُكْشَفْ إِلَّا بِتَوْبَةٍ وَقَدْ تَوَجَّهَ الْقَوْمُ بِي إِلَيْكَ لِمَكَانِي مِنْ نَبِيِّكَ وَهَذِهِ أَيْدِينَا إِلَيْكَ بِالذُّنُوبِ وَنَوَاصِينَا إِلَيْكَ بِالتَّوْبَةِ فَاسْقِنَا الْغَيْثَ فَأَرْخَتِ السَّمَاءُ مِثْلَ الْجِبَالِ حَتَّى أَخْصَبَتِ الْأَرْضَ وَعَاشَ النَّاسُ وَأَخْرَجَ أَيْضًا مِنْ طَرِيقِ دَاوُدَ عَنْ عَطَاءٍ عَنْ زَيْدِ بْنِ أَسْلَمَ عَنِ بن عُمَرَ قَالَ اسْتَسْقَى عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ عَامَ الرَّمَادَةِ بِالْعَبَّاسِ بْنِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ فَذَكَرَ الْحَدِيثَ وَفِيهِ فَخَطَبَ النَّاسَ عُمَرُ فَقَالَ إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَرَى لِلْعَبَّاسِ مَا يَرَى الْوَلَدُ لِلْوَالِدِ فَاقْتَدُوا أَيُّهَا النَّاسُ بِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي عَمِّهِ الْعَبَّاسِ وَاتَّخِذُوهُ وَسِيلَةً إِلَى اللَّهِ وَفِيهِ فَمَا بَرِحُوا حَتَّى سَقَاهُمُ اللَّهُ.
-“হে আল্লাহ্! কোনো শাস্তি-ই পাপ ছাড়া অবতীর্ণ হয় না, আর তা তওবা (অনুতপ্ত হওয়া) ছাড়া মোচন-ও হয় না। মানুষেরা আপনার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে আমার সম্পর্কের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত আমার মর্যাদার ওয়াস্তে আপনার করুণাপ্রার্থী। আর এই হলো আমাদের হাত যা আপনার দরবারের দিকে তোলা; যদিও আমাদের অনেক পাপ, তবুও আমাদের কপালের উপরিবর্তী কেশগুচ্ছ অনুতপ্ত; অতএব, আমাদের বৃষ্টি দান করুন এবং আপনার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর চাচার সত্তায় অম্লান রাখুন।” অতঃপর আকাশ থেকে রশির মতো মোটা (অর্থাৎ ভারী) বর্ষণ আরম্ভ হলো এবং মানুষেরা হযরত আব্বাসের রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু কাছে এসে হাত বুলিয়ে দিয়ে বল্লো, “আপনাকে মোবারকবাদ (অভিনন্দন), মক্কা ও মদীনা (হারামাইন শরীফাইন)-এর সেচকারী।” হযরত উমর ফারুক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এমতাবস্থায় বলেন, “তিনি হলেন আল্লাহর কাছে মধ্যস্থতাকারী এবং নৈকট্যের মকাম (স্থান)।” এ বর্ণনাটি আল্ আনসাব পুস্তকে আল্ যুবায়ের ইবনে বক্কর রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে উদ্ধৃত করেছেন ইবনে হাজর রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর ‘ফাত্হুল বারী’ গ্রন্থে (২:৪৯৭)।[৩]
অতএব, তাওয়াসসুল মুলতঃ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মধ্যস্থতায়ই হয়েছে, কেননা আল্লাহর নৈকট্য অন্বেষণকারী মানুষের জন্যে তিনি-ই হলেন চূড়ান্ত অসিলা, যা তিনি স্বয়ং জনৈক অন্ধ সাহাবীকে শিখিয়েছিলেন-
يَا مُحَمَّدُ ، إِنِّي تَوَجَّهْتُ بِكَ إِلَى رَبِّي فِي حَاجَتِي
“বলো, ইয়া মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)! ইন্নী আতাওয়াজ্জাহু বিকা ইলা রাব্বী – অর্থাৎ, হে রাসূল! আমি আপনার মধ্যস্থতায় আল্লাহর দিকে ফিরলাম।” [৪]
আর অনেক সাহাবী থেকেই এ মর্মে স্পষ্ট বিবরণ বিদ্যমান যার কয়েকটি নিচে দেয়া হলো:
(ক) এক বেদুঈন আরব আমাদের মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেন,

جَاءَ أَعْرَابِيٌّ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللهِ لَقَدْ أَتَيْنَاكَ وَمَا لَنَا بَعِيرٌ يُيَطُّ وَلَا صَبِيٌّ يَصِيحُ، وأنشده.
أَتَيْنَاكَ وَالْعَذْرَاءُ يَدْمَى لَبَانُهَا … وَقَدْ شُغِلَتْ أُمُّ الصَّبِيِّ عَنِ الطِّفْلِ
وَأَلْقَى بِكَفَّيْهِ الصَّبِيُّ اسْتِكَانَةً … مِنَ الْجُوعِ ضَعْفًا مَا يُمَرُّ وَلَا يُخْلِي
وَلَا شَيْءَ مِمَّا يَأْكُلُ النَّاسُ عِنْدَنَا … سِوَى الْحَنْظَلِ الْعَامِيِّ وَالْعِلْهِزِ الْفَسْلِ
وَلَيْسَ لَنَا إِلَّا إِلَيْكَ فِرَارُنَا … وَأَيْنَ فِرَارُ النَّاسِ إِلَّا إِلَى الرُّسْلِ
فَقَامَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَجُرُّ رِدَاءَهُ حَتَّى صَعِدَ الْمِنْبَرَ ثُمَّ رَفَعَ يَدَيْهِ إِلَى السَّمَاءِ، فَقَالَ: اللهُمَّ اسْقِنَا غَيْثًا مُغِيثًا مَرِيئًا مَرِيعًا غَدَقًا، طَبَقًا عَاجِلًا غَيْرَ رَائِثٍ، نَافِعًا غَيْرَ ضَارٍّ تَمْلَأُ بِهِ الضَّرْعَ وَتُنْبِتُ بِهِ الزَّرْعَ وَتُحْيِي بِهِ الْأَرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا وَكَذَلِكَ تُخْرَجُونَ، فو الله مَا رَدَّ يَدَيْهِ إِلَى نَحْرِهِ حَتَّى أَلْقَتِ السَّمَاءُ بِأَبْرَاقِهَا، وَجَاءَ أَهْلُ الْبِطَانَةِ يَعْنِجُونَ يَا رَسُولَ اللهِ! الْغَرَقَ الْغَرَقَ، فَرَفَعَ يَدَيْهِ إِلَى السَّمَاءِ ثُمَّ قَالَ:
اللهُمَّ حَوَالَيْنَا وَلَا عَلَيْنَا، فَانْجَابَ السَّحَابُ عَنِ الْمَدِينَةِ حَتَّى أَحْدَقَ بِهَا كَالْإِكْلِيلِ، فَضَحِكَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَتَّى بَدَتْ نَوَاجِذُهُ ثُمَّ قَالَ: لِلَّهِ دَرُّ أَبِي طَالِبٍ لَوْ كَانَ حَيًّا قَرَّتَا عَيْنَاهُ مَنْ يُنْشِدُنَا قَوْلَهُ؟ فَقَامَ عَلِيُّ بْنُ أَبِي طَالِبٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ فَقَالَ يَا رَسُولَ الله كأنك أردت:
وَأَبْيَضُ يُسْتَسْقَى الْغَمَامُ بِوَجْهِهِ … ثِمَالُ الْيَتَامَى عِصْمَةٌ لِلْأَرَامِلِ
يَلُوذُ بِهِ الْهُلَّالُ مِنْ آلِ هَاشِمٍ … فَهُمْ عِنْدَهُ فِي نِعْمَةٍ وَفَوَاضِلِ
كَذَبْتُمْ وبيت الله يبزي محمدا … وَلَمَّا نُقَاتِلْ دُونَهُ وَنُنَاضِلِ
وَنُسْلِمُهُ حَتَّى نُصَرَّعَ حَوْلَهُ … وَنَذْهَلُ عَنْ أَبْنَائِنَا وَالْحَلَائِلِ

-“আমরা এমন সময় আপনার শরণাপন্ন হয়েছি যখন আমাদের কুমারীদের (বুকের) দুধ শুকিয়ে গেছে, আর মায়েরা আপন শিশুর জীবনের চেয়ে নিজের জীবন সম্পর্কে বেশি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। ওই শিশু ক্ষুধায় হাত নামিয়ে স্থবির বসে আছে; কেননা এই ক্ষিদে জ্বালাময় এবং বিরামহীন। খাওয়ার মতো কিছুই আর আমাদের জনগোষ্ঠীর কাছে নেই, কেবল আছে তেতো শশা জাতীয় সবজি এবং রক্তমিশ্রিত উটের পশম। আমাদের আশ্রয় নেয়ার মতো আর কেউ নেই আপনি ছাড়া। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড়া মানুষেরা আর কোথায়ই বা আশ্রয় নেবে?”
