ব্লগ সংরক্ষাণাগার

বুধবার, ৩ মে, ২০১৭

আলবানীর খণ্ডনে শায়খ গোমারীর পত্র


মূল: শায়খ আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আল-সিদ্দীক্ব আল-গোমারী
ইংরেজি অনুবাদ ও টীকা: মুহাম্মদ উইলিয়াম চার্লস্
অতিরিক্ত টীকা: শায়খ আবূল হাসান
বাংলা ভাষান্তর: কাজী সাইফুদ্দীন হোসেন
আরবী ও অনলাইন সেট-আপ: রুবাইয়েৎ বিন মূসা

[তাওয়াসসুল ও অভাবগ্রস্ত ব্যক্তিসম্পর্কিত হাদীস]

[Epistle in Refutation of Albani released online by www.marifah.net]


মহান আল্লাহর (করুণাপূর্ণ) নামে আরম্ভ, যিনি অতি দয়াময় ও অনুগ্রহশীল।

সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজগতের অধিপতি আল্লাহতা’লারই প্রাপ্য। উত্তম পরিণতি হবে তাঁদেরই যাঁরা খোদাভীরু। যারা সীমালঙ্ঘন করে থাকে তাদের সাথেই কেবল বৈরিতা বিহিত। আমি সালাত ও সালাম জানাই আমাদের আকা ও মওলা হযরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের প্রতি এবং তাঁরই মহৎ পরিবার সদস্যদের (আহলে বায়ত) প্রতিও। আল্লাহ তা’লা হুযূর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবাবৃন্দ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম ও তাঁদের অনুসারীদের প্রতি সন্তুষ্ট হোন (আমীন)।

মূল আলোচনায় উপনীত হয়ে আমি ঘোষণা করছি যে, শায়খ আলবানী, আল্লাহ মাফ করুন, এমন এক ব্যক্তি যিনি দুরভিসন্ধি ও আপন খায়েশ দ্বারা পরিচালিত। তিনি কোনো হাদীস [১] কিংবা ‘আসার’ [২] যেটা তার উদ্দেশ্যের পরিপন্থী, সেটা দেখামাত্রই যয়ীফ বা দুর্বল বলে নাকচ করে থাকেন। ধূর্ততা ও ধোকাবাজির সাহায্যে তিনি তার পাঠকদের বুঝিয়ে থাকেন যে তিনি-ই সঠিক; অথচ তিনি নেহায়েত ভ্রান্ত, বরঞ্চ পাপিষ্ঠ ও প্রতারক। এ ধরনের দ্বৈততা দ্বারা তিনি তার অনুসারীবর্গ, যারা তার প্রতি আস্থা রাখেন এবং তাকে সঠিক মনে করেন, তাদেরকে বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। তার দ্বারা বিভ্রান্তদের একজন হলেন হামদী সালাফী, যিনি ‘আল-মু’জাম আল-কবীর’ [৩] গ্রন্থটি সম্পাদনা করেছেন। এই হামদী সালাফীও একটি সহীহ হাদীসকে যয়ীফ বলার দুঃসাহস দেখিয়েছেন, কেননা তা তার গোষ্ঠীগত মতবাদের সাথে মিলেনি, ঠিক যেমনি তা তার শায়খের (মানে আলবানীর) লক্ষ্যের সাথেও মিলেনি। এর প্রমাণ হলো এই যে, হামদী সালাফী আহাদীসের দুর্বলতা সম্পর্কে যা বলেন, তা হুবহু তার শায়খেরই বক্তব্য।

এমতাবস্থায় আমি সত্য প্রকাশ এবং প্রতারক (আলবানী) ও প্রতারিত (হামদী) উভয়ের মিথ্যে দাবি খণ্ডনের আশা পোষণ করছি।

আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করছি যে আল্লাহ ছাড়া কারো ওপর আমি নির্ভর করি না; তিনি-ই আমার সহায় এবং আমি তাঁরই প্রতি সমর্পিত।

ইমাম তাবারানী রহমতুল্লাহি আলাইহি নিজ ‘মু’জাম আল-কবীর’ (৯:১৭) গ্রন্থে বর্ণনা করেন,
حَدَّثَنَا ابْنُ وَهْبٍ، عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْمَكِّيِّ، عَنْ رَوْحِ بْنِ الْقَاسِمِ، عَنْ أَبِي جَعْفَرٍ الْخَطْمِيِّ الْمَدَنِيِّ، عَنْ أَبِي أُمَامَةَ بْنِ سَهْلِ بْنِ حُنَيْفٍ، عَنْ عَمِّهِ عُثْمَانَ بْنِ حُنَيْفٍ: أَنَّ رَجُلًا، كَانَ يَخْتَلِفُ إِلَى عُثْمَانَ بْنِ عَفَّانَ رَضِي اللهُ عَنْهُ فِي حَاجَةٍ لَهُ، فَكَانَ عُثْمَانُ لَا يَلْتَفِتُ إِلَيْهِ وَلَا يَنْظُرُ فِي حَاجَتِهِ، فَلَقِيَ ابْنَ حُنَيْفٍ فَشَكَى ذَلِكَ إِلَيْهِ، فَقَالَ لَهُ عُثْمَانُ بْنُ حُنَيْفٍ: " ائْتِ الْمِيضَأَةَ فَتَوَضَّأْ، ثُمَّ ائْتِ الْمَسْجِدَ فَصَلِّ فِيهِ رَكْعَتَيْنِ، ثُمَّ قُلْ: اللهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ وَأَتَوَجَّهُ إِلَيْكَ بِنَبِيِّنَا مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَبِيِّ الرَّحْمَةِ، يَا مُحَمَّدُ إِنِّي أَتَوَجَّهُ بِكَ إِلَى رَبِّي فَتَقْضِي لِي حَاجَتِي وَتُذَكُرُ حَاجَتَكَ " وَرُحْ حَتَّى أَرْوَحَ مَعَكَ، فَانْطَلَقَ الرَّجُلُ فَصَنَعَ مَا قَالَ لَهُ، ثُمَّ أَتَى بَابَ عُثْمَانَ بْنِ عَفَّانَ رَضِي اللهُ عَنْهُ، فَجَاءَ الْبَوَّابُ حَتَّى أَخَذَ بِيَدِهِ فَأَدْخَلَهُ عَلَى عُثْمَانَ بْنِ عَفَّانَ رَضِي اللهُ عَنْهُ، فَأَجْلَسَهُ مَعَهُ عَلَى الطِّنْفِسَةِ، فَقَالَ: حَاجَتُكَ؟ فَذَكَرَ حَاجَتَهُ وَقَضَاهَا لَهُ، ثُمَّ قَالَ لَهُ: مَا ذَكَرْتُ حَاجَتَكَ حَتَّى كَانَ السَّاعَةُ، وَقَالَ: مَا كَانَتْ لَكَ مِنْ حَاجَةٍ فَأَذْكُرُهَا، ثُمَّ إِنَّ الرَّجُلَ خَرَجَ مِنْ عِنْدِهِ فَلَقِيَ عُثْمَانَ بْنَ حُنَيْفٍ، فَقَالَ لَهُ: جَزَاكَ اللهُ خَيْرًا مَا كَانَ يَنْظُرُ فِي حَاجَتِي وَلَا يَلْتَفِتُ إِلَيَّ حَتَّى كَلَّمْتَهُ فِيَّ، فَقَالَ عُثْمَانُ بْنُ حُنَيْفٍ: وَاللهِ مَا كَلَّمْتُهُ، وَلَكِنِّي شَهِدْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَتَاهُ ضَرِيرٌ فَشَكَى إِلَيْهِ ذَهَابَ بَصَرِهِ، فَقَالَ لَهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «فَتَصَبَّرْ» فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللهِ، لَيْسَ لِي قَائِدٌ وَقَدْ شَقَّ عَلَيَّ، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «ائْتِ الْمِيضَأَةَ فَتَوَضَّأْ، ثُمَّ صَلِّ رَكْعَتَيْنِ، ثُمَّ ادْعُ بِهَذِهِ الدَّعَوَاتِ» قَالَ ابْنُ حُنَيْفٍ: فَوَاللهِ مَا تَفَرَّقْنَا وَطَالَ بِنَا الْحَدِيثُ حَتَّى دَخَلَ عَلَيْنَا الرَّجُلُ كَأَنَّهُ لَمْ يَكُنْ بِهِ ضُرٌّ قَطُّ حَدَّثَنَا إِدْرِيسُ بْنُ جَعْفَرٍ الْعَطَّارُ، ثنا عُثْمَانُ بْنُ عُمَرَ بْنِ فَارِسٍ، ثنا شُعْبَةُ، عَنْ أَبِي جَعْفَرٍ الْخَطْمِيُّ، عَنْ أَبِي أُمَامَةَ بْنِ سَهْلِ بْنِ حُنَيْفٍ، عَنْ عَمِّهِ عُثْمَانَ بْنِ حُنَيْفٍ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، نَحْوَهُ.
  • ইবনে ওয়াহব হতে, তিনি শাবীব হতে, তিনি রওহ ইবনে আল-ক্বাসিম হতে, তিনি আবূ জা’ফর আল-খাতামী আল-মাদানী হতে, তিনি আবূ উমামা ইবনে সাহল ইবনে হুনাইফ হতে, তিনি উসমান ইবনে হুনাইফ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে এই মর্মে যে, জনৈক ব্যক্তি খলীফা হযরত উসমান ইবনে আফফান [৪] রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু’র কাছে নিজের কোনো প্রয়োজন পূরণের জন্যে গিয়েছিলেন। কিন্তু খলীফা তাঁর কথা শুনেননি, তাঁর প্রয়োজন-ও পূরণ করেননি। ওই ব্যক্তি হযরত উসমান ইবনে হুনাইফ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে গিয়ে এ ব্যাপারে আরয করেন। হযরত উসমান ইবনে হুনাইফ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে বলেন, “যাও, ওযূ করো! অতঃপর মসজিদে (নববীতে)গিয়ে দুই রাক’আত (নফল) নামায পড়ো এবং আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করো এই বলে: ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে চাই আপনারই নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের মধ্যস্থতায়, যিনি রহমতের পয়গম্বর। এয়া মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম! আমি আমার প্রভুর শরণাপন্ন হলাম আপনারই মধ্যস্থতায়, যাতে আমার প্রয়োজন পূরণ হয়’ - এ দোয়া পাঠের পর তোমার প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করবে। এরপর আমার কাছে এসো, যাতে আমিও তোমার সাথে যেতে পারি (খলীফার দরবারে)।”

    অতঃপর ওই ব্যক্তি চলে যান এবং যা তাঁকে বলা হয়েছিল তা সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি খলীফা উসমান ইবনে আফফান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর (দরবারের) দরজায় উপস্থিত হলে দ্বাররক্ষী তাঁকে হাত ধরে খলীফার সামনে নিয়ে উপস্থিত করেন। খলীফা নিজের মাদুর বিছিয়ে তাতে ওই ব্যক্তির পাশে বসেন এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, “আমি আপনার জন্যে কী করতে পারি?” তিনি খলীফাকে নিজের প্রয়োজনের কথা জানালে তিনি তা পূরণ করে দেন। অতঃপর খলীফা তাঁকে বলেন, “আমি এতোক্ষণ পর্যন্ত আপনার সমস্যার কথা মনে করতে পারিনি। আপনার কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে আমার কাছে আসবেন।” ওই ব্যক্তি এরপর খলীফার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হযরত উসমান ইবনে হুনাইফ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে যান এবং তাঁকে বলেন, “আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুন। খলীফা উসমান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু আমার দিকে তাকাননি, ফরিয়াদের শুনানিও দেননি, যতোক্ষণ না আপনি তাঁকে আমার ব্যাপারে সুপারিশ করেছেন।” হযরত উসমান ইবনে হুনাইফ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “আমি আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, আমি তাঁর কাছে সুপারিশ করিনি।”

    “আসলে আমি এক অন্ধ ব্যক্তিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-এর কাছে এসে নিজ অন্ধত্বের ব্যাপারে ফরিয়াদ করতে দেখেছিলাম। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম তাঁকে বলেন, ’তুমি কি ধৈর্য ধরতে পারো না?’ অন্ধ ব্যক্তি উত্তরে বলেন, ’এয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম! আমাকে পথ দেখাবার কেউ নেই এবং এটা আমার জন্যে কষ্টদায়ক হয়ে গিয়েছে।’ এমতাবস্থায় হুযূর পূর নূর সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম ফরমান, ’যাও, ওযূ করো। অতঃপর দুই রাকআত (নফল) নামায আদায় করে এই দোয়াটি (ওপরোক্ত দোয়াটি) পাঠ করো।’ আমি (উসমান ইবনে হুনাইফ) আল্লাহর নামে কসম করে বলছি, আমরা স্থান ত্যাগ করিনি, দীর্ঘক্ষণ আলাপও করিনি, যখন ওই ব্যক্তি ফিরে আসেন এমন অবস্থায় যেন তিনি কখনো কোনো কষ্টে ছিলেন না (মানে অন্ধত্ব দ্বারা আক্রান্ত ছিলেন না)।” [৫]
  • ইমাম তাবারানী রহমতুল্লাহি আলাইহি ওপরের এই রওয়ায়াতটিকে সহীহ ঘোষণা করেছেন [৬] অথচ হামদী সালাফী তাঁর সাথে দ্বিমত পোষণ করে বলেন:

    “এই হাদীসে অন্ধ ব্যক্তিটির বিবরণসম্বলিত অংশের ব্যাপারে কোনো সন্দেহ-ই নেই। তবে সন্দেহ ঘটনার প্রথম অংশে (যেখানে সাহাবী উসমান ইবনে হুনাইফ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু’র কাছে অভাবী ব্যক্তিটি সাহায্য চেয়েছিলেন), যেটা বেদআতী গোষ্ঠী (মানে সুন্নীবৃন্দ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-কে আহ্বান করার বেদআতী প্রথার বৈধতা দানের চেষ্টায় প্রয়োগ করে থাকে। [এই সন্দেহের কারণগুলো আমরা পরে ব্যাখ্যা করবো] [৭]
 “প্রথমতঃ ইমাম তাবারানী রহমতুল্লাহি আলাইহি উল্লেখ করেছেন যে (বর্ণনাকারীদের সনদ বা পরম্পরায়) শাবীব-ই একমাত্র ব্যক্তি যিনি এ হাদীসটি বর্ণনা করেন।

“আবার শাবীবের বর্ণনাগুলো মন্দ নয় (লা বা’আসা বিহী) যদি তা হয় দুটি শর্তের অধীন: ১/ তাঁর পুত্র আহমদ যদি তাঁর থেকে রওয়ায়াত করেন; এবং ২/ শাবীব যদি ইঊনুস ইবনে এয়াযীদ হতে হাদীস বর্ণনা করেন। তবে বর্তমান ক্ষেত্রে শাবীবের এ রওয়ায়াত তিনজন হতে এসেছে: ইবনে ওয়াহব এবং শাবীবের দুই পুত্র ইসমাঈল ও আহমদ।

“ইবনে ওয়াহবের বেলায় বলা চলে যে সিক্বা (তথা অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য হাদীস বর্ণনাকারী)-মণ্ডলী শাবীব হতে গৃহীত ইবনে ওয়াহবের রওয়ায়াতগুলোর সমালোচনা করেছেন, ঠিক যেমনটি তাঁরা করেছেন খোদ শাবীবকেই। আর শাবীবের পুত্র ইসমাঈল একজন অপরিচিত ব্যক্তি।

“যদিও ইমাম আহমদ রহমতুল্লাহি আলাইহি-ও এই হাদীসখানি শাবীব হতে বর্ণনা করেছেন, তবুও এটা ইঊনুস ইবনে এয়াযীদ হতে বর্ণিত নয় [যেটা হামদী সালাফীর মতে শাবীবের রওয়ায়াতগুলোর গ্রহণযোগ্যতার জন্যে হাদীসশাস্ত্র বিশারদদের আরোপিত একটি শর্ত]।

“উপরন্তু, আহমদ ইবনে শাবীবের বর্ণিত এ হাদীসের মতন বা মূল লিপির ব্যাপারে মুহাদ্দেসীনের মধ্যে মতপার্থক্য বিদ্যমান।

“ইবনে আল-সুন্নী এ হাদীসটি নিজ ‘আমল আল-এয়াওম ওয়াল-লায়লাহ’ পুস্তকে এবং হাকিম তিনটি ভিন্ন ভিন্ন সনদে বর্ণনা করেছেন, কিন্তু ওগুলোর কোনোটাতেই হযরত উসমান ইবনে হুনাইফ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু অথবা খলীফা উসমান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর দর্শনপ্রার্থী ব্যক্তিটির উল্লেখ নেই।

“আল-হাকিম এ হাদীসটি রাওহ ইবনে আল-ক্বাসিম হতে ‘আওন ইবনে ‘আমারা আল-বসরীর এসনাদে বর্ণনা করেছেন।

“আমার শায়খ মুহাম্মদ নাসিরুদ্দীন আলবানী বলেন, ‘যদিও আওন বর্ণনাকারী হিসেবে দঈফ তথা দুর্বল, তথাপিও (উসমান ইবনে হুনাইফের ঘটনা ব্যতিরেকে) তাঁর বর্ণিত হাদীসটি শাবীবের বর্ণনা হতে শ্রেয়তর, কেননা রাওহ’র বর্ণনাটি আবূ জা’ফর আল-খাতমীর (উসমান ইবনে হুনাইফের ঘটনাবিহীন বর্ণনার) সূত্রে শু’বাহ ও হাম্মাদ ইবনে সালামাহ’র বর্ণনাগুলোর সাথে মিলে যায়।’” [হামদী সালাফী]      

হামদী সালাফীর ওপরে উদ্ধৃত বক্তব্যটি বিভ্রান্তিকর এবং বিভিন্ন দিক থেকে বিকৃত ব্যাখ্যা বটে। এটা তারই শায়খ আলবানী কর্তৃক নিজ ‘আল-তাওয়াসসুল’ পুস্তকের ৮৮ পৃষ্ঠায় প্রদত্ত বক্তব্যের চর্বিত চর্বণ ছাড়া কিছু নয়।

প্রামাণ্য দলিল - ১

হযরত উসমান ইবনে হুনাইফ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ও খলীফা উসমান ইবনে আফফান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর দর্শনপ্রার্থী ব্যক্তির ঘটনাটি ইমাম বায়হাক্বী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর ‘দালা’ইল আল-নুবুওয়াহ’ গ্রন্থের ৬ষ্ঠ খণ্ডের ১৬৭-১৬৮ পৃষ্ঠায় বর্ণনা করেছেন নিম্নবর্ণিত এসনাদসহ:
حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ شَبِيبِ بْنِ سَعِيدٍ الْحَبَطِيُّ، قَالَ: حَدَّثَنِي أَبِي، عَنْ رَوْحِ بْنِ الْقَاسِمِ، عَنْ أَبِي جَعْفَرٍ الْمَدِينِيِّ وَهُوَ الْخَطْمِيُّ، عَنْ أَبِي أُمَامَةَ بْنِ سَهْلِ بْنِ حُنَيْفٍ، عَنْ عَمِّهِ، عُثْمَانَ بْنِ حُنَيْفٍ، قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَجَاءَهُ رَجُلٌ ضَرِيرٌ فَشَكَا إِلَيْهِ ذَهَابَ بَصَرِهِ، فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللهِ لَيْسَ لِي قَائِدٌ وَقَدْ شَقَّ عَلَيَّ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " ائْتِ الْمِيضَأَةَ فَتَوَضَّأْ، ثُمَّ صَلِّ رَكْعَتَيْنِ، ثُمَّ قُلْ: اللهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ وَأَتَوَجَّهُ إِلَيْكَ بِنَبِيِّكَ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَبِيِّ الرَّحْمَةِ، يَا مُحَمَّدُ، إِنِّي أَتَوَجَّهُ بِكَ إِلَى رَبِّي فَيُجَلِّي لِي بَصَرِي، اللهُمَّ شَفِّعْهُ فِيَّ وَشَفِّعْنِي فِي نَفْسِي "، قَالَ عُثْمَانُ: فَوَاللهِ مَا تَفَرَّقْنَا وَلَا طَالَ الْحَدِيثُ حَتَّى دَخَلَ الرَّجُلُ وَكَأَنَّهُ لَمْ يَكُنْ بِهِ ضُرٌّ قَطُّ.
- এয়াক্বূব ইবনে সুফইয়া’ন বলেন, আহমদ ইবনে শাবীব ইবনে সাঈদ আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে তাঁর পিতা তাঁকে জানিয়েছেন রাওহ ইবনে আল-ক্বাসিম হতে, তিনি আবূ জা’ফর আল-খাতামী হতে, তিনি আবূ উসামাহ ইবনে সাহল ইবনে হুনাইফ হতে এই মর্মে যে, জনৈক ব্যক্তি খলীফা উসমান ইবনে আফফান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর দর্শনপ্রার্থী হন; আর তিনি (আবূ উসামাহ) পুরো ঘটনাটির (আনুপূর্বিক) বিবরণ দেন।

এয়াক্বূব ইবনে সুফইয়া’ন হলেন (আবূ ইঊসুফ) আল-ফাসা’বী [৮]; তিনি একাধারে ছিলেন হাফেয [৯], ইমাম [১০]আল-সিক্বা [১১] , বরঞ্চ সিক্বার চেয়েও উত্তম এক আলেম।

এই হাদীসের সনদ একদম নির্ভরযোগ্য/সহীহ [১২]। অতএব, হযরত উসমান ইবনে হুনাইফ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর ঘটনাটি সম্পূর্ণ সত্য। অন্যান্য হাদীসবেত্তামণ্ডলীও হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। হাফেয আল-মুনযিরী রহমতুল্লাহি আলাইহি এটাকে তাঁর ‘আল-তারগিব আল-তারহিব’ পুস্তকের ২য় খণ্ডের ৬০৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন; আর ইমাম ইবনে হাজর হায়তামী মক্কী রহমতুল্লাহি আলাইহি উদ্ধৃত করেন নিজ ‘মজমা’ আল-ক্বাওয়াঈদ’ গ্রন্থের ২য় খণ্ডের ১৭৯ পৃষ্ঠায়।[১৩]

প্রামাণ্য দলিল - ২

আহমদ ইবনে শাবীব এমন এক রাবী যাঁর ওপর ইমাম বুখারী রহমতুল্লাহি আলাইহি নির্ভর করতেন। তিনি ইবনে শাবীব হতে হাদীস বর্ণনা করেছেন নিজ ’সহীহ’ ও ‘আল-আদাব আল-মুফরাদ’ উভয় পুস্তকেই। আবূ হাতেম আল-রাযী-ও তাঁকে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য (সিক্বা) ঘোষণা করেন; আর তিনি এবং আবূ যুর’আ তাঁর কাছ থেকে হাদীস লিখে সংকলন করতেন। ইবনে ‘আদী উল্লেখ করেন যে قال علي : وقد كتبها عن ابنه أحمد بن شبيب. বসরাবাসী হাদীসবিদবৃন্দ তাঁকে সিক্বা বিবেচনা করতেন এবং আলী আল-মাদিনী তাঁর কাছ থেকে হাদীস লিখে নিতেন।

আহমদের পিতা শাবীব ইবনে সাঈদ আল-তামিমী আল-হাবাতী আল-বসরী-ও ছিলেন এমন হাদীস বর্ণনাকারী, যাঁর ওপর ইমাম বুখারী রহমতুল্লাহি আলাইহি নিজ ‘সহীহ’ ও ‘আল-আদাব আল-মুফরাদ’ উভয় গ্রন্থের ক্ষেত্রে নির্ভর করতেন।

শাবীবকে সিক্বা বিবেচনাকারী হাদীসবেত্তাদের মধ্যে রয়েছেন আবূ যুর’আ, আবূ হাতেম, আল-নাসাঈ, আল-যুহালী, আল-দারাক্বুতনী এবং আল-তাবারানী।[১৪]

আবূ হাতেম বর্ণনা করেন যে শাবীব নিজের কাছে ইঊনুস ইবনে এয়াযীদের বইপত্র গচ্ছিত রাখতেন এবং আরো বলেন যে তিনি (শাবীব) হাদীসশাস্ত্রে সালেহ তথা নির্ভরযোগ্য ছিলেন, আর তার মধ্যে কোনো ভুল-ভ্রান্তি ছিল না
)।لأ بَأسَ بِهَا(

ইবনে আদী বলেন,
سمعت علي بن المديني يقول : شبيب بن سَعِيد بصري ثقة ، كان من أصحاب يُونُس ، كان يختلف في تجارة إلى مصر ، وكتابه كتاب صحيح ، قال علي : وقد كتبها عن ابنه أحمد بن شبيب.
  • “শাবীবের কাছে আল-যুহরী’র বইয়ের একটি কপি ছিল। আল-যুহরী হতে ইঊনুস বর্ণিত অনেক হাদীস তাঁর কাছে গচ্ছিত ছিল।” [১৫] (আলী) ইবনে আল-মাদিনী বর্ণনাকারী শাবীব সম্পর্কে বলেন, “তিনি একদম নির্ভরযোগ্য (সিক্বা)। ব্যবসার উদ্দেশে তিনি মিসরে ভ্রমণ করতেন। তাঁর বইটি প্রামাণিক/খাঁটি (সহীহ)।” [১৬]

    ওপরের আলোচনা শাবীবের তা’দিল তথা প্রামাণিকতার বিবরণ দিয়েছে।[১৭]  
    পাঠকমণ্ডলী, আপনারা নিশ্চয় লক্ষ্য করেছেন যে শাবীবের বর্ণনাগুলো সহীহ হওয়ার জন্যে ইঊনুস ইবনে এয়াযীদ হতে সেগুলো বর্ণিত হতে হবে মর্মে কোনো শর্তারোপ এখানে করা হয়নি।

  • অধিকন্তু, আল-মাদিনী দৃঢ়ভাবে ঘোষণা দেন যে শাবীবের বই প্রামাণিক[১৮] । অপরদিকে, ইবনে আদী শাবীবের কাছে গচ্ছিত আল-যুহরীর বইয়ের ব্যাপারে মন্তব্য করার মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেন, কিন্তু তিনি শাবীবের বাকি সব বর্ণনা জানানোর ব্যাপারে অভিপ্রায় ব্যক্ত করেননি। অতএব, আলবানী যে শাবীবের রওয়ায়াতগুলোর নির্ভরযোগ্যতার জন্যে ইঊনুস ইবনে এয়াযীদের কাছ থেকে তা হওয়া চাই মর্মে শর্তারোপ করেছেন, তা এক মস্ত ধোকা এবং বিদ্যা শিক্ষাগত নীতির ও ধর্মীয় আস্থার চরম লঙ্ঘন-ও।

    শাবীবের নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে  আমি (শায়খ গোমারী) ওপরে যা বলেছি, তা আরো সমর্থিত হয়েছে এই বাস্তবতার আলোকে যে, শাবীবের বর্ণিত মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-এর তাওয়াসসুল (অসীলা গ্রহণ)-কারী অন্ধ সাহাবীর অপর হাদীসটি-ও হুফফায তথা হাদীস বিশারদমণ্ডলী প্রামাণিক বলে ঘোষণা করেন; যদিও শাবীব তা আল-যুহরীর সূত্রে ইঊনুস হতে বর্ণনা করেননি, বরং রাওহ ইবনে আল-ক্বাসিম হতে বর্ণনা করেছিলেন।

