ব্লগ সংরক্ষাণাগার

শনিবার, ৮ জুন, ২০১৯

জনৈক সরকারি কর্মকর্তার বক্তব্যের খণ্ডন



সম্প্রতি এক সরকারি কর্মকর্তা বলেছেন, বাবা-মায়ের চেয়ে বড় পীর-আউলিয়া নেই। তাঁর কথার পরিপ্রেক্ষিতে আমার ভাবনা নিচে তুলে ধরছি।

পিতা ও মাতা জন্মদাতা। তাঁরা আমাদের শিশু বয়সে রক্ষণাবেক্ষণকারী; বেড়ে ওঠার সময়ে শিক্ষা-দীক্ষা দানকারীও। সে জন্যে পাক কালামে ঘোষিত হয়েছে: وَبِٱلْوَالِدَيْنِ إِحْسَاناً অর্থাৎ, তোমাদের পিতা-মাতার প্রতি অনুগ্রহ করো তথা তাঁদের হক্ব আদায় করো [১৭:২৩]। শরীয়ত তাঁদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু এটা স্রেফ জাহেরী বা লৌকিক একটা বিষয়। এতে খোদাতা’লাকে অন্বেষণের পথ বর্ণিত হয়নি। তাঁর নৈকট্য লাভের পদ্ধতিও বলা হয়নি। বিশেষ করে তাঁকে জানার বা তাঁর ভেদের রহস্য জানার তরীক্বাও বাতলে দেয়া হয়নি। সেই পথটি দেখাতে পারেন একমাত্র আল্লাহর ওলী, সত্যপন্থী পীর ও মুর্শীদ। এরশাদ হয়েছে: يَا أَيُّهَا ٱلَّذِينَ آمَنُواْ ٱتَّقُواْ ٱللَّهَ وَٱبْتَغُوۤاْ إِلَيهِ ٱلْوَسِيلَةَ অর্থাৎ, হে ঈমানদারবর্গ, আল্লাহর নৈকট্যের মাক্বাম লাভের উদ্দেশ্যে অসীলার তালাশ করো [সূরা মায়েদা, ৩৫]। হক্কানী/রব্বানী উলামাবৃন্দ এই আয়াতে উক্ত অসীলা শব্দটির তাফসীর করেছেন ওলী/মুর্শীদ [যেমন- ইমামে রব্বানী মোজাদ্দেদে আলফে সানী]। অতএব, চূড়ান্ত মিশন যেটা, সেটা ভুলে গেলে চলবে না। উল্লেখ্য যে, পিতা যদি হন কামেল ওয়াল মোকাম্মেল মুর্শীদ, তাহলে তো সোনায় সোহাগা! কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মা ও বাবা নিজেদের জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে সন্তানকে দুনিয়ার জঞ্জালের দিকে টেনে নিয়ে যান; এমতাবস্থায় তরীক্বায় দীক্ষা লাভকারী সন্তান নিরবচ্ছিন্ন সাধনা করতে পারেন না। তাই এই দুটোর মধ্যে তালগোল পাকানো উচিৎ হবে না।

এই বিষয়ে যাঁরা আরো জানতে আগ্রহী, তাঁরা নিচের লিঙ্কে প্রদত্ত বইটি ডাউনলোড করে পড়তে পারেন। লিঙ্ক: https://www.mediafire.com/file/eveehda2tgqefg3/

[পুনশ্চ: মা-বাবার খেদমতগারী দ্বারা বেহেশত নিশ্চিত হতে পারে মো’মেন মুসলমানদের। দোযখের আগুন থেকে পরিত্রাণও পেতে পারেন তাঁরা। কিন্তু আউলিয়া-সূফী-দরবেশবৃন্দের অভীষ্ট লক্ষ্য তো বেহেশত নয়। তাঁরা চান বেহেশত-দোযখের মালিক স্বয়ং খোদাতা’লাকে; তাঁরই রেযামন্দিকে। এই লক্ষ্যের মধ্যে বেহেশত-দোযখের বিষয়টি একদম নেই। আপনাদের কি সূফী-দরবেশ হযরত রাবেয়া বসরী (রহমতুল্লাহে আলাইহা)’র ঘটনার কথা মনে নেই? তিনি এক হাতে পানির পাত্র এবং অপর হাতে আগুনের চেরাগ নিয়ে বলেন, আমি বেহেশতের আশায় এবাদত-বন্দেগীকে আগুন দ্বারা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দেবো; আর দোযখের আগুনের ভয়ে তা পালন করাকে পানি দ্বারা নিভিয়ে দেবো [মোটামুটি এই ছিলো তাঁর ভাষ্যের মর্মবাণী]। এমতাবস্থায় আমি তাসাউফ-তরীক্বতের দীক্ষাগ্রহণকারী হিসেবে এই অভীষ্ট লক্ষ্যের চেয়ে কম কোনো কিছুতে কোনোক্রমেই সন্তুষ্ট হতে পারি না।]

শুক্রবার, ৩১ মে, ২০১৯

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত: ইসলামের সঠিক পথ ও মত

Post by the Admin

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
নাহমাদুহু ও নুসল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম
আম্মা বা’আদ।

মহান আল্লাহতা’লা তাঁর পাক কালামে মুসলমানবৃন্দকে দুআ করতে আদেশ করেন এই মর্মে:

 ٱهْدِنَا ٱلصِّرَاطَ ٱلْمُسْتَقِيمَ، صِرَاطَ ٱلَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ، غَيْرِ ٱلْمَغْضُوبِ عَلَيْهِم وَلاَ ٱلضَّآلِّينَ

অর্থ: (হে প্রভু), আমাদেরকে সোজা পথে পরিচালিত করুন; তাঁদেরই পথে যাঁদের প্রতি আপনি অনুগ্রহ করেছেন; তাদের পথে নয় যাদের প্রতি গযব/খোদায়ী শাস্তি অবতীর্ণ হয়েছে; আর পথভ্রষ্টদের পথেও নয়। [সূরা ফাতিহাহ, ৫-৭ আয়াত; নূরুল এরফান]

এই হচ্ছে সোজা-সরল পথ ও মত - খোদাতা’লা হতে প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)’র প্রাপ্ত ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম)’এর প্রচারিত ইসলাম ধর্মের মৌলিক আক্বীদা-বিশ্বাস।

আমাদের রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এই প্রসঙ্গে এরশাদ ফরমান: "আমার উম্মত অনতিবিলম্বে ৭৩ দলবিভক্ত হবে; একটি দল ছাড়া বাকি সবাই জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” সাহাবায়ে কেরাম (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম) তাঁকে জিজ্ঞেস করেন: “কোন্ দলটি নাজাতপ্রাপ্ত হবে, এয়া রাসূলাল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)?” এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন: “আমি ও আমার সাহাবা যে পথ ও মত তথা আক্বীদা-বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত, তার অনুসারীরাই মুক্তি পাবে। [সুনানে তিরমিযী; হাদীস নং ২৬৪১ - আরবী এবারত: وتفترق امتي على ثلاث وسبعين ملة كلهم في النار إلا ملة واحدة، قالوا: ومن هي يا رسول الله؟ قال: ما انا عليه واصحابي]

এই জ্যোতির্ময় আক্বীদা-বিশ্বাস, যার ধারক ও বাহক হলেন মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর অনুগত সাহাবায়ে কেরাম (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম), তা সম্পর্কে প্রত্যেক মুসলমানের সম্যক অবগত হওয়া জরুরি। কেননা ইসলামের ছদ্মবেশে এমন বাহাত্তরটি গোমরাহ-পথভ্রষ্ট দল আবির্ভূত হবে, যাদের মহাভ্রান্ত ধ্যানধারণা মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম)’এর আক্বীদা-বিশ্বাসের একদম পরিপন্থী হবে বা তার সাথে সাংঘর্ষিক হবে।

ওপরে উক্ত হাদীসে বর্ণিত বাহাত্তরটি ভ্রান্ত দলের আবির্ভাব হয়েছে। তারা তাদের ভ্রান্ত ধ্যানধারণা অপপ্রচার করছে। এই সঙ্কটকালে মুসলমান সমাজের সঠিক আক্বীদা-বিশ্বাস শিক্ষাগ্রহণের উদ্দেশ্যে সর্বাত্মক চেষ্টা করা একান্ত অপরিহার্য। ওই নাজাত লাভকারী আক্বীদা-বিশ্বাস সম্পর্কে প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) আরেকটি হাদীস শরীফে স্পষ্ট বলেন:

فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي

অর্থ: আমার সুন্নাত (সুন্নী আক্বীদাহ-বিশ্বাস/রীতিনীতি) তোমাদের প্রতি বিধেয় (তথা আজ্ঞা হিসেবে আরোপিত) হলো। [সুনানে ইবনে মাজাহ, বই নং ১, হাদীস নং ৪৪]

রাসূলে খোদা (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) আরো এরশাদ করেন:

فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي

অর্থ: যে ব্যক্তি আমার সুন্নী আদর্শ/রীতিনীতি হতে ফিরে গেলো (তথা প্রত্যাখ্যান করলো), সে আমার (দলভুক্ত) নয়। [সুনানে নাসাঈ, বই নং ২৬, হাদীস নং ৩২১৭]

এটাই প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)’র নাজাত লাভকারী আদর্শ বা আক্বীদা-বিশ্বাস, যেটা সম্পর্কে তিনি তিয়াত্তর দলের বর্ণনাসম্বলিত হাদীসে উল্লেখ করেছেন। এই আশীর্বাদময় সুন্নী আক্বীদা-বিশ্বাস ধারণ করেই মুসলমান সমাজ আখেরাতে মুক্তি অর্জন করবেন। পক্ষান্তরে, বাহাত্তরটি পথভ্রষ্ট দল সুন্নী আক্বীদা-বিশ্বাস বর্জন করার ফলশ্রুতিতে জাহান্নামে যাবে। তারা নিজেদেরকে ইসলামী দল হিসেবে প্রদর্শন করবে ঠিক, কিন্তু তারা সূরাতুল ফাতিহায় আল্লাহতা’লা কর্তৃক প্রতিশ্রুত রহমত-বরকত হতে বঞ্চিত হবে।