এমতাবস্থায় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উঠে দাঁড়ালেন এবং তাঁর জুব্বা মোবারক টানতে টানতে মিম্বরে আরোহণ করলেন। অতঃপর আরয করলেন: “হে আল্লাহ্! আমাদের বৃষ্টি মঞ্জুর করুন।” অমনি ভারী বর্ষণ আরম্ভ হলো। এ দেখে তিনি বল্লেন, “আবু তালিব (নবীর চাচা) আজ জীবিত থাকলে এ দৃশ্য দেখে নয়ন জুড়াতেন। ওই বেদুঈন (আবু তালেব) যা বলেছেন কে আছো তা পুনরায় আবৃত্তি করবে আমাদের উদ্দেশ্যে?” এই কথা শুনে হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু উঠে দাঁড়িয়ে আরয করলেন, “হে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার মনে হয় আপনি তাঁর এই কথা বোঝাচ্ছেন, “শুভ্র সেই সত্তা যার চেহারা মোবারক দ্বারা মেঘমালা কামনা করা হয়, যিনি এতিম অনাথদের লালন-পালনকারী ও বিধবাদের রক্ষক। তাঁরই মধ্যস্থতায় হাশেম গোত্র দুর্যোগ থেকে আশ্রয় চায়; কেননা তারা তাঁরই মধ্যে খুঁজে পায় মহা অনুগ্রহ ও করুণা…..।”[৫]
এই হাসীসটি আল্ বায়হাকী বর্ণনা করেছেন তাঁর ‘দালাইল আল্ নুবুয়্যত’ গ্রন্থে (৬:১৪১), ইবনে কাসীর তার ‘আল্ বেদায়া ওয়ান্ নেহায়া’ পুস্তকে (৬:৯০-৯১) এবং ইবনে হাজর তাঁর ‘ফাত্হুল বারী’ বইয়ে (১৯৮৯ সংস্করণ, ২:৬২৯)।
(খ) হযরত সাওয়াদ ইবনে কারীব আল্ সাদুসী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু কবিতার আকারে আবৃত্তি করেন-

فَمُرْنَا بِمَا يَأْتِيكَ يَا خَيْرَ مَنْ مَشَى … وَإِنْ كَانَ فِيمَا جَاءَ شَيْبُ الذَّوَائِبِ
وَكُنْ لِي شَفِيعًا يَوْمَ لَا ذِي شَفَاعَةٍ … سِوَاكَ بِمُغْنٍ عَنْ سَوَادِ بْنِ قَارِبِ
“সত্যি আপনি হলেন আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্তিতে নবীদের মাঝে সর্বোৎকৃষ্ট মাধ্যম’; মহানতম ও নির্মলতম পিতামাতার পুত্র সন্তান; অতএব, এই সাওয়াদ ইবনে কারীবের জন্যে ওই দিন সুপারিশকারী হোন, যেদিন সুপারিশকারীদের মধ্যে আপনি ছাড়া আর কারো সুপারিশই আমার জন্যে ন্যূনতম উপকারী হবে না।”
এ বক্তব্য শ্রবণে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃদু হাসলেন এবং বল্লেন, “সাওয়াদ! তুমি সাফল্য অর্জন করেছো।”[৬] 
হাদীসটি বর্ণনা করেছেন আবু ইয়া’লা তাঁর ‘মু’জাম’ বইয়ে (পৃষ্ঠা ২৬৫), তাবারানী নিজ ‘আল্ কবীর’ পুস্তকে (৭:৯৪ ৬৪৭৫), আবু নু’য়াইম তাঁর ‘দালাইল্ আল্ নুবুওয়া’ গ্রন্থে (পৃষ্ঠা ১১৪, অধ্যায় ৬৩), আল্ তায়মী নিজ ‘দালাইল’ পুস্তকে (পৃষ্ঠা ১৩২), আল্ হাকিম তাঁর ‘মুস্তাদ্রাক’ গ্রন্থে (৩:৭০৫), আল্ বায়হাকী নিজ ‘দালাইল’ বইয়ে (২:২৫১), ইবনে আব্দিল বারর তাঁর ‘ইস্তিয়াব’ পুস্তকে (২:৬৭৫), ইবনে কাসীর নিজ ‘তাফসীর’ (৪:১৬৯) এবং ‘বেদায়া’ গ্রন্থে, ইবনে হাজর তাঁর ‘ফাত্হুল বারী’ (৭:১৮০) ও ‘ইসাবা’ (৩:২৯৯) পুস্তকে।
(গ) হযরত হাসসান বিন সাবিত রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু পদ্যের আকারে আবৃত্তি করেন-

يَا رُكْنُ مُعْتَمِدٌ وَعِصْمَةُ لَائِذٌ … وَمَلاَذُ مُنْتَجِعٌ وَجَارٌ مُجَاوَرٌ
يَا مَنْ تُخَيّْرُهُ الإِلَهُ لِخَلْقِهِ … فَحُبَّاهُ بِالخْلَقِ الزَّكِيِ الطَّاهِرِ
أَنْتُ النَّبِيُّ وَخَيْرُ عُصْبَةِ آَدَمَ … يَا مَنْ تُجَوِّدُ كَفَيْضِ بَحْرٌ زَاخِرٌ
-“আপনার প্রতি যাঁরা আস্থা রাখেন, ওহে তাঁদের ভিত্তিস্তম্ভ, ওহে তাঁদের আশ্রয়স্থল যাঁরা আপনার মাঝে আশ্রয় খোঁজেন, আর যাঁরা  শষ্য ও বৃষ্টি খোঁজেন তাঁদের আশ্রয়দাতা, ওহে আশ্রয় অন্বেষণকারীদের প্রতিবেশী ও রক্ষাকারী, যাঁর মাঝে পূর্ণতা ও চারিত্রিক নির্মলতা সন্নিবেশ করে খোদাতা’লা তাঁর সৃষ্টিকুলের জন্যে মনোনীত করেছেন!”[৭]
এ বর্ণনাটি ইবনে আব্দিল বারর তাঁর ‘আল্ ইস্তিয়াব’ গ্রন্থে (১:২৭৬) এবং ইবনে সাইয়্যেদ আল্ নাস্ নিজ ‘মিনাহ্ আল্ মায’ পুস্তকে (পৃষ্ঠা ৭৩) লিপিবদ্ধ করেছেন।
(৪) হযরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক বৃষ্টির জন্যে প্রার্থনার প্রেক্ষিত হিসেবে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুস্পষ্ট তাওয়াসসুল আরেকটি বর্ণনায় পাওয়া যায়, যা সাহাবী হযরত বেলাল ইবনে হারিস্ মুযানী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু রেওয়ায়াত করেছেন এবং যা দু’টি ভাষ্যে পাওয়া যায়।
(ক) ভাষ্য – ১
সাহাবী  হযরত মালেক আল দার রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন-