    অধিকন্তু, আলবানী দাবি করেছেন, যেহেতু ইবনে আল-সুন্নী ও আল-হাকিম কর্তৃক উল্লেখিত কতিপয় রাবীর বর্ণিত হাদীসে হযরত উসমান ইবনে হুনাইফ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর ঘটনাটির উল্লেখ নেই, সেহেতু রওয়ায়াতটি সন্দেহজনক/দুর্বল (যঈফ)। এটাও আলবানীর ধোকাবাজির আরেকটা (জ্বলন্ত) উদাহরণ। উসূলে হাদীস তথা হাদীসশাস্ত্রের নীতিমালা সম্পর্কে যাঁরা জানেন, তাঁরা সম্যক অবহিত যে কিছু বর্ণনাকারী কোনো নির্দিষ্ট হাদীস গোটা বর্ণনা করেন; অপরদিকে অন্যান্যরা হয়তো নিজেদের উদ্দেশ্য অনুযায়ী তা সংক্ষিপ্ত আকারে পেশ করতে পারেন।

    উদাহরণস্বরূপ, আল-বুখারী রহমতুল্লাহি আলাইহি নিজ সহীহ গ্রন্থে এটা নিয়মিত করেছেন, যেখানে তিনি সংক্ষিপ্ত আকারে হাদীস বর্ণনা করেছেন, আর অন্য কেউ তা পূর্ণ আকারে উদ্ধৃত করেছেন।

    উপরন্তু, ইমাম বায়হাক্বী রহমতুল্লাহি আলাইহির বর্ণনায় হযরত উসমান ইবনে হুনাইফ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর ঘটনাটি যিনি রওয়ায়াত করেন, তিনি অসাধারণ ইমাম এয়াক্বূব ইবনে সুফইয়ান। আবূ যুর’আ দিমাশক্বী তাঁর সম্পর্কে  বলেন:
    “মানবজাতির দু জন মহৎ ব্যক্তি আমাদের মাঝে আবির্ভূত হন। তাঁদের মধ্যে একজন এয়াক্বূব ইবনে সুফইয়ান, যিনি উভয়ের মধ্যে বেশি দেশভ্রমণ করেন, তিনি তাঁর মতো আরেকজন বর্ণনাকারী তৈরিতে ইরাক্ববাসীর জন্যে (আজো) চ্যালেঞ্জ হয়ে আছেন।”

    আওনের বর্ণনা যেটা বাস্তবিক-ই দুর্বল, সেটাকে আলবানী কর্তৃক হযরত উসমান ইবনে হুনাইফ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর ঘটনা বর্ণনাকারীদের রওয়ায়াতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ঘোষণা করাটা আলবানীর দ্বৈততা ও জালিয়াতির তৃতীয় একটি দিক। কেননা আওনের সূত্রে আল-হাকিম যখন অন্ধ সাহাবীর ঘটনাটি সংক্ষিপ্ত আকারে বর্ণনা করেন, তখন তিনি উল্লেখ করেছিলেন:
فَدَعَا بِهَذَا الدُّعَاءِ فَقَامَ وَقَدْ أَبْصَرَ تَابَعَهُ: شَبِيبُ بْنُ سَعِيدٍ الْحَبَطِيُّ، عَنْ رَوْحِ بْنِ الْقَاسِمِ «زِيَادَاتٍ فِي الْمَتْنِ وَالْإِسْنَادِ، وَالْقَوْلُ فِيهِ قَوْلُ شَبِيبٍ فَإِنَّهُ ثِقَةٌ مَأْمُونٌ»

“রাওহ ইবনে আল-ক্বাসিমের সূত্রে শাবীব ইবনে সাঈদ আল-হাবাতী এই একই হাদীসের মতন (লিপি) ও এসনাদ (পরম্পরা) উভয় ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত আরো কিছু বর্ণনা যোগ করেছেন। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত শাবীবেরই, কেননা তিনি একদম নির্ভরযোগ্য (সিক্বা) এবং আস্থাভাজন (মা’মূন)।” [ হাকেম : আল মুস্তাদরাক আলাস সহীহাইন, কিতাবুদ দোয়া, ১/৭০৭ হাদীস নং ১৯২৯]

আল-হাকিম এখানে যা বলেছেন, তা মুহাদ্দেসীনবৃন্দের ও উসূলে ফেক্বাহ’র (মানে ধর্মশাস্ত্রীয় আইনের নীতিমালার) দ্বারা সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত একটি বিধানকে সমর্থন যোগায়; আর তা হলো, কোনো রাবী যিনি একদম সিক্বা, তাঁর দ্বারা বর্ণিত অতিরিক্ত কথা/তথ্য গ্রহণযোগ্য (মক্ববূলা); অধিকন্তু, কেউ কোনো কিছু স্মরণ করতে পারলে তা যিনি স্মরণ করতে পারেননি, তার বিপরীতে প্রমাণ হিসেবে সাব্যস্ত হয়।

প্রামাণ্য দলিল - ৩

ইমাম আল-হাকিমের বক্তব্য আলবানী দেখেছেন ঠিকই, কিন্তু পছন্দ করেননি। আর তাই তিনি সেটাকে উপেক্ষা করেন এবং একগুঁয়েভাবে ও অসততার আশ্রয় নিয়ে আওনের দুর্বল রওয়ায়াতের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের অপপ্রয়াস পান।

হযরত উসমান ইবনে হুনাইফ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর ঘটনাসম্বলিত বর্ণনাটিকে অসার প্রতীয়মান করার উদ্দেশ্যে আলবানীর (এবং ইবনে তাইমিয়ার) প্রতারণাপূর্ণ অপচেষ্টা সত্ত্বেও সেটা যে সহীহ হাদীস, তা ওপরে খোলাসা করা হয়েছে। এই ঘটনা পরিস্ফুট করে যে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-এর বেসাল শরীফ তথা পরলোকে আল্লাহর সাথে মিলিত হওয়ার পরও তাঁর শাফাআত তথা সুপারিশ প্রার্থনা জায়েয। কেননা যে সাহাবী [১৯]হাদীসটি বর্ণনা করেন, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এটা জায়েয। আর বর্ণনাকারীর এই উপলব্ধি শরীয়তের দৃষ্টিতে তাৎপর্যপূর্ণ একটি বিষয়। কেননা শরীয়তের বিস্তারিত আইনকানুন (গবেষণা করে) বের (এস্তেম্বাত) করার ক্ষেত্রে এর ওজন অনেকখানি।

আমরা যুক্তির খাতিরেই বর্ণনাকারীর উপলব্ধি অনুযায়ী কথা বলেছি। নতুবা বাস্তবে হযরত উসমান ইবনে হুনাইফ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক ওই অভাবগ্রস্ত ব্যক্তিকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-এর সুপারিশ কামনা করতে বলাটা ইতিপূর্বে হুযূর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-এর বরাবরে অন্ধ সাহাবী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর শাফাআত প্রার্থনার যে সাক্ষ্য [২০]তিনি বহন করছিলেন, সেই শরীয়তসিদ্ধ রীতিরই অনুসরণ ছাড়া কিছু নয়।

ইবনে আবি খায়তামা আপন ‘তারীখ’ তথা হাদীস বর্ণনাকারীদের জীবনী ও খ্যাতির বিবরণসম্বলিত পুস্তকে [২১]বিবৃত করেন:
عَنْ أَبِي جَعْفَرٍ، عَنْ عُمَارَةَ بْنِ خُزَيْمَةَ، عَنْ عُثْمَانَ بْنِ حُنَيْفٍ، أَنَّ " رَجُلًا ضَرِيرَ الْبَصَرِ أَتَى النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: ادْعُ اللَّهَ أَنْ يُعَافِيَنِي، فَقَالَ: «إِنْ شِئْتَ أَخَّرْتَ ذَاكَ، فَهُوَ أَعْظَمُ لِأَجْرِكَ، وَإِنْ شِئْتَ دَعَوْتُ اللَّهَ؟» ، فَقَالَ: ادْعُهُ، فَأَمَرَهُ أَنْ يَتَوَضَّأَ وَيُصَلِّيَ رَكْعَتَيْنِ، وَيَدْعُوَ بِهَذَا الدُّعَاءِ: «اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ وَأَتَوَجَّهُ إِلَيْكَ بِنَبِيِّكَ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَبِيِّ الرَّحْمَةِ، يَا مُحَمَّدُ، إِنِّي تَوَجَّهْتُ بِكَ إِلَى رَبِّي فِي حَاجَتِي هَذِهِ فَتُقْضَى، اللَّهُمَّ فَشَفِّعْهُ فِيَّ»

- মুসলিম ইবনে ইবরাহীম আমার কাছে বর্ণনা করেন যে হাম্মাদ ইবনে সালামা বলেছেন: “আবূ জা’ফর আল-খাতামী আমাকে জানান ‘আমারা ইবনে খুযায়মা হতে, তিনি উসমান ইবনে হুনাইফ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে এই মর্মে যে,

জনৈক অন্ধ ব্যক্তি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-এর কাছে আসেন এবং আরয করেন, ‘এয়া রাসূলাল্লাহ, আমি দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছি। আমার জন্যে আল্লাহর কাছে দোয়া বা প্রার্থনা করুন।’

রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম এরশাদ ফরমান, ‘যাও এবং অযূ করে দুই রাকআত (নফল) নামায পড়ো; অতঃপর দু’আ করো, হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করি আপনারই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-এর মধ্যস্থতায়, যিনি করুণার পয়গম্বর। এয়া মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম! আমি আল্লাহর দরবারে আপনারই সুপারিশ তথা মধ্যস্থতা চাচ্ছি যাতে আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরে আসে। হে আল্লাহ! আমার এই আরযি ক্ববূল করুন এবং আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেয়ার জন্যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-এর সুপারিশ আপনি গ্রহণ করুন।’ (মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম অতঃপর বলেন) তোমার যদি কখনো এ ধরনের কোনো প্রয়োজন দেখা দেয়, তাহলে এভাবে দু’আ করবে।’ [২২]
ওপরের এই হাদীসের এসনাদ (সনদ) সহীহ। এর শেষ বাক্যটি কখনো প্রয়োজন দেখা দিলে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-এর কাছে শাফাআত প্রার্থনার ক্ষেত্রে তাঁরই প্রকাশ্য অনুমতির কথা ব্যক্ত করে।

এতদসত্ত্বেও ইবনে তাইমিয়া খোঁড়া যুক্তি দাঁড় করিয়ে ওই শেষ বাক্যটির প্রতি আপত্তি উত্থাপন করেন এই মর্মে যে, এতে লুক্কায়িত কিছু পরিভাষাগত ত্রুটি (’ইল্লা) বিদ্যমান [২৩]। আমি (শায়খ গোমারী) ওইসব অপযুক্তির অসারতা অন্যত্র প্রদর্শন করেছি [২৪]। বাস্তবিকই ইবনে তাইমিয়া কর্তৃক আপন উদ্দেশ্যের পরিপন্থী কোনো হাদীসের দেখা পেলে তা প্রত্যাখ্যান করার দুঃসাহস দেখানোটা তার মজ্জাগত একটি বৈশিষ্ট্য, যদিও ওইসব হাদীস সহীহ বলে সপ্রমাণিত। [২৫]

এর একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হচ্ছে আল-বুখারী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর ‘সহীহ’ গ্রন্থে বর্ণিত হাদীসটি:  كَانَ اللَّهُ وَلَمْ يَكُنْ شَيْءٌ غَيْرُهُ “আল্লাহ অস্তিত্বশীল ছিলেন এবং তিনি ছাড়া আর কিছুই অস্তিত্বশীল ছিল না” ।[২৬]

আল-ক্বুরআন, সুন্নাহ, যুক্তি এবং আল-এজমা’ আল-মুতাএয়াক্কান তথা নির্দিষ্ট ঐকমত্যের স্পষ্ট দলিল-প্রমাণের সাথে এই হাদীসটি সঙ্গতিপূর্ণ। কিন্তু যেহেতু এটা ইবনে তাইমিয়ার চিরন্তন জগতের ধারণার সাথে মিলেনি, সেহেতু তিনি আল-বুখারীরই বর্ণিত এই হাদীসের অপর একটি সংস্করণের দিকে ফেরেন; তাতে এরশাদ হয়েছে: كَانَ اللَّهُ وَلَمْ يَكُنْ شَيْءٌ غَيْرُهُ “আল্লাহ অস্তিত্বশীল ছিলেন এবং তাঁর আগে কিছুই ছিল না।”[বুখারী : আস সহীহ, ৪/১০৫ হাদীস নং ৩১৯১] তিনি হাদীসের প্রথম সংস্করণটি দ্বিতীয়টির মোকাবেলায় নাকচ করে দেন এই অজুহাতে যে সেটা অপর একটি হাদীসের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ: أَنْتَ الْأَوَّلُ فَلَيْسَ قَبْلَكَ شَيْءٌ “আপনি-ই প্রথম; আপনার আগে কোনো কিছুই ছিল না।” 
[ ইবনে আবী শায়বা : আল মুসান্নাফ, ৬/৩৯ হাদীস নং ২৯৩১৩।
(ক) আহমদ : আল মুসনাদ, ২/৩৮১ হাদীস নং ৮৯৪৭।
(খ) মুসলিম : আস সহীহ, ৪/২০৮৪ হাদীস নং ৪/২০৮৪ হাদীস নং ২৭১৩।
(গ) ইবনে মাজাহ : আস সুনান, ২/১২৫৯ হাদীস নং ৩৮৩১।
(ঘ) আবু দাউদ : আস সুনান, ৪/৩১২ হাদীস নং ৫০৫১।
(ঙ) তিরমিযী : আস সুনান, ৫/৩৪২ হাদীস নং ৩৪০০।[২৭]।

ওপরে উদ্ধৃত হাদীসগুলোর মাঝে দৃশ্যতঃ যে অসঙ্গতি বিরাজমান, তা সঙ্গতিপূর্ণ করার সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে  হাফেয ইবনে হাজর বলেন:

“বস্তুতঃ হাদীসের এই দুইটি সংস্করণের মাঝে সঙ্গতি আনতে হলে প্রথমটির আলোকে দ্বিতীয়টিকে বুঝতে হবে, দ্বিতীয়টির আলোকে প্রথমটিকে নয়। অধিকন্তু, নীতিগত একটি ঐকমত্য (এজমা’) এক্ষত্রে বিদ্যমান যে, নস তথা ধর্মশাস্ত্রলিপির দুটি দৃশ্যতঃ পরস্পরবিরোধী সংস্করণের মাঝে সামঞ্জস্য বিধানের পদ্ধতিটি একটি সংস্করণকে বাতিল করার বিনিময়ে অপরটিকে সমর্থন করার পদ্ধতির ওপর প্রাধান্য পাবে।”

আসলে ইবনে তাইমিয়ার পক্ষপাত এই দুটি হাদীসের সংস্করণকে বোঝার ক্ষেত্রে তাকে অন্ধ বানিয়ে দিয়েছিল, যদিও প্রকৃতপক্ষে সেগুলো পরস্পরবিরোধী নয়। এটা এ কারণে যে, “আল্লাহ অস্তিত্বশীল ছিলেন এবং তাঁর আগে কোনো কিছু ছিল না” মর্মে হাদীসের সংস্করণের অর্থ হিসেবে আল্লাহতা’লার মোবারক নাম ‘প্রথম’ বিদ্যমান; অথচ “আল্লাহ অস্তিত্বশীল ছিলেন এবং তিনি ছাড়া আর কিছুই অস্তিত্বশীল ছিল না” মর্মে হাদীসের সংস্করণে উদ্দিষ্ট অর্থ হচ্ছে তাঁর মোবারক নাম ‘এক’। এর প্রমাণ হলো আরেকটি হাদীসের সংস্করণ, যা’তে ঘোষিত হয়েছে, “সবকিছুর আগে আল্লাহ অস্তিত্বশীল ছিলেন।”    

হাদীস অস্বীকার করার ক্ষেত্রে ইবনে তাইমিয়ার ধৃষ্টতার আরেকটি নমুনা হলো নিম্নের হাদীসটি: 
أَمَرَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِسَدِّ الأَبْوَابِ الشَّارِعَةِ فِي الْمَسْجِدِ وَتَرْكِ بَابِ عَلِيٍّ ".
  • “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম মসজিদে নববীর সমস্ত দরজা যেগুলো রাস্তার দিকে মুখ করে ছিল, সেগুলো বন্ধ করে দেন; কিন্তু তিনি হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর দরজা (খোলা) রাখেন।” 
এই হাদীসটি সহীহ। ইবনে আল-জাওযী ভুল করে এটাকে নিজ ‘মওদু’আত ১/৩৬৩’ শীর্ষক বানোয়াট হাদীসের সংকলন পুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। হাফেয ইবনে হাজর রহমতুল্লাহি আলাইহি নিজ ‘আল-ক্বওল আল-মোসাদ্দাদ ১/৬’ গ্রন্থে [২৮]তাঁর এই ভুল শুধরে দেন। হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর প্রতি সর্বজনবিদিত বিদ্বেষভাবের কারণে ইবনে তাইমিয়া এই হাদীসটি বানোয়াট মর্মে ইবনে আল-জাওযীর ঘোষণায় সন্তুষ্ট থাকেননি, বরং তিনি নিজের জালিয়াতির ঝুলি থেকে বের করা এই ছুতা-ও যোগ করেন যে মুহাদ্দেসীন তথা হাদীস বিশারদমণ্ডলী হাদীসটির জাল হওয়ার ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেছিলেন। ইবনে তাইমিয়ার মতের সাথে মিলেনি বলে কতো অগণিত হাদীস যে তিনি এভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন, তার হিসেব রাখা কঠিন।[২৯] 

প্রামাণ্য দলিল - ৪

আলবানীর খাতিরে আমরা ধরে নিলাম যে হযরত উসমান ইবনে হুনাইফ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর ঘটনাটি দুর্বল, আর ইবনে আবী খায়তামা বর্ণিত হাদীসের সংস্করণটি قَالَ: " إِنْ شِئْتَ دَعَوْتُ لَكَ (‘তোমার যদি কখনো এ ধরনের কোনো প্রয়োজন দেখা দেয়, তাহলে এভাবে দু’আ করবে’ - এই বাড়তি কথাসহ) ত্রুটিপূর্ণ (মু’আল্লাল), ঠিক যেমনটি ইবনে তাইমিয়া একে দেখতে চেয়েছেন। তথাপিও মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-এর শাফাআত প্রার্থনার বৈধতা প্রমাণের জন্যে অন্ধ সাহাবী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর ঘটনাসম্বলিত হাদীসটি-ই যথেষ্ট হবে। এটা এ কারণে যে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম অন্ধ সাহাবী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে ওই পরিস্থিতিতে তাঁর সুপারিশ প্রার্থনা করার শিক্ষা দেয়াতে সর্বপরিস্থিতিতে তা প্রার্থনার যথার্থতা এতে পরিস্ফুট হয়েছে।

উপরন্তু, এ ধরনের শাফাআতকে বেদআত (বা গোমরাহী) বলে উল্লেখ করার কোনো অনুমতি-ই নেই। ঠিক যেমনটি অনুমতি নেই এ ধরনের সুপারিশকে অযৌক্তিকভাবে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হায়াতে জিন্দেগী তথা দুনিয়ার জীবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা (মানে তাঁর বেসালের পরও এই শাফাআত প্রার্থনা বৈধ)।

বস্তুতঃ যে ব্যক্তি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-এর এই সুপারিশকে তাঁরই প্রকাশ্য জিন্দেগীর সময়কালের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে, সে এক গোমরাহ-পথভ্রষ্ট [৩০]। কেননা সে একটি সহীহ হাদীসকে নাকচ করে এবং ফলশ্রুতিতে এর প্রয়োগকেও নিরুদ্ধ করে। আর এটাই হারাম কাজ।

আলবানী, আল্লাহ মাফ করুন, শর্ত সাপেক্ষতাকে রদ/রহিত বলে দাবি করার দুঃসাহস দেখান এ কারণে যে, তাঁর পূর্বধারণা ও প্ররোচনা স্রেফ কোনো ধর্ম শাস্ত্রলিপির দ্বারা পক্ষপাতদুষ্ট বলে সাব্যস্ত হয়েছে। অন্ধ সাহাবী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসটি যদি তাঁরই জন্যে বিশেষ/খাস (নেয়ামতের) বণ্টন হতো, তাহলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম তা স্পষ্ট করে বলতেন, যেমনটি তিনি হযরত আবূ বুরদা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে স্পষ্টভাবে বলেছিলেন তাঁর ক্ষেত্রে দুই বছর বয়সী ছাগলের ক্বুরবানী-ই যথেষ্ট হবে, কিন্তু অন্যদের বেলায় তা যথেষ্ট হবে না। অধিকন্তু, এ কথাও ধরে নেয়া যায় না যে হুযূর পূর নূর সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম কোনো বিষয়ের ব্যাখ্যা দিতে হয়তো কালক্ষেপণ করেছিলেন, যখন তাঁর সাহাবীদের (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমের) ওই জ্ঞান তৎক্ষণাৎ জানার প্রয়োজন ছিল।

একটি ছল-চাতুরী ও তার নিবারণ    

ধরুন, কেউ এসে বল্লেন, ’এই হাদীসকে নবী পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-এর হায়াতে জিন্দেগীতে আমাদের সীমাবদ্ধ করতে হবে এ কারণে যে এতে হুযূর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামকে নেদা’ দিতে বা আহ্বান করতে হয়, (যেটা তাঁর বেসাল শরীফের পরে বৈধ নয়)।’ আমরা এই আপত্তির জবাবে বলবো, এটা প্রত্যাখ্যান করতে হবে; কেননা অসংখ্য হাদীসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম আমাদের দিকনির্দেনা দিয়েছেন নামাযের তাশাহহুদ পাঠ করতে হবে [৩১]। আর এই তাশাহহুদেই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি সম্বোধনসূচক সালাত-সালাম: “হে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম! আপনার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক”) السَّلَامُ عَلَىكَ أيُّها  النَّبِيِّ)। এই পদ্ধতিটি-ই সর্ব-হযরত আবূ বকর, হযরত উমর, হযরত ইবনে যুবায়র ও মুআবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম মিম্বরে [৩২]দাঁড়িয়ে মানুষদেরকে শিক্ষা দিয়েছিলেন। অতঃপর এ বিষয়টি এজমা’ তথা ঐকমত্যে পরিণত হয়, যে সম্পর্কে ইবনে হাযম [ফাসল ফীল নিহল, ১:৮৯] ও ইবনে তাইমিয়া দৃঢ়ভাবে ঘোষণা দিয়েছেন।

আলবানী যেহেতু (ধর্মে) বিভেদ সৃষ্টিপ্রবণ, সেহেতু তিনি এজমা’ লঙ্ঘন করেছেন এবং হযরত ইবনে মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত একটি রওয়ায়াতকে অনুসরণের বেলায় গোঁ ধরেছেন। ওই বর্ণনায় আছে,
فَلَمَّا قُبِضَ، قُلْنَا: السَّلَامُ عَلَى النَّبِيِّ
  • “অতঃপর তিনি বেসালপ্রাপ্ত হলে আমরা পাঠ করি ‘আস্ সালামু আ’লান্ নাবিই’, অর্থাৎ, নবী পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক।[৩৩]
আফসোস, নিশ্চয় হাদীস ও এজমা’কে লঙ্ঘন করাই গোমরাহীর মূল।

উপরন্তু, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম হতে এমন প্রামাণিক বর্ণনাসমূহ বিদ্যমান, যেগুলো জ্ঞাত করে যে আমাদের আমলনামা তাঁর সামনে রওযা-এ-আক্বদসে পেশ করা হয়, যেমনিভাবে তাঁর কাছে পেশ করা হয় আমাদের সালাত ও সালাম। এমন কিছু ফেরেশতা সম্পর্কে আরো প্রামাণিক বর্ণনাসমূহ আছে, যাঁরা উম্মতের কেউ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি সালাত-সালাম পেশ করলে তা হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-এর রওযা শরীফে পৌঁছে দেন। এ ছাড়াও ’তাওয়াতুর’ (দ্ব্যর্থহীন ক্বুরআনের আয়াত ও হাদীসের মতো ভিন্ন ভিন্ন সূত্র দ্বারা সমর্থিত একটি সার্বিক অর্থ) ও এজমা’ প্রমাণ করে যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম তাঁর মোবারক রওযায় (বরযখ) জীবনে জিন্দা। আর তাঁর পবিত্র শরীর মোবারকেরও ক্ষয় নেই। এতো সবের পরে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-এর শাফাআত প্রার্থনাকালে তাঁকে সম্বোধন করা যাবে না, এই দাবি কেউ কীভাবে উত্থাপন করার দুঃসাহস দেখাতে পারে? এটা কি তাশাহহুদে তাঁকে সম্বোধনের চেয়ে ভিন্নতর কোনো কিছু?