যে পথ ও মতের ওপর আল্লাহতা’লার রহমত-বরকত বর্ষিত হচ্ছে, তা আমাদের প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)’র সুন্নী আক্বীদা-বিশ্বাস বা আদর্শ; এই পথ ও মত গ্রহণ করেছেন তাঁরই সাহাবায়ে কেরাম (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম) ও আউলিয়া কেরাম (রহমতুল্লাহে আলাইহিম)। আর যুগে যুগে এর দিকনির্দেশনা দিয়েছেন সুন্নী উলামায়ে হাক্কানী/রাব্বানী তথা বুযূর্গানে দ্বীন। বড়পীর গাউসুল আযম হযরত আবদুল ক্বাদের জিলানী (রহমতুল্লাহে আলাইহে) তাঁর প্রণীত ‘গুনিয়াতুত-তালেবীন’ পুস্তকে বেহেশ্ত লাভকারী এই দলটিকে ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত’ বলে চিহ্নিত করেন। মুসলমানদের উচিৎ আউলিয়া-দরবেশবৃন্দের গৃহীত এই নেআমত-প্রাপ্ত দলটির অনুসরণ করা এবং এর বিরোধিতাকারী এবং এরই কুৎসা রটনাকারী বাহাত্তরটি দলকে বর্জন করা। ইসলামের স্বর্ণযুগে আউলিয়া কেরাম (রহমতুল্লাহে আলাইহিম)-ই ছিলেন ইসলামের পতাকাবাহী, উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা।

আজকে অনেক ভ্রান্ত দলের আবির্ভাব হয়েছে। ওহাবী, মওদূদী, সালাফী, তাবলীগী, শিয়া, কাদিয়ানী প্রভৃতি দল প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর আউলিয়াবৃন্দের সুন্নী মতাদর্শকে গালমন্দ করছে। তারা নিজেদের ভ্রান্ত মতবাদ পীস্ টিভি, এটিএন বাংলা ইত্যাদি স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলে এবং ইন্টারনেটে প্রচার করছে। এগুলোর সবই চলছে ‘তাফসীরুল ক্বুরআন’ ও ‘সীরাতুন্নবী (দ:)’ শিরোনামে। এছাড়া বইপত্র তো আছেই। তাই মুসলমানদেরকে এই সব গোমরাহ দল সম্পর্কে সচেতন ও সাবধান হওয়া প্রয়োজন।

                                         *সমাপ্ত* 



শনিবার, ২৫ মে, ২০১৯

ই'তিকাফ


 ইমরান বিন বদরী 

নাহমাদুহু ওয়া নুসল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম,আম্মা বা’দ

"ই'তিকাফ" শব্দটি আরবী, যার অর্থ অবস্থান করা। ইসলামী শরীয়তে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। আল্লাহ তা‘য়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে দুনিয়াবী সকল কাজ থেকে মুক্ত হয়ে সম্পূর্ণ আল্লাহর ইবাদতের জন্য মসজিদে অবস্থান করাকে ই‘তিকাফ বলা হয়। ই’তিকাফ  মুমিনের জীবনে একটি শিক্ষামূলক নিবিড় আত্মিক প্রশিক্ষণ। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও অনেক আগ্রহ সহকারে ই'তিকাফে থাকতেন এবং সাহাবীদেরকেও ই'তিকাফে থাকার জন্য বলতেন।

عَنْ عَائِشَةَ زَوْجِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم أَنَّ النَّبِيَّ كَانَ يَعْتَكِفُ الْعَشْرَ الأَوَاخِرَ مِنْ رَمَضَانَ حَتَّى تَوَفَّاهُ اللهُ ثُمَّ اعْتَكَفَ أَزْوَاجُهُ مِنْ بَعْدِهِ
অর্থ: উম্মুল মুমেনীন হজরত আয়েশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানের শেষ ১০ দিন ই'তিকাফ করতেন। এভাবে পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়া পর্যন্ত ই'তিকাফ করেছেন। পরবর্তীতে উম্মুল মুমেনিনবৃন্দ ই'তিকাফ করেছেন।(মুত্তাফাকুন আলাইহ)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন, যে ব্যক্তি রমজানের শেষ দশদিন ই’তিকাফ করবে, সে যেন দু’টি হজ্ব এবং দু’টি উমরাহর সাওয়াব লাভ করবে। (বায়হাকী)

বিভিন্ন সহীহ হাদীসের মাধ্যমে ই’তিকাফের মর্যাদা এবং এর অধিক সওয়াবের কথা বর্ননা করা হয়েছে। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীবৃন্দও অধিক আগ্রহের সাথে ই'তিকাফ করতেন।
 ই‘তিকাফের উদ্দেশ্য 