أَصَابَ النَّاسَ قَحَطٌ فِي زَمَانِ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ، فَجَاءَ رَجُلٌ إِلَى قَبْرِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللهِ: اسْتَسْقِ اللهَ لِأُمَّتِكَ فَإِنَّهُمْ قَدْ هَلَكُوا، فَأَتَاهُ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي الْمَنَامِ، فَقَالَ ائْتِ عُمَرَ، فَأَقْرِئْهُ السَّلَامَ، وَأَخْبِرْهُ أَنَّكُمْ مُسْقَوْنَ. وَقُلْ لَهُ: عَلَيْكَ الْكَيْسَ الْكَيْسَ. فَأَتَى الرَّجُلُ عُمَرَ، فَأَخْبَرَهُ، فَبَكَى عُمَرُ ثُمَّ قَالَ: يَا رَبُّ مَا آلُو إِلَّا مَا عَجَزْتُ عَنْهُ.
-“হযরত খলীফা উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে মানুষেরা খরাপীড়িত হন। এমতাবস্থায় কেউ একজন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রওযা পাকে আসেন এবং আরয করেন, ‘হে নবী, আপনার উম্মতের জন্যে (আল্লাহর দরবারে) বৃষ্টি প্রার্থনা করুন, কেননা নিশ্চয় তারা নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে।’ অতঃপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক রাতে ওই ব্যক্তির স্বপ্নে দেখা দেন এবং তাঁকে বলেন, ‘উমরের কাছে যাও এবং তাকে আমার সম্ভাষণ জানাও। তারপর তাকে বলবে যে বৃষ্টি হবে। তাকে বলবে বিচক্ষণ হতে (শাসনে)’। ওই ব্যক্তি খলীফার কাছ গিয়ে সব ঘটনা জানালেন। এতে খলীফা খুব কাঁদলেন এবং দোয়া করলেন, ‘হে প্রভু! আমি চেষ্টায় ক্রটি করি না, শুধু যা আমার ক্ষমতার বাইরে তা ছাড়া!” ইবনে কাসীর তার রচিত ‘আল বেদায়া ওয়ান নেহায়া’ পুস্তকে (মা’আরিফ সংস্করণ ৭:৯১-৯২ এবং দার ইহইয়া আল্ তুরাস্ সংস্করণ ৭:১০৫) ইমাম বায়হাকী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর ‘দালাইল আল নুবুয়্যত’ (৭:৪৭) থেকে বর্ণনাটি উদ্ধৃত করে বলেন, “ইসনাদুহু সহীহ্” (এর সনদ বিশুদ্ধ); তিনি আরও ঘোষণা করেছেন, “ইসনাদুহু জাইয়্যেদুন কাওয়ী,” অর্থাৎ, এর সনদ নির্ভরযোগ্য (জামেউল মাসানিদ, ১:২২৩)। ইবনে আবি শায়বা (৬:৩৫২ এবং ১২:৩১-৩২) সহীহ্ সনদের সাথে এটি বর্ণনা করেছেন যা ইবনে হাজর মক্কী রহমতুল্লাহি আলাইহি নিজ ফাত্হুল বারী, ইস্তিস্কা পুস্তকের তৃতীয় অধ্যায়ে (১৯৮৯ সংস্করণ, ২:৬২৯-৩০ ও ১৯৫৯ সংস্করণ ২:৮৯৫) সমর্থন করেছেন এ কথা বলে, “রাওয়া ইবনে আবি শায়বা বি ইসনাদিন সহীহ্;” তিনি নিজ রচিত আল ইসাবা পুস্তকে (৬:১৬৪ এবং ৩:৪৮৪) বলেন যে এটি ইবনে আবি খায়তামা বর্ণনা করেছেন। এর বর্ণনাকারীদের মধ্যে আরও আছেন আল খলিলী তাঁর’ইরশাদ’ বইয়ে (১:৩১৩-১৪) এবং ইবনে আব্দিল বারর তাঁর ‘আল্ ইস্তিয়াব’ গ্রন্থে (২:৪৬৪ এবং ৩:১১৪৯)। আল্ আলবানী তার প্রণীত ‘তাওয়াসসুল’ পুস্তকে (পৃষ্ঠা ১২০) এ বর্ণনাটিকে দুর্বল প্রমাণ করতে চেয়েছে, কিন্তু তাকে শায়খ মামদুহ্ নিজ রচিত ‘রাফ’আল্ মিনারা’ গ্রন্থে (২৬২-২৭৮ পৃষ্ঠা) বিস্তারিত খণ্ডন করেছেন; ওতে ইবনে বা’য (ফাত্হুল বারীর হাশিয়া), আবু বকর জাযাইরীর ‘ওয়াজাউ ইয়ারকুদুন’, হাম্মাদ আল্ আনসারীর প্রবন্ধ ‘আল্ মাফহুম আল্ সহীহ্ লিল্ তাওয়াসসুল’ যার অপর শিরোনাম ‘তোহ্ফাত আল্ কারী ফী রাদ্দি আ’লাল গুমারী’ এবং অনুরূপ লেখনীর খণ্ডন বিধৃত হয়েছে।
ইমাম ইবনে হাজর রহমতুল্লাহি আলাইহি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রওযায় গমনকারী সাহাবীকে হযরত বেলাল ইবনে হারিস্ মুযানী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলে শনাক্ত করেন। ইমাম বুখারী রহমতুল্লাহি আলাইহি যে তাঁর সহীহ্ গ্রন্থের ইসতিসকা বাবে (অধ্যায়ে) “খরাপীড়িত হলে ইমামের প্রতি মানুষের অনুরোধ” শিরোনামে একটি অধ্যায় রচনা করেছেন, তার কারণগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে এই বর্ণনাকে ইমাম ইবনে হাজর গণ্য করেন।
(খ) ভাষ্য – ২
আত্ তাবারী রহমতুল্লাহি আলাইহির ‘তারিখ’ (ইতিহাস ২:৫০৯) থেকে সংগৃহীত:

أَنَّ رَجُلًا مِنْ مُزَيْنَةَ عَامَ الرَّمَادَةِ سَأَلَهُ أَهْلُهُ أَنْ يَذْبَحَ لَهُمْ شَاةً فَقَالَ: ليس فيهن شئ. فَأَلَحُّوا عَلَيْهِ فَذَبَحَ شَاةً فَإِذَا عِظَامُهَا حُمْرٌ فَقَالَ يَا مُحَمَّدَاهُ. فَلَمَّا أَمْسَى أَرَى فِي الْمَنَامِ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وسلَّم يقول له: ” أبشر بالحياة، إيت عمر فأقره مِنِّي السَّلَامَ وَقُلْ لَهُ إِنَّ عَهْدِي بِكَ وَفِيَّ الْعَهْدِ شَدِيدَ الْعَقْدِ، فَالْكَيْسَ الْكَيْسَ يَا عُمَرُ “، فَجَاءَ حَتَّى أَتَى بَابَ عُمَرَ فَقَالَ لِغُلَامِهِ اسْتَأْذِنْ لِرَسُولِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.