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আলবানী অযৌক্তিকতায় একগুঁয়ে এবং তিনি গোমরাহীতেও নিমজ্জিত, ঠিক যেমনিভাবে তার অন্ধ অনুসারীরাও একগুঁয়ে ও পথভ্রষ্ট।

এই হলো আমার কৃত আলবানীর রদ। আর হামদী সালাফীর বিষয়ে বলবো, তাকে আলাদাভাবে খণ্ডনের কোনো প্রয়োজন নেই। কেননা তিনি স্রেফ আলবানীরই প্রতিধ্বনি করেন।

এখানে আরেকটি বিষয় আমার বলা উচিত যে, হাদীসের প্রামাণিকতা বা দুর্বলতার ব্যাপারে আলবানীর ওপর নির্ভর করা যায় না; কারণ তিনি মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্যে নিয়মিত নানা ধরনের অপকৌশল প্রয়োগ করে থাকেন, আর উলামাবৃন্দের কথাকে বিকৃত করে তাঁদের মতামত বর্ণনায় তিনি নিজ আস্থার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করাকে মোটেও ঘৃণা করেন না। অধিকন্তু, তিনি এজমা’র বিরোধিতা করা এবং বিনা দালিলিক প্রমাণে নস্ তথা ধর্মশাস্ত্রলিপির রহিতকরণের (‘নাসখ’-এর) দাবি উত্থাপন করার হঠকারিতা-ও দেখিয়েছেন। ফেক্বাহ-শাস্ত্রের মৌলনীতি ও এস্তেম্বাত তথা শরঈ আইন-কানুন বের করার নিয়ম সম্পর্কে তার অজ্ঞতার কারণেই তিনি এই সীমালঙ্ঘন করেছেন।

আলবানী দাবি করেন যে শাফায়াত প্রথা নিষেধ করে এবং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-এর মোবারক নাম উচ্চারণের সময় ‘সাইয়্যেদিনা’ লক্বব/খেতাবটি ব্যবহারে মানুষকে বারণ করে, আর বেসালপ্রাপ্ত পুণ্যাত্মাবৃন্দের খাতিরে ক্বুরআন মজীদ পাঠে বাধা দিয়ে তিনি বেদআত তথা ধর্মে প্রবর্তিত নতুন প্রথার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছেন। তবে প্রকৃত ঘটনা হলো, আল্লাহ যে বিষয়ের অনুমতি দিয়েছেন তা নিষেধ করে এবং আশ’আরীদের [৩৪]ও সূফীবৃন্দের প্রতি [৩৫] গালমন্দ করে তিনি নিজেই আসল বেদআত সংঘটন করেছেন।

এসব বিষয়ে আলবানী ঠিক ইবনে তাইমিয়ার মতোই, যিনি সকল ধরনের মানুষের প্রকাশ্য নিন্দাবাদ করেছিলেন। (ইবনে তাইমিয়া) কাউকে ঘোষণা করেন কাফের (অবিশ্বাসী), আবার কাউকে বা গোমরাহ; অতঃপর তিনি নিজেই দুটি সর্বনিকৃষ্ট গোমরাহী সংঘটন করেন। প্রথমটিতে তিনি মতামত ব্যক্ত করেন যে এই জগত চিরন্তন (মানে এর কোনো সূচনা নেই এবং সবসময়-ই আল্লাহর সাথে বিরাজমান ছিল)। এটাই হচ্ছে পথভ্রষ্টতা যেটা স্পষ্ট কুফর/অবিশ্বাস সৃষ্টিকারক। আমরা এর থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাই। দ্বিতীয় নজিরটিতে তিনি হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর বিরুদ্ধে ছিলেন পক্ষপাতদুষ্ট, যার জন্যে তার সময়কার উলেমামণ্ডলী তার প্রতি মোনাফেক্বী তথা কপটতার অভিযোগ উত্থাপন করেন [৩৬]। এটা এ কারণে যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-কে বলেছিলেন, إِنَّهُ لَا يُحِبُّكَ إِلَّا مُؤْمِنٌ، وَلَا يُبْغِضُكَ إِلَّا مُنَافِقٌ “তোমাকে ঈমানদার ছাড়া কেউই ভালোবাসে না, আর মোনাফেক্ব/কপট ব্যক্তি ছাড়া কেউই ঘৃণা করে না।”[৩৭]

নিঃসন্দেহে হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে ইবনে তাইমিয়ার অপছন্দ করাটা আল্লাহর তরফ হতে তারই প্রতি শাস্তি ছাড়া কিছু নয়। এতদসত্ত্বেও আলবানী তাকে ‘শায়খুল ইসলাম’উপাধিতে সম্বোধন করেছেন (এ খেতাবটি ঐতিহ্যগতভাবে যুগের সেরা আলেমের জন্যে সংরক্ষণ করা হয়ে থাকে)। ইবনে তাইমিয়া যেখানে অনৈসলামী আক্বীদা-বিশ্বাস ধারণ করেন, সেখানে আলবানী কর্তৃক তাকে এরকম খেতাব দেয়ার ব্যাপারটি আমাকে সত্যি বিস্মিত করেছে।

আমি ভাবি, না, বরঞ্চ নিশ্চিত জানি যে, হাফেয ইবনে নাসির (আল-দ্বীন আল-দিমাশক্বী) যদি ইবনে তাইমিয়ার এসব জঘন্য আক্বীদা-বিশ্বাস সম্পর্কে জানতেন, তাহলে তিনি কখনোই তাঁর ‘আল-রাদ্দু আল-ওয়াফির’ শীর্ষক পুস্তকে (আলাউদ্দীন বুখারী কৃত  ‘আদ দ্বাওউল লামিউ: ২/২৯২’ শীর্ষক কিতাবে উদ্ধৃত অভিযোগগুলোর জবাবে বলেন  مَنْ اطْلَقَ عَلِيْ اِبْنِ تَيْمِيَةِ لَقْبِ  شَيْخِ الاِسْلاَمِ فَهُوَ بِهَذَا الاِطْلاَقِ كَافِرٌ’ অর্থাৎ, ‘ইবনে তাইমিয়াকে যে ব্যক্তি শায়খুল ইসলাম বলবে, সে কাফের’) ইবনে তাইমিয়ার পক্ষ সমর্থন করতেন না।

নিঃসন্দেহে ইবনে নাসির যখন তাঁর বইটি লেখেন, তখন তিনি ইবনে তাইমিয়ার প্রশংসাকারী লোকদের দ্বারা ধোকাপ্রাপ্ত হন। একইভাবে, বিখ্যাত তাফসীরকার মাহমূদ শুকরী আলূসীর পুত্র আল-আলূসী, যিনি বিশাল ‘রূহুল মা’আনী’ তাফসীরের কিতাবটি রচনা করেন, ইবনে তাইমিয়ার আসল চেহারা সম্পর্কে জানলে তিনিও তাঁর ‘জালাল আল-আয়নাঈন’ পুস্তকটি রচনা করতেন না।

আলবানীর অদ্ভূত ও বৈধর্মিক ধ্যান-ধারণা ও মতামত মুক্তচিন্তার প্রতি তার অপবিত্র ঝোঁকেরই ফসল; তারই ধোকাবাজি এবং সঠিক অর্থের পরিবর্তে নিজের খায়েশ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে হাদীসকে সহীহ বা যয়ীফ হিসেবে ঘোষণা করার ক্ষেত্রে তারই অসততা; উলেমা ও ইসলামী মহান ব্যক্তিত্বদের প্রতি তারই আঁচড়সমালোচনা। এসব আল্লাহতা’লার পক্ষ থেকে শাস্তি বটে, কিন্তু তবু তিনি তা বুঝতে অক্ষম।

নিশ্চয় আলবানী ওই সকল ব্যক্তির অন্তর্ভুক্ত যাদের সম্পর্কে আল-ক্বুরআনে এরশাদ হয়েছে, وَهُمْ يَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ يُحْسِنُونَ صُنْعًا  “এরা মনে করে ভালো কাজ করছে; না, বরঞ্চ এই ভাবনায় এরা কতোই না ভ্রান্তিতে পতিত!” [৩৮]

আমরা আল্লাহতা’লার কাছে আরয করি যেন আলবানীর প্রতি তাঁর (বিধানকৃত) শাস্তি হতে আমাদের হেফাযত করেন। আমরা সকল ধরনের মন্দ হতে তাঁরই কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি। বিশ্বজগতের অধিপতি আল্লাহতা’লারই জন্যে সকল প্রশংসা বিহিত। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম ও তাঁর উম্মতের প্রতি আল্লাহতা’লা আশীর্বাদ বর্ষণ করুন, আমীন।

উপসংহার

“আমাদের ধর্মীয় বিধানে শাফাআত অনুমতিপ্রাপ্ত,
মুসলিম বিশ্বে নেই এ বিষয়ে বিতর্ক- এ কথা সত্য,
ব্যতিক্রম শুধু যারা দেখিয়েছে ঔদ্ধত্য ,
পাষণ্ড তারা, মুসলমানদের ঘৃণিত ওহাবী দুর্বৃত্ত,
তারাই করেছে একে নিষিদ্ধ, নিন্দার তীরে কলুষিত,
কোনো কারণ দর্শানো ব্যতীত।
উসমান বিন হুনাইফের বৈধ দৃষ্টান্ত,
আমাদের জন্যে দলিল চূড়ান্ত, নয়কো তা বিতর্কিত,
আল্লাহ ওহাবীদের সুমতি দিন দলিলে হয়ে পরাস্ত।”


তথ্যসূত্র ও টীকা টিপ্পনি
[১] নোট: মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম হতে বর্ণিত বাণী, অথবা তাঁরই কর্ম, স্বভাব, চরিত্র বা পবিত্র সুরত সম্পর্কিত বিবরণ।
 [২] নোট: সাহাবী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু তথা হুযূরে পাকের সাথী হতে বর্ণিত বাণী; সাহাবীকে দেখেছেন, কিন্তু তাঁর কাছ থেকে কিছু শুনেননি, এমন  তাবেঈন/অনুসারীর বর্ণনাও এ’  পর্যায়ভুক্ত।
[৩] নোট: ইমাম তাবারানী সংকলিত হাদীসের গ্রন্থ।
[৪] নোট: ২৩ হিজরী/৬৪৩ খৃষ্টাব্দ সালে তিনি হযরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর স্থলাভিষিক্ত হন এবং ১২ বছর শাসন করার পর ১৮ যিলহজ্জ্ব ৩৫ হিজরী/১৭ জুন, ৬৫৬ খৃষ্টাব্দ সালে ষড়যন্ত্রকারীদের দ্বারা ৮২ বছর বয়সে শহীদ হন; রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম তাঁর সাথে নিজ কন্যা রুক্বাইয়াকে বিয়ে দেন এবং রুকাইয়ার বেসাল হলে দ্বিতীয় কন্যা উম্মে কুলসূমকেও বিয়ে দেন। এ কারণে খলীফাকে মুসলমানবৃন্দ যিন্নূরাইন নামে ডেকে থাকেন।
[৫]মু’জাম আল-কবীর, ৯:১৭।
[৬] নোট: ইমাম ইবনে হাজর হায়তামী রহমতুল্লাহি আলাইহি-ও এটাকে তাই বলেছেন নিজ ‘মজমা’ আল-যাওয়াঈদ’ গ্রন্থের ২য় খণ্ডের ১৭৯ পৃষ্ঠায়; আর ইমাম মুনযিরী নিজ ‘আল-তারগিব ওয়াল-তারহিব পুস্তকে ১:২৭৩ #১০১৮; এই বর্ণনা ইমাম তাবারানী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর ‘মু’জাম আল-সগীর’ পুস্তকে (নং ৫০৮) বিদ্যমান এবং তিনি এটাকে সহীহ বলেছেন; এছাড়াও ইমাম সাহেবের ‘কিতাব আল-দু’আ’ বইটিতেও (২:১২৮৮) তিনি এটাকে সহীহ বলেন; শায়খ শু’আইব আরনা’উত-ও শায়খ গোমারী এবং সর্ব-ইমাম তাবারানী, আল-হায়তামী ও আল-মুনযিরীর মতো পূর্ববর্তী মুহাদ্দেসীনবৃন্দের সাথে একমত হন যে এ রওয়ায়াতটি সহীহ (শায়খ নূহ হা মিম কেলার সম্পাদিত ‘Reliance of the Traveler', সংযোজনী ডব্লিউ ৪০.৭, ৯৩৯ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য)]।
[৭] জরুরি নোট: হাদীসশাস্ত্রের বরেণ্য পণ্ডিতবৃন্দ অন্ধ ব্যক্তির বিবরণসম্বলিত এ হাদীসটিকে সহীহ হিসেবে বিবেচনা করেন। ইমাম তিরমিযী রহমতুল্লাহি আলাইহি এটা বর্ণনা করেন(তিরমিযী : আস সুনান, ৫/৪৬১ হাদীস নং ৩৫৭৮) এবং বলেন
هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ غَرِيبٌ، لاَ نَعْرِفُهُ إِلاَّ مِنْ هَذَا الوَجْهِ مِنْ حَدِيثِ أَبِي جَعْفَرٍ وَهُوَ الْخَطْمِيُّ.
 যে এটা হাসান সহীহ গরীব; তিনি আরো বলেন যে এই এসনাদ (পরম্পরা) ছাড়া অন্য কোনো এসনাদে তিনি হাদীসটি পাননি। ইবনে খুযাইমা রহমতুল্লাহি আলাইহি একই সনদে এটা বর্ণনা করেন নিজ ‘হাদীস’ পুস্তকে(২/২২৫ হাদীস নং ১২২৫); আর ইমাম আহমদ রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর ‘মুসনাদ’ গ্রন্থের ৪র্থ খণ্ডের ১৩৮ পৃষ্ঠায় তা বর্ণনা করেন; ইমাম নাসাঈ রহমতুল্লাহি আলাইহি বর্ণনা করেন নিজ ‘আমল আল-এয়াওম ওয়াল-লায়লাহ’ পুস্তকের ৪১৭ পৃষ্ঠায়; ইমাম ইবনে মাজাহ রহমতুল্লাহি আলাইহি বর্ণনা করেন তাঁর ‘আল-সুনান’ শীর্ষক বইয়ের ১ম খণ্ডের ৪৪১ পৃষ্ঠায়; আল-বুখারী বর্ণনা করেন নিজ ‘আল-তারিখ আল-কবীর’ পুস্তকের ৬ষ্ঠ খণ্ডের ২১০ পৃষ্ঠায়; আল-তাবারানী আপন ‘মু’জাম আল-কবীর’ গ্রন্থের ৯ম খণ্ডের ১৯ পৃষ্ঠায় এবং ‘কিতাব আল-দু’আ’র ২য় খণ্ডের ১২৮৯ পৃষ্ঠায়; আল-হাকিম নিজ ‘মুসতাদরাক’ পুস্তকের ১ম খণ্ডের ৩১৩ ও ৫১৯ পৃষ্ঠাগুলোতে; তিনি এ হাদীসটিকে সহীহ বলেন এবং আল-যাহাবী ‘মুসতাদরাক’ গ্রন্থের ব্যাখ্যামূলক পুস্তকে তা নিশ্চিত করেন; আল-বায়হাক্বী এটা নিজ ‘দালা’ইল আল-নুবুওয়্যাহ’ গ্রন্থের ৬ষ্ঠ খণ্ডের ১৬৬ পৃষ্ঠায় এবং ‘আল-দা’ওয়াত আল-কবীর’ পুস্তকেও বর্ণনা করেন। ইমাম তিরমিযীর (একটি এসনাদে পাওয়ার) বক্তব্য সত্ত্বেও এ হাদীস আরেকটি এসনাদে পাওয়া যায়, যাকে বিশেষজ্ঞ হাদীসবিদমণ্ডলী ‘মুতা-বা’আহ’ নামে অভিহিত করেন। শু’বাহ একই হাদীস ইমাম আবূ জা’ফর হতে হাম্মাদ ইবনে সালামা’র এসনাদে বর্ণনা করেন, যেটা ইমাম তিরমিযী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর সংস্করণে বিদ্যমান। শায়খ আবদুল্লাহ গোমারী এ হাদীসটি বিভিন্ন পৃথক সূত্র ও বিকল্প এসনাদ (মুতাবা’আহ)-সহ বর্ণনা করেন নিজ ‘আল-রাদ্দ আল-মোহকাম আল-মাতীন ‘আলা কিতাব আল-ক্বওল আল-মুবীন’ গ্রন্থের ১৪৪-১৪৯ পৃষ্ঠায় (কায়রো, মাকতাবাত আল-কাহিরা, ৩য় সংস্করণ, ১৯৮৬); যেমনিভাবে বর্ণনা করেন শায়খ মাহমূদ সাঈদ মামদূহ তাঁর ‘রাফ’আল-মিনারা ফী তাখরিজ আহাদীস আল-তাওয়াসসুল ওয়াল-যিয়ারাহ’ পুস্তকের ৯৪-৯৫ পৃষ্ঠায় (আম্মান, জর্দান, দারুল ইমাম আল-নববী, ১ম সংস্করণ, ১৯৯৫)]   
[৮] ইন্তেকাল: ১৭৭ হিজরী; তাঁর নাম ইমাম ইবনে হাজর রহমতুল্লাহি আলাইহি নিজ ‘তাক্বরিব আল-তাহযীব’ শীর্ষক প্রসিদ্ধ মুহাদ্দেসীনবৃন্দের বৃত্তান্তমূলক বইয়ে উল্লেখ করেছেন (বৈরুত, দারুল রাশাদ, ৩য় সংস্করণ, ১৯৯১, ৬০৮ পৃষ্ঠা।
[৯] নোট: হাদীসবেত্তা যাঁর স্মরণশক্তি প্রখর; কারো কারো মতে এক লাখ হাদীস মুখস্থ করার মতো স্মরণশক্তিসম্পন্ন।
[১০] নোট: এলম আল-জারহ ওয়াল তা’দিল পণ্ডিত, যে হাদীসবেত্তার ন্যায়পরায়ণতা ও শাস্ত্রগত পাণ্ডিত্য এমন উচ্চ পর্যায়ের যে দিকনির্দেশনার জন্যে তাঁর ওপর অন্যান্য বিদ্বানবৃন্দ নির্ভর করেন; ইমামবৃন্দ-ই নির্ধারণ করতেন কারা দুর্বল বর্ণনাকারী আর কারা নির্ভরযোগ্য; একইভাবে, তাঁরা নির্ধারণ করতেন হাদীসের কোন্ সংস্করণটি সঠিক আর কোনটি ভুল বা দুর্বল; কেউ ইমাম হিসেবে একবার প্রতিষ্ঠা পেলে তিনি অভিসংশনযোগ্য হলেও কারো সমালোচনা-ই তাঁর খ্যাতি বা কর্তৃত্বকে খর্ব করতে পারতো না। এটাই এলম আল-জারহ ওয়াল তা’দিলের নীতিমালা্।
[১১] নোট: অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য হাদীস বর্ণনাকারী যাঁদের ছিল আদালা তথা ন্যায়পরায়ণতা ও নিখুঁত ধীশক্তি; নিখুঁত ধীশক্তি বলতে রাবীকে সঠিকভাবে প্রথমবারের বর্ণনাটুকু শ্রবণ ও স্মরণ রাখতে হবে এবং তারপর যে কোনো সময় তিনি তা বর্ণনা করতে চাইলে সঠিকভাবে মনে করতে সক্ষম হতে হবে; আরেক কথায়, প্রথমবার থেকে প্রতিবারই সঠিকভাবে বর্ণনা করতে হবে; ন্যায়পরায়ণতা বলতে বোঝায় তিনি কখনো মিথ্যে বলেন না এবং কবীরা গুনাহ করেন না।
[১২] নোট: সহীহ পারিভাষিক শব্দ যা নিম্নের পাঁচটি গুণগত মানসম্বলিত বর্ণনাকে বোঝায়: ১/ এমন এক সনদ যা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত ফেরত গিয়েছে; ২/ এমন এক সনদ যেখানে প্রত্যেক রাবী সরাসরি বর্ণনাকারীর কাছ থেকে হাদীস শুনেছেন; এই শর্তকে এত্তেসাল বলে; ৩/ প্রত্যেক রাবী তথা বর্ণনাকারী এলম আল-জারহ ওয়াল তা’দিল কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সিক্বা হিসেবে বিবেচিত হতে হবে; ৪/ হাদীসের মতন তথা লিপি ও রাবীদের এসনাদ উভয়-ই অপ্রকাশ্য ত্রুটি (’ইল্লা) হতে মুক্ত হতে হবে; এই অপ্রকাশ্য ত্রুটি হাদীসের বা এর সনদের বিশুদ্ধতাকে পক্ষপাতদুষ্ট করতে পারে; এর সূক্ষ্মতা ইমাম দারাক্বুতনী, আল-তিরমিযী, আল-হাকিম, ইবনে রাজাবের মতো পণ্ডিতমণ্ডলী-ই কেবল বুঝতে সক্ষম; এবং ৫/ হাদীসের লিপি কোনো মুতাওয়াতির তথা জনশ্রুত হাদীসের অথবা আল-ক্বুরআনের (আল-নুসুস আল-ক্বাতেয়্যার) দ্বারা প্রতিষ্ঠিত নীতিমালার খেলাফ হতে পারবে না; কোনো রাবী তাঁর চেয়ে অধিক নির্ভরযোগ্য রাবীদের সাথে বর্ণনা বা বর্ণনাকারীদের সনদের ব্যাপারে ভিন্নমত পোষণ করতে পারবেন না; এরকম যদি হয়, তবে ওই হাদীসকে শায্ তথা অনিয়মিত/অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও এরই ফলে দুর্বল বিবেচনা করা হবে; এরকম অসামঞ্জস্য চিনতে হলে হাদীসশাস্ত্রের সম্যক জ্ঞান অর্জন করতে হবে, আর তাই এর একমাত্র যোগ্য ছিলেন প্রাথমিক যুগের ইমামমণ্ডলী।
[১৩] আল-তাবারানী এটা তাঁর ‘আল-মু’জাম আল-সগীর’ পুস্তকের ১ম খণ্ডের ১৮৪ পৃষ্ঠায় এবং ‘আল-মু’জাম আল-কবীর’ গ্রন্থের ৯ম খণ্ডের ১৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন।
[১৪] নোট: শায়খ মাহমূদ সাঈদ মামদূহ নিজ ‘রাফ’ আল-মিনারা’ পুস্তকের ৯৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন যে আবূ যুর’আ, আবূ হাতেম ও আল-নাসাঈ সকলেই শাবীব সম্পর্কে বলেছেন, لاَ بَاْسَ بِهِ’ -তাঁর ভুল-ভ্রান্তি নেই। শায়খ মাহমূদ উল্লেখ করেন, “কোনো রাবী তথা হাদীস বর্ণনাকারীর নির্ভরযোগ্যতা প্রতিপাদন বা নিশ্চিত করতে এবং তিনি যা বর্ণনা করেন তাকে সহীহ বলে নিশ্চয়তা দিতে, অধিকন্তু (ইমাম বুখারী ও মুসলিমের) দুটি সহীহ হাদীসগ্রন্থে সেগুলোর উল্লেখকে নির্ভরযোগ্য বলে নিশ্চিত করতে এতোটুকু-ই যথেষ্ট হবে।  
[১৫] ইবনে আদী : আল কামিল, ৫/৪৭ পৃষ্ঠা নং ৮৯১।
নোট: আল-যুহরীর বইটি-ই হাদীসশাস্ত্রের প্রথম লিখিত বই। খলীফা উমর ইবনে আব্দিল আযীয, যাঁকে উত্তরসূরীবৃন্দ ইসলামের পঞ্চম খলীফা বলে প্রশংসা করেন, তিনি হাদীসশাস্ত্র লিখিত আকারে সংরক্ষণ করা না হলে হারিয়ে যেতে পারে -এই আশঙ্কায় আল-যুহরীকে তা বই আকারে প্রকাশ করতে নির্দেশ দেন। অতঃপর আল-যুহরীর বইটি হাদীসশাস্ত্রের ইতিহাসে দ্বিতীয় অধ্যায়ের সূচনা করে। প্রাথমিক যুগে কোনো কিছু লিখিত আকারে সংরক্ষণ করা হয়নি। মুহাদ্দেসীনবৃন্দ নিজেদের প্রখর স্মরণশক্তির ওপর নির্ভর করতেন এবং লেখালেখির বিপক্ষে ছিলেন।
[১৬] নোট: শায়খ মাহমূদ সাঈদ মামদূহ নিজ ‘রাফ’ আল-মিনারা ফী তাখরিজ আহাদীস আল-তাওয়াসসুল ওয়াল যিয়ারা’ শীর্ষক পুস্তকের ১০০ পৃষ্ঠায় বলেন যে আলবানী নিজ ‘আল-তাওয়াসসুল’ কিতাবের ৮৬ পৃষ্ঠায় আলী ইবনে মাদিনীর ওপরোক্ত বক্তব্য উদ্ধৃত করার সময় ইচ্ছাকৃতভাবে ওর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রথমাংশ-ই ছেঁটে ফেলেন। অর্থাৎ, শাবীব একদম সিক্বা মর্মে অংশটি বাদ দেন। আলবানী ‘আল-তাওয়াসসুল’ বইয়ে লিখেন, “আলী আল-মাদিনী বলেন:
 سمعت علي بن المديني يقول ، كان يختلف في تجارة إلى مصر ،
‘তিনি ব্যবসার উদ্দেশ্যে মিসরে যেতেন..’।” কিন্তু কোথাও আলবানী এ কথা স্বীকার করেননি যে আলী আল-মাদিনী শাবীবকে সিক্বা বা নির্ভরযোগ্য বলে অভিহিত করেছিলেন। শাবীব আস্থাভাজন নন বলে আলবানীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আল-মাদিনী কর্তৃক শাবীবের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিতকরণের বিষয়টি আলবানীর বাদ দিয়ে যাওয়াটি অত্যন্ত গুরুতর ব্যাপার।