মহান আল্লাহ তা’লার একান্ত সান্নিধ্যে যাওয়া।আত্মশুদ্ধির জন্য মহান আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করা। একাগ্রচিত্তে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হয়ে,বিনয় নম্রতায় নিজেকে আল্লাহর দরবারে সমপর্ণ করা এবং বিশেষ করে লাইলাতুল কদরে ইবাদত করার সুযোগ লাভ করা।
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ ح قَالَ سُفْيَانُ وَحَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَمْرٍو عَنْ أَبِي سَلَمَةَ عَنْ أَبِي سَعِيدٍ ح قَالَ وَأَظُنُّ أَنَّ ابْنَ أَبِي لَبِيدٍ حَدَّثَنَا عَنْ أَبِي سَلَمَةَ عَنْ أَبِي سَعِيدٍ قَالَ اعْتَكَفْنَا مَعَ رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم الْعَشْرَ الأَوْسَطَ فَلَمَّا كَانَ صَبِيحَةَ عِشْرِينَ نَقَلْنَا مَتَاعَنَا فَأَتَانَا رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ مَنْ كَانَ اعْتَكَفَ فَلْيَرْجِعْ إِلَى مُعْتَكَفِهِ فَإِنِّي رَأَيْتُ هَذِهِ اللَّيْلَةَ وَرَأَيْتُنِي أَسْجُدُ فِي مَاءٍ وَطِينٍ فَلَمَّا رَجَعَ إِلَى مُعْتَكَفِهِ وَهَاجَتْ السَّمَاءُ فَمُطِرْنَا فَوَالَّذِي بَعَثَهُ بِالْحَقِّ لَقَدْ هَاجَتْ السَّمَاءُ مِنْ آخِرِ ذَلِكَ الْيَوْمِ وَكَانَ الْمَسْجِدُ عَرِيشًا فَلَقَدْ رَأَيْتُ عَلَى أَنْفِهِ وَأَرْنَبَتِهِ أَثَرَ الْمَاءِ وَالطِّينِ
অর্থ: হজরত আবূ সাঈদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, আমরা রমযানের মধ্য দশকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সংগে ইতিকাফ করেছিলাম। বিশ তারিখের সকালে (ইতিকাফ শেষ করে চলে আসার উদ্দেশ্যে) আমরা আমাদের আসবাবপত্র সরিয়ে ফেলি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কাছে এসে বলেন: যে ব্যাক্তি ইতিকাফ করেছে, সে যেন তার ইতিকাফস্থলে ফিরে যায়। কারণ আমি এই রাতে (লাইলাতুল কদর) দেখতে পেয়েছি এবং আমি আরও দেখেছি যে, আমি পানি ও কাদার মধ্যে সিজদা করছি। এরপর যখন তিনি তাঁর ইতিকাফের স্থানে ফিরে গেলেন এবং আকাশে মেঘ দেখা দিলো, তখন আমাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষিত হলো। সেই সত্তার কসম! যিনি তাঁকে যথাযথ প্রেরণ করেছেন। ওই দিনের শেষভাগে আকাশে মেঘ দেখা দিল। মসজিদ ছিল খেজুর পাতার ছাউনির। আমি তাঁর নাকের অগ্রভাগে পানি ও কাদার চিহ্ন দেখেছিলাম। [ইমাম ইসমাইল বুখারী (রঃ) উনার বিখ্যাত সহীহ বুখারীতে হাদিস শরীফটি উল্লেখ করেছেন, ই,ফা, বা, ১৯৯০ সংস্করণ]

(জরুরি নোট: আকাশে মেঘ নেই বৃষ্টির কোন সম্ভাবনাও নেই, কিন্তু মহানবী সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- বৃষ্টি হবে; কাদা-পানিতে সিজদা করবো। তাই হলো)
ই‘তিকাফের জন্য শর্ত

(ক) মুসলমান হওয়া;
(খ) জ্ঞান থাকা;
(গ) বড় নাপাকী থেকে পবিত্র থাকা, গোসল ফরয হলে গোসল করে নেয়া;
(ঘ) মসজিদে ই‘তিকাফ করা।

কাজেই কাফির-মুশরিক, অবুঝ শিশু, পাগল ও অপবিত্র লোক এবং হায়েয-নিফাস অবস্থায় নারীদের ই‘তিকাফ শুদ্ধ হবে না।

ই'তিকাফের হুকুম

ই'তিকাফে থাকা সুন্নাতে রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম। সমাজের কেউ যদি ই'তিকাফ না করে, তাইলে সমাজের সবাই গুনাহগার হবে। আর যদি একজনও করেন, তাইলে সবার পক্ষে আদায় হয়ে যাবে। যিনি ই’তিকাফ করেন, তাঁকে মু’তাকিফ বলা হয়।

ই'তিকাফে বর্জনীয়

মহান আল্লাহ পাক বলেন:-

وَلاَ تُبَاشِرُوهُنَّ وَأَنتُمْ عَاكِفُونَ فِي الْمَسَاجِدِ
অর্থাৎ, ইতিকাফ অবস্থায় বিবিদের সাথে মিলিত হয়োনা। [সূরা আল বাকারা:১৮৭]

স্ত্রীকে চুম্বন ও স্পর্শ করা, মসজিদ থেকে বের হওয়া, বেচাকেনা, চাষাবাদ করা নিষেধ। অন্যান্য অপছন্দনীয় কাজ থেকে বিরত থাকাও। যেমন - অযথা গল্প-গুজব, কথাবার্তা না বলা।

উম্মুল মুমেনীন হজরত আয়েশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন:

عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ : كَانَ النَّبِيُّ -صلى الله عليه وسلم- إِذَا اعْتَكَفَ لاَ يَدْخُلُ الْبَيْتَ إِلاَّ لِحَاجَةِ الإِنْسَانَ
অর্থ: ‘হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, একান্ত (পেশাব-পায়খানার) প্রয়োজন পূরণ ছাড়া নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদ ছেড়ে বাড়িতে প্রবেশ করতেন না।’ [মুসলিম ২৯৭]