– আল্ রামাদা নামের খরার বছর যখন হযরত উমর ফারুক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খলীফা ছিলেন, তখন সাহাবী বিলাল ইবনে হারিস্ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু তাঁর কোনো এক আত্মীয়ের জন্যে ভেড়া জবাই করেন। ওই সময় তিনি দেখতে পান ভেড়ার হাড়গুলো লাল হয়ে গিয়েছে, কেননা ওর মাংস শুকিয়ে হাড়ের সাথে লেগে গিয়েছিল। তিনি নেদা (আহ্বান) দিয়ে বলেন, “ইয়া মোহাম্মাদা” (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)! অতঃপর তিনি হুজুর পূর নূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নে দেখতে পান, যিনি তাঁকে হযরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর কাছে গিয়ে আসন্ন বৃষ্টির সুসংবাদ দিতে বলেন এবং খলীফাকে জ্ঞান-প্রজ্ঞা দ্বারা শাসন করতে বলেন। এ কথা শুনে হযরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু সকলকে সমবেত করেন এবং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শ্রদ্ধেয় চাচা হযরত আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-কে সাথে নিয়ে বৃষ্টির জন্যে দোয়া করতে বেরিয়ে আসেন।
(৫) হযরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু অতীতে হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মধ্যস্থতা (তাওয়াসসুল) গ্রহণ করেছিলেন, যে কারণে তিনি বলেছেন, 
“আমরা ইতিপূর্বে আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আপনার কাছে প্রার্থনার সময় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গ্রহণ করতাম . . . ।” অর্থাৎ, ওই সময় যখন হযরত আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফত আমল চলছিল এবং তাঁর খেলাফত আমলেও বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তাওয়াসসুল হযরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু করেছিলেন; হুজর পূর নূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের (প্রকাশ্য) জিন্দেগীর সময়ই কেবল তাওয়াসসুল করা হয়নি, বরং পরবর্তীকালেও তা করা হয়েছে, কেননা উক্ত দু’টি শাসনকালে, অর্থাৎ, সাড়ে আট বছরে তাঁরা আর কখনোই খরাপীড়িত না হওয়ার বিষয়টি অ-সম্ভাব্য। আল্ কাওসারী বলেন, “কিন্তু (হযরত উমরের) এই বাক্যটিকে রাসূলে আকরাম রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর যাহেরী (প্রকাশ্য) জিন্দেগীতে সীমাবদ্ধ করার চেষ্টা এমনই একটি ঘাটতি যা নিরর্থক মনের ইচ্ছা থেকে নিঃসৃত, রেওয়ায়াতের মূল বিষয়ের বিকৃতি সাধনের অপচেষ্টা এবং দলিল-প্রমাণ ছাড়া কল্পনাশ্রিত ব্যাখ্যামাত্র।”
(৬) উপরন্তু, অধিকাংশ সাহাবায়ে কেরাম-ই হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যাহেরী জীবদ্দশার পরে তাঁর তাওয়াসসুল করেছেন যা আমাদের মা আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেছেন ইমাম দারিমী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর ‘সুনান’ গ্রন্থে, ভূমিকার ১৫ অধ্যায়ে (১:৪৩); এর শিরোনাম হলো “নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি তাঁর বেসালের (আল্লাহর সাথে মিলনপ্রাপ্তির) পর আল্লাহর অনুগ্রহ।” এই রেওয়ায়াতটি নির্ভরযোগ্য সনদে হযরত আউস্ ইবনে আব্দিল্লাহ্ বর্ণনা করেছেন:

حَدَّثَنَا أَبُو الْجَوْزَاءِ أَوْسُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ: قُحِطَ أَهْلُ الْمَدِينَةِ قَحْطًا شَدِيدًا، فَشَكَوْا إِلَى عَائِشَةَ فَقَالَتْ: ” انْظُرُوا قَبْرَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَاجْعَلُوا مِنْهُ كِوًى إِلَى السَّمَاءِ حَتَّى لَا يَكُونَ بَيْنَهُ وَبَيْنَ السَّمَاءِ سَقْفٌ. قَالَ: فَفَعَلُوا، فَمُطِرْنَا مَطَرًا حَتَّى نَبَتَ الْعُشْبُ، وَسَمِنَتِ الْإِبِلُ حَتَّى تَفَتَّقَتْ مِنَ الشَّحْمِ، فَسُمِّيَ عَامَ الْفَتْقِ.