[১৭] নোট: শায়খ মাহমূদ নিজ ‘রাফ’ আল-মিনারা’ গ্রন্থের ৯৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন আলবানী-ই প্রথম ব্যক্তি, যিনি শাবীব দুর্বল বর্ণনাকারী মর্মে দাবি উত্থাপন করেন। হাদীস বিদ্যার বিশারদ (এলম আল-জারহ ওয়াল তা’দিল পণ্ডিত) নয়জনের নাম শায়খ মাহমূদ উল্লেখ করেন, যাঁরা শাবীবকে সিক্বা ঘোষণা করেছিলেন। এই ইমামবৃন্দ হলেন আলী আল-মাদিনী, মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া আল-যুহালী, আল-দারাক্বুতনী, আল-তাবারানী, ইবনে হিব্বান, আল-হাকিম, আবূ যুর’আ, আবূ হাতেম ও আল-নাসাঈ।
[১৮] নোট: শায়খ মাহমূদ সাঈদ মামদূহ নিজ ‘রাফ’ আল-মিনারা ফী তাখরিজে আহাদীস আল-তাওয়াসসুল ওয়াল-যিয়ারা’ পুস্তকের ৯৯-১০০ পৃষ্ঠাগুলোতে উল্লেখ করেন যে কোনো রাবী তথা বর্ণনাকারীর নির্ভুল হওয়া (এবং ন্যায়পরায়ণ হওয়া যা হাদীস বর্ণনায় নির্ভরযোগ্যতার মাপকাঠিস্বরূপ, তা) দুই ধরনের: ১/ স্মৃতিশক্তিতে নির্ভুল হওয়া, এবং ২/ দাবত্ আল-কিতাবা তথা তিনি যা লিখেছেন তাতেও নির্ভুল হওয়া। আলী আল-মাদিনী কোনো রকম শর্তারোপ ছাড়াই প্রথমে ঘোষণা করেন যে শাবীব একদম নির্ভরযোগ্য (সিক্বা)। অতঃপর তিনি তাতে জোর দিতে বলেন যে তাঁর বই-ও প্রামাণিক, আর এক্ষেত্রে তিনি শাবীবের নির্ভরযোগ্যতাকে ওই বইয়ের জন্যে শর্তসাপেক্ষ করেননি।
[১৯] নোট: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-কে জীবদ্দশায় যিনি দেখেছেন এবং তাঁর প্রতি ঈমান এনেছেন এমন পুণ্যাত্মাবৃন্দ হচ্ছেন সাহাবা-এ-কেরাম।
[২০] নোট: হযরত উসমান ইবনে হুনাইফ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-ই হাদীসটির রওয়ায়াতকারী।
[২১] নোট: ইবনে তাইমিয়া-ও এই বিবরণ নিজ ‘ক্বা’য়েদা ফীল তাওয়াসসুল’ গ্রন্থের ১০৬ পৃষ্ঠায় উদ্ধৃত করেন।
[২২] তারীখে ইবনে আবি খায়তামা।    
[২৩] নোট: যে ধরনের ত্রুটি হাদীসের বা অন্ততঃ সেটার শেষ বাক্যের প্রামাণিকতা পক্ষপাতদুষ্ট করতে পারে।
[২৪] নোট: শায়খ গোমারী তাঁর আল-রাদ্দ আল-মুহকাম আল-মতীন ‘আলাল কিতাব আল-মুবীন’ শীর্ষক পুস্তকের ১৪১ পৃষ্ঠায় প্রদর্শন করেন যে ইবনে তাইমিয়া নিজ ‘আল-ক্বওল আল-মুবীন ফী হুকমিদ্ দু’আ ওয়া নিদ’আ আল-মওতা মিন আল-আম্বিয়া ওয়াল-সালেহীন’ গ্রন্থে এমন ভান করেন যেন হযরত উসমান ইবনে হুনাইফ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ও তাঁর দ্বারা ওই তাওয়াসসুলের দু’আ শিক্ষাপ্রাপ্ত ব্যক্তির ঘটনাটা বানোয়াট (মাকযুবা); কেননা (ইবনে তাইমিয়ার মতে) এই ঘটনা সত্য হলে এর জন্যে শর্তস্বরূপ খলীফা উসমান ইবনে আফফান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-কে যালেম হতে হতো, এমন যালেম শাসক যিনি মানুষের অধিকার অস্বীকার করতেন এবং তাদের ফরিয়াদ শুনতেন না। উপরন্তু, ইবনে তাইমিয়া দাবি করেন যে সুন্নাহের কোনো বইপত্রেই এই ঘটনার উল্লেখ নেই।
[২৫] বঙ্গানুবাদকের জরুরি নোট: খলীফা উসমান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ও অভাবগ্রস্ত ব্যক্তির ঘটনাটি সত্য হলে খলীফা যালেম হিসেবে প্রতীয়মান হন মর্মে ইবনে তাইমিয়ার যুক্তি ধোপে টেকে না। কেননা খলীফা ওই অভাবগ্রস্ত ব্যক্তিকে পরে বলেছিলেন যে তিনি তাঁর আরজির বিষয়টি স্মরণ করতে পারছিলেন না। যেখানে খলীফা নিজেই কারণ দর্শিয়েছেন, সেখানে যুক্তি খাড়া করার কোনো অবকাশ-ই নেই। উপরন্তু, এই ঘটনায় রূহানী তথা আধ্যাত্মিক প্রশাসনের আলামত পাওয়া যায়। ওই অভাবগ্রস্ত ব্যক্তি মসজিদে নববীতে অবস্থিত রওযা-এ-আকদসের কাছে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-এর তাওয়াসসুল পালন করার পর খলীফা উসমান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু নিশ্চয় হুযূর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম হতে রূহানী তথা আধ্যাত্মিক নির্দেশনা পেয়েছিলেন। নতুবা তিনি বিষয়টি স্মরণ করতে পারতেন না এবং এর প্রতি গুরুত্বও দিতেন না। রাষ্ট্রীয়কার্য পরিচালনায় এতোগুলো বিষয়ের মাঝে কারো সুনির্দিষ্ট বিষয় স্মরণ করতে পারাও এক কঠিন ব্যাপার বটে! ওই যুগে তো আর বর্তমানকালের মতো কম্পিউটার ফাইলিং ছিল না! সব কিছুই খলীফাকে স্মরণে রাখতে হতো।
[২৬] দেখুন হাফেয ইবনে হাজর কৃত ‘ফাতহুল বারী’, ১৩:৪১০।
[২৭] নোট: ইবনে তাইমিয়া ধারণা পোষণ করতেন যে সৃষ্টিসমূহ সবসময়-ই আল্লাহর সাথে অস্তিত্বশীল ছিল।
[২৮] আ’লম আল-কুতূব সংস্করণের ১০-১১ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।
[২৯] নোট: শায়খ আবদুল্লাহ গোমারী তাঁর বিভিন্ন লেখনীতে ইবনে তাইমিয়ার এই অসততার দৃষ্টান্তগুলো তুলে ধরেছেন। তাঁর এরকম একটি বইয়ের নাম ‘আল-রাদ্দ আল-মুহকাম আল-মতীন ‘আলাল কিতাব আল-মুবীন’। আরো অনেক আলেম-উলেমা ইবনে তাইমিয়ার এই দোষের ব্যাপারে অভিযোগ করেন। তাঁদের মধ্যে সর্ব-ইমাম তক্বীউদ্দীন সুবকী, ইবনে হাজর আল-মক্কী, তক্বীউদ্দীন আল-হুসনী, আরবী আল-তুব্বানী, আহমদ যাইনী দাহলান মক্কী, মুহাম্মদ যাহেদ আল-কাউসারী প্রমুখের নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।
[৩০] নোট: এটা এ কারণে যে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম যা বৈধ ঘোষণা করেছেন, তাকে ওই ব্যক্তি কার্যতঃ না-জায়েয ঘোষণা করেছে; আর এটাই হলো গোমরাহীমূলক কর্মকাণ্ড, যেটা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-এর শরীয়তের রদ-বদল বা বিরোধিতা ছাড়া কিছু নয়।
[৩১] নোট: প্রতি দুই রাকআত নামাযের শেষে বেঠকে আল্লাহর একত্ব ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-এর রেসালাতের শাহাদাত বা সাক্ষ্য প্রদান।
[৩২] নোট: তথা মসজিদের ভেতরে জুমুআ’র নামাযে ইমামের খুতবা দিতে দাঁড়াবার সিঁড়িবিশেষ।
[৩৩] ইবনে আবী শায়বা : আল মুসনাদ, ১/২১৬ হাদীস নং ৩১৯।
(ক) আহমদ : আল মুসনাদ, ১/৪১৪ হাদীস নং ৩৯৩৫।
(খ) বায়হাকী : আস সুনানুল কুবরা, ২/১৯৮ হাদীস নং ২৮২০। 
[৩৪] নোট: আশ’আরী (আল-আশআ’ইরা) হচ্ছে সেই মুতাকাল্লিমীন তথা ধর্মতাত্ত্বিকদের মাযহাব, যাঁরা মু’তাযেলা ও আরবীয় দার্শনিকদের মতো পথভ্রষ্ট দলগুলোর প্রবর্তিত বিভ্রান্তি হতে রক্ষাকল্পে যৌক্তিক দৃষ্টিকােণ থেকে ইসলামী আক্বীদা-বিশ্বাসকে সমর্থনের উদ্দেশ্যে বিকাশ লাভ করেন। এঁরা ক্বুরআন ও সুন্নাহকে প্রশ্নাতীতভাবে সত্য এবং এই দুটো উৎসের কর্তৃত্বকে চূড়ান্ত জ্ঞান করতেন। এতদসত্ত্বেও তাঁরা মনে করতেন ক্বুরআন ও সুন্নাহের শিক্ষা যুক্তির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। নুসূস্ তথা পবিত্র ধর্মশাস্ত্রলিপিগুলোর সঠিক উপলব্ধি এবং ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের ও অগ্রাধিকারের কিছু নির্দিষ্ট নীতিমালা প্রতিষ্ঠার জন্যে তাঁরা যুক্তি প্রয়োগ করতেন। আশ’আরীবৃন্দ অাল্লাহতা’লার নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্বের পক্ষে মতামত ব্যক্ত করতেন; কেননা সেটা যুক্তি দাবি করে এবং মোহকামাহ (প্রকাশ্য আদেশ) ও কাতে’ঈ (স্পষ্ট) ধর্মশাস্ত্রীয় দলিলাদি প্রচার করে। আশ’আরীবৃন্দ অভিমত ব্যক্ত করেন যে আল্লাহ একাই চির অস্তিত্বশীল সত্তা। তাঁর এই অস্তিত্ব অত্যাবশ্যক বলে জ্ঞাত এই কারণে যে এ বিশ্বজগত, যেটা অপরূপ সুন্দর এক বিস্ময়কর ও মস্তিষ্ক-ধাঁধানো নিখুঁত সৃষ্টিকর্ম, সেটার জন্যে প্রয়োজন এক উৎসমূল তথা স্রষ্টার, যিনি সমস্ত অস্তিত্বশীল সত্তার প্রধান কারণ হওয়া সত্ত্বেও নিজে সকল কারণের উর্ধ্বে অবস্থান করছেন। বাকি সব কিছু তাঁরই সাপেক্ষে হয়তো অস্তিত্বশীল, আবার হয়তো অনস্তিত্বশীল-ও। তাঁর অস্তিত্ব অত্যাবশ্যক হয়ে তিনি সকল ধরনের পরিবর্তনের অতীত; অনাদি ও অনন্ত; অথচ প্রতিটি বস্তুরই আরম্ভ আছে, আর সেটা পরিবর্তন ও লয়প্রাপ্তি সাপেক্ষ। অধিকন্তু, অবশ্য অস্তিত্বশীল এই সত্তা তাঁর পবিত্র যাত (সত্তা) ও গুণাবলী উভয় ক্ষেত্রেই অনন্য। কোনো সৃষ্টি-ই তাঁর (যাতী) সিফাত তথা সত্তাগত বৈশিষ্ট্যাবলীর কোনোটির শরীকদার নয়, আর তিনিও কোনো সৃষ্টির গুণাবলীর কোনোটি দ্বারা গুণান্বিত নন। ফলে তিনি দেহবিশিষ্ট নন, অণুকণার অংশ দ্বারাও গঠিত নন; তাঁর কোনো দিক বা সীমা যেমন নেই, তেমনি স্থান বা কাল দ্বারাও তিনি আবদ্ধ নন। তিনি আমাদের কল্পনারও অতীত। তিনি এ জগতের (অভ্যন্তরে) যেমন নন, তেমনি এর বাইরেও নন; পৃথিবীর সাথে যেমন সংশ্লিষ্ট তিনি নন, তেমনি পৃথকও নন। যদিও তিনি অস্তিত্বশীল, আর তাঁর এই অস্তিত্ব অত্যাবশ্যক, তবুও আমরা তাঁর অস্তিত্বের প্রকৃতি উপলব্ধি করতে অক্ষম।
[৩৫] নোট: সূফীবৃন্দ হলেন সেই পুণ্যাত্মা, যাঁরা অভ্যন্তরে তথা অন্তরের গভীরে শরীয়তকে অনুসরণ করেন, যার দরুন তার প্রভাব বাইরে দৃশ্যমান হয়; উপরন্তু তাঁরা শরীয়তকে বাহ্যিকভাবেও অনুসরণ করেন, যার দরুন তার প্রভাব অন্তস্তলে দৃশ্যমান হয়। এটাই হচ্ছে শায়খ শরীফ আল-জুরজা’নী কর্তৃক নিজ ‘আল-তা’রিফাত’ গ্রন্থে প্রদত্ত সূফীবাদের সংজ্ঞা। এটা এমন এক বিদ্যা যার উদ্দেশ্য আত্মার পরিশুদ্ধি ও ব্যক্তিত্বের পুনর্গঠন, যাতে সূফী/দরবেশবৃন্দ আল্লাহর অস্তিত্বের প্রকৃত সচেতনতার মাঝে বেঁচে থাকেন, আর মহান প্রভু তাঁদের যে দায়িত্ব অর্পণ করেছেন, তাতে শৈথিল্যের মধ্যে তাঁদের যেন তিনি না পান, আর তিনি তাঁদের যা বারণ করেছেন, তাতেও লিপ্ত না পান। এই দিক থেকে সূফীবাদ একটি বৈধ ইসলামী বিদ্যা। বরঞ্চ এটা একটা উচ্চতর বিদ্যা। এতদসত্ত্বেও এই জ্ঞান আক্বায়েদ (আক্বীদা-বিশ্বাস), ফেক্বাহ, উসূলে ফেক্বাহ, ক্বুরআনের তাফসীর, হাদীসের নীতিমালা, আরবী ব্যাকরণ, বালাগ্বাত (আরবী ভাষাতত্ত্ব)-এর মতো অন্যান্য ইসলামী জ্ঞানের পরিপূরক এবং সেগুলোর ওপর নির্ভরশীল-ও। যদি সূফীবাদ বৈধর্মিক বিবৃদ্ধি দ্বারা আক্রান্ত হয়ে থাকেও, তবুও তা তার বৈধ ও মহৎ বিদ্যা হওয়াকে রহিত করেনি, ঠিক যেমনিভাবে ইহুদী ও খৃষ্টানদের মিথ্যে লোক-বিদ্যার বিবৃদ্ধি ক্বুরআন মজীদের তাফসীরকে বৈধ ও মহৎ বিদ্যা হওয়া থেকে রহিত করেনি। তাফসীরবিদ ইমামবৃন্দ যেমন ভেজাল বস্তু ওই বিদ্যাশাস্ত্র হতে দূর করে সেটাকে পরিশুদ্ধ এবং সেটার সঠিক/নির্ভুল নীতিমালা প্রতিষ্ঠা করেছেন, ঠিক তেমনি সূফীবাদের ইমামবৃন্দ-ও এই শাস্ত্রকে অবৈধ বস্তু হতে পরিশুদ্ধ করেছেন। শায়খ আবদুল ক্বাদির আল-জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি হতে বর্ণিত আছে যে তিনি বলেন, “আমি আমার সময়কার ভণ্ড সূফীদের থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।”।
[৩৬] নোট: দেখুন হাফেয ইবনে হাজর আসক্বালানী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর প্রণীত ‘আল-দুরার আল-কামিনা’ গ্রন্থ, ১:১১৪।
[৩৭] আহমদ : আল মুসনাদ, মুসনাদু আলী ইবনে আবী তালিব, ১/৯৫ হাদীস নং ৭৩১।(ক) তিরমিযী : আস সুনান, ৬/৯৩ হাদীস নং ৩৭৩৬।
(খ) নাসায়ী : আস সুনান, আলামাতুল ইমান, ৮/১১৫ হাদীস নং ৫০১৮।
(গ) তবরানী : আল মু‘জামুল আওসাত, ২/৩৩৭ হাদীস নং ২১৫৬।]
[৩৮] আল কুরআন : আল কাহাফ, ১৮:১০৪।
                                              *সমাপ্ত*


     

    


  

শুক্রবার, ২৮ এপ্রিল, ২০১৭

শবে বরা'তের ফযীলত

মূল: শাইখ মুহাম্মদ হিশাম কাব্বানী (রহ.)
অনুবাদ: কাজী সাইফুদ্দীন হোসেন

[আরবী রিসোর্স: দ্বীনীভাই ও ফেইসবুক-বন্ধু জনাব Mahmud Hasan]

[Bengali translation of www.sunnah.org's article "Benefits of mid-Sha'ban night"]

ইমাম গাযযালী (রহ:) তাঁর ‘এহইয়ায়ে উলূম আল-দ্বীন’ গ্রন্থে লিখেছেন,

فضائل ليلة النصف من شعبان
كتب الأمام الغزالي: وليلة النصف من شعبان – ففيها مائة ركعة يقرا في كل ركعة بعد الفاتحة سورة الاخلاص عشر مرات كانوا لا يتركونها كما اوردناه في صلاة التطوع – وليلة عرفة‏ . ( إحياء علوم الدين )

অর্থাৎ, “মধ্য-শা’বান (মাস)-এর রাতে (অর্থাৎ, শবে বরা’তে) ১০০ রাকআত (নফল) নামায পড়বে, যা’তে প্রতি রাকআতে সূরা ফাতেহার পর ১০ বার সূরা এখলাস থাকবে; তাঁরা (সাহাবায়ে কেরাম ও সালাফবৃন্দ) এটি তরক (ত্যাগ) করেন নি, যেমনিভাবে আমরা সম্পৃক্ত হয়েছি অতিরিক্ত নফল নামায ও আ’রাফাত রজনীর সাথে।” [গ্রন্থ সূত্র: ইমাম গাযযালী (রহ:) কৃত ‘এহইয়ায়ে উলূম আল-দ্বীন’]

শায়খ ইসমাঈল হাক্কী তাঁর কৃত ’তাফসীরে রুহুল বয়ান’ পুস্তকে বলেন,

وقال بعض المفسرين المراد من الليلة المباركة ليلة النصف من شعبان ولها أربعة اسماء الاول الليلة المباركة لكثرة خيرها وبركتها على العاملين فيها الخير وان بركات جماله تعالى تصل الى كل ذرة من العرش الى الثرى كما فى ليلة القدر وفى تلك الليلة اجتماع جميع الملائكة فى حظيرة القدس.

অর্থাৎ, “তাফসীরকার উলামাদের কয়েকজন বলেন যে কুরআন মজীদে সুরা দুখান-এর ৩ নং আয়াতে উল্লেখিত ‘লাইলাতুল মুবারক’ তথা ’বরকতময় রজনী’ বলতে মধ্য-শা’বানের রাতকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে। আর এই রাতের ৪টি নাম: প্রথমটি ‘বরকতময় রজনী’, যেহেতু অসংখ্য মানুষ এই রাতে নেক আমল পালন করেন; আর বাস্তবিকই এতে আল্লাহতা’লার সৌন্দর্যের নেয়ামত আরশ-কুরসি থেকে দুনিয়াপৃষ্ঠ পর্যন্ত বিরাজমান প্রতিটি অণুকণার কাছে পৌঁছে থাকে, যেমনিভাবে তা ঘটে ’লাইলাতুল কদর’ রজনীতে, যা’তে ফেরেশতাকুল মহান আল্লাহতা’লার দরবারে হাজির হন।” [গ্রন্থ সূত্র: শায়খ ইসমাঈল হাক্কী প্রণীত ’তাফসীরে রুহুল বয়ান’, সুরা দুখান, আয়াত ৩ এঁর তাফসীর]

সুরা দুখানের ৩-৪ নং আয়াতে এরশাদ হয়েছে,

إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُّبَارَكَةٍ ۚ إِنَّا كُنَّا مُنذِرِينَ
فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ

“নিশ্চয় আমি (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি বরকতময় রাতে; নিশ্চয় আমি সতর্ককারী। তাতে (ওই রাতে) বণ্টন করে দেয়া হয় প্রতিটি হেকমতময় কাজ।” [ক্বুরআ'নুল কারিম, সুরা দুখান, আয়াত ৩ - ৪]

এই আয়াতের ব্যাখ্যা নিয়ে প্রাথমিক জমানার তাফসীরবিদদের মধ্যে মতপার্থক্য আছে।

أولاً: ما ورد فى فضل هذه الليلة في القرأن و تفسيره

ক্বুরআ'নুল কারিম ও তাফসীর সমূহে এই রজনীর মাহাত্ম্য সম্পর্কে আলোচনা:

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:)-সহ বেশির ভাগ উলামা বলেছেন ওই রাত ‘শবে কদরের’। পক্ষান্তরে, হযরত একরিমাহ (রা:) ও তাঁর সাথে একমত পোষণকারী উলামাবৃন্দ বলেছেন যে সেটা ’শবে বরাত’।

উপরোক্ত আয়াতটি (৪৪:৩-৪) প্রসঙ্গে মাহমূদ আলুসী নিজ তাফসীরগ্রন্থে বলেন,

– قال الألوسي في تفسيره عند قوله تعالى: ﴿فِي لَيْلَةٍ مُبَارَكَةٍ إِنَّا كُنَّا مُنْذِرِين﴾: “هي ليلة القدر على ما روى ابن عباس وقتادة وابن جبير ومجاهد وابن زيد والحسن، وعليه أكثر المفسرين والظواهر معهم، وقال عكرمة وجماعة: هي ليلة النصف من شعبان”. وقال الطبري في تفسيره عن هذه الآية الكريمة: واختلف أهل التأويل في تلك الليلة، أي ليلة من ليالي السنة هي؟ فقال بعضهم: هي ليلة القدر، ثم ذكرهم، وقال بعد سردهم: “وقال آخرون: بل هي ليلة النصف من شعبان، ولم يذكرهم”،.

অর্থাৎ, সর্ব-হযরত ইবনে আব্বাস (রা:), কাতাদাহ (রা:), ইবনে জুবাইর (রা:), মুজাহিদ (রা:), ইবনে যায়দ (রা:) ও আল-হাসান (রা:)-এর মতানুযায়ী পবিত্র আয়াতুল কারিম (৪৩:৩ "إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُّبَارَكَةٍ ۚ إِنَّا كُنَّا مُنذِرِينَ ")-এ উল্লেখিত রাত হলো শবে কদর। আর এটি-ই অধিকাংশ মোফাসসেরীন তথা তাফসীরকারক উলেমার অভিমত। পক্ষান্তরে, হযরত একরিমাহ (রা:) ও তাঁর দল বলেন, “এটি মধ্য শা’বানের রাত।”

আত্ তাবারী তাঁর তাফসীরে এই পবিত্র আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন: তাফসীর বিশারদমণ্ডলীর মাঝে এই রজনীর বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে: তা হলো, সেটি বছরের কোন্ রজনী? আর তাঁদের কেউ কেউ এটিকে 'লাইলাত আল ক্বদর' বলে মত প্রকাশ করেছেন, অতঃপর তিনি তাঁদের নাম উল্লেখ করেন; তিনি এরপর বলেন যে তিনি তাঁদের কারো কারো বর্ণনাও উল্লেখ করবেন।

অন্যান্য তাফসীরকারবৃন্দ অবশ্য এর সাথে ভিন্ন অভিমত পেশ করেছেন। তাঁরা বলেন, “না, এটি মধ্য শা'বানের রজনী হবে”, অবশ্য তিনি তাঁদের নাম উল্লেখ করেন নি। [গ্রন্থ সূত্র: আল্লামা মাহমুদ আলুসী (রহ:) রচিত তাফসীরে রুহুল মা'আনী, ৩-৪ নং আয়াতের তাফসীর]

وقال النيسابوري في تفسير الآية الكريمة أيضًا: وأكثر المفسرين على أنها ليلة القدر لقوله تعالى: ﴿إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ﴾ (القدر:1)، وليلة القدر عند الأكثر في رمضان.

অর্থাৎ, আন্ নিসাপুরী তাঁর প্রণীত তাফসীরগ্রন্থে এই পবিত্র আয়াত প্রসঙ্গে বলেন, “বেশির ভাগ তাফসীরকার এই রাতকে লাইলাতুল কদর বলে চিহ্নিত করেছেন। কেননা মহান আল্লাহতা’লা এরশাদ ফরমান, ‘নিশ্চয় আমি তা (কুরআন) ক্বদরের রাতে অবতীর্ণ করেছি’ (৯৭:০১)। আর অধিকাংশ উলামার মতে কদরের রাত রমযান মাসে।”

ثم نقل كلام الطبري وقال بعده: وزعم بعضهم كعكرمة وغيره أنها ليلة النصف من شعبان

অর্থাৎ, আমরা আত্ তাবারীর বক্তব্যের অংশ বিশেষও এখানে উদ্ধৃত করবো; তিনি বলেন, “হযরত একরিমাহ (রা:)-এঁর মতো (প্রাথমিক যুগের) কতিপয় মুফাসসির দাবি করেন যে এই আয়াতে মধ্য শা’বানের রাতকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে।”

ما ورد من أحاديث في فضل هذه الليلة، ومن ذلك

ফজিলতপূর্ণ এই রজনী সম্পর্কে প্রিয়নবী (দ:)-এর আহাদীস

اربع لياليهن كايامهن وايامهن كلياليهن يبر الله فيهن القسم ويعتق فيهن النسم ويعطي فيهن الجزيل‏:‏ ليلة القدر وصباحها، و ليلة عرفة وصباحها، وليلة النصف من شعبان وصباحها و ليلة الجمعة وصباحها‏.‏ ‏(‏الديلمي – عن انس‏)‏‏.‏

অর্থাৎ, হযরত আনাস (রা:)-এর বর্ণিত একটি হাদীসে মহানবী (দ:) এরশাদ ফরমান যে ৪টি রাতে আল্লাহতা’লা তাঁর প্রতিশ্রুতি পূরণ করেন এবং নেয়ামত দেন। এগুলো হলো, শবে কদরের রাত ও এরপরে আগত সকাল; আ’রাফাতের রাত ও তৎপরবর্তী সকাল; শবে বরা’ত ও তৎপরবর্তী সকাল এবং প্রতি জুমু’আর রাত ও তৎপরবর্তী সকাল। [দায়লামী শরীফ]

يسح الله عز وجل من الخير في اربع ليال سحا‏:‏ ليلة الاضحى والفطر وليلة النصف من شعبان، ينسخ فيها الاجال والارزاق ويكتب فيها الحج، وفي ليلة عرفة الى الاذان‏.

অর্থাৎ, হযরত আয়েশা (রা:)-কে রাসূলুল্লাহ (দ:) বলেন, ৪টি রাতে আল্লাহর সীমাহীন অনুগ্রহ ও দয়া বান্দাদের জন্যে অবারিত হয়:

১/ ঈদুল আযহার (আগের দিনগত) রাত;
২/ ঈদুল ফিতরের রাত;
৩/ মধ্য-শা’বানের রাত (শবে বরাত), যা’তে আল্লাহ বান্দার হায়াত নির্ধারণ করেন এবং রিযিকও বন্টন করেন; আর কারা কারা হজ্জ্ব করবেন, তাও নির্ধারিত হয়;
৪/ আ’রাফাত রজনী - আযান হওয়া অবধি।

واخرج ابن جرير وابن المنذر وابن ابي حاتم من طريق محمد بن سوقة، عن عكرمة ‏}‏فيها يفرق كل امر حكيم‏{‏ قال‏:‏ في ليلة النصف من شعبان يبرم امر السنة وينسخ الاحياء من الاموات ويكتب الحاج، فلا يزاد فيهم ولا ينقص منهم احد‏.‏

অর্থাৎ, আল-কুরআনে বর্ণিত “ওই রাতে বণ্টন করে দেয়া হয় প্রতিটি হেকমতময় কাজ” (৪৪:৪) - আয়াতটি প্রসঙ্গে হযরত একরিমাহ (রা:) বলেন, “এটি মধ্য-শা’বানের রাত, যখন আল্লাহ পাক (আগামী) সারা বছরের বিষয়গুলো (নিয়মবদ্ধভাবে) সাজান। তিনি জীবিতদের কাউকে কাউকে মৃতদের তালিকাভুক্ত করেন, আর যারা আল্লাহর ঘরে হজ্জ্ব করতে যাবেন, তাদের নামও লিপিবদ্ধ করেন; এতে তিনি বেশি মানুষের নাম যেমন অন্তর্ভুক্ত করেন না, তেমনি তিনি কাউকে বাদও দেন না।”

واخرج ابن زنجويه والديلمي، عن ابي هريرة ان رسول الله صلى الله عليه وسلم قال‏:‏ ‏”‏تقطع الاجال من شعبان الى شعبان، حتى ان الرجل لينكح ويولد له، وقد خرج اسمه في الموتى‏”‏‏.‏

অর্থাৎ, হযরত আবূ হোরায়রা (রা:) বর্ণনা করেন হযরত রাসূলে করীম (দ:)-এর বাণী, যিনি এরশাদ ফরমান:
“মানুষের হায়াত এক শা’বান থেকে আরেক শা’বান মাসে কর্তন করা হয়, যার দরুন কেউ হয়তো বিয়ে-শাদী করে সন্তানের জনকও হতে পারে, অথচ তার নাম জীবিতদের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে ভাগ্যে মৃত্যু লেখা হয়ে গিয়েছে।”

واخرج ابن ابي شيبة، عن عطاء بن يسار قال‏:‏ لم يكن رسول الله صلى الله عليه وسلم في شهر اكثر صياما منه في شعبان، وذلك انه ينسخ فيه اجال من ينسخ في السنة‏.‏

অর্থাৎ, হযরত আতা ইবনে এয়াসার (রা:) বলেন, “মহানবী (দ:) শা’বান মাসে যেভাবে (নফল) রোযা রাখতেন, অন্য কোনো মাসে সেভাবে রাখতেন না। আর এটি এ কারণে যে, ওই বছর যারা মৃত্যুবরণ করবেন, তা তাতে লিপিবদ্ধ হতো।”

واخرج ابن مردويه وابن عساكر، عن عائشة قالت‏:‏ لم يكن رسول الله صلى الله عليه وسلم في شهر اكثر صياما منه في شعبان لانه ينسخ فيه ارواح الاحياء في الاموات، حتى ان الرجل يتزوج وقد رفع اسمه فيمن يموت، وان الرجل ليحج وقد رفع اسمه فيمن يموت‏.‏

অর্থাৎ, হযরত আয়েশা (রা:) বলেন, “রাসূলুল্লাহ (দ:) অন্য কোনো মাসে এতো অধিক (নফল) রোযা রাখতেন না যেমনটি রাখতেন শা’বান মাসে; কারণ এতে জীবিত যারা মারা যাবেন তাদের নাম লিপিবদ্ধ করা হয়, যে পর্যন্ত না কেউ বিয়ে করেন অথচ তার নাম মৃতদের তালিকায় লিপিবদ্ধ হয়ে গিয়েছে; আর কেউ হজ্জ্ব করেন, কিন্তু তার নাম মৃতদের তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে।”

أخرجه بن ماجه والبيهقي في شعب الإيمان عن علي- كرم الله وجهه- قال: قال رسول الله- صلى الله عليه وسلم: “إذا كانت ليلة النصف من شعبان فقوموا ليلها، وصوموا نهارها، فإن الله ينزل فيها لغروب الشمس إلى سماء الدنيا، فيقول: ألاَ من مستغفر لي، فأغفر له! ألا مسترزق فأرزقه! ألا مبتلىً فأعافيه! ألا كذا ألا كذا حتى يطلع الفجر”.