ইমাম বায়হাকী (রহঃ ) উম্মুল মুমেনীন হজরত আয়েশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা হতে বর্ণনা করেন, ইতিকাফ অবস্থায় কোনো রোগী দেখতে যাবেনা; মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও অবস্থান করবেনা; স্ত্রীর সাথে মিলবেনা; প্রয়োজন ছাড়া বাইরে যাবেনা। ইতিকাফকারীকে রোজাদার হতে হবে। যে মসজিদে জামাতের সাথে সালাত হয়, সে মসজিদে ইতিকাফ করতে হবে।

ইতিকাফ অবস্থায় অধিক পরিমাণে ইবাদত করা প্রয়োজন। পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত, নফল ইবাদতে সময় পার করা উত্তম। মসজিদে অহেতুক কথা না বলাই ইতিকাফ্ পালনকারীর জন্যে উত্তম।

আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন যেনো আমাদেরকে সঠিকভাবে ই'তিকাফ পালন করার তাওফীক দান করেন, আমীন।

                                                                            *সমাপ্ত*

বুধবার, ১ মে, ২০১৯

জাগ্রত অবস্থায় প্রিয়নবী (দ:)’কে দেখা প্রসঙ্গে পুণ্যাত্মাবৃন্দের সাক্ষ্য

[Bengali translation of the online article "Seeing of Prophet (peace be upon him) while awake." Translator: Kazi Saifuddin Hossain]

মূল: www.ahlus-sunna.com
অনুবাদ: কাজী সাইফুদ্দীন হোসেন

[অনুবাদকের আরয: ইদানীং মহানবী (দ:)’র ‘হাজির-নাজির’ হওয়ার আক্বীদা-বিশ্বাস নিয়ে জনৈক বাঙালি বংশোদ্ভূত মার্কিন আলেম সাহেব প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, গত শতাব্দীর সুন্নী আলেমে দ্বীন ইমাম আহমদ রেযা (রহ:) ছাড়া ইতিপূর্বে আর কেউই এই বিশ্বাস পোষণ করেন নি; এমন কী টার্মটি নাকি চালু-ও ছিলো না! বিতর্কে না যেয়ে প্রাথমিক তথা স্বর্ণযুগের পুণ্যবান আলেম-উলামাবৃন্দের এতদসংক্রান্ত আক্বীদা-বিশ্বাস আমরা তুলে ধরার প্রয়াস পাবো। বলা বাহুল্য যে, তাঁরা প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)’কে প্রতিনিয়ত দেখার প্রত্যাশী ছিলেন, যা তাঁরই হাজির-নাজির হওয়ার সাক্ষ্য বহন করে। আমরা সবার প্রতি তাঁদের এতদসংক্রান্ত সাক্ষ্যগুলোকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বিচার-বিশ্লেষণের আহ্বান জানাই। আমাদের ধর্ম একগুঁয়েমিকে সমর্থন করে না।]  

প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)’কে জাগ্রত অবস্থায় দেখা এবং মা’রেফাতের জ্ঞানসমৃদ্ধ পুণ্যাত্মাদের এ ব্যাপারে অবহিত থাকার বাস্তবতা-সংক্রান্ত শরঈ ফতোয়া সম্পর্কে এই প্রবন্ধটিতে আলোকপাত করা হবে। কিন্তু তার আগে আমরা দৃষ্টি দেবো:

আল-ক্বুরআনের আলোকে

এরশাদ হয়েছে:

هُوَ ٱلَّذِي بَعَثَ فِي ٱلأُمِّيِّينَ رَسُولاً مِّنْهُمْ يَتْلُواْ عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ ٱلْكِتَابَ وَٱلْحِكْمَةَ وَإِن كَانُواْ مِن قَبْلُ لَفِي ضَلاَلٍ مُّبِينٍ

অর্থ: তিনি-ই (খোদা), যিনি উম্মী লোকদের মধ্যে তাদেরই মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করেন যেনো তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করেন, তাদেরকে পবিত্র করেন এবং তাদেরকে কিতাব  ও হিকমতের জ্ঞান দান করেন, আর নিশ্চয় নিশ্চয় তারা ইতিপূর্বে সুস্পষ্ট পথভ্রষ্টতার মধ্যে ছিলো। [৬২:২; নূরুল এরফান]

পরবর্তী আয়াতে ঘোষিত হয়েছে:

وَآخَرِينَ مِنْهُمْ لَمَّا يَلْحَقُواْ بِهِمْ وَهُوَ ٱلْعَزِيزُ ٱلْحَكِيمُ

অর্থ: এবং তাদের মধ্য থেকে অন্যান্যদের পবিত্র করেন এবং জ্ঞান দান করেন তাদেরকে, যারা ওই পূর্ববর্তীদের সাথে মিলিত হয়নি; আর তিনি-ই সম্মান ও প্রজ্ঞাময়। [৬২:৩; নূরুল এরফান]

ক্বুরআনের তাফসীরবিদবৃন্দের শিরোমণি ইমাম তাবারী (রহমতুল্লাহে আলাইহে) এই আয়াতের ব্যাখ্যা্য় বলেন:

قال ابن زيد، في قول الله عزّ وجلّ: { وآخَرِينَ مِنْهُمْ لَمَّا يَلْحَقُوا بِهِمْ } قال: هؤلاء كلّ من كان بعد النبيّ صلى الله عليه وسلم إلى يوم القيامة، كلّ من دخل في الإسلام من العرب والعجم