মদীনাবাসী মানুষেরা একবার তীব্র খরাপীড়িত হয়ে হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার কাছে আরয করেন। তিনি তাঁদেরকে বল্লেন, “(হায়াতুন্নবীর) পাক রওযায় যাও, আর রওযার ছাদ খুলে দাও, যাতে তাঁর এবং আকাশের মাঝখানে কিছু না থাকে।” মদীনাবাসীরা তাই করলেন। অতঃপর এমন বর্ষণ আরম্ভ হলো যে ফলে-ফসলে মাঠ-প্রান্তর ভরে উঠলো এবং উট হৃষ্টপুষ্ট হলো। এই বছরটিকে ‘প্রাচুর্যের বছর’ আখ্যা দেয়া হয়েছিল।
পাঠকবৃন্দ, এই বর্ণনার ওপর বিস্তারিত দালিলিক প্রমাণাদি পাবেন এনসাইক্লোপেডিয়া অফ ইসলামিক ডক্ট্রিন তথা ইসলামী তত্ত্বের বিশ্বকোষে (৪:৪৭-৫২)। হাদীসের বিশারদ সকল সুন্নী আলেম-ই এটিকে সহীহ্ বলেছেন যার মধ্যে সর্বশেষ জন হলেন শায়খ নাবিল ইবনে হাশিম আল্ গামরী তাঁরই রচিত ১০ খণ্ড বিশিষ্ট দারিমী শরীফের ব্যাখ্যামূলক ‘ফাত্হুল মান্নান’ (১:৫৬৪-৬৬) গ্রন্থে, যেখানে তিনি আল্ আলবানী ও তার মতো ব্যক্তিদের এই রেওয়ায়াতের প্রতি উত্থাপিত আপত্তিসমূহ খণ্ডন করেছেন।
(৭) তাবুকের যুদ্ধের সময় হযরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হযরত রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তাওয়াসসুল করেছিলেন এবং এর ফলে সরাসরি খোদায়ী অপরিমিত দানশীলতার ও মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহত্ত্বের ছোঁয়া পেয়েছিলেন। বর্ণিত আছে:

عَنْ سَلَمَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ: خَفَّتْ أَزْوَادُ القَوْمِ، وَأَمْلَقُوا، فَأَتَوُا النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي نَحْرِ إِبِلِهِمْ، فَأَذِنَ لَهُمْ، فَلَقِيَهُمْ عُمَرُ، فَأَخْبَرُوهُ فَقَالَ: مَا بَقَاؤُكُمْ بَعْدَ إِبِلِكُمْ، فَدَخَلَ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، مَا بَقَاؤُهُمْ بَعْدَ إِبِلِهِمْ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «نَادِ فِي النَّاسِ، فَيَأْتُونَ بِفَضْلِ أَزْوَادِهِمْ» ، فَبُسِطَ لِذَلِكَ نِطَعٌ، وَجَعَلُوهُ عَلَى النِّطَعِ، فَقَامَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَدَعَا وَبَرَّكَ عَلَيْهِ، ثُمَّ دَعَاهُمْ بِأَوْعِيَتِهِمْ، فَاحْتَثَى النَّاسُ حَتَّى فَرَغُوا، ثُمَّ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَأَنِّي رَسُولُ اللَّهِ»
– “কোনো এক সফরে যখন মানুষদের খাবার ফুরিয়ে যাচ্ছিল তখন তাঁরা নিজেদের উটগুলো জবাই করার কথা ভাবতে শুরু করেন। এমতাবস্থায় হযরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হুজুর পূর নূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গিয়ে আরয করেন, ’হে রাসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! উটগুলো ছাড়া তারা কীভাবে টিকবে?’ বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বল্লেন, ‘তাদের বলো অবশিষ্ট খাবারগুলো এখানে আনতে।’ এক টুকরো চামড়া বিছিয়ে দেয়া হলে তাতে মানুষদের অবশিষ্ট খাবার সামগ্রী রাখা হলো। অতঃপর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে দোয়া করলেন এবং খাবারগুলোতে ফুঁকে দিলেন; এরপর সবাইকে ঝুলি আনতে বল্লেন। মানুষেরা ঐশী প্রাচুর্যময় সমস্ত খাবার সংগ্রহ করে নিলেন, এমন কি শেষটুকুও। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করলেন, ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য মা’বুদ নেই এবং আমি-ই তাঁর প্রেরিত রাসূল!’
এই হাদীসটি বোখারী ও মুসলিম হযরত সালামা ইবনে আল্ আকওয়া’ থেকে এবং মুসলিম ও ইমাম আহমদ হযরত আবু হোরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন।
(৮) হযরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হযরত আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর তাওয়াসসুল করে সমাজে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উঁচু পারিবারিক মর্যাদা মানুষদের সামনে তুলে ধরেছেন এবং তাদেরকে নবী বংশের প্রতি সম্মান প্রদর্শন শিক্ষা দিয়েছেন, যেমনিভাবে ইমাম ইবনে হাজর রহমতুল্লাহি আলাইহি হযরত আনাস্ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত আলোচ্য রেওয়ায়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন: “মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আত্মীয়স্বজন ও বযুর্গানে দ্বীনের শাফায়াত বা সুপারিশ প্রার্থনা করা একান্ত কাম্য; আর এই ঘটনা হযরত আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর মাহাত্ম্য ও উচ্চ মকাম এবং হযরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুরও মাহাত্ম্য প্রতিভাত করে, যেহেতু তিনি হযরত আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু’র প্রতি বিনয়ী হয়েছিলেন এবং তাঁর হক্ক তথা অধিকারের প্রতি স্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।”
এটি ’আল্ শরীয়া’র ব্যাখ্যামূলক পুস্তকে আল্ আজিউররী এবং ‘ফাযাইল আল্ সাহাবী’ গ্রন্থে (২:৯৩৭ # ১৮০২) ইমাম আহমদ সমর্থন করেছেন অপর এক বর্ণনা দ্বারা, 
أَنَّ كَعْبًا الْحَبْرَ أَخَذَ بِيَدِ الْعَبَّاسِ فَقَالَ: «اخْتَبِئْهَا لِلشَّفَاعَةِ عِنْدَكَ» قَالَ: وَهَلْ لِي شَفَاعَةٌ؟ قَالَ: نَعَمْ «لَيْسَ أَحَدٌ مِنْ أَهْلِ بَيْتِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَّا كَانَتْ لَهُ شَفَاعَةٌ» .
 হযরত কা’আব আল্ আহবার রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হযরত আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর হাত মোবারক নিজ হাতে নিয়ে তাঁকে বলেছিলেন, “আমি এই করমর্দন লুকিয়ে রাখবো আমার পক্ষে আপনার সুপারিশের (শাফায়াতের) জন্যে।” হযরত আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু উত্তর দেন, “কেন, আমি কি শাফায়াত করতে পারবো (অর্থাৎ, শাফায়াতের ক্ষমতা আমার থাকবে কি না?” কা’আব উত্তর দিলেন, “বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আহল তথা ঘরের মানুষ বা পরিবার সদস্যদের এমন কেউই হবেন না যাঁর শাফায়াতের ক্ষমতা থাকবে না!” কা’আব আল্ আহবার রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হযরত উমর ফারুক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-কে আরও বলেন, “বনী ইসরাইল গোত্রের মানুষেরা যখনই খরাপীড়িত হতো, তখনই তারা তাদের নবী (মূসা আলাইহিস্ সালাম)-এর পরিবার সদস্যদের সুপারিশ কামনা করতো।” (২:৮১৪)
(৯) এ কথা সর্বজন জ্ঞাত যে আহলে বায়তের তথা নবী পরিবারের প্রতি হযরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর এক বিশেষ শ্রদ্ধাবোধ ছিল, যা নিচের কয়েকটি রেওয়ায়াতে প্রতিভাত হয়: (ক) আল্ শা’বী এবং আল্ হাসান থেকে ইবনে সা’দ বর্ণনা করেন যে, 
أنا عَلِيُّ بْنُ زَيْدٍ، عَنِ الْحَسَنِ،: بَقِيَ مِنْ بَيْتِ مَالِ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ شَيْءٌ بَعْدَمَا قَسَمَ  بَيْنَ النَّاسِ، فَقَالَ الْعَبَّاسُ لِعُمَرَ وَلِلنَّاسِ: أَرأَيْتُمْ لَوْ كَانَ فِيكُمْ عَمُّ مُوسَى أَكُنْتُمْ تُكْرِمُونَهُ؟ قَالُوا: نَعَمْ، قَالَ: فَأَنَا أَحَقُّ مِنْهُ، أَنَا عَمُّ نَبِيِّكُمْ، فَكَلَّمَ عُمَرُ النَّاسَ، فَأَعْطَوْهُ الْبَقِيَّةَ الَّتِي بَقِيَتْ “الخ.