অর্থাৎ, সাইয়্যেদুনা হযরত আলী (ক:) থেকে বর্ণিত যে মহানবী (দ:) এরশাদ ফরমান: “মধ্য-শা’বানের রাত তোমরা এবাদত-বন্দেগী করে অতিবাহিত করো এবং ওই দিন রোযা রেখো। কেননা, নিশ্চয় সূর্যাস্ত থেকে আরম্ভ করে এই রাতে আল্লাহতা’লা সর্বনিম্ন (নিকটতম) আসমানে নেমে আসেন এবং বলেন, ‘কেউ কি আছো ক্ষমা চাইবার, যাকে আমি ক্ষমা করে দিতে পারি? কেউ কি আছো রিযক চাইবার, যাকে রিযক মঞ্জুর করতে পারি? কেউ কি আছো মসিবত/পরীক্ষায়, যাকে তা থেকে মুক্ত করে দিতে পারি?’ ইত্যাদি, ইত্যাদি, যতোক্ষণ না ফজরের সময় (সূর্যোদয়) হয়।” [হযরত আবদুর রাযযাক (রা:) ও ইবনে মাজাহ বর্ণিত]

أخرجه الترمذي وابن أبي شيبة والبيهقي وابن ماجه عن عائشة قالت: فقدت رسول الله- صلى الله عليه وسلم- ذات ليلة فخرجت أطلبه، فإذا هو بالبقيع رافعًا رأسه إلى السماء، فقال: “يا عائشة، أكنت تخافين أن يحيف الله عليك ورسوله؟”، فقلت: ما بي من ذلك، ولكني ظننت أنك أتيت بعض نسائك، فقال: “إن الله- عز وجل- ينزل في ليلة النصف من شعبان إلى السماء الدنيا، فيغفر لأكثر من عدد شعر غنم بني كلب”.

অর্থাৎ, হযরত আয়েশা (রা:) বলেন, “এক রাতে আমি হুযূর পাক (দ:)-কে (ঘরে) না পেয়ে ’বাকী’ কবরস্থানে যাই (এবং সেখানে তাঁর দেখা পাই)। এই সময় তাঁর পবিত্র মস্তক মোবারক আসমানের দিকে ওঠানো ছিল। তিনি বলেন, ‘ওহে আয়েশা! তুমি কি আশংকা করো যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (দ:) তোমার প্রতি অন্যায্য আচরণ করবেন?’ আমি বল্লাম, এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:)! আমি মনে করেছিলাম আপনি হয়তো আপনার কোনো বিবি সাহেবার কাছে গিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মধ্য-শা’বানের রাতে মহান আল্লাহতা’লা সর্বনিম্ন (নিকটতম) আসমানে অবতরণ করেন এবং বনূ কালব্ গোত্রের মালিকানাধীন সমস্ত ভেড়ার গায়ে যতো লোম আছে, ওই সংখ্যক মানুষকে ক্ষমা করে দেন’।” [ইমাম আহমদ, ইবনে মাজাহ ও তিরমিযী বর্ণিত হাদীস; শেষোক্ত হাদীসবিদ বলেন যে তিনি শুনেছেন ইমাম বোখারী (রহ:) একে ’দুর্বল’ শ্রেণীভুক্ত করেছেন, কেননা এর কতিপয় বর্ণনাকারী হাদীসটি একে অপরের কাছ থেকে সরাসরি বর্ণনা করেন নি।]

حَدَّثَنَا حَمَّادُ بْنُ اُسَامَةَ، قَالَ اَخْبَرَنَا عُبَيْدُ اللَّهِ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ يَحْيَى بْنِ حَبَّانَ، عَنِ الْاَعْرَجِ، عَنْ اَبِي هُرَيْرَةَ، عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ فَقَدْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ذَاتَ لَيْلَةٍ مِنْ الْفِرَاشِ فَالْتَمَسْتُهُ فَوَقَعَتْ يَدِي عَلَى بَطْنِ قَدَمَيْهِ وَهُوَ فِي الْمَسْجِدِ وَهُمَا مَنْصُوبَتَانِ وَهُوَ يَقُولُ اللَّهُمَّ اِنِّي اَعُوذُ بِرِضَاكَ مِنْ سَخَطِكَ وَبِمُعَافَاتِكَ مِنْ عُقُوبَتِكَ وَاَعُوذُ بِكَ مِنْكَ لَا اُحْصِي ثَنَاءً عَلَيْكَ اَنْتَ كَمَا اَثْنَيْتَ عَلَى نَفْسِكَ‏.(مسند أحمد و مسلم و نحوه في سنن النسائي و موطأ مالك و سنن أبي داود و صحيح ابن خزيمة و سنن الترمذي و سنن ابن ماجه)

অর্থাৎ, উম্মুল মো’মেনীন হযরত আয়েশা (রা:) থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন: “এক রাতে আমি রাসূলুল্লাহ (দ:)-কে বিছানায় পাই নি; (খুঁজে পেয়ে) আমার হাত তাঁর কদম মোবারকের মধ্যভাগ স্পর্শ করে, আর ওই সময় তিনি মসজিদে ছিলেন। তাঁর পবিত্র দুই পায়ের পাতা খাড়া ছিল (অর্থাৎ, সেজদায় ছিলেন)। এমতাবস্থায় তিনি বলেন, ‘আমি আপনার (আল্লাহর) শাস্তি হতে আপনারই ক্ষমার মাঝে আশ্রয় নিচ্ছি; আপনার না-রাজি হতে আপনারই রেযামন্দির আশ্রয় নিচ্ছি; আর আপনার (রুদ্ররোষ) হতে আপনারই মাঝে আশ্রয় নিচ্ছি। আপনার যেভাবে প্রশংসা প্রাপ্য, সেভাবে আমি আপনার প্রশংসা করতে অপারগ। আপনি তা-ই, যেভাবে আপনি আপনার পরিচয় দিয়েছেন’।” [এই হাদীস বর্ণনা করেন ইমাম আহমদ, ইবনে মাজাহ, আবূ দাউদ, নাসাঈ ও তিরমিযী।]

وفي رواية { جاءني جبريل ليلة النصف من شعبان فقال يا محمد ارفع راسك الى السماء فقلت ماهذه الليلة ، قال هذه ليلة يفتح الله فيها ثلاثمائة من ابواب الرحمة يغفر الله لجميع من لا يشرك به شيئاً }

অর্থাৎ, অপর এক রওয়ায়াতে মহানবী (দ:) এরশাদ ফরমান: “মধ্য-শা’বানের রাতে জিবরীল আমীন (আ:) আবির্ভূত হয়ে আমাকে বলেন, ‘এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:)! আপনার সে’র (মস্তক) মোবারক আসমানের দিকে উত্থিত করুন।’ আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করি, এটি কোন্ রাত? তিনি জবাব দেন, ‘এটি সেই রাত যখন মহান আল্লাহতা’লা তাঁর রহমতের তিন‘শটি দ্বার উম্মুক্ত করেন এবং সে সব ব্যক্তিকে মাফ করে দেন যারা তাঁর সাথে (কোনো উপাস্যকে) শরীক করে নি’।”

يقول رسول الله صلى الله عليه وسلم : { إذا كانت ليلة النصف من شعبان فتحت أبواب السماء السبع ووقف على كل باب ملائكة يستغفرون للمسلمين ، فيغفر لكل مسلم إلا من كان مصراً على كبيرة }

অর্থাৎ, হুযূর করীম (দ:) অন্যত্র এরশাদ ফরমান: “মধ্য-শা’বানের রাতে (শবে বরা’তে) সপ্তম আসমানের দ্বারগুলো খুলে দেয়া হয়; আর প্রতিটি দ্বারে ফেরেশতারা দাঁড়িয়ে মুসলমানদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন যতোক্ষণ না প্রত্যেক মুসলমানকে মাফ করা হয়; এর ব্যতিক্রম শুধু কবীরা গুনাহ সংঘটনকারীরা।”

عائشة رضي الله عنها تقول { كانت ليلتي من رسول الله صلى الله عليه وسلم فدخل الفراش حتى نمت ثم استيقظت فلم اجده فقمت فوجدته يصلي فخفف القيام ثم ركع وسجد مطولاً سجوده الى نصف الليل ثم قام الى الثانية كذلك ثم ركع وسجد حتى كاد الفجر أن يطلع فظننت انه قد قبض فوضعت يدي على قدميه فتحرك فحمدت الله تعالى فسمعته يقول : سجد لك سوادي وآمن بك فؤادي فاغفرلي الذنب العظيم فإنه لا يغفر الذنب العظيم الا الرب العظيم اعوذ برضاك من سخطك وبمعافاتك من عقوبتك وبك منك لا احصي ثناء عليك انت كما اثنيت على نفسك ، فلما فرغ من صلاته قال اتدرين أي ليلة هذه ياعائشة قلت لا قال : هذه ليلة النصف من شعبان إن الله يطلع على عباده في ليلة النصف من شعبان فيغفر للمستغفرين ويرحم المسترحمين ويؤخر اهل الحقد كما هم }

অর্থাৎ, উম্মুল মো’মেনীন হযরত আয়েশা (রা:) থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন: “রাসূলে পাক (দ:) এক রাতে আমার ঘরে ছিলেন; তিনি বিছানায় শুয়েছিলেন যতোক্ষণ না আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। অতঃপর তিনি শয্যা ত্যাগ করেন এবং আমি (জেগে উঠে) তাঁকে (বিছানায়) পাই নি। তাঁকে দেখতে পেলাম নামাযে; সংক্ষিপ্তভাবে দাঁড়িয়ে ও রুকু করে তিনি অত্যন্ত দীর্ঘ এক সেজদায় যান, যার ফলে অর্ধেক রাত তাতেই অতিবাহিত হয়। অতঃপর তিনি দ্বিতীয় রাকআতে উঠে দাঁড়ান এবং আবারও রুকু করে দীর্ঘ সেজদায় সময় অতিবাহিত করেন, যার দরুন প্রায় ফজরের ওয়াক্ত উপস্থিত হয়। আমার এমন আশঙ্কা হয় যে তিনি বুঝি বেসাল (খোদার সাথে পরলোকে মিলিত) হয়েছেন। তাই আমি তাঁর মোবারক কদমে হাত রাখি, আর তিনি নড়ে ওঠেন এবং আল্লাহর প্রশংসা করেন। আমি তাঁকে বলতে শুনি, ‘এয়া আল্লাহ! আমি আপনাকে সেজদা করেছি (সারা) রাতের অন্ধকারে, আর (তাই) আমার অন্তর আপনার প্রতি পূর্ণ আস্থাশীল। অতএব, মহাপাপ (কবীরা গুনাহ) ক্ষমা করে দিন, কেননা তা মহাপ্রভু ছাড়া কেউই মাফ করতে পারে না। আমি আপনার বিরাগ ভাজন হওয়া থেকে আপনারই রেযামন্দির (সন্তুষ্টির) মাঝে আশ্রয় নিচ্ছি; আশ্রয় নিচ্ছি আপনার শাস্তি থেকে আপনারই ক্ষমার মাঝে; আর আপনার (রাগ) থেকে আপনারই মাঝে আশ্রয় নিচ্ছি। আপনি যেভাবে আপনার প্রশংসা করেছেন, আমি তা পুরোপুরিভাবে করতে অক্ষম।’ অতঃপর নামাযশেষে তিনি আমায় বলেন, ‘ওহে আয়েশা! তুমি কি জানো এটি কোন্ রাত?’ আমি বল্লাম, ‘না।’ তিনি বল্লেন, ‘মধ্য-শা’বানের রাত (শবে বরাত)। এই রাতে আল্লাহতা’লা তাঁর বান্দাদের দিকে নজর করেন এবং যারা এতে ক্ষমাপ্রার্থী হয় তাদেরকে মাফ করেন; আর যারা তাঁর করুণা প্রার্থনা করে, তাদের প্রতি তিনি নিজ করুণা বর্ষণ করেন। কিন্তু যাদের অন্তরে বিদ্বেষ আছে, তাদেরকে তিনি আগের সে অবস্থাতেই রেখে দেন’।”

وأخبرني أبو نصر قال أنبأني والدي حدثنا محمد بن أحمد الحافظ أنبأنا عبد الله بن محمد أنبأنا أبو العباس الهروي وابراهيم ابن محمد بن الحسن قالا أخبرنا أبو عامر الدمشقي أنبأنا الوليد بن مسلم أخبرني هشام بن ألغاو سلمان بن مسلم وغيره عن مكحول عن عائشة رضي الله عنها أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال لها يا عائشة أية ليلة هي قالت الله ورسوله أعلم فقال ليلة النصف من شعبان فيها ترفع أعمال الدنيا وأعمال العباد ولله فيها عتقاء من النار بعدد شعر غنم بني كلب فهل أنت أذنت لي الليل قالت قلت نعم فصلى فخفف القيام وقرأ الحمد وسورة خفيفة ثم سجد إلى شطر الليل ثم قام في الركعة الثانية فقرأ فيها نحوا من قراءة الأولى فكان سجوده إلى الفجر قالت عائشة رضي الله عنها وكنت أنظره حتى ظننت أن الله تعالى قد قبض رسوله صلى الله عليه وسلم فلما طال على دنوت منه حتى مسست أخص قدميه فتحرك فسمعته يقول في سجوده ( أعوذ بعفوك من عقابك وأعوذ برضاك من سخطك وأعوذ بك منك جل ثناؤك لا أحصى ثناءاً عليك أنت كما أثنيت على نفسك) قلت يا رسول الله قد سمعتك تذكر في سجودك الليلة شيئا ما سمعتك تذكره قط قال صلى الله عليه وسلم وعلمت ذلك قلت نعم قال صلى الله عليه وسلم تعليمهن وعلميهن فان جبريل عليه السلام أمرني أن أذكرهن في السجود وأخبرني أبو نصر عن والده قال أنبأنا عبد الله بن محمد أنبأنا اسحق بن احمد الفارسي أنبأنا أحمد بن الصباح بن أبى شريح أنبأنا يزيد بن هرون حدثنا الحجاج بن أرطأة عن يحيى بن أبى كثير عن عروة عن عائشة رضي الله عنها قالت فقدت رسول الله صلى الله عليه وسلم ذات ليلة فخرجت فإذا هو بالبقيع رأسه إلى السماء فقال لي أكنت تخافين أن يحيف الله ورسوله عليك فقلت له يا رسول الله ظننت أنك أتيت بعض نسائك فقال صلى الله عليه وسلم إن الله تعالى ينزل ليلة النص من شعبان إلى السماء الدنيا فيغفر لا كثر من عدد شعر غنم بني كلب وعن عكرمة مولى ابن عباس رحمه الله ورضي عنهما في قول الله تعالى (( فيها يفرق كل أمر حكيم )) قال هي ليلة النصف من شعبان يدبر الله تعالى أمر السنة وينسخ الأحياء إلى الأموات ويكتب حاج بيت الله فلا يزيد فيهم أحد ولا ينقص منهم أحد

অর্থাৎ, হযরত আবূ নাসর (রা:) থেকে সাইয়্যেদুনা গাউসুল আ’যম হযরত আবদুল কাদের জ্বিলানী (রহ:) তাঁর ‘গুনইয়াতুত্ তালেবীন’ পুস্তকে হযরত আয়েশা (রা:)-এর কথা উদ্ধৃত করেন; তিনি বলেন: “মধ্য-শা’বানের রাতে একবার মহানবী (দ:) আমার একখানি বস্ত্র অপসারণ করেন। আল্লাহর কসম! আমার ওই বস্ত্র রেশমও ছিল না, মিহি রেশমও ছিল না; সেটি সুতোরও ছিল না, আবার সুতো ও তুলোর (মিশ্রণ)-ও ছিল না; (এমন কি) তুলোরও ছিল না।” বর্ণনাকারী (আবূ নাসর) বলেন, “আল্লাহরই প্রশংসা! তাহলে সেটি কিসের তৈরি ছিল?” হযরত আয়েশা (রা:) উত্তর দেন, “এর বনুন হয়েছিল চুল ও রেশমের সংমিশ্রণে। আমি ধারণা করেছিলাম যে তিনি হয়তো তাঁর অপর কোনো স্ত্রীর কাছে গিয়েছিলেন; তাই আমি উঠে (অন্ধকার) কক্ষে তাঁর খোঁজ করি। আমার হাত তাঁর কদম মোবারক স্পর্শ করে। ওই সময় তিনি নামাযে সেজদারত ছিলেন। আমার মনে পড়ে, তিনি দোয়া করছিলেন এই বলে: ‘(এয়া আল্লাহ), আপনার সামনে সেজদারত আমার দেহ (মোবারক) ও রূহ (মোবারক), আর আমার অন্তর রয়েছে আপনারই হেফাযতে। আমি আপনার রহমত-বরকতের শোকর-গুজার করি এবং আপনার কাছেই আমার কৃতকর্ম স্বীকার করি। আমি এস্তেগফার করি; অতএব, আমায় মাফ করে দিন! আমি আপনার শাস্তি হতে আপনারই ক্ষমার মাঝে আশ্রয় নিচ্ছি; আপনার রাগ হতে আপনারই করুণার মাঝে আশ্রয় নিচ্ছি। আপনার না-রাজি থেকে আপনারই রেযামন্দির মাঝে আশ্রয় নিচ্ছি। আমি আপনার (রাগ) হতে আপনারই মাঝে আশ্রয় নিচ্ছি। আমি আপনার প্রশংসা করতে পারি না, কেননা আপনি তা-ই, যেভাবে আপনি আপনার নিজের প্রশংসা করেছেন’।” অতঃপর মা আয়েশা (রা:) আরও বলেন, “মহানবী (দ:) নামায পড়া ক্ষান্ত দেন নি, কখনো দাঁড়িয়ে, আবার কখনো বসে, যতোক্ষণ না ভোর হয়। অতঃপর তিনি তাঁর কদম মোবারক ওপরে তোলেন এবং আমি তা টিপে দেই। আমি তাঁকে বলি, আমার বাবা ও মা আপনার জন্যে কোরবান হোন। আল্লাহতা’লা কি নিশ্চয় আপনার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী কৃতকর্ম মাফ করে দেন নি? তিনি কি আপনার ব্যাপারে দয়াশীল হন নি? তা নয় কি? তা নয় কি? এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (দ:) উত্তর দেন, ‘ওহে আয়েশা! আমি কি তাহলে কৃতজ্ঞ বান্দা হবো না? তুমি কি জানো এই রাতে কী হয়?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়ে থাকে? তিনি বল্লেন, ‘এ রাতে সকল (শিশুর) জন্মের (দিন-ক্ষণ) লিখে রাখা হয়; আর সকল মৃত্যুরও। এই সন্ধিক্ষণে মনুষ্যজাতির রিযক-ও বরাদ্দ করা হয়, আর তাদের কৃতকর্মের হিসেব নেয়া হয়।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহর করুণা (রহমত) ছাড়া কি কেউই বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবেন না? তিনি আমায় বল্লেন, ‘কেউই আল্লাহর রহমত ছাড়া জান্নাতে যেতে পারবে না।’ অামি আবার জিজ্ঞেস করলাম, এমন কি আপনিও পারবেন না? বিশ্বনবী (দ:) উত্তর দিলেন, ‘না, এমন কি আমিও না, যতোক্ষণ না আল্লাহতা’লার রহমত আমাকে পরিবেষ্টন করছে।’ এরপর তিনি নিজ মস্তক ও চেহারা মোবারকে তাঁর হাত মোবারক বুলান।” [গ্রন্থ সূত্র: সাইয়্যেদুনা গাউসুল আ’যম হযরত আবদুল কাদের জ্বিলানী (রহ:) রচিত ‘গুনইয়াতুত্ তালেবীন’]

[বঙ্গানুবাদকের নোট: মহানবী (দ:)-এর উদ্ধৃত ‘কৃতকর্ম’ শব্দটি দ্বারা তিনি আমাদেরকে আল্লাহর কাছে মাফ চাইতে শিক্ষা দিয়েছেন। কেননা, ইসলামী আকীদা-বিশ্বাস হলো, আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দ বে-গুনাহ। বিশ্বনবী (দ:)-এর ‘এস্তেগফার’ করার মানে উম্মতের জন্যে সুপারিশ ছাড়া কিছু নয় (সূরা নিসা, ৬৪)।]

ان الله تعالى يطلع على عباده في ليلة النصف من شعبان فيغفر للمستغفرين، ويرحم المسترحمين، ويؤخر اهل الحقد كما هم عليه‏.‏ ‏(الطبراني في الكبير‏ عن عائشة‏‏)

অর্থাৎ, হযরত আয়েশা (রা:) অন্যত্র বর্ণনা নবী করীম (দ:)-এর হাদীস, যিনি বলেন: “মধ্য-শা’বানের রাতে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি নজর করেন এবং ক্ষমাপ্রার্থীদেরকে ক্ষমা করেন; আর যারা অন্তরে বিদ্বেষভাব পোষণ করে, তাদেরকে সেই অবস্থাতেই ছেড়ে দেন।” [আত্ তাবারানী কৃত ‘কবীর’ পুস্তক]

হাদীস ব্যাখ্যাকারীগণ বলেন যে বনূ কালব্ ওই সময় সবচেয়ে বড় গোত্র ছিল এবং এর সদস্যদের বড় বড় ভেড়ার পাল ছিল। অতএব, এই হাদীসে শেষ বাক্যটি ইশারা করে যে মহান আল্লাহ পাক ওই রাতে অসংখ্য মানুষকে মাফ করে থাকেন।

عن عبدالله بن عمرو بن العاص أن رسول الله- صلى الله عليه وسلم- قال: “يطلع الله- عز وجل- إلى خلقه ليلة النصف من شعبان، فيغفر لعباده إلا اثنين: مشاحن، وقاتل نفس”. أخرجه أحمد بن حنبل في المسند و لترمذي

অর্থাৎ, রাসূলে খোদা (দ:) এরশাদ ফরমান, “মধ্য-শা’বানের রাতে আল্লাহতা’লা তাঁর বান্দাদের দিকে তাকান এবং এবাদত-বন্দেগীতে রত বান্দাদেরকে ক্ষমা করেন; তবে দুই ধরনের লোককে তিনি ক্ষমা করেন না:
১/ অন্তরে বিদ্বেষভাব পোষণকারী; এবং
২/ খুনী।” [ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল প্রণীত ‘মুসনাদ’ ও আত্ তিরমিযী]

শবে বরাতে আল্লাহতা’লা তাঁর বান্দাদের প্রতি কৃপাদৃষ্টি করেন ও মো’মেন তথা বিশ্বাসীদেরকে ক্ষমা করেন; আর অবিশ্বাসীদেরকে শাস্তি প্রদানে নিবৃত্তি দেন, এবং যারা বিদ্বেষভাব পোষণ করে তাদেরকে নিজ নিজ বিদ্বেষের আবর্তে ছেড়ে দেন, যতোক্ষণ না তারা তাঁর কাছে ক্ষমা চায়।

اذا كان ليلة النصف من شعبان اطلع الله الى خلقه، فيغفر للمؤمنين، ويملي للكافرين، ويدع اهل الحقد بحقدهم حتى يدعوه‏.‏

অর্থাৎ, হযরত আবূ বকর (রা:) বর্ণনা করেন, “মধ্য-শা’বানের রাতে আল্লাহ পাক পৃথিবীর আকাশে অবতরণ করেন এবং প্রত্যেক মো’মেন (বিশ্বাসী) মুসলমানকে ক্ষমা করেন; এর ব্যতিক্রম শুধু পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান (আল-’আক্ক) ও যার অন্তরে বিদ্বেষভাব আছে।” [বায়হাকী তাঁর কৃত ‘শুআব’, ইবনে খুযায়মা (রা:) ও ইবনে হিব্বান (রা:)]

عن القاسم بن محمد بن ابي بكر الصديق عن ابيه عن عمه عن جده‏.‏ ينزل الله الى السماء الدنيا ليلة النصف من شعبان، فيغفر لكل بشر الا رجلا مشركا، او رجلا في قلبه شحناء‏.‏ ابن زنجويه والبزار وحسنه ‏( للدارقطني في السنن, لابن عدي في الكامل و للبيهقي في شعب الإيمان

অর্থাৎ, আল-কাসিম ইবনে মোহাম্মদ ইবনে আবি বকর সিদ্দিক (রহ:) তাঁর পিতা হতে, তিনি তাঁর চাচা হতে বর্ণনা করেন যে তাঁর পিতামহ বলেন: “আল্লাহতা’লা মধ্য-শা’বানের রাতে তাঁর সকল সৃষ্টির প্রতি কৃপাদৃষ্টি করেন এবং সবাইকে ক্ষমা করে দেন; ব্যতিক্রম শুধু যারা আল্লাহর সাথে শরীক করে এবং যাদের অন্তরে বিদ্বেষভাব আছে।” [ইবনে যানজুউইয়ীয়্যা, আদ্ দারু কুতনী কৃত ’সুনান’, ইবনে আদী প্রণীত ‘কামিল’ এবং আল-বায়হাকী রচিত ‘শুয়াবুল ঈমান’ গ্রন্থে উদ্ধৃত]

ينزل ربنا الى السماء الدنيا في النصف من شعبان، فيغفر لاهل الارض الا مشركا او مشاحنا‏.‏ (ابن زنجويه عن ابي موسى‏.‏)

অর্থাৎ, রাসূলে খোদা (দ:) এরশাদ ফরমান, “শবে বরাতের রাতে আমাদের প্রভু খোদাতা’লা পৃথিবীর আকাশে নেমে আসেন এবং দুনিয়াবাসীকে মাফ করেন; ব্যতিক্রম কেবল মূর্তি পূজারী ব্যক্তিবর্গ ও অন্তরে বিদ্বেষভাব লালনকারী লোকেরা।” [ইবনে মূসা হতে ইবনে যানজুউইয়ীয়্যা বর্ণিত]

يطلع الله تعالى الى خلقه في ليلة النصف من شعبان، فيغفر لجميع خلقه، الا لمشرك او مشاحن‏.‏ ‏(‏حب طب‏)‏ وابن شاهين في الترغيب ‏(‏و للبيهقي في شعب الإيمان ‏ وابن عساكر عن معاذ‏.‏)‏

অর্থাৎ, হযরত মুয়ায (রা:) মহানবী (দ:)-এর কথা বর্ণনা করেন; তিনি বলেন: “আল্লাহ পাক শবে বরাতে তাঁর সৃষ্টিকুলের প্রতি রহমতের নযর বিস্তৃত করেন এবং সবাইকে মাফ করেন; মাফ করেন না শুধু মুশরিক (মূর্তি পূজারী) ও অন্তরে বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যক্তিবর্গকে।” [ইবনে হিব্বান (১২:৪৮১ #৫৬৬৫), আল-আরনাওত এই এসনাদকে সহীহ বলেছেন; আত্ তাবারানী, আল-হায়তামী যার সনদকে সহীহ বলেছেন; আল-বায়হাকী কৃত ‘শুয়াবুল ঈমান’ এবং ইবনে আসাকিরও এই হাদীস বর্ণনা করেন]

ان الله تعالى ليطلع في ليلة النصف من شعبان فيغفر لجميع خلقه الا لمشرك او مشاحن ‏(‏مشاحن‏:‏ المشاحن‏:‏ المعادي، والشحناء العداوة‏.‏ النهاية‏.‏ 2/449‏.‏ ب‏)‏‏.‏ ‏(‏ه – عن ابي موسى‏)‏ ‏(‏اخرجه ابن ماجه كتاب اقامة الصلاة باب ما جاء في الليلة النصف من شعبان رقم ‏(‏1390‏)‏ وقال في الزوائد‏:‏ اسناده ضعيف‏.‏ سعيد ابن منصور في سننه‏)‏‏.‏

অর্থাৎ, রাসূলে পাক (দ:) এরশাদ ফরমান: “নিশ্চয় আমাদের প্রভু শবে বরাতে উদিত হন এবং সৃষ্টিকুলকে ক্ষমা করেন; ব্যতিক্রম শুধু মূর্তি পূজারী ও অন্তরে বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যক্তিবর্গ।” [ইবনে মাজাহ ও ইবনে মনসূর নিজ ‘সুনান’ পুস্তকে]

في ليلة النصف من شعبان يغفر الله لاهل الارض الا لمشرك او مشاحن‏.‏ ‏(‏ للبيهقي في شعب الإيمان عن كثير بن مرة الحضرمي مرسلا‏)‏‏.‏

অর্থাৎ, মহানবী (দ:) এরশাদ ফরমান: “মহান আল্লাহ পাক শবে বরাতে তাঁর সৃষ্টিকুলের প্রতি নজর করেন এবং সকল সৃষ্টিকে মাফ করেন; মাফ করেন না শুধু মূর্তি পূজারী ও অন্তরে বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যক্তিদের।” [আল-বায়হাকী কৃত ‘শুয়াবুল ঈমান’]

في ليلة النصف من شعبان يوحي الله الى ملك الموت بقبض كل نفس يريد قبضها في تلك السنة‏.‏ ‏(‏الدينوري في المجالسة – عن راشد بن سعد مرسلا‏)‏‏.‏

অর্থাৎ, শবে বরাতে আল্লাহতা’লা যমদূত আজরাঈলের কাছে ওই বছর যাদের জীবনাবসান চান, তাদের তালিকা প্রকাশ করেন। [রশীদ ইবনে সা’আদ হতে আদ্ দায়নূরী নিজ ‘আল-মাজালিসা’ গ্রন্থে (মুরসালান)]

اذا كان ليلة النصف من شعبان نادى مناد‏:‏ هل من مستغفر فاغفر له‏؟‏ هل من سائل فاعطيه‏؟‏ فلا يسال احد شيئا الا اعطاه الا زانية بفرجها او مشرك‏.‏ ‏(‏ للبيهقي في شعب الإيمان عن عثمان بن ابي العاص‏)‏‏.‏

অর্থাৎ, হযরত উসমান ইবনে আবি আল-’আস হতে ইমাম বায়হাকী তাঁর ‘শুয়াবুল ঈমান’ গ্রন্থে বর্ণনা করেন যে শবে বরা’তে আল্লাহ পাক ডেকে বলেন: “ক্ষমাপ্রার্থী কেউ আছো কি, যাকে আমি মাফ করতে পারি? আমার কাছে কোনো কিছূ প্রার্থী কেউ আছো কি, যাকে আমি তা মঞ্জুর করতে পারি?” ফলে যার যা প্রার্থনা, তা তিনি মঞ্জুর করেন; কিন্তু এর ব্যতিক্রম হলো দুরাচারে লিপ্ত ব্যভিচারিনী এবং মূর্তি পূজারী।

ان الله تبارك وتعالى ينزل ليلة النصف من شعبان الى سماء الدنيا فيغفر لاكثر من عدد شعر غنم كلب‏.‏ ‏(‏أحمد في مسنده،الترمذي ‏(‏اخرجه ابن ماجه كتاب اقامة الصلاة باب ما جاء في ليلة النصف من شعبان رقم ‏(‏1389‏)‏‏.‏ سعيد ابن منصور في سننه‏ عن عائشة‏)‏‏.