অর্থ: হযরত ইবনে যায়দ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) উক্ত আয়াত (যারা ওই পূর্ববর্তীদের সাথে মিলিত হয়নি) সম্পর্কে বলেন যে এটা ওই ‘সকল’ লোককেই উদ্দেশ্য করে, যাঁরা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)’এর যাহেরী জিন্দেগীর পরে ক্বেয়ামত অবধি দ্বীন ইসলামে প্রবেশ করতে থাকবেন; আর এঁদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত আরব ও অনারব উভয় জাতিগোষ্ঠী-ই। [তাফসীরে তাবারী, ৭ম খণ্ড, ৮৩ পৃষ্ঠা; দারুল ফিকর বৈরুত, লেবানন]

আল্লামা মাহমূদ আলূসী এই আয়াতে করীমার ব্যাখ্যায় বলেন:

طوائف الناس الذين يلحقون إلى يوم القيامة من العرب والروم والعجم وغيرهم؛ وبذلك فسره الضحاك وابن حيان ومجاهد في رواية، ويكون الحديث من باب الاقتصار والتمثيل

অর্থ: এতে অন্তর্ভুক্ত ক্বেয়ামত অবধি সমগ্র মানবজাতি: আরব, রোমান, আজমী/অনারব প্রমুখ...এ প্রসঙ্গে ইবনে হাইয়্যান ও মুজাহিদের (পারস্য-সংক্রান্ত) ক্বওল/বক্তব্য স্রেফ একটি উদাহরণকে ব্যাখ্যা করার খাতিরেই প্রদত্ত হয়েছে। [আল-আলূসী কৃত ‘রূহুল মা’আনী,’ ৮ম খণ্ড, ৩৯ পৃষ্ঠা]

[বঙ্গানুবাদকের নোট: মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) যেমন সাহাবা-এ-কেরাম (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম)’কে পরিশুদ্ধ করেন ও হেকমত/আধ্যাত্মিক জ্ঞান-প্রজ্ঞা শিক্ষা দেন, ঠিক তেমনি পরবর্তী মুসলমান প্রজন্মগুলোর প্রতিও তিনি একই দায়িত্ব পালন করে চলেছেন]

হাদীস শরীফের আলোকে

স্বপ্নে নবী পাক (দ:)’এর দর্শন লাভ

হাদীস # ১

হযরত আবূ হোরায়রাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)’র বাণী; যিনি বলেন:

حَدَّثَنَا أَبُو الرَّبِيعِ، سُلَيْمَانُ بْنُ دَاوُدَ الْعَتَكِيُّ حَدَّثَنَا حَمَّادٌ، ـ يَعْنِي ابْنَ زَيْدٍ ـ حَدَّثَنَا أَيُّوبُ، وَهِشَامٌ، عَنْ مُحَمَّدٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مَنْ رَآنِي فِي الْمَنَامِ فَقَدْ رَآنِي فَإِنَّ الشَّيْطَانَ لاَ يَتَمَثَّلُ بِي

অর্থ: যে ব্যক্তি আমাকে স্বপ্নে দেখে, সে প্রকৃতপক্ষে আমাকেই দেখে; (কেননা) নিশ্চয় নিশ্চয় শয়তান আমার অনুরূপ সুরত ধারণ করতে পারে না। [মুসলিম শরীফ, বই নং ২৯, হাদীস নং ৫৬৩৫]

হাদীস # ২

وَحَدَّثَنِي أَبُو الطَّاهِرِ، وَحَرْمَلَةُ، قَالاَ أَخْبَرَنَا ابْنُ وَهْبٍ، أَخْبَرَنِي يُونُسُ، عَنِ ابْنِ، شِهَابٍ حَدَّثَنِي أَبُو سَلَمَةَ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ، أَنَّ أَبَا هُرَيْرَةَ، قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ ‏مَنْ رَآنِي فِي الْمَنَامِ فَسَيَرَانِي فِي الْيَقَظَةِ أَوْ لَكَأَنَّمَا رَآنِي فِي الْيَقَظَةِ لاَ يَتَمَثَّلُ الشَّيْطَانُ بِي  ‏

অর্থ: হযরত আবূ হুরায়রাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন: আমি প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)’কে বলতে শুনেছি, “যে ব্যক্তি আমাকে স্বপ্নে দেখে, সে সহসা আমাকে জাগ্রত অবস্থায় দেখবে; কিংবা সে যেনো আমাকে জাগ্রত অবস্থাতেই দেখে। কেননা শয়তান আমার অনুরূপ সুরত ধারণ করতে পারে না। [মুসলিম শরীফ, বই নং ২৯, হাদীস নং ৫৬৩৬]

হাদীস # ৩

হযরত আবূ ক্বাতাদা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)’এর বাণী, যিনি বলেন:

وَقَالَ فَقَالَ أَبُو سَلَمَةَ قَالَ أَبُو قَتَادَةَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مَنْ رَآنِي فَقَدْ رَأَى الْحَقَّ  

অর্খ: যে ব্যক্তি আমাকে (স্বপ্নে) দেখে, সে প্রকৃতপক্ষে হক্ক’কে প্রত্যক্ষ করে। [মুসলিম শরীফ, বই নং ২৯, হাদীস নং ৫৬৩৭]