 একদিন হযরত আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর খলীফা উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-কে কোনো এক কাজে প্রয়োজন হলে তিনি তাঁকে বলেন, “আমিরুল্ মো’মেনীন! ধরুন, মূসা  আলাইহিস সালামের চাচা আপনার কাছে মুসলমান হয়ে এসেছেন। আপনি তাঁর সাথে কেমন আচরণ করবেন? হযরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু উত্তরে বল্লেন, “আল্লাহর শপথ (কসম)! আমি তাঁর সাথে ভালো আচরণ করবো!” অতঃপর হযরত আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বল্লেন, “তাহলে আমি তো হলাম বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচা!” হযরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বল্লেন, “হে আবুল ফযল (হযরত আব্বাস রা:)! আপনি কী ধারণা করেন? আল্লাহর শপথ, আপনার পিতা (আব্দুল মোত্তালিব) আমার কাছে নিশ্চয় আমার আপন পিতার চেয়েও বেশি প্রিয়!” হযরত আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞেস করলেন, “আল্লাহর কসম?” হযরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু উত্তর দিলেন, “আল্লাহর শপথ! কেননা, আমি জানি আব্দুল মোত্তালিব মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আমার বাবার চেয়েও প্রিয়; তাই আমি আমার নিজস্ব পছন্দের চেয়ে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পছন্দকে বেশি ভালোবাসি।”
(খ) জনৈক ব্যক্তি একবার হযরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর উপস্থিতিতে হযরত আলী ইবনে আবি তালেব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর প্রতি মর্যাদাহানিকর কিছু কথা বলেছিল। এতে হযরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে বলেন, 
تَعْرِفُ صَاحِبَ هَذَا الْقَبْرِ؟ هُوَ مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ، وَعَلِيُّ بْنُ أَبِي طَالِبِ بْنِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ، فَلَا تَذْكُرْ عَلِيًّا إِلَّا بِخَيْرٍ، فَإِنَّكَ إِنْ أَبْغَضْتَهُ ” آذَيْتَ هَذَا فِي قَبْرِهِ.
 “তুমি জানো এই রওযায় কে শায়িত আছেন? উনি মুহাম্মদ ইবনে আব্দিল্লাহ্ ইবনে আব্দিল মোতালিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আর আলী (ক:) হলেন আবু তালেব ইবনে আব্দিল মোত্তালিবের পুত্র। অতএব হযরত আলী (ক:) সম্পর্কে কথা বলতে হলে ভালোভাবে বলবে, নইলে তুমি যদি তাঁর প্রতি বিদ্বেষভাব প্রকাশ করো, তবে এই রওযা পাকে যিনি শায়িত আছেন তাঁর অন্তরে তুমি আঘাত করবে।” এই রেওয়ায়াতটি নির্ভরযোগ্য সনদে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর ‘ফাযাইল আল্ সাহাবা’ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন (২:৬৪১ # ১০৮৯)।
(গ) ইমাম হুসাইন ইবনে আলী এবনে আবি তালেব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-কে ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে দেখে হযরত উমর ফারুক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে বলেন, 
أَنْتَ أَحَقُّ بِالإذْنِ مِنْ عَبْدِ اللهِ بْنُ عُمَرَ. إِنَّمَا أَنْتَ فِيْ رُؤُوْسِنَا مَا تَرَىْ: اللهُ، ثُمَّ أَنْتُمْ، وَوَضَعَ يَدَهُ عَلَى رَأْسِهِ.
 “এ ঘরে প্রবেশ করার অনুমতির ক্ষেত্রে আপনি (আমার ছেলে) আবদুল্লাহ্ ইবনে উমরের রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর চেয়েও বেশি হকদার! আপনি আমাদের কপালে (তকদীরে) যা লেখা হয়েছে তা দেখতে পান; অতএব, প্রথমে আল্লাহ্ তার পরে আপনি!” এই কথা বলার সময় হযরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ইমাম হোসাইনের রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর হাত মোবারক নিজ কপালে রাখেন। রেওয়ায়াতটি বর্ণনা করেছেন ইবনে সা’দ, ইবনে রাহুইয়া এবং আল্ খতীব।
(ঘ) হযরত জাবের রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন যে তিনি হযরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-কে মিম্বরে উঠে বলতে শুনেছেন, একজন তরুণীকে (হযরত আলী ও মা ফাতেমার কন্যা উম্মে কুলসুমকে) বিয়ে করার জন্যে আমাকে অপমান করো না, কেননা আমি হুজুর পূর নূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি – ‘শেষ বিচার দিবসে সকল উপায় বন্ধ হয়ে যাবে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক কাটা পড়বে, কেবল আমারটা ছাড়া’। এটি বর্ণনা করেছেন তাবারানী। ইমাম ইবনে হাজর হায়তামী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন যে এর বর্ণনাকারীরা হলেন আল্ বুখারী ও মুসলিমেরই বর্ণনাকারী।
ওই বিয়ের মাধ্যমে হযরত উমর ফারুক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আহল্ বা আত্মীয় হতে অভিলাষী হয়েছিলেন, যেহেতু আহলে বায়তের অগ্রাধিকার রয়েছে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শাফায়াতের ক্ষেত্রে।
(১০) এই শাফায়াত কোনোক্রমেই শুধু নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বা হযরত আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর দোয়া করা নয়, যা বাতিলপন্থীরা দাবি করছে বা আলোচ্য ঘটনার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করছে; বরং এই শাফায়াত ছিল তাঁদের যাত বা সত্তা মোবারক এবং দোয়ার মাধ্যমে, যা অসংখ্য বিবরণের মধ্য হতে নিম্নের কয়েকটিতে আক্ষরিকভাবে বলা হয়েছে:
(ক) হযরত ইবনে উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর ভাষ্যানুযায়ী মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যাত মোবারকের মাধ্যমে শাফায়াত: সহীহ্ বোখারী শরীফে আব্দুল্লাহ্ ইবনে দিনার রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
قَالَ: سَمِعْتُ ابْنَ عُمَرَ يَتَمَثَّلُ بِشِعْرِ أَبِي طَالِبٍ:  وَأَبْيَضَ يُسْتَسْقَى الغَمَامُ بِوَجْهِهِ … ثِمَالُ اليَتَامَى عِصْمَةٌ لِلْأَرَامِلِ»
 ‘আমি হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-কে আবু তালেবের কবিতা আবৃত্তি করতে শুনলাম – ‘শুভ্র সেই সত্তা যার চেহারা মোবারক দ্বারা মেঘমালা কামনা করা হয়; যিনি এতিম-অনাথদের লালন-পালনকারী ও বিধবাদের রক্ষক।’
উমর ইবনে হামযা বলেন, সেলিম তাঁর বাবা হযরত ইবনে উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর কথা উদ্ধৃত করেন যিনি বলেন, ‘মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বৃষ্টির জন্যে দোয়ারত অবস্থায় তাঁর চেহারা মোবারকের দিকে তাকিয়ে থাকার সময় কবির সেই দুটো পংক্তি আমার মনে পড়ে গিয়েছিল। আর তিনি (মিম্বর থেকে) নেমে আসেন নি, যতোক্ষণ না প্রতিটি ছাদ থেকে মুষলধারায় বৃষ্টিপাত হয়েছিল।’
কোনো এক বর্ণনাকারী ওই দুটি পংক্তিকে আবু তালেবের রচিত বলেছেন।
এখানে উল্লেখ্য যে, মোহাম্মদ মোহ্সিন খান বোখারী শরীফ (৩২:৬৫)-এর নিজস্ব ব্যাখ্যায় হাদীসের বাণী পরিবর্তন করে অর্থ লিখেছেন, ‘একজন শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তি যাঁকে বৃষ্টির জন্যে প্রার্থনা করতে অনুরোধ করা হয়েছিল।’ এখানে ‘যাঁর চেহারা মোবারক দ্বারা মেঘমালা কামনা করা হয়’ – বাক্যটি পরিবর্তিত হয়েছে। আর এটাই হলো তাহরিফ, অর্থাৎ, আল্ কুরআনের পরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী দলিলের বিকৃতি সাধন এবং বাক্-কসরতের মাধ্যমে ওর উদ্দেশ্যের মধ্যে বিচ্যুতি সৃষ্টি।
(খ) হযরত উমর ফারুক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর ভাষ্যানুযায়ী হযরত আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর যাত মোবারকের মাধ্যমে শাফায়াত প্রার্থনা: 
فَخَطَبَ عُمَرُ النَّاسَ فَقَالَ: أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَرَى لِلْعَبَّاسِ مَا يَرَى الْوَلَدُ لِلْوَالِدِ، وَيُعَظِّمُهُ وَيُفَخِّمُهُ فَاقْتَدُوا أَيُّهَا النَّاسُ بِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي عَمِّهِ الْعَبَّاسِ وَاتَّخِذُوهُ وَسِيلَةً إِلَى اللَّهِ فِيمَا نَزَلَ بِكُمْ
 “ওহে মানুষেরা! রাসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-কে তাঁর শ্রদ্ধেয় পিতার মতো বিবেচনা করতেন; তাঁকে সম্মান করতেন এবং তাঁর অধিকারকেও। অতএব, ওহে মানুষেরা, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচার সত্তা মোবারকের আকৃতিতে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হুকুম মান্য করো এবং হযরত আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-কে তোমাদের এই দুর্যোগের সময় মহাপরাক্রমশালী খোদা তা’লার দরবারে প্রার্থনাকালে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গ্রহণ করো!”