অর্থাৎ, হযরত আয়েশা (রা:) বর্ণনা করেন মহানবী (দ:)-এর হাদীস; তিনি এরশাদ ফরমান: “মহান আল্লাহতা’লা মধ্য-শা’বানের রাতে পৃথিবীর আকাশে অবতীর্ণ হন এবং বনূ কালব্ গোত্রের মালিকানাধীন ভেড়ার পালের সমস্ত ভেড়ার লোমের চেয়েও বেশি সংখ্যক মানুষকে ক্ষমা করেন।” [সাঈদ ইবনে মনসূর প্রণীত ‘সুনান’ দ্রষ্টব্য]

اذا كان ليلة النصف من شعبان يغفر الله من الذنوب اكثر من عدد شعر غنم كلب‏.‏‏( للبيهقي في شعب الإيمان – عن عائشة‏)‏‏.‏

অর্থাৎ, হযরত আয়েশা (রা:) বর্ণনা করেন রাসূলে খোদা (দ:)-এর বাণী: “শবে বরাতে আল্লাহতা’লা বণূ কালব্ গোত্রের সমস্ত ভেড়ার লোমের সমপরিমাণ গুনাহ মাফ করেন।” [বায়হাকী কৃত ‘শুয়াবুল ঈমান’]

يا عائشة‏!‏ اكنت تخافين ان يحيف ‏(‏يحيف‏:‏ الحيف‏:‏ الجور والظلم‏.‏ النهاية‏.‏ 1/469‏.‏ ب‏)‏ الله عليك ورسوله‏؟‏ بل اتاني جبريل فقال‏:‏ هذه الليلة ليلة النصف من شعبان، ولله فيها عتقاء من النار بعدد شعور غنم كلب، لا ينظر الله فيها الى مشرك ولا الى مشاحن ولا الى قاطع رحم ولا الى مسبل ‏(‏مسبل‏:‏ المسبل‏:‏ هو الذي يطول ثوبه ويرسله الى الارض اذا مشى‏.‏ وانما يفعل ذلك كبرا واختيالا‏.‏ النهاية‏.‏ 2/339‏.‏ ب‏)‏ ولا الى عاق لوالديه ولا الى مدمن خمر‏.‏ ‏(‏ للبيهقي في شعب الإيمان وضعفه – عن عائشة‏)‏‏.‏

অর্থাৎ, মা হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা:) হুযূর পূর নূর (দ:)-কে উদ্ধৃত করেন, যিনি বলেন: “ওহে আয়েশা! তুমি কি ভেবেছো আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (দ:) তোমার প্রতি অন্যায্য আচরণ করবেন? বরঞ্চ জিবরীল আমীন আমার কাছে এসে বল্লেন, ‘এটি-ই মধ্য-শা’বানের রাত। আল্লাহতা’লা এ রাতে বনূ কালব্ গোত্রের সমস্ত ভেড়ার লোমের সমসংখ্যক মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্ত করে দেন। কিন্তু তিনি মাফ করেন না মূর্তি পূজারীদের কিংবা অন্যদের প্রতি অন্তরে বিদ্বেষভাব পোষণকারীদের; অথবা আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারীদেরও; অথবা পায়ের গোড়ালির নিচে বস্ত্র পরিধানকারীদেরও (যারা অর্থ-বিত্তের দম্ভের প্রতীকস্বরূপ তা পরে); কিংবা পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তানদেরও; অথবা মদ্যপায়ীদেরও।” [বায়হাকী রচিত ‘শুয়াবুল ঈমান’]

এ যাবৎ যতো হাদীস ও রওয়ায়াত উদ্ধৃত হয়েছে, সেগুলো একত্র করলে স্পষ্ট হয়ে যাবে যে শবে বরা’তের ফযীলত তথা ইহ ও পারলৌকিক উপকারিতার ভিত্তি সুদৃঢ়; আর এই পবিত্র রাত এবাদত-বন্দেগীতে কাটানোর সুস্পষ্ট ইঙ্গিতও বিদ্যমান। বস্তুতঃ এ সব হাদীদের কিছু কিছুকে বেশ কিছু হাদীসবিদ সহীহ (বিশুদ্ধ) হিসেবে বিবেচনা করেছেন, আর বাকিগুলোতে ছোটখাটো পরিভাষাগত ত্রুটি রয়েছে বলে তাঁরা মনে করেছেন; এই পরিভাষাগত ত্রুটি হাদীসশাস্ত্র অনুযায়ী বিভিন্ন বর্ণনার সমন্বয়ে সারানো যায়। এ কারণেই এই উম্মাহ’র বুযূর্গানে দ্বীনবৃন্দ শবে বরা’তকে রহমত-বরকতময় রজনী হিসেবে এবাদত-বন্দেগীর মাধ্যমে পালন করেছেন যুগে যুগে।

শবে বরাতের দোয়া

هذا الدعاء ما علمنا عن أصله أنه ذكر، أو بعضه قد ورد على لسان بعض الصحابة والتابعين الصالحين، قال الألوسي في تفسيره:
أخرج بن أبي شيبة في المصنف وغيره عن ابن مسعود – رضي الله عنه- قال: ما دعا عبد قط بهذه الدعوات إلا وسع الله عليه في معيشته: “يا ذا المن ولا يمن عليه، يا ذا الجلال والإكرام، يا ذا الطول، لا إله إلا أنت، ظهر اللاجئين وجار المستجيرين، ومأمن الخائفين، إن كنت كتبتني عندك في أم الكتاب شقيًّا فامح عني اسم الشقاوة، وأثبتني عندك سعيدًا، وإن كنت كتبتني عندك في أم الكتاب محرومًا مقترًا عليَّ رزقي، فامح حرماني، ويسر رزقي، وأثبتني عندك سعيدًا موفقًا للخير، فإنك تقول في كتابك الذي أنزلت: ﴿يَمْحُو اللَّهُ مَا يَشَاءُ وَيُثْبِتُ وَعِنْدَهُ أُمُّ الْكِتَابِ﴾،

অর্থাৎ, মাহমূদ আলূসী নিজ তাফসীরগ্রন্থে ইবনে আবি শায়বা কৃত ‘মোসান্নাফ’ পুস্তক হতে হযরত ইবনে মাসউদ (রা:)-এর কথা উদ্ধৃত করেন, যিনি বলেন, “বান্দা আল্লাহর কাছে (নিচের) এই দোয়া করলে তিনি তার জীবন-জীবিকা বৃদ্ধি করে দেন: হে আল্লাহ! অফুরন্ত রহমত-বরকতের অধিকারী! হে সর্বোচ্চ শান-শওকত, সম্মান ও ক্ষমতার মালিক! আপনি ভিন্ন অন্য কোনো খোদা নেই। আপনি-ই আশ্রয়হীনদের আশ্রয় এবং নৈকট্য অন্বেষীদের প্রতিবেশী (নিকটবর্তী); মুত্তাকী (খোদাভীরু)-দের অভিভাবক। এয়া আল্লাহ! আপনি যদি আপনার মূল লিপিতে আমার দুর্দশা ভারাক্রান্ত হবার বিষয়টি নির্ধারণ করে থাকেন, তবে তা অপসারণ করুন এবং আমাকে সুখ-সমৃদ্ধি দান করুন। হে আমার প্রভু! আপনি যদি আপনার কেতাবে আমার জন্যে আপনার রহমত (আশীর্বাদ) বাদ দেয়ার কথা লিখে রাখেন, তবে তা মুছে দিন এবং আমার রিযক আমার জন্যে সহজ করে দিন; আপনার দরবারে আমাকে সুখী, সৎকর্মশীল ও সমৃদ্ধিশালী করে দিন। কেননা, আপনি আপনার পাক কালামে এরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহ যা চান নিশ্চিহ্ন করেন এবং প্রতিষ্ঠিত করেন; এবং মূল লিপি তাঁরই কাছে রয়েছে’।” [আল-কুরআন, ১৩:৩৯, মুফতী আহমদ এয়ার খান সাহেব কৃত ’নূরুল এরফান’]

وأخرج عبد بن حميد وغيره عن عمرو- رضي الله عنه- أنه قال- وهو يطوف بالبيت-: “اللهم إن كنت كتبت عليَّ شقوة أو ذنبًا فامحه واجعله سعادة ومغفرة، فإنك تمحو ما شئت، وتثبت وعندك أم الكتاب”،

অর্থাৎ, আবদ ইবনে হুমাইদ এবং অন্যান্যরা বর্ণনা করেন যে হযরত উমর ফারুক (রা:) কাবা শরীফের তাওয়াফকালে দোয়া করেন: “এয়া আল্লাহ! যদি আপনি লিখে রাখেন আমি দুঃখী বা পাপী হবো, তবে তা (পরিণতি) মুছে দিন এবং আমার ভাগ্যে সুখ-সমৃদ্ধি ও গুনাহ মাফের বিষয়টি লিখুন। কেননা, আপনি যা চান নিশ্চিহ্ন করেন এবং প্রতিষ্ঠিত করেন, আর আপনার কাছেই রয়েছে মূল লিপি।”

وذكر مثله عن شقيق أبي وائل ، نقل ذلك بن جرير الطبري عن ابن عباس من طريق سعيد بن جبير، وعن مجاهد كذلك من طرق عدة، وذكر صاحب الإبداع أنه نقل عن اليافعي أن أول ما يدعى في ليلة النصف من شعبان: “اللهم يا ذا المن ولا يمن عليه“.

অর্থাৎ, হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রা:) ও হযরত মোজাহিদ (রা:)-এর তরীকা (পদ্ধতি) অনুসারে ইবনে জারির তাবারীর বর্ণনায় এবং অন্যান্য রওয়ায়াত ও আল-এয়াফী’ হতে ‘আল-এবদা’আ’ পুস্তকের লেখকের বিবরণে জানা যায়, শবে বরা’তে প্রথমে যে দোয়া করা হয় তা হলো - ‘এয়া আল্লাহ, অফুরন্ত রহমত-বরকতের মালিক!’

                                                                    সমাপ্ত


প্রবন্ধটি http://sunnah.org/…/2014/02/25/benefits-night-of-mid-shaban/
লিঙ্কে প্রকাশিত প্রবন্ধ থেকে অনুবাদ করা হয়েছে।


সোমবার, ২৪ এপ্রিল, ২০১৭

মে’রাজের রাতে রাসূলে কারীম (দ:) কি আল্লাহকে সরাসরি দেখেছেন?


ভূমিকা

এই নিবন্ধটিকে বিভিন্ন অংশে বিভক্ত করা হয়েছে, যাতে করে সহজে উপলুব্ধ ও বোধগম্য হয়।
(মে’রাজ রাতে) প্রিয় নবী (صلى الله عليه و آله و سلم) আল্লাহকে দেখেছেন, এ বিষয়টিকে যারা অস্বীকার করে, তাদের ভ্রান্তি অপনোদনে আল-কুরআন, সহীহ হাদীস ও প্রাথমিক যুগের বোযর্গ উলেমাদের যথাযথ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের আলোকে প্রামাণ্য দলিলাদি এতে উপস্থাপন করা হয়েছে।

বি:দ্র: আমরা এই নিবন্ধ লেখা আরম্ভ করার আগে এ কথা স্পষ্ট করা জরুরি যে আমাদের ওয়েবসাইটের মূল সূচিপত্রে লেখাটিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কেননা বিষয়টি তাওহিদের (মানে ঈমান-আকীদার) সাথে সম্পৃক্ত। বিষয়টি (মুসলিম) মিল্লাত তথা সম্প্রদায়ের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত; কারণ কুরআন মজীদের সুরা আন্ নজমে অবিশ্বাসীদের প্রতি একটি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়া হয়েছে। অতঃপর (ওই সূরার) ১৮ নং আয়াতের পরপরই আল্লাহ পাক মক্কার মুশরিকদের পরম শ্রদ্ধেয় ও সেরা উপাস্য মূর্তি আল-লাত, আল-উযযা ও মানা’আত সম্পর্কে উল্লেখ করেন।
অতএব, আমাদের রহমতের নবী (صلى الله عليه و آله و سلم) কর্তৃক আল্লাহকে দেখাটা মুশরিকদের সামনে তাওহিদেরই সাক্ষ্য প্রদান ছাড়া আর কিছু নয়।

এই বিষয়টি সেসব বিষয়ের অন্যতম, যেগুলোর ব্যাপারে এমন কি সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-ও নিজেদের মধ্যে ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তাই আমরা জানি যে কিছু মূর্খ লোক (মুসলমান ও অ-মুসলমান উভয়)-ও এই বিষয়ে দ্বিমত করে বলবে, সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-ও কি ঈমান-আকীদার বিষয়গুলোতে ভিন্নমত পোষণ করেছিলেন? ওই সব লোকের প্রতি জবাব হলো, এমন কিছু আকীদা-বিশ্বাসসংক্রান্ত বিষয় আছে যা ‘কাতেঈ’ তথা চূড়ান্ত ও নিঃশর্ত (যথা – আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস, পয়গম্বরবৃন্দ, ফেরেশতামণ্ডলী, আসমানী কেতাবসমূহ, শেষ বিচার দিবস, আল-কদর/তাকদীর, কুরআন মজীদের পূর্ণতা ইত্যাদিতে বিশ্বাস); এসবের ব্যাপারে ভিন্নমত পোষণের কোনো অবকাশই নেই। পক্ষান্তরে,
অপর কিছু বিষয় আছে যা ’যান্নী’ তথা নমনীয় (যথা – রূপক বর্ণনাসমৃদ্ধ কুরআনের আয়াতগুলো, ‘এসতাওয়া’, ’নাযুল’, ’এয়াদুল্লাহ’ ইত্যাদি শব্দের আক্ষরিক না রূপক অর্থ গ্রহণ করতে হবে, আল্লাহকে দেখা ইত্যাদি বিষয়)।
আহলুস্ সুন্নাহ’র সঠিক মত হলো, যদিও আল্লাহতা’লার ওই সব সিফাত বা গুণ/বৈশিষ্ট্যকে যেভাবে আছে সেভাবেই ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ব্যতিরেকে গ্রহণ করতে হবে, তবুও কখনো কখনো রূপক ব্যাখ্যা জরুরি হয়ে পড়ে। তবে কোনো ব্যক্তি সেই রূপক ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করলে সে কাফের বা অবিশ্বাসী হবে না, যদি না সে একেবারেই আনাড়ি আক্ষরিক ব্যাখ্যা দেয়, যেমনটি দিয়ে থাকে ‘সালাফী’ সীমা লঙ্ঘনকারীরা, যখন-ই তারা উদ্ভট কথাবার্তা বলে যে আল্লাহতা’লা আরশকে স্পর্শ করেন, মধ্যরাতে আল্লাহ পাক সর্বনিম্ন আসমানে ‘স্বশরীরে’ নেমে আসেন, আল্লাহর ২টি পা আছে, ছায়া আছে, বা তিনি আক্ষরিক অর্থেই দৌড়ান ইত্যাদি। [বিশ্বাস করা কঠিন হলেও আমাদের পাঠকমণ্ডলী অবাক হবেন এ কথা জেনে যে, ‘সালাফী’ গোষ্ঠীর কর্তৃত্বশীল নেতারা এসব উদ্ভট ধারণাকেই সমর্থন করেন। এদের মধ্যে রয়েছেন সউদী রাজ্যের সরকার কর্তৃক নিযুক্ত আল-কুরআনের অনুবাদক মোহসিন খান এবং ওই রাজ্যের বড় মুফতী ইবনে উসায়মীন, বিন বা’য গং।]

মে’রাজ রাতে মহানবী (দ:) কি আল্লাহকে দেখেছিলেন? এ প্রশ্নটির জবাবে এই নিবন্ধে আল-কুরআন হতে প্রচুর প্রামাণিক দলিল উপস্থাপিত হবে। কিন্তু তা পর্যালোচনার আগে মুসলিম শরীফের একখানা হাদীসের ভুল (Wrong) অনুবাদ জনসমক্ষে তুলে ধরতে চাই। হাদীসটিতে প্রিয় নবী করীম (صلى الله عليه و آله و سلم)-এঁর উচ্চারিত মূল অারবী ‘ইন্নী’ শব্দটিও মোহাদ্দেসীনবৃন্দ কীভাবে পড়ে থাকেন, তা যাচাই না করে অনেকে এই ভুল অনুবাদকে সঠিক মনে করেন।

সুপ্রিয় পাঠক! দেখুন, সহীহ মুসলিম শরীফের হাদীসের ভুল অনুবাদ হযরত আবূ যর্র (রা:)-এর বর্ণিত; তিনি বলেন:
“আমি প্রিয়নবী (صلى الله عليه و آله و سلم)-কে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি আল্লাহকে দেখেছেন? তিনি বল্লেন, ’তিনি (আল্লাহ) নূর (তথা জ্যোতি); আমি তাঁকে কীভাবে দেখবো’?”
[সহীহ মুসলিম, অনলাইন সংস্করণ, ১ম বই, হাদীস নং ০৩৪১]

প্রিয় পাঠক! এখন দেখুন, সহীহ মুসলিমের উক্ত হাদিসের পরবর্তী হাদীস; আবদুল্লাহ ইবনে শাকিক বর্ণনা করেন:
আমি আবূ যর্র (রা:)-কে জিজ্ঞেস করি, আমি যদি প্রিয় নবী করীম (صلى الله عليه و آله و سلم)-এর দেখা পেতাম, তাহলে জানতে চাইতাম। তিনি (আবূ যর্র) বলেন, তুমি কী বিষয় সম্পর্কে জানতে চাইতে? অতঃপর আব্দুল্লাহ ইবনে শাকিক বলেন, আমি তাঁর (হুযূরের) কাছে জানতে আগ্রহী ছিলাম তিনি খোদাতা’লাকে দেখেছিলেন কি না? আবূ যর্র (রা:) আরও বলেন, আমি প্রকৃতপক্ষে তাঁকে জিজ্ঞেস-ও করেছিলাম; আর তিনি জবাবে বলেন, আমি (হুযূর পূর নূর সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম) নূর (তথা জ্যোতি) দেখেছিলাম।
[সহীহ মুসলিম শরীফ, অনলাইন সংস্করণ, ১ম বই, হাদীস নং ০৩৪২]

প্রথমোক্ত হাদীসের (#০৩৪১) অনুবাদ মারাত্মক ভুল। আমরা তা যেভাবে আছে সেভাবে গ্রহণ করলে পরবর্তী হাদীসটি (#০৩৪২) তার সাথে অর্থের দিক দিয়ে সাংঘর্ষিক/পরষ্পরবিরোধী হবে। মনে রাখবেন, ইমাম মুসলিম (রহ:) একজন হাদীসের বিশারদ, যিনি তাঁর অনবদ্য হাদীস সংকলন ‘মুসলিম শরীফে’ দুটি পরস্পরবিরোধী হাদীস পাশাপাশি বর্ণনা করতে পারেন বলে ধারণা করাটাই অবান্তর।

প্রথমোক্ত হাদীসের (#০৩৪১) ভুল (Wrong) অনুবাদ বিবৃত করে:
“তিনি নূর, আমি তাঁকে কীভাবে দেখবো?”
এখানে দাবি করা হয়েছে যে আল্লাহ হলেন নূর, তাঁকে কীভাবে দেখা যাবে?

অতঃপর দ্বিতীয় হাদীস (#০৩৪২) বিবৃত করে:
“আমি (আবূ যর্র) প্রকৃতপক্ষে তাঁকে জিজ্ঞেস-ও করেছিলাম; আর তিনি জবাবে বলেন,
আমি (হুযূর পূর নূর সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম) নূর (তথা জ্যোতি) দেখেছিলাম।”

এখন আমরা প্রথম হাদীসটির আরবী উদ্ধৃতির দিকে দৃষ্টি দেবো, তাহলেই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হবে যে প্রিয়নবী  (صلى الله عليه و آله و سلم) আসলেই আল্লাহ পাককে দেখেছিলেন।

মূল আরবী পাঠ দেখুন,

حدّثنا أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ : حَدَّثَنَا وَكِيعٌ عَنْ يَزِيدَ بْنِ إِبْرَاهِيمَ عَنْ قَتَادَةَ عَنْ عَبْدِ اللّهِ بْنِ شَقِيقٍ عَنْ أَبِي ذَرٍّ ، قَالَ: سَأَلْتُ رَسُولَ اللّهِ: هَلْ رَأَيْتَ رَبَّكَ؟ قَالَ: «نُورٌ انى أَرَاهُ»؟.

’মতন’-এর অনুবাদ:
হযরত আবূ যর্র (রা:) বর্ণনা করেন: আমি প্রিয়নবী (صلى الله عليه و آله و سلم)-কে জিজ্ঞেস করি, আপনি কি আপনার প্রভুকে দেখেছেন? তিনি জবাব দেন, ‘তিনি (খোদা) নূর; আমি তাঁকে দেখেছি (ইন্নী আরায়াহু)’
[সহীহ মুসলিম, হাদীস নং # ৩৫১, আল্লামা গোলাম রাসূল সাঈদী প্রণীত শরহে সহীহ মুসলিম গ্রন্থের হাদীসের ক্রমিক নম্বর অনুযায়ী]।

এই অনুবাদ-ই নিখুঁত, যা স্পষ্ট প্রতীয়মান করে যে প্রিয়নবী (صلى الله عليه و آله و سلم) মে’রাজ রাতে অবশ্যই আল্লাহকে দেখেছিলেন। বিষয়টি সর্বসাধারণের বোঝার সহজ করণার্থে নিম্নরূপে তুলে ধরা হলো।

আমরা প্রতিটি অক্ষর ধরে ধরে নিচে অনুবাদ করলাম:
‘নূর’ (نُور) – তিনি জ্যোতি (সদৃশ);
‘ইন্নী’ (انى) – নিশ্চয় আমি (মহানবী);
‘আরায়াহু’ (أِرَاهُ) – তাঁকে (খোদাকে) দেখেছি।

আমরা এভাবে অনুবাদ না করলে সহীহ মুসলিম পরস্পরবিরোধী হবে; কেননা পরবর্তী হাদীসটি-ই ব্যক্ত করে – ‘রায়াইতু নূরান’ (رَأَيْتُ نُورا), অর্থাৎ, আমি নূর (জ্যোতি) দেখেছি (মানে নিশ্চয় আল্লাহকে দেখেছি)।

আল-কুরআনের আলোকে

وَهُوَ بِالْأُفُقِ الْأَعْلَىٰ ثُمَّ دَنَا فَتَدَلَّىٰ فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَىٰ فَأَوْحَىٰ إِلَىٰ عَبْدِهِ مَا أَوْحَىٰ مَا كَذَبَ الْفُؤَادُ مَا رَ‌أَىٰ أَفَتُمَارُ‌ونَهُ عَلَىٰ مَا يَرَ‌ىٰ

আল্লাহ পাক এরশাদ ফরমান: “আর তিনি উচ্চাকাশের সর্বোচ্চ দিগন্তে ছিলেন। অতঃপর ওই জ্যোতি/‘নূর’ (نُور) নিকটবর্তী হলো। অার খুব নেমে এলো। অতঃপর ওই জ্যোতি/‘নূর’ (نُور)-ও এ মাহবুব (صلى الله عليه و آله و سلم)-এঁর মধ্যে দু’হাতের ব্যবধান রইলো। বরং তার চেয়েও কম। তখন (আল্লাহ) ওহী করলেন আপন বান্দার প্রতি যা ওহী করার ছিল। (মহানবীর) অন্তর মিথ্যা বলেনি যা তিনি দেখেছেন। তবে কি তোমরা তাঁর সাথে তিনি যা দেখেছেন তা নিয়ে বিতর্ক করছো?”
[সূরা নজম, ৭-১২ নং আয়াত; মুফতী আহমদ এয়ার খান সাহেবের ‘তাফসীরে নূরুল এরফান’]

ওপরোক্ত সূরার ১২ নং আয়াতে আমাদের প্রভু খোদাতা’লা সারা বিশ্বকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন যে, ‘তবে কি তোমরা তাঁর সাথে তিনি যা দেখেছেন তা নিয়ে বিতর্ক করছো’। এ দেখা যদি হতো শুধু হযরত জিবরীল আমীন (আ:), তাহলে এটি তেমন বড় কোনো চ্যালেঞ্জ হতো না। কেননা, পূর্ববর্তী আম্বিয়া (আ:)-ও বিভিন্ন মর্যাদাপূর্ণ খোদায়ী অনুগ্রহ ও সুবিধা পেয়েছিলেন। যেমন হযরত মূসা (আ:) আল্লাহর সাথে সরাসরি কথা বলেছিলেন; আর হযরত ইবরাহীম (আ:)-কে বেহেশত-রাজ্য দেখানো হয়েছিল, যা জিবরীল (আ:)-কে দেখার চেয়েও উচ্চ মর্যাদার বিষয় বলে বিবেচিত।
অতএব, কুরআনী ‘নস’ তথা দলিল থেকে সুপ্রতিষ্ঠিত হয় যে আল্লাহকে দেখার সৌভাগ্য একমাত্র মহানবী (صلى الله عليه و آله و سلم)-এর জন্যেই চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়েছিল, যেমনটি হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) ও অন্যান্যদের বর্ণিত আহাদীস থেকেও প্রমাণিত হয়।

এখন আমরা ইমাম ইবনুল জাওযীর কৃত ওপরোক্ত আয়াতগুলোর তাফসীর দেখবো। তিনি ৮ম ও ৯ম আয়াতগুলোকে সহীহ আহাদীস ও আকওয়ালের আলোকে ব্যাখ্যা করেন যে,

وفي المشار إليه بقوله: «ثُمَّ دنا» ثلاثة أقوال.
أحدها: أنه الله عز وجل. روى البخاري ومسلم في «الصحيحين» من حديث شريك بن أبي نَمِر عن أنس بن مالك قال: دنا الجبّار ربُّ العِزَّة فتدلَّى حتى كان منه قابَ قوسين أو أدنى. وروى أبو سلمة عن ابن عباس: «ثم دنا» قال: دنا ربُّه فتدلَّى، وهذا اختيار مقاتل. قال: دنا الرَّبُّ من محمد ليلةَ أُسْرِي به،، فكان منه قابَ قوسين أو أدنى. وقد كشفتُ هذا الوجه في كتاب «المُغْني» وبيَّنتُ أنه ليس كما يخطُر بالبال من قُرب الأجسام وقطع المسافة، لأن ذلك يختص بالأجسام، والله منزَّه عن ذلك.
والثاني: أنه محمد دنا من ربِّه، قاله ابن عباس، والقرظي.
والثالث: أنه جبريل. ثم في الكلام قولان.