হাদীস # ৪

হযরত আনাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণিত এক হাদীসে প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এরশাদ ফরমান: 

حَدَّثَنَا مُعَلَّى بْنُ أَسَدٍ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الْعَزِيزِ بْنُ مُخْتَارٍ، حَدَّثَنَا ثَابِتٌ الْبُنَانِيُّ، عَنْ أَنَسٍ ـ رضى الله عنه ـ قَالَ قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم ‏ "‏ مَنْ رَآنِي فِي الْمَنَامِ فَقَدْ رَآنِي، فَإِنَّ الشَّيْطَانَ لاَ يَتَخَيَّلُ بِي، وَرُؤْيَا الْمُؤْمِنِ جُزْءٌ مِنْ سِتَّةٍ وَأَرْبَعِينَ جُزْءًا مِنَ النُّبُوَّةِ ‏"‏‏.‏
  
অর্থ: যে ব্যক্তি আমাকে স্বপ্নে দেখে, সে নিঃসন্দেহে আমাকেই দেখে; কেননা শয়তান আমার রূপ ধারণ করতে পারে না। [আল-বুখারী, বই নং ৯, হাদীস নং ১২৩]

প্রিয়নবী (দ:)’কে জাগ্রত অবস্থায় দেখা

‘প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)’কে জাগ্রত অবস্থায় দেখার’ বিষয়টি আল-আলূসী প্রমাণ করেন:

وجوز أن يكون ذلك بالاجتماع معه عليه الصلاة والسلام روحانية، ولا بدع في ذلك فقد وقعت رؤيته صلى الله عليه وسلم بعد وفاته لغير واحد من الكاملين من هذه الأمة والأخذ منه يقظة، قال الشيخ سراج الدين بن الملقن في «طبقات الأولياء»: قال الشيخ عبد القادر الكيلاني قدس سره: رأيت رسول الله صلى الله عليه وسلم قبل الظهر فقال لي: يا بني لم لا تتكلم؟ قلت: يا أبتاه أنا رجل أعجم كيف أتكلم على فصحاء بغداد فقال: افتح فاك ففتحته فتفل فيه سبعاً وقال: تكلم على الناس وادع إلى سبيل ربك بالحكمة والموعظة الحسنة فصليت الظهر وجلست وحضرني خلق كثير فارتج عليَّ فرأيت علياً كرم الله تعالى وجهه قائماً بإزائي في المجلس فقال لي: يا بني لم لا تتكلم؟ قلت: يا أبتاه قد ارتج علي فقال: افتح فاك ففتحته فتفل فيه ستاً فقلت: لم لا تكملها سبعاً قال: أدباً مع رسول الله صلى الله عليه وسلم ثم توارى عني فقلت: غواص الفكر يغوص في بحر القلب على درر المعارف فيستخرجها إلى ساحل الصدر فينادي عليها سمسار ترجمان اللسان فتشترى بنفائس أثمان حسن الطاعة في بيوت أذن الله أن ترفع.

وقال أيضاً في ترجمة الشيخ خليفة بن موسى النهر ملكي: كان كثير الرؤية لرسول الله عليه / الصلاة والسلام يقظة ومناماً فكان يقال: إن أكثر أفعاله يتلقاه منه صلى الله عليه وسلم يقظة ومناماً ورآه في ليلة واحدة سبع عشرة مرة قال له في إحداهن: يا خليفة لا تضجر مني فكثير من الأولياء مات بحسرة رؤيتي، وقال الشيخ تاج الدين بن عطاء الله في «لطائف المنن»: قال رجل للشيخ أبـي العباس المرسي يا سيدي صافحني بكفك هذه فإنك لقيت رجالاً وبلاداً فقال: والله ما صافحت بكفي هذه إلا رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: وقال الشيخ لو حجب عني رسول الله صلى الله عليه وسلم طرفة عين ما عددت نفسي من المسلمين، ومثل هذه النقول كثير من كتب القوم جداً.  

অনুবাদ:

মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)’র সাথে আধ্যাত্মিক হালত-অবস্থায় দেখা-সাক্ষাতের সাক্ষ্য-প্রমাণাদি বিদ্যমান; আর এটা কোনো নতুন বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত নয়। কেননা এই উম্মতের অনেক কামেল/পূর্ণতাপ্রাপ্ত বুযূর্গ তাঁকে ‘জাগ্রত’ অবস্থায় দেখেছেন এবং তাঁর কাছ থেকে জ্ঞান-প্রজ্ঞা লাভ করেছেন। শায়খ সিরাজউদ্দীন (রহমতুল্লাহে আলাইহে) নিজ ‘তাবাক্বাত আল-আউলিয়া’ পুস্তকে উদ্ধৃত করেন বড় পীর গাউসুল আযম শায়খ আবদুল ক্বাদের জিলানী (রহমতুল্লাহে আলাইহে)’র কথা, যিনি বলেন: আমি যোহর ওয়াক্তের নামাযের আগে রাসূলুল্লাহ (দ:)’এর সাক্ষাৎ লাভ করি। প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) বলেন: ওহে পুত্র, তুমি কেন ভাষণ দাও না? আমি (উত্তরে) বলি: হে আমার পিতা (নোট: শায়খ জিলানী একজন সৈয়দ বংশীয়), আমি একজন আজমী/অনারব হয়ে বাগদাদের (অভিজাত) ব্যক্তিত্বদের সামনে কীভাবে তা করতে পারি? প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) বলেন: তোমার মুখ খোলো। আমি তা খুল্লে তিনি নিজের লালা মোবারক আমার ঠোঁটে সাতবার দেন এবং এরপর বলেন: এখন থেকে তোমার উচিৎ মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বান করা এবং ওই (মহৎ) কাজে হেকমত/জ্ঞান-প্রজ্ঞা ও সুন্দর সুন্দর কথা ব্যবহার করা।