এই বর্ণনাটি হযরত উমর ফারুক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে আল্ বালাযিরী নির্ভরযোগ্য সনদে লিপিবদ্ধ করেছেন; আর দুর্বল সনদে ইবনে উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণনা করেছেন আল্ যুবায়র ইবনে বাক্কার নিজ ’আল্ ‘আনসাব’ পুস্তকে এবং ইবনে আসাকির তাঁর ‘তারিখে দিমাশক্’ গ্রন্থে (৮:৯৩২), যা ইমাম ইবনে হাজর রহমতুল্লাহি আলাইহি কর্তৃক প্রণীত ‘ফাত্হ’ পুস্তকে উদ্ধৃত হয়েছে (১৯৫৯ সংস্করণ, ২:৪৯৭)। শায়খ মাহমুদ মামদুহ্ তাঁর ‘রাফ’আল মিনারা’ (১২০ পৃষ্ঠা) গ্রন্থে আল্ আলবানীর ‘তাওয়াসসুল’ পুস্তকে উত্থাপিত দাবির খন্ডন করেছেন এই মর্মে যে, ওই পুস্তকের ৬৭-৬৮ পৃষ্ঠায় আলোচ্য রেওয়ায়াতটিকে ‘মুদতারিব’ বা তালগোল পাকানো বলাটা এক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
আপত্তি:
শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ্ তাঁর প্রণীত আল্ বালাগ-উল-মুবীন বইয়ে লিখেছেন যে, পরলোকগত কারো শাফায়াত কামনা কিংবা অনুপস্থিত কারো তাওয়াসসুলকে খলীফা উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু জায়েয মনে করেন নি।
জবাব:
এই বক্তব্য শাহ্ ওযালিউল্লাহর লিখিত ফুয়ুয-উল-হারামাইন গ্রন্থে প্রদত্ত অভিমতের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এর ব্যাখ্যায় শুধু এতটুকুই বলা যায়, শাহ্ ওয়ালিউল্লাহর অনেক বইপত্র বাতেলপন্থীদের হাতে বিকৃত হয়েছে।
এ কথা সর্বজন জ্ঞাত যে, বিভিন্ন প্রাণী ও কীট-পতঙ্গ নিজেরাই বৃষ্টির জন্যে প্রার্থনা করে থাকে, যেভাবে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পিঁপড়া সংক্রান্ত হাদীসটি বর্ণনা করেছে। এই হাদীস্ রেওয়ায়াত করেছেন হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে দারু কুতনী, তাঁর ছাত্র আল্ হাকিম ও নিম্নবর্ণিত হাদীসবেত্তাগণ: ইবনে আবি শায়বা (৬:৬২, ৭:৭১), আবু আল শায়খ তাঁর আল্ আযামা পুস্তকে (৫:১৫৭২), তফসীরে ইবনে কাসীর (৩:৩৬০), ইমাম ইবনে হাজর তাঁর তালাখিস্ ও আল্ হাবীর গ্রন্থ দু’টোতে (২:৯৭ # ৭১৮), ইবনে আল্ মুলাক্কিন স্বরচিত খোলাসাতুল বদর বইয়ে (১:২৫০), আল্ সান’আনী নিজ সুবুলুস্ সালাম গ্রন্থে (২:৮৩), আলা শওকানী স্বরচিত নায়ল্ আল্ আওতার পুস্তকে (৪:২৭), এবং থানভী নিজ “ইলা আল্ সুনান” বইয়ে (৪:১৯৩)।
এস্তেস্কা তথা বৃষ্টির জন্যে নামাযের সময় আমাদের প্রতি সুন্নাহের বিধান হলো গবাদি ও উট-ঘোড়া ইত্যাদি পশুগুলোকেও খোলা ময়দানে বের করে আনতে হবে। কেননা, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন- “(যাকাত প্রদান থেকে বিরত) ব্যক্তিদের প্রতি বৃষ্টি মঞ্জুর করা হতো না, যদি না গবাদি পশুরা থাকতো।” এ হাদীস বর্ণনা করেছেন ইবনে মাজাহ্ রহমতুল্লাহি আলাইহি। অন্যত্র তিনি এরশাদ ফরমান- “চরে খাওয়া গবাদি পশু না হলে তোমাদের প্রতি আক্ষরিক অর্থেই শাস্তি নেমে আসতো।” এ হাদীস্ রেওয়াযাত করেছেন আবু ইয়ালা, আল্ বাযযার এবং অন্যান্যরা।
এখন আমাদের জিজ্ঞাস্য, গবাদ পশুর মধ্যস্থতা মেনে নেয়া যায়, অথচ আমাদের প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শাফায়াত/ তাওয়াসসুল মানা যায় না কেন? এ কেমন আচরণ?
প্রকৃত বিষয় হলো, খলীফা উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু কখনোই এ কথা মনে করেন নি যে আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘মরে’ গিয়েছেন বা অনুপস্থিত আছেন। নইলে তিনি কেন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও হযরত আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-কে তাঁদের রওযা পাকে নিম্নে বর্ণিত ঘটনায় সম্ভাষণ জানিয়েছিলেন, যা বিশ্বাসভাজন বর্ণনাকারীদের বরাত দিয়ে রেওয়ায়াত করেছেন তাবারানী রহমতুল্লাহি আলাইহি? আর কেনই বা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও হযরত আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর রওযার পাশে সমাহিত হওয়ার আকুতির চেয়ে তাঁর কাছে ‘অন্য কোনো কিছু এতোটা গুরুত্বপূর্ণ নয়’ বলেছিলেন তিনি, যা সহীহ্ বুখারী শরীফে বর্ণিত হয়েছে?