অর্থাৎ : ‘তিনি নেমে এলেন এবং নিকটবর্তী হলেন’, আল্লাহতা’লার এ কালাম (বাণী) সম্পর্কে তিনটি প্রসিদ্ধ ভাষ্য আছে: প্রথমতঃ (তিনি) স্বয়ং আল্লাহ পাক, যা বোখারী ও মুসলিম সহিহাইন গ্রন্থগুলোতে হযরত আনাস বিন মালেক (রা:) হতে শারিক বিন আবি নুমাইরের বর্ণিত একখানা রেওয়ায়াতে জ্ঞাত হয়। হযরত আনাস (রা:) বলেন, অপ্রতিরোধ্য, সর্বোচ্চ সম্মান ও মহাপরাক্রমশালী প্রভু খোদাতা’লা নেমে আসেন এবং (মাহবুব সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের) সন্নিকটবর্তী হন; এতো কাছে আসেন যে ধনুকের দুই বাহু পরিমাণ দূরত্ব অবশিষ্ট থাকে, বা তারও কম।
[সহীহ আল-বোখারী # ৭৫১৮; মুসলিম # ১৬২]

অধিকন্তু, হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) হতে আবূ সালামা বর্ণিত রেওয়ায়াতে ‘তিনি নেমে আসেন’ বলতে বোঝানো হয়েছে, ‘আল্লাহ কাছে আসেন’; এই ভাষ্য মাকাতিল (রা:)-ও গ্রহণ করেছেন, যিনি বলেন: ইসরা তথা মে’রাজ রাতে আল্লাহ পাক তাঁর রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের সন্নিকটবর্তী হন, এতো কাছে হন যে ধনুকের দুই বাহুর দূরত্ব অবশিষ্ট ছিল, বা তারও কম। তবে ‘আল-মুগনী’ পুস্তকে লেখা আছে, এই কাছে আসা শারীরিক বা দূরত্বের অর্থে নয় যেমনটি হয়ে থাকে সৃষ্টিকুলের ক্ষেত্রে। কেননা মহান আল্লাহর প্রতি আরোপিত এ ধরনের সীমাবদ্ধতা হতে তিনি বহু ঊর্ধ্বে। দ্বিতীয়তঃ মহানবী (صلى الله عليه و آله و سلم) স্বয়ং আল্লাহর কাছে যান। এ ভাষ্য হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) ও কুরযী (রহ:)-এর।

তৃতীয়তঃ এটি জিবরীল (আ:) ছিলেন এবং এই কওল বা ভাষ্যে কালাম তথা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ বিদ্যমান… [এরপর ইমাম ইবনে জাওযী সাইয়্যেদাহ আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা‘র মতো সাহাবা-এ-কেরামের মতামত পেশ করেন, যাঁরা বলেন যে মহানবী (صلى الله عليه و آله و سلم) আল্লাহকে দেখেননি। কেন তিনি এই রকম বিশ্বাস করতেন এবং অন্যান্য সাহাবা-এ-কেরাম (রা:) তাঁর সাথে কীভাবে ভিন্নমত পোষণ করতেন, সে সম্পর্কে পরে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়া হবে, ইনশা’আল্লাহ]।
রেফারেন্স: ইমাম ইবনে জাওযী প্রণীত ‘যাদ আল-মাসীর ফী এলম আত্ তাফসীর, ৮ম খণ্ড, ৬৫-৬ পৃষ্ঠা।

অতএব, আল-কুরআন ও বোখারী-মুসলিম হাদীসের গ্রন্থগুলো হতে প্রাপ্ত উক্ত সূরা নজমের ৮ম ও ৯ম আয়াতের সর্বোত্তম ব্যাখ্যা দ্বারা স্পষ্ট প্রমাণিত হলো যে মহানবী (صلى الله عليه و آله و سلم) আল্লাহকে দেখেছেন।
[হযরত আনাস বিন মালেক (রা:), যাঁর সম্পর্কে দাবি করা হয় যে তিনি আল্লাহকে দেখার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, তিনি নিজেই এসব আহাদীসে প্রমাণ করেছেন যে রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه و آله و سلم) অবশ্যঅবশ্য আল্লাহকে দেখেছিলেন। হাদীসের উসূল বা মৌলনীতি হলো, যদি সাহাবা (রা:)-বৃন্দ দুটো পরস্পরবিরোধী কথা বলেন, তাহলে ‘মাসবাত’ (প্রমাণ) প্রাধান্য পাবে ‘নফী’ (না-সূচক বর্জন)-এর ওপর। তাই এই উসূল অনুযায়ী নিশ্চিতভাবে প্রমাণ হয় যে রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه و آله و سلم) অবশ্যই আল্লাহকে দেখেছিলেন, আর এই বিষয়ে নফী তথা না-সূচক বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করতে হবে।]

কুরআন মজীদের অন্যত্র এরশাদ হয়েছে:

وَلَمَّا جَآءَ مُوسَىٰ لِمِيقَاتِنَا وَكَلَّمَهُ رَبُّهُ قَالَ رَبِّ أَرِنِيۤ أَنظُرْ إِلَيْكَ قَالَ لَن تَرَانِي وَلَـٰكِنِ انْظُرْ إِلَى الْجَبَلِ فَإِنِ اسْتَقَرَّ
مَكَانَهُ فَسَوْفَ تَرَانِي فَلَمَّا
تَجَلَّىٰ رَبُّهُ لِلْجَبَلِ جَعَلَهُ دَكّاً وَخَرَّ موسَىٰ صَعِقاً فَلَمَّآ أَفَاقَ قَالَ سُبْحَانَكَ تُبْتُ إِلَيْكَ وَأَنَاْ أَوَّلُ ٱلْمُؤْمِنِي

অর্থাৎ : “এবং যখন মূসা (আ:) আমার ওয়াদার ওপর হাজির হলেন এবং তাঁর সাথে তাঁর রব্ব কথা বল্লেন।
(তখন তিনি) আরয করলেন, ‘হে আমার প্রভু! আমাকে আপন দর্শন দিন! আমি আপনাকে দেখবো।’
(তিনি) বল্লেন, ‘তুমি আমাকে কখনো দেখতে পারবে না। [কুরআনের এখানে ‘লান তারানী’ বলা হয়েছে, ‘লান উরা’ বলা হয়নি]; বরং এ পাহাড়ের দিকে তাকাও। এটি যদি স্বস্থানে স্থির থাকে, তবে তুমি আমাকে (অবিলম্বে) দেখবে।’
অতঃপর যখন তাঁর রব্ব পাহাড়ের ওপর আপন নূর বিচ্ছুরণ করলেন, তখন তা সেটিকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিলো, আর মূসা (আ:) সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে গেলেন। অতঃপর যখন তাঁর জ্ঞান ফিরে এলো, (তখন) তিনি বল্লেন, পবিত্রতা আপনারই; আমি আপনারই দিকে প্রত্যাবর্তন করলাম এবং আমি সবার মধ্যে প্রথম মুসলমান।” [সূরা আল-আ’রাফ, ১৪৩ নং আয়াত; মুফতী আহমদ এয়ার খান সাহেব রচিত ‘নূরুল এরফান’।]

বিশ্বখ্যাত ‘তাফসীরে জালালাইন’ (সর্ব-ইমাম জালালউদ্দীন সৈয়ুতী ও আল-মুহাল্লী রচিত) গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে:

أَنظُرْ إِلَيْكَ قَالَ لَن تَرَٰنِى } أي لا تقدر على رؤيتي، والتعبير به دون «لن أُرَى» يفيد إمكان رؤيته تعالى { وَلَٰكِنِ انْظُرْ إِلَى الْجَبَلِ } الذي هو أقوى منك { فَإِنِ اسْتَقَرَّ } ثبت { مَكَانَهُ فَسَوْفَ تَرَٰنِى } أي تثبت لرؤيتي، وإلا فلا طاقة لك { فَلَمَّا تَجَلَّىٰ رَبُّهُ } أي ظهر من نوره قدر نصف أنملة الخنصر كما في حديث صححه الحاكم

অর্থাৎ : “(তুমি আমাকে কখনো দেখতে পারবে না) আয়াতটির অর্থ হচ্ছে, ‘আমাকে দেখার সামর্থ্য তোমার নেই।’ ‘লান উরা’ (আমাকে কখনো দেখা যাবে না বা দেখা সম্ভব নয়) বাক্যটির পরিবর্তে ‘লান তারানী’ বাক্যের ব্যবহারে বোঝা যায় যে আল্লাহকে দেখা সম্ভব।

“বরং এ পাহাড়ের দিকে তাকাও। এটি যদি স্বস্থানে স্থির থাকে, তবে তুমি আমাকে (অবিলম্বে) দেখবে; নতুবা আমাকে দেখার সামর্থ্য তোমার হবে না।” [‘অতঃপর যখন তাঁর রব্ব পাহাড়ের ওপর আপন নূর বিচ্ছুরণ করলেন, তখন তা সেটিকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিলো, আর মূসা (আ:) সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে গেলেন।’ হাকীম বর্ণিত সহীহ হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে যে এই নূর ছিল পরিমাণে হাতের ছোট আঙ্গুলের নখের অর্ধেক মাত্র।]
রেফারেন্স: তাফসীরে জালালাইন শরীফ, ১৬৭ পৃষ্ঠা, দারু ইবনে কাসীর, দামেশক (সিরিয়া) হতে প্রকাশিত। 
 
আয়াতে করীমার শেষাংশে মূসা (আ:) বলেন: “আর মূসা (আ:) সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে গেলেন। অতঃপর যখন তাঁর জ্ঞান ফিরে এলো, (তখন) তিনি বল্লেন, পবিত্রতা আপনারই; আমি আপনারই দিকে প্রত্যাবর্তন করলাম এবং আমি সবার মধ্যে প্রথম মুসলমান।” (৭:১৪৩)

তাফসীর আল-কুরতুবী

ইমাম কুরতুবী (রহ:) একে এভাবে ব্যাখ্যা করেন,

وأجمعت الأمة على أن هذه التوبة ما كانت عن معصية؛ فإن الأنبياء معصومون. وأيضاً عند أهل السنة والجماعة الرؤيةُ جائزةٌ.

অর্থাৎ : “ইমামবৃন্দ এ ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেন যে মূসা (আ:)-এর তওবা করা কোনো পাপের কারণে নয়; কেননা, আম্বিয়া (আ:) সবাই মাসূম তথা নিষ্পাপ। অধিকন্তু, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের দৃষ্টিকোণ থেকে আল্লাহর দর্শন লাভ সম্ভব। [রেফারেন্স: তাফসীরুল কুরতুবী, ৭:১৪৩]

অতএব, স্বয়ং কুরআন মজীদ থেকে এ কথা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয় যে আম্বিয়া (আ:) অসম্ভব কোনো কিছু কখনো (আল্লাহর দরবারে) প্রার্থনা করেন না। আর আল্লাহকে দেখা যদি অসম্ভব (Impossible) হতো, তাহলে হযরত মূসা (আ:) তা চাইতেন না; আর আল্লাহতা’লা-ও তাঁর দর্শনের বিষয়টিকে পাহাড়ের স্থির থাকার শর্তের সাথে বেঁধে দিতেন না। তাই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে তাঁর দর্শন একমাত্র মহানবী (صلى الله عليه و آله و سلم)-এর জন্যেই সংরক্ষিত (Reserved) ছিল, মূসা (আ:)-এঁর জন্যে ছিল না।

হাদীস শরীফের আলোকে

আমাদের হাতে মওজুদ আছে উম্মুল মো’মেনীন (বিশ্বাসীদের মা) হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা:) কওল তথা ভাষ্য এবং তাঁর সাথে এতদসংক্রান্ত বিষয়ে ভিন্নমত পোষণকারী সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-এর মধ্যে তাফসীর-শাস্ত্র বিশারদ ও নেতৃস্থানীয় হযরত ইবনে আব্বাস (রা:)-এর সিদ্ধান্ত (রায়)।

এই মতপার্থক্যকে ‘সালাফী’ গোষ্ঠী ভুল বুঝেছে। অথচ হযরত আয়েশা (রা:)-এর ওই না-সূচক মত বা প্রত্যাখ্যান হচ্ছে ‘এদরাক’ (আল্লাহ-সম্পর্কিত পূর্ণ জ্ঞান)-বিষয়ক। এটি আমরা তথা আহলুস সুন্নাহ-ও নাকচ করে দেই। কিন্তু ‘এদরাক’-এর নাকচ হওয়া মানে এই নয় যে প্রিয়নবী  (صلى الله عليه و آله و سلم) আল্লাহকে একেবারেই দেখেননি।
[অনুবাদকের জরুরি নোট: সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-এর মধ্যেও হাকীকত উপলব্ধি নিয়ে তারতম্য ছিল। প্রিয়নবী (صلى الله عليه و آله و سلم)-এর একটি হাদীস এখানে প্রণিধানযোগ্য; তিনি বলেন: ‘যে ব্যক্তি যতোটুকু উপলব্ধি করতে সক্ষম, তাকে ততোটুকু জানাও।’ অতএব, তাসাউফপন্থী আলেমদের উপলব্ধি আর সাধারণ আলেমদের উপলব্ধি এক হবার নয়।]

দ্বিতীয়তঃ ‘এসরা’ বা মে’রাজ যখন সংঘটিত হয়, তখন হযরত আয়েশা (রা:) ছিলেন শিশু। মনে রাখবেন, এটি ঘটেছিল হুযূর পূর নূর  (صلى الله عليه و آله و سلم)-এর মক্কী জীবনে, অার হযরত আয়েশা (রা:)-এর সাথে তাঁর বিয়ে হয়েছিল মদীনায় হিজরতের ১ বছরের মাথায়। তাই মে’রাজ সম্পর্কে সিনিয়র বা জ্যেষ্ঠ সাহাবী (রা:)-বৃন্দের মতামত-ই অগ্রগণ্য হবে। কেননা তাঁরা বিষয়টি সম্পর্কে অধিক অবহিত ও সমঝদার ছিলেন।

আমরা এ বিষয়ে স্পষ্ট বলতে চাই যে, বৈধ ভিন্নমতকে আমরা গ্রহণ বা স্বীকার করি। কিন্তু ওহাবীদের ‘এস্তেদলাল’ এক্ষেত্রে অন্তঃসারশূন্য। কেননা, তারা হলো ‘হাওয়া’ (নফসানী খায়েশ)-বিশিষ্ট লোক এবং তারা কোনো মযহাবের ফেকাহ মানে না। আর তারা আহলুস্ সুন্নাহ’র আকীদা-বিশ্বাসগত আশআরী/মাতুরিদী পথ ও মতকেও গ্রহণ করে না।
তাই তারা যদি কোনো সঠিক সিদ্ধান্তেও উপনীত হয়, তথাপিও আল্লাহতা’লা ও তাঁর প্রিয়নবী  (صلى الله عليه و آله و سلم)-এর দৃষ্টিতে তা নিশ্চিতভাবে প্রত্যাখ্যাত হবে।

হযরত আয়েশা (রা:)-এর বর্ণিত হাদীসের শরাহ (ব্যাখ্যা) করেছেন মহান ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ:), যাঁকে তথাকথিত ‘সালাফী মোকাল্লিদ’-বর্গ অনুসরণ করার দাবি করে থাকে। হযরত ইমামের এই বাণী উদ্ধৃত করেছেন বোখারী শরীফের ভাষ্যকার ইমাম ইবনে হাজর আসকালানী (রহ:) নিজ ‘ফাতহুল বারী শরহে সহীহ আল-বোখারী’ গ্রন্থে:

عن المروزي قلت لأحمد إنهم يقولون إن عائشة قالت من زعم أن محمدا رأى ربه فقد أعظم على الله الفرية فبأي شيء يدفع قولها قال بقول النبي صلى الله عليه وسلم رأيت ربي قول النبي صلى الله عليه وسلم أكبر من قولها

অর্থাৎ : ”মারুযী (রহ:) ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ:)-কে জিজ্ঞেস করেন, মানুষেরা বলাবলি করতো যে হযরত আয়েশা (রা:) বলেছিলেন, যে ব্যক্তি এই মত ব্যক্ত করে মহানবী (صلى الله عليه و آله و سلم) আল্লাহকে দেখেছিলেন, সে আল্লাহর প্রতি মিথ্যে আরোপ করে। এই ব্যাপারে জবাব কী হবে?

হযরত ইমাম (রহ:) উত্তর দেন, প্রিয়নবী (صلى الله عليه و آله و سلم) যেখানে হাদীসে এরশাদ ফরমান, ’রায়াইতু রাব্বী’ (“رأيت ربي”), মানে ‘আমি আমার প্রভু খোদাতা’লাকে দেখেছি’, সেখানে এটি-ই হযরত আয়েশা (রা:)-এর কওল (ভাষ্য)-এর জবাব হবে। কেননা, মহানবী (صلى الله عليه و آله و سلم)-এর বাণী হযরত আয়েশা (রা:)-এর ভাষ্যের চেয়ে বহু ঊর্ধ্বে।”
[রেফারেন্স: বোখারী শরীফের সেরা ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘ফাতহুল বারী শরহে সহীহ আল-বোখারী, ৮ম খণ্ড, ৪৯৪ পৃষ্ঠা]

ইমাম নববী (রহ:) যিনি সহীহ মুসলিম শরীফের ভাষ্যকার, তিনি এই বিষয়ে আরও আলোকপাত করেন নিচে:

‏وإذا صحت الروايات عن ابن عباس في إثبات الرؤية وجب المصير إلى إثباتها فإنها ليست مما يدرك بالعقل , ويؤخذ بالظن , وإنما يتلقى بالسماع ولا يستجيز أحد أن يظن بابن عباس أنه تكلم في هذه المسألة بالظن والاجتهاد . وقد قال معمر بن راشد حين ذكر اختلاف عائشة وابن عباس : ما عائشة عندنا بأعلم من ابن عباس , ثم إن ابن عباس أثبت شيئا نفاه والمثبت مقدم على النافي

অর্থাৎ : ”হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণিত বিভিন্ন সহীহ হাদীস থেকে যখন (বিষয়টি) প্রমাণিত হয়েছে, তখন আমরা ধরে নিতে পারি না যে তিনি এসব ভাষ্য নিজ হতে (মনগড়াভাবে) দিয়েছেন; তিনি অবশ্যই এগুলো মহানবী (صلى الله عليه و آله و سلم)-এর কাছ থেকে শুনে বলেছেন।

মা’মার বিন রাশীদ (রহ:) সর্ব-হযরত আয়েশা (রা:) ও ইবনে আব্বাস (রা:)-এর মধ্যকার মতপার্থক্য সম্পর্কে বলেন যে হযরত আয়েশা (রা:) এই বিষয়ে পূর্ণ ওয়াকেফহাল ছিলেন না, কিন্তু হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) তা ছিলেন। তাই
হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) এটি সমর্থন করলে, আর অন্য কেউ তা নাকচ করলেও উসূল তথা (সিদ্ধান্ত গ্রহণের) মৌলনীতি অনুযায়ী ‘মাসবাত’ (হ্যাঁ-সূচক প্রমাণ) ’নফী’ (না-সূচক সিদ্ধান্ত)-এর ওপর প্রাধান্য পাবে।”
[রেফারেন্স: শরহে সহীহ মুসলিম শরীফ, কিতাবুল ঈমান; ‘তিনি দ্বিতীয় অবতরণে তাঁকে দেখেন’ অধ্যায় দ্রষ্টব্য]

দলিল নং ১

ইবনে শেহাব (রহ:) বলেন: ইবনে হাযম আমাকে জানান যে হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) ও আবদ হাব্বা আল-আনসারী (রা:) প্রায়ই বলতেন যে প্রিয়নবী (صلى الله عليه و آله و سلم) এরশাদ ফরমান, অতঃপর তিনি (জিবরীল) আমার সাথে ঊর্ধ্বগমন করেন যতোক্ষণ না আমাকে এতো উচ্চস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে (তাকদীর লেখার) কলমগুলোর খসখস শব্দ শুনতে পাই।

ইবনে হাযম ও হযরত আনাস্ (রা:) বর্ণনা করেন মহানবী (صلى الله عليه و آله و سلم)-এর বাণী, যিনি বলেন: আল্লাহ আমার উম্মতের জন্যে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায ফরয (বাধ্যতামূলক) করেছিলেন। অতঃপর আমি ফেরার পথে মূসা (আ:)-কে অতিক্রম করছিলাম। এমতাবস্থায় হযরত মূসা (আ:) আমাকে বলেন, ‘আপনার প্রভুর কাছে ফিরে যান (‏فراجع ربك), কেননা আপনার উম্মত এই বোঝা বহন করতে সক্ষম হবে না।’ আমি আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে ফিরে যাই (فراجعت ربي) এবং তিনি ওর থেকে কিছু অংশ মওকুফ করেন। এরপর আমি আবার মূসা (আ:)-এর কাছে গিয়ে তাঁকে এ সম্পর্কে জানাই। তিনি বলেন, ‘আপনার প্রভুর কাছে ফিরে যান (‏راجع ربك), কেননা আপনার উম্মত এই বোঝা বহন করতে সক্ষম হবে না।’ আমি আবার মহান প্রভুর দরবারে ফিরে গেলে (فراجعت ربي) তিনি বলেন,
‘এতে আছে পাঁচ (ওয়াক্ত) যা একই সময়ে পঞ্চাশ ওয়াক্তের সমান। যা আদিষ্ট হয়েছে, তা আর পরিবর্তন করা হবে না।’
আমি আবার মূসা (আ:)-এর কাছে গেলে তিনি বলেন, ‘আপনার প্রভুর কাছে ফিরে যান।’ এমতাবস্থায় আমি (তাঁকে) বলি, আমি আমার প্রভুর সামনে লজ্জিত (قد استحييت من ربي) (হায়া-শরমসম্পন্ন)। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩১৩ – ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত]

ওপরের হাদীসটি নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে যে মহানবী (صلى الله عليه و آله و سلم) আল্লাহ পাককে দেখেছেন। কেননা
মূসা (আ:) প্রতিবারই তাঁকে ‘তাঁর প্রভুর কাছে ফিরে যেতে’ বলেছেন এবং অবশেষে মহানবী (صلى الله عليه و آله و سلم) বলেছেন, ‘আমি আমার প্রভুর সামনে লজ্জিত।’

দলিল নং ২
 
‏ عن ‏ ‏ابن عباس ‏ ‏قال ‏
رأى ‏ ‏محمد ‏ ‏ربه قلت أليس الله يقول ‏
لا تدركه الأبصار وهو يدرك الأبصار ‏
قال ويحك ذاك إذا تجلى بنوره الذي هو نوره وقال أريه مرتين ‏
قال ‏ ‏أبو عيسى ‏ ‏هذا ‏ ‏حديث حسن

অর্থাৎ, হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন যে হুযূর পূর নূর (صلى الله عليه و آله و سلم) তাঁর প্রভু খোদাতা’লাকে দেখেছেন। (একরামা) জিজ্ঞেস করেন, ‘আল্লাহ কি বলেননি আঁখি তাঁকে উপলব্ধি করতে অক্ষম?’ এমতাবস্থায় তিনি (ইবনে আব্বাস) উত্তর দেন, ‘আজব ব্যাপার যে তুমি বুঝতে পারো নি। এটি সে সময়-ই ঘটে যখন আল্লাহতা’লা তাঁর নূরের এক ঝলক দেখান (যা উপলব্ধিরও অতীত)। অতএব, মহানবী (صلى الله عليه و آله و سلم) অবশ্যঅবশ্য আল্লাহতা’লাকে দুবার দেখেছেন।’
রেফারেন্স: সুনান-এ-তিরমিযী, সূরা নজমের তাফসীর, হাদীস নং ৩২০১; ইমাম তিরমিযী (রহ:) এই রেওয়ায়াতকে ‘হাসান’ আখ্যায়িত করেন।

দলিল নং ৩

শায়খ আবদুল হক্ক মোহাদ্দীসে দেহেলভী (রহ:) লেখেন: হযরত ইবনে উমর (রা:) এই বিষয়ে জানতে হযরত ইবনে আব্বাস (রা:)-এর শরণাপন্ন হন এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করেন  প্রিয়নবী (صلى الله عليه و آله و سلم) আল্লাহতা’লাকে দেখেছেন কি না। হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) হাঁ-সূচক জবাব দিলে হযরত ইবনে উমর (রা:) তা গ্রহণ করেন এবং আর কখনোই তা প্রত্যাখ্যান করেননি। [আশআতুল লোমআত, ৪র্থ খণ্ড, ৪৩১ পৃষ্ঠা]

প্রিয় পাঠক! এখানে অপর এক মুজতাহিদ সাহাবী, অর্থাৎ, হযরত ইবনে উমর (রা:)-কে পাওয়া গেল যিনি বিশ্বাস করতেন যে মহানবী (صلى الله عليه و آله و سلم) আল্লাহকে (মে’রাজ রাতে) দেখেছিলেন!

দলিল নং ৪

বোখারী শরীফ গ্রন্থের ভাষ্যকার ইমাম বদরুদ্দীন আইনী (রহ:) বলেন,

روى ابن خزيمة بإسناد قوي عن أنس قال رأى محمد ربه وبه قال سائر أصحاب ابن عباس وكعب الأحبار والزهري وصاحب معمر وآخرون وحكى عبد الرزاق عن معمر عن الحسن أنه حلف أن محمدا رأى ربه وأخرج ابن خزيمة عن عروة بن الزبير إثباتها

অর্থাৎ, ‘হযরত আনাস বিন মালেক (রা:) হতে শক্তিশালী সনদে ইবনে খুযায়মা (রহ:) বর্ণনা করেন; হযরত আনাস (রা:) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর প্রভু খোদাতা’লাকে দেখেছেন। একই কথা রেওয়ায়াত করা হয়েছে হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) হতে; এবং কাঅাব আল-আহবার (রহ:), ‍যুহিরী (রহ:) ও মা’মার (রহ:)-এঁর মতো তাঁর শিষ্যদের কাছ থেকেও।

ইমাম আবদুর রাযযাক (রহ:) মা’মার হতে বর্ণনা করেন, যিনি হযরত হাসান আল-বসরী (রহ:)-এঁর প্রায়ই উচ্চারিত কথা উদ্ধৃত করেন; হযরত হাসান বসরী (রহ:) বলতেন, আমি শপথ নিয়ে বলছি যে মহানবী (صلى الله عليه و آله و سلم) তাঁর প্রভু খোদাতা’লাকে দেখেছেন। ইবনে খুযায়মা (রহ:) আল্লাহকে দেখার পক্ষে প্রদত্ত হযরত উরওয়া ইবনে যুবায়র (রা:)-এঁর ভাষ্য-ও সাবেত করেছেন। [উমদাত আল-কারী শরহে সহীহ আল-বোখারী, ১৯তম খণ্ড, ১৯৮ পৃষ্ঠা]

ইমাম হাসান বসরী (রহ:)-এর শপথ নেয়াটা কোনো মামুলি ব্যাপার নয়। হাদীস বর্ণনায় তাঁর মর্যাদাপূর্ণ আসন সম্পর্কে যারা অনুধাবন করতে পারে না, তারা হাদীসের বুনিয়াদি বিষয় সম্পর্কেই অজ্ঞ।

দলিল নং ৫
 
ইমাম বদরুদ্দীন আইনী (রহ:) আরও ব্যাখ্যা করেন:

وروى الطبراني في (الأوسط) بإسناد قوي عن ابن عباس قال رأى محمد ربه مرتين ومن وجه آخر قال نظر محمد إلى ربه جعل الكلام لموسى والخلة لإبراهيم والنظر لمحمد فظهر من ذلك أن مراد ابن عباس ههنا رؤيا العين

অর্থাৎ, ইমাম তাবারানী (রহ:) নিজ ‘আল-আওসাত’ পুস্তকে শক্তিশালী সনদে হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) থেকে রেওয়ায়াত করেন, যিনি বলেন যে রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه و آله و سلم) তাঁর প্রভু খোদাতা’লাকে দু বার দেখেছিলেন; এই ভাষ্যের কারণ হলো তিনি স্বচক্ষেই আল্লাহ পাককে দেখেছিলেন। কেননা, হযরত মূসা (আ:) সরাসরি অাল্লাহর সাথে কথা বলেছিলেন, হযরত ইবরাহীম (আ:)-কে খোদাতা’লার বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল, আর রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه و آله و سلم) -কে (তাঁর) দর্শনের জন্যে মনোনীত করা হয়েছিল (অর্থাৎ, অন্য কোনো নবীকে এই মর্যাদা দেয়া হয়নি)। স্পষ্টতঃ হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) এখানে যা বলতে চান তা হলো, মহানবী (صلى الله عليه و آله و سلم) নিজ মোবারক চোখে মহান আল্লাহকে দেখেছিলেন। [‘উমদাতুল কারী শরহে সহীহ আল-বোখারী’, ১৭তম খণ্ড, ৩০ পৃষ্ঠা]

দলিল নং ৬

সর্ব-ইমাম নাসাঈ (রহ:) ও আল-হাকীম (রহ:) সহীহ এসনাদে বর্ণনা করেন:

أخبرنا إسحاق بن إبراهيم قال أخبرنا معاذ بن هشام قال حدثني أبي عن قتادة عن عكرمة عن بن عباس قال أتعجبون أن تكون الخلة لإبراهيم والكلام لموسى والرؤية لمحمد صلى الله عليه وسلم

অর্থাৎ, হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বিবৃত করেন, তোমরা কি হযরত ইবরাহীম (আ:)-এর খলীলউল্লাহ (আল্লাহর বন্ধু) হওয়া, হযরত মূসা (আ:)-এর সরাসরি আল্লাহর সাথে কথা বলা, এবং প্রিয়নবী (صلى الله عليه و آله و سلم) -এর (আল্লাহকে) দর্শনের বিষয়গুলোর প্রতি আশ্চর্যান্বিত? [সুনানে নাসাঈ আল-কুবরা, আমল আল-এয়াওম ওয়াল-লায়লাহ অধ্যায়, ৬ষ্ঠ খণ্ড, হাদীস নং ১১৫৩৯; মোস্তাদরাক ’আলা সহিহাইন, ১ম খণ্ড, হাদীস নং ২১৬]

ইমাম আল-হাকীম (রহ:) ওপরের বর্ণনা শেষে বলেন:

هذا حديث صحيح على شرط البخاري

অর্থাৎ, এটি সহীহ রেওয়ায়াত, আল-বোখারীর সূত্রে। [প্রাগুক্ত মোস্তাদরাক, হাদীস নং ২১৬]

ইমাম ইবনে হাজর আসকালানী (রহ:) বলেন:

ما أخرجه النسائي بإسناد صحيح وصححه الحاكم أيضا من طريق عكرمة عن بن عباس قال أتعجبون أن تكون الخلة لإبراهيم والكلام لموسى والرؤية لمحمد

অর্থাৎ, এই রেওয়ায়াত ইমাম নাসাঈ (রহ:) ‘সহীহ এসনাদ’ সহকারে বর্ণনা করেন এবং ইমাম আল-হাকীম (রহ:)-ও এটিকে ‘সহীহ’ বলেছেন, যার এসনাদে অন্তর্ভুক্ত আছেন হযরত একরামা (রহ:), যিনি স্বয়ং হযরত ইবনে আব্বাস (রা:)-কে এ কথা বলতে শুনেছেন (এবং এই রেওয়ায়াত নিজেই উদ্ধৃত করেছেন)। [‘ফাতহুল বারী শরহে সহীহ আল-বোখারী’, ৮ম খণ্ড, ৪৯৩ পৃষ্ঠা]

অতএব, ওহে মুসলমান সম্প্রদায়, এই বাস্তবতা সম্পর্কে জানার পর বিস্মিত হবেন না। কেননা, মহানবী (صلى الله عليه و آله و سلم) বাস্তবিক-ই তাঁর প্রভু খোদাতা’লাকে দেখেছিলেন; আর এই বিষয়টি-ই আমাদের তথা আহলুস্ সুন্নাহ’র সাথে পথভ্রষ্ট মো’তাযেলী গোষ্ঠীর মৌলিক পার্থক্যগুলোর মধ্যে অন্যতম। তারা এই বিষয়টিকে প্রত্যাখ্যান করতো (আজকে তাদের প্রতিনিধিত্ব করছে শিয়া গোষ্ঠী)।

দলিল নং ৭

ইমাম নববী (রহ:) হযরত ইবনে মাসউদ (রা:)-এঁর বর্ণিত হাদীসের নিচে লেখেন যে ‘মহানবী (صلى الله عليه و آله و سلم)-এর অন্তর তিনি যা দেখেছিলেন সে সম্পর্কে মিথ্যে বলেনি’ আয়াতটির মানে তিনি জিবরীল (আ:)-কে দেখেছিলেন,
هذا الذي قاله عبد الله رضي الله عنه هو مذهبه في الآية , وذهب الجمهور من المفسرين إلى أن المراد أنه رأى ربه سبحانه وتعالى
অর্থাৎ, এই কথা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা:) ও তাঁর মযহাবের। কিন্তু (হযরত ইবনে আব্বাস সহ) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ মোফাসসেরীন তথা কুরআন ব্যাখ্যাকারী উলামা-মণ্ডলীর মযহাব (পথ ও মত) হলো রাসূলুল্লাহ (দ:) মে’রাজ রাতে আল্লাহ সোবহানাহু ওয়া তা’লাকে দেখেছিলেন।
[রেফারেন্স: শরহে সহীহ মুসলিম, কিতাব আল-ঈমান অধ্যায়, সিদরাত আল-মোনতাহা সম্পর্কে আলোচনা; হাদীস নং ২৫৪]

ইমাম নববী (রহ:) আরও বলেন:

فالحاصل أن الراجح عند أكثر العلماء : أن رسول الله صلى الله عليه وسلم رأى ربه بعيني رأسه ليلة الإسراء لحديث ابن عباس وغيره مما تقدم . وإثبات هذا لا يأخذونه إلا بالسماع من رسول الله صلى الله عليه وسلم هذا مما لا ينبغي أن يتشكك فيه

অর্থাৎ, (এ যাবত প্রদর্শিত যাবতীয় দলিলের) সামগ্রিক ফলাফল এই যে, বহু উলামা-এ-কেরামের কাছে প্রধানত প্রতিষ্ঠিত (সিদ্ধান্ত) রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه و آله و سلم) মে’রাজ রাতে স্বচক্ষে আল্লাহকে দেখেছিলেন, যেমনটি ইতিপূর্বে উল্লেখিত হয়েছে হযরত ইবনে আব্বাস (রা:)-এঁর এবং অন্যান্যদের রেওয়ায়াতে; এই দালিলিক প্রমাণ স্বয়ং রাসূলে খোদা (صلى الله عليه و آله و سلم) থেকে এসেছে, আর তাই এতে কোনো সন্দেহেরই অবকাশ নেই। [শরহে সহীহ মুসলিম, কিতাব আল-ঈমান, ‘তিনি দ্বিতীয় অবতরণে তাঁকে দেখেন’ অধ্যায়ের ব্যাখ্যায়]

দলিল নং ৮

হযরত আয়েশা (রা:)-এর বর্ণিত হাদীস সম্পর্কে ইমাম নববী (রহ:) আরও বলেন:

‏فأما احتجاج عائشة بقول الله تعالى : { لا تدركه الأبصار } فجوابه ظاهر , فإن الإدراك هو الإحاطة والله تعالى لا يحاط به , وإذا ورد النص بنفي الإحاطة لا يلزم منه نفي الرؤية بغير إحاطة

অর্থাৎ : হযরত আয়েশা (রা:)-এর (আল্লাহকে দেখার বিপক্ষে) গৃহীত দলিল (অর্থাৎ, চোখ তাঁকে উপলব্ধি করতে অক্ষম) সম্পর্কে স্পষ্ট জবাব হলো, আল্লাহতা’লার এদরাক হতে পারে না (মানে তাঁর সম্পর্কে সম্পূর্ণ উপলব্ধি অসম্ভব); অতএব, (কোরআনী) নস্ (তথা প্রামাণ্য দলিল) ‘নফী আল-এহা’ত’ (পূর্ণ উপলব্ধি নাকচ) করে, কিন্তু তা ‘এহা’তা-বিহীন দর্শনকে নাকচ করে না। [প্রাগুক্ত শরহে সহীহ মুসলিম] 
 
দলিল নং ৯

ইমাম ইবনে জারির তাবারী (রহ:) ‘মহানবী (صلى الله عليه و آله و سلم) -এর অন্তর তিনি যা দেখেছেন সে সম্পর্কে মিথ্যে বলেনি’ (আল-কুরআন, ৫৩:১১) আয়াতের তাফসীরে লেখেন:

عيسى بن عبيد، قال: سمعت عكرِمة، وسُئل هل رأى محمد ربه، قال نعم، قد رأى ربه.

অর্থাৎ : ঈসা ইবনে উবায়দ (রহ:) বলেন, রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه و آله و سلم) তাঁর প্রভু খোদাতা’লাকে মে’রাজ রাতে দেখেছিলেন কি না, এ ব্যাপারে একরামা (রহ:)-কে জিজ্ঞেস করা হয়। তিনি বলেন, হ্যাঁ, তিনি তাঁর রব্ব আল্লাহকে দেখেছিলেন। [তাফসীরে তাবারী, ৫৩:১১]

দলিল নং ১০

ইমাম তাবারী (রহ:) খোদ রাসূলুল্লাহ প্রিয় নাবী কারিম (صلى الله عليه و آله و سلم) হতে প্রমাণ পেশ করেন:

عن عطاء، عن ابن عباس، قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: " رأَيْتُ رَبِي فِي أحْسَنَ صُورَةٍ

অর্থাৎ, হযরত আতা (রহ:) বর্ণনা করেন হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) থেকে মহানবী (صلى الله عليه و آله و سلم) -এর হাদীস, যিনি এরশাদ ফরমান, আমি আল্লাহতা’লাকে সেরা সুরত তথা আকৃতিতে দেখেছি (আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-ই ভালো জানেন)। [তাফসীরে তাবারী, ৫৩:১১] 

আমরা এই নিবন্ধ শেষ করবো মহানবী (صلى الله عليه و آله و سلم)-এর সীরাহ-বিষয়ে লেখা সেরা গ্রন্থ ইমাম কাজী আয়ায (রহ:)-এর ‘শেফা শরীফ’ হতে দীর্ঘ উদ্ধৃতি পেশ করে।

হযরত ইমাম নিজ গ্রন্থে লেখেন:

فصل
رؤيته لربه عز و جل و اختلاف السلف فيها
و أما رؤيته ـ صلى الله عليه و سلم لربه جل و عز ـ فاختلف السلف فيها ، فأنكرته عائشة .
حدثنا أبو الحسن سراج بن عبد الملك الحافظ بقراءتي عليه ، قال حدثني أبي و أبو عبد الله بن عتاب الفقيه ، قالا : حدثنا القاضي يونس بن مغيث ، حدثنا أبو الفضل الصلقي ، حدثنا ثابت بن قاسم بن ثابت ، عن أبيه وجده ، قالا : حدثنا عبد الله بن علي ،
قال : حدثنا محمود بن آدم ، حدثنا وكيع ، عن ابن أبي خالد ، عن عامر عن مسروق ـ أنه قال لعائشة رضي الله عنها ـ يا أم المؤمنين ، هل رأى محمد ربه ؟ فقالت : لقد قف شعري مما قلت . ثلاث من حدثك بهن فقد كذب : من حدثك أن محمد اً رأى ربه فقد كذب ، ثم قرأت : لا تدركه الأبصار وهو يدرك الأبصار وهو اللطيف الخبير ، و ذكر الحديث .
و قال جماعة بقول عائشة رضي الله عنها ، و هو المشهور عن ابن مسعود .
و مثله عن أبي هريرة أنه [ ا ] : إنما رأى جبريل . و اختلف عنه . و قال بإنكار هذا و امتناع رؤيته في الدنيا جماعة من المحدثين ، و الفقهاء و المتكلمين .
و عن ابن عباس رضي الله عنهما أنه رآه بعينه . وروى عطاء عنه ـ أنه رآه بقلبه .
و عن أبي العالية ، عنه : رآه بفؤاده مرتين .
و ذكر ابن إسحاق أن عمر أرسل إلى ابن عباس رضي الله عنهما يسأله : هل رأى محمد ربه ؟ فقال : نعم .
و الأشهر عنه انه رأى ربه بعينه ، روي ذلك عنه من طرق ، و قال : إن الله تعالى اختص موس بالكلام ، و إبراهيم بالخلة ،و محمداً بالرؤية و حجته قوله تعالى : ما كذب الفؤاد ما رأى * أفتمارونه على ما يرى * ولقد رآه نزلة أخرى [ سورة النجم /53 ، الآية : 11 ، 13 ] .
قال الماوردي : قيل : إن الله تعالى قسم كلامه و رؤيته بين موس ، و محمد صلى الله عليه و سلم ، فر آه محمد مرتين ، و كلمه موس مرتين .
و حكى أبو الفتح الرازي ، و أبو الليث السمرقدي الحكاية عن كعب .
و روى عبد الله بن الحارث ، قال : اجتمع ابن عباس و كعب ، فقال ابن عباس : أما نحن بنو هاشم فنقول : إن محمد اً قد رأى ربه مرتين ، فكبر كعب حتى جاوبته الجبال ،
و قال : إن الله قسم رؤيته و كلامه بين محمد و موس ، فكلمه موسى ، و رآه محمد بقلبه .
و روى شريك عن أبي ذر رضي الله عنه في تفسير الآية ، قال : رأى النبي صلى الله عليه و سلم ربه .
و ح كى السمرقندي ، عن محمد بن كعب القرظي ، و ربيع بن أنس ـ أن النبي صلى الله عليه و سلم سئل : هل رأيت ربك ؟ قال : رأيته بقؤادي ، و لم أره بعيني .
و روى مالك بن يخامر ، عن معاذ ، عن النبي صلى الله عليه و سلم ، قال : رأيت ربي ... و ذكر كلمة ، فقال : يا محمد ، فيم يختصم الملأ الأعلى الحديث .
و حكى عبد الرزاق أن الحسن كان يحلف با الله لقد رأى محمد ربه

অর্থাৎ, আল্লাহর দর্শন ও সালাফ আস্ সালেহীনের মধ্যকার এতদসংক্রান্ত মতপার্থক্যবিষয়ক অধ্যায়

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম কর্তৃক তাঁর প্রভু খোদাতা’লাকে দেখার ব্যাপারে প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের মধ্যে মতভেদ ছিল।

সাইয়্যেদাহ আয়েশা (রা:) একে প্রত্যাখ্যান করেন; আর যখন হযরত মাসরুখ (রা:) তাঁকে প্রশ্ন করেন: ‘হে উম্মুল মো’মেনীন (বিশ্বাসীদের মা)! মহানবী (صلى الله عليه و آله و سلم) কি তাঁর প্রভু আল্লাহ পাককে (মে’রাজ রাতে)  দেখেছিলেন?’ তখন তিনি উত্তর দেন: ‘তুমি যা জিজ্ঞেস করেছো, তাতে আমার মাথার চুল সব খাড়া হয়ে গিয়েছে।’
অতঃপর তিনি তিনবার বলেন, ‘তোমাকে এ কথা যে ব্যক্তি বলেছে, সে মিথ্যেবাদী।’ এরপর তিনি কুরআনে করীম থেকে তেলাওয়াত করেন নিম্নের আয়াত – “চক্ষুসমূহ তাঁকে (খোদাকে) আয়ত্ত (মানে উপলব্ধি) করতে পারে না এবং সমস্ত চক্ষু তাঁরই আয়ত্তে রয়েছে; আর তিনি-ই অতীব সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক পরিজ্ঞাত” (৬:১০৩)।

হযরত আয়েশা (রা:) যা বলেছিলেন, তার সাথে কিছু মানুষ একমত হয়েছেন এবং এটি-ও সর্বজনবিদিত যে সর্ব-হযরত ইবনে মাসউদ (রা:) ও আবূ হোরায়রা (রা:)-ও অনুরূপ কথাবার্তা বলেছিলেন; তাঁরা বলেছিলেন যে মহানবী (صلى الله عليه و آله و سلم) জিবরীল (আ:)-কেই দেখেছিলেন। তবে এই বিষয়ে এখতেলাফ তথা মতপার্থক্য বিদ্যমান।

হাদীসশাস্ত্র বিশারদ, ফুকাহা (ফকীহবৃন্দ) ও ধর্মতত্ত্ববিদদের জামা’আত (বড় দলটি) (ওপরের) ওই বক্তব্য এবং মহানবী (صلى الله عليه و آله و سلم) কর্তৃক আল্লাহতা’লার দর্শন লাভকে নাকচকারী সিদ্ধান্তটি প্রত্যাখ্যান করেন।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন: মহানবী (صلى الله عليه و آله و سلم) স্বচক্ষে আল্লাহকে দেখেছিলেন; অপরদিকে হযরত আতা (রা:) তাঁর কাছ থেকেই বর্ণনা করেন যে হুযূর পূর নূর (صلى الله عليه و آله و سلم) নিজ অন্তর (চক্ষু) দ্বারা আল্লাহকে দেখেছিলেন।

হযরত আবূল আলিয়্যা বলেন যে তিনি অন্তর (ও মস্তিষ্ক) দ্বারা দু বার তাঁর প্রভুকে দেখেছিলেন।

ইবনে এসহাক উল্লেখ করেন যে হযরত ইবনে উমর (রা:) তাঁকে হযরত ইবনে আব্বাস (রা:)-এর কাছে প্রেরণ করেন এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে – মহানবী (صلى الله عليه و آله و سلم) নিজ প্রভু খোদাতা’লাকে দেখেছেন কি না। তিনি জবাব দেন, “হ্যাঁ।”

এ ব্যাপারে সর্বাধিক জ্ঞাত অভিমত হলো নবী করীম (صلى الله عليه و آله و سلم) নিজ চোখে খোদাতা’লাকে দেখেছেন।
এটি হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) হতে বিভিন্ন সূত্রে রেওয়ায়াত করা হয়েছে। তিনি বলেন যে আল্লাহতা’লা হযরত মূসা (আ:)-কে (এককভাবে) বাছাই করেছিলেন তাঁর সাথে কালাম (আলাপ) করার জন্যে; হযরত ইবরাহীম (আ:)-কে ঘনিষ্ঠ বন্ধু (খলীল) হওয়ার জন্যে; আর মহানবী (صلى الله عليه و آله و سلم) -কে তাঁরই দর্শন (Vision) নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করার জন্যে।

কুরঅান মজীদেই বিধৃত হয়েছে এর সমর্থনে প্রামাণ্য দলিল: “তবে কি তোমরা তাঁর সাথে তিনি যা দেখেছেন তা নিয়ে বিতর্ক করছো? এবং তিনি তো ওই জ্যোতি দু’বার দেখেছেন।” [৫৩:১২-১৩; মুফতী আহমদ এয়ার খান সাহেব কৃত ‘নূরুল এরফান’]

আল-মাওয়ার্দী বলেন: এ কথা বলা হয় যে আল্লাহ পাক তাঁর দর্শন ও কালাম তথা কথপোকথনকে হযরত রাসূলে করীম (صلى الله عليه و آله و سلم) ও হযরত মূসা (আ:)-এর মধ্যে ভাগ করে দেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম দু বার আল্লাহতা’লাকে দেখেন এবং দু বার মূসা (আ:)-এর সাথে কথা বলেন।

আবূল ফাতহ রাযী ও আবূল্ লায়েস্ সামারকন্দী বর্ণনা করেন, সর্ব-হযরত কাআব আল-আহবার (রহ:) ও আবদুল্লাহ ইবনে হারিস (রহ:) হতে; তাঁরা বলেন যে হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) ও কাআব (রহ:) এ ব্যাপারে একমত হয়েছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন: আমরা, বনূ হাশিম গোত্র, বলি যে মহানবী (صلى الله عليه و آله و سلم) তাঁর প্রভু খোদাতা’লাকে দু বার দেখেছিলেন।

হযরত কাআব (রহ:) বলেন: আল্লাহু আকবর, যতোক্ষণ না পর্বতমালা তাঁর (কথার) প্রতিধ্বনি করেছিল। তিনি আরও বলেন, আল্লাহ পাক তাঁর দর্শন ও কালাম তথা কথপোকথনকে হযরত রাসূলে করীম (صلى الله عليه و آله و سلم) ও হযরত মূসা (আ:)-এর মধ্যে ভাগ করে দেন।

শারিক বর্ণনা করেন যে হযরত আবূ যর্র (রা:) ওপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন: “মহানবী (صلى الله عليه و آله و سلم) তাঁর প্রভু খোদাতা’লাকে দেখেছিলেন।”

(এসলাফ-বৃন্দের অন্যতম) ইমাম সামারকন্দী (রহ:) সর্ব-হযরত মুহাম্মদ বিন কা’আব আল-কুরদী (রহ:) ও রাবিউ’ ইবনে আনাস (রহ:) হতে বর্ণনা করেন যে রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه و آله و سلم) -কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: আপনি কি আপনার প্রভুকে দেখেছেন? তিনি জবাবে বলেন: আমি আমার অন্তর (চক্ষু) দ্বারা তাঁকে দেখেছি, কিন্তু চোখ দ্বারা দেখিনি [পাদটীকা-১: এই এসনাদ নির্ভরযোগ্য নয়, যেটি প্রিয়নবী (صلى الله عليه و آله و سلم) পর্যন্ত ফেরত পৌঁছেনি। অধিকন্তু, মহানবী (صلى الله عليه و آله و سلم) যে স্বচক্ষে আল্লাহতা’লাকে দেখেছিলেন, তা দলিল দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমরা আহলুস্ সুন্নাহভুক্ত মুসলমানবৃন্দ ‘সালাফী’দের মতো মৌলিক লিপিকে জাল করি না, আর তাই আমাদের সততা সেগুলোকে পরিবর্তন না করেই উপস্থাপনের দাবি আমাদের কাছে পেশ করে থাকে]।

মালেক ইবনে ইউখামির (রহ:) বর্ণনা করেন হযরত মু’য়ায ইবনে জাবাল (রা:) হতে; তিনি মহানবী (صلى الله عليه و آله و سلم) হতে বর্ণনা করেন, যিনি এরশাদ ফরমান: আমি আমার প্রভু খোদাতা’লাকে দেখেছি এবং তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘ওহে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম), ফেরেশতাকুল কী বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছে?’ [পাদটীকা-২: আল-বোখারীর সূত্রে একদম সহীহ হাদীস]

আবদুর রাযযাক ইবনে হামমাম (ইমাম বোখারীর শায়খ ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের মতে সেরা মোহাদ্দীস) বর্ণনা করেন যে ইমাম হাসান বসরী (রহ:) আল্লাহর নামে শপথ করে বলতেন, প্রিয়নবী (صلى الله عليه و آله و سلم) (মে’রাজ রাতে) আল্লাহকে দেখেছিলেন। [ইমাম কাজী আয়ায প্রণীত ‘শেফা শরীফ’ গ্রন্থের উদ্ধৃতি এখানে শেষ হলো]

দারুল ইফতা জামেয়া নিযামিয়া’র ফতোওয়া 
 
প্রশ্ন: মহানবী (صلى الله عليه و آله و سلم) কি মে’রাজের রাতে আল্লাহ পাককে দেখেছিলেন? উলামা-মণ্ডলীর অনেককে বলতে শুনেছি তিনি খোদাতা’লাকে দেখেছেন।

জবাব: মে’রাজ রাতে মহানবী (صلى الله عليه و آله و سلم) আল্লাহতা’লাকে দেখার আশীর্বাদধন্য হন এবং এটি-ই হলো আহলুস্ সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকীদা-বিশ্বাস
[দারুল ইফতা জামেয়া নিযামিয়্যা, তারিখ: ১৪/০৫/২০০৮]

কৃতজ্ঞতা 

মূল: আহলুস্ সুন্নাহ-ডট-কম।
অনুবাদ: কাজী সাইফুদ্দীন হোসেন

[Bengali translation of http://www.ahlus-sunna.com’s article ‘Did the Prophet (peace be upon him) see Allah?’ Translator: Kazi Saifuddin Hossain]
Arabic and Online setup by brother-in-Islam and Facebook friend Mahmud Hasan