কায়স্ ইবনে আবি হাযেম বর্ণনা করেন যে, একদিন খলীফা উমর ফারুক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু মদীনায় অবস্থিত মসজিদে নব্বীর মিম্বরে উঠে মানুষদের উদ্দেশ্যে ফরমান: 
عَنْ قَيْسِ بْنِ أَبِي حَازِمٍ، قَالَ: خَطَبَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ النَّاسَ ذَاتَ يَوْمٍ عَلَى مِنْبَرِ الْمَدِينَةِ، فَقَالَ فِي خِطْبَتِهِ: «إِنَّ فِي جَنَّاتِ عَدْنٍ قَصْرًا لَهُ خَمْسُمَائةِ بَابٍ، عَلَى كُلِّ بَابٍ خَمْسَةُ آلَافٍ مِنَ الْحُورِ الْعِينِ، لَا يَدْخُلُهُ إِلَّا نَبِيٌّ، ثُمَّ نَظَرَ إِلَى قَبْرِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: هَنِيئًا لَكَ يَا صَاحِبَ الْقَبْرِ، ثُمَّ قَالَ: أَوْ صِدِّيقٌ، ثُمَّ الْتَفَتَ إِلَى قَبْرِ أَبِي بَكْرٍ، فَقَالَ: هَنِيئًا لَكَ يَا أَبَا بَكْرٍ، ثُمَّ قَالَ: أَوْ شَهِيدٌ، ثُمَّ أَقْبَلَ عَلَى نَفْسِهِ، فَقَالَ: وَأَنَّى لَكَ الشَّهَادَةُ يَا عُمَرُ، ثُمَّ قَالَ: إِنَّ الَّذِي أَخْرَجَنِي مِنْ مَكَّةَ إِلَى هِجْرَةِ الْمَدِينَةِ لَقَادِرٌ أَنْ يَسُوقَ إِلَيَّ الشَّهَادَةَ
“নিশ্চয় আ’দন-এর বাগানে (বেহেস্তে) একটি প্রাসাদ আছে যার ৫’শটি দরজা; প্রতিটি দরজায় ৫ হাজার বেহেস্তী হুর দায়িত্বরত; কেউই ওতে প্রবেশ করতে পারবে না একজন নবী ছাড়া।” অতঃপর তিনি বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রওযা মোবারকের দিকে ফিরে আরয করলেন, “আপনাকে অভিনন্দন, হে রওযা মোবারকে শায়িত নবী” সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! এর পর তিনি আবার বল্লেন, “এবং কেউই ওতে প্রবেশ করতে পারবে না একজন সিদ্দীক (সত্যনিষ্ঠ) ছাড়া।” এ কথা বলে তিনি হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর রওযা পাকের দিকে ফিরে সম্ভাষণ জানালেন, “আপনাকে মোবারকবাদ, হে আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু।” অতঃপর হযরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ফরমালেন, “এবং কেউই ওতে প্রবেশ করতে পারবে না একজন শহীদ (ধর্মযুদ্ধে নিহত) ছাড়া।” এ কথা বলে তিনি নিজের দিকে ইশারা করলেন এবং আপনাআপনি নিজেকে প্রশ্ন করলেন স্বাভাবিক কণ্ঠস্বরে, “ওহে উমর, কবে তুমি শাহাদাত বরণ করলে”?    অতঃপর তিনি আপনাআপনিই বল্লেন, “যিনি আমাকে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের জন্যে বের করে এনেছেন, তিনিই আমাকে শাহাদাত এনে দেবেন।”
তাবারানী রহমতুল্লাহি আলাইহি নির্ভরযোগ্য রেওয়ায়াতকারীদের বরাত দিয়ে এ বর্ণনাটি লিপিবদ্ধ করেছেন তাঁর ‘আল্ আওসাত’ পুস্তকে যা ইমাম ইবনে হাজর হয়তামী রহমতুল্লাহি আলাইহি উদ্ধৃত করেছেন তাঁর প্রণীত ’মজমাউল জাওয়াইদ’ গ্রন্থে (৯:৫৪-৫৫)।
প্রশ্ন: আহনাফ তথা (পূর্ববর্তী) বুযুর্গ আলেম-উলামাবৃন্দ কি মনে করেন যে খলীফা উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এ বিষয়ে এজতেহাদ (গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্ত) প্রয়োগ করেছিলেন? আর আহনাফ কি তাঁর সাথে ভিন্নমত পোষণ করেছিলেন এ ব্যাপারে?  অনুগ্রহ করে ব্যাখ্যা করুন।
জবাব: খলীফা উমর ফারুক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর এই কাজ (তাওয়াসসুল) মূলতঃ সুন্নাহ্ হিসেবে পরিগণিত। যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেয়া হয় যে তা মৌলিক সুন্নাহ্ নয়, তথাপি এই মহান ধর্মে খুলাফায়ে রাশেদীনের (খলীফাবৃন্দের) ইজতেহাদও সুন্নাহের বৈধ দলিল হিসেবে গৃহীত, যার সাথে কোনো মযহাবেরই ভিন্নমত পোষণ করার অধিকার নেই। বস্তুতঃ আহনাফ কখনোই খলীফার সাথে কোনো বিষয়েই দ্বিমত পোষণ করেন নি, যদিও তা মনগড়াভাবে প্রমাণ করতে অপতৎপর হয়েছে আহলে বেদআত তথা বেদআতীরা।
[ডঃ হাদ্দাদের এই লেখাটি http://www.livingislam.org থেকে অনূদিত হয়েছে।]
রেফারেন্স :
[১].বুখারী : আস সহীহ, বাবু সুওয়ালিন নাসি ইমামিল ইসতিসকা, ২:২৭, হাদীস নং ১০১০।
ক.  বাগাবী : শরহুস সুন্নাহ, বাবুল ইসতিসকা লি আহলিস সালাহ, ৪:৪০৯ হাদীস নং ১১৬৫।
খ. বায়হাকী : দালায়িলুন নবুওয়াত, ৬:১৪৮।
[২]. সুয়ূতি : তারিখুল খুলাফা, আল খলিফাতুস সানি উমর ইবনুল খাত্তাব, ১:১০৬।
[৩] ইবন হাজর আসকালানী : ফাতহুল বারী শরহু বুখারী, ২:৪৯৭।
[৪] আহমদ : আল মুসনাদ, ৪:১৩৮, হাদীস নং ১৭২৭৯।
ক. নাসায়ী : আস সুনানুল কুবরা, ৯:২৪৪ হাদীস নং ১০৪২০।
খ. ইবনে খুযামা : আস সহীহ, ২:২২৫ হাদীস নং ১২১৯।
গ. তিরমিযী : আস সুনান, ১৩:১২৪ হাদীস নং ৩৯২৭।
[৫] ফাতহুল বারী : শরহু বুখারী, ৫:১২৭।
ক. বায়হাকী : দালায়িলুন নবুওয়াত, ৬:১৪১।
খ. ইবনে কাছির : আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৬:৯৯।