অতঃপর আমি যোহরের নামায পড়ে (মসজিদে) উপবিষ্ট হলাম; সহসা বিপুল সংখ্যক মানুষ আমার চারপাশে জড়ো হন। আমি তাঁদের মাঝে হযরত আলী (কার্রামাল্লাহু ওয়াজহাহু)’কে উপবিষ্ট দেখতে পেয়ে (ভয়ে) কম্পমান হই। তিনি আমায় বলেন: হে পুত্র, তুমি কেন তোমার ভাষণ আরম্ভ করছো না? আমি বলি: হে আমার পিতা, আমি এক্ষণে (ভয়ে) কম্পমান। তিনি আমাকে আমার মুখ খুলতে বলেন এবং (তা খুল্লে) তিনি আমার ঠোঁটে ছয়বার নিজের লালা মোবারক দেন। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করি, আপনি কেন সাতবার তা করেননি? তিনি জবাবে বলেন: রাসূলুল্লাহ (দ:)’এর প্রতি আদবশীলতার কারণে। অতঃপর তিনি আমার দৃষ্টির অন্তরালে চলে যান। (ওই সময়) আমি নিজের মাঝে আধ্যাত্মিক জ্ঞান-প্রজ্ঞার প্রাচুর্য অনুভব করি, যা আমাকে বিভিন্ন (ঐশী) বাস্তবতা সম্পর্কে সম্যক অবহিত করতে থাকে....।

শায়খ ইবনে মূসা আল-নাহর মক্কী (রহমতুল্লাহে আলাইহে) লেখেন যে, বড় পীর গাউসুল আযম শায়খ মহিউদ্দীন আবদুল ক্বাদের জিলানী (রহমতুল্লাহে আলাইহে) ঘনঘন প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)’কে স্বপ্নে দেখতেন এবং জাগ্রত অবস্থায়ও দেখতে পেতেন। একবার কোনো এক রাতে তিনি তাঁকে সত্তরবার দেখেছিলেন। এ রকম কোনো রূহানী সাক্ষাতে প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) তাঁকে বলেন, ওহে আমার খলীফা/প্রতিনিধি, আমাকে দেখার জন্যে অতো আগ্রহী হয়ো না; কেননা অগণিত সংখ্যক আউলিয়া আমাকে (স্রেফ একবার) দেখার আশায় বেসালপ্রাপ্ত হয়েছেন।

শায়খ তাজউদ্দীন ইবনে আতাউল্লাহ (রহমতুল্লাহে আলাইহে) ‘লাতায়েফ আল-মানান’ কিতাবে উল্লেখ করেন, একবার কোনো এক ব্যক্তি শায়খ আবূল আব্বাস আল-মুরসী (রহমতুল্লাহে আলাইহে)’কে জিজ্ঞেস করেন: এয়া সৈয়দী, অনুগ্রহ করে আপনার হাতে আমায় মোসাফাহ (করমর্দন) করতে দিন। তিনি জবাবে বলেন: আমি করমর্দন করি না, কেবল প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)’র সাথে ছাড়া। শায়খ মুরসী (রহমতুল্লাহে আলাইহে) একবার বলেন: প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)’কে যদি আমি চোখের পলক ফেলার মতো ক্ষণিকের তরেও না দেখতে পাই, তাহলে আমি নিজেকে ওই মুহূর্তের জন্যে মুসলমান হিসেবেও বিবেচনা করি না।

(আল্লামা আলূসী বলেন), এসব ঘটনা ইসলামী বইপত্রে বিস্তর পরিমাণে উল্লেখিত হয়েছে। [তাফসীরে রূহুল মা’আনী, ২২তম খণ্ড, ৫১-৫২ পৃষ্ঠা]

ইমাম জালালউদ্দীন সৈয়ূতী (রহমতুল্লাহে আলাইহে)

تنوير الحلك في إمكان رؤية النبي والملك
بسم الله الرحمن الرحيم

الحمد لله وسلام على عباده الذين اصطفى. وبعد فقد كثر السؤال عن رؤية أرباب الأحوال للنبي صلى الله عليه وسلم في اليقظة وإن طائفة من أهل العصر ممن لا قدم لهم في العلم بالغوا في إنكار ذلك والتعجب منه وادعوا أنه مستحيل فألفت هذه الكراسة في ذلك وسميتها تنوير الحلك في إمكان رؤية النبي والملك ونبدأ بالحديث الصحيح الوارد في ذلك: أخرج البخاري ومسلم وأبو داود عن أبي هريرة رضي الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم من رآني في المنام فسيراني في اليقظة ولا يتمثل الشيطان بي، وأخرج الطبراني مثله من حديث مالك بن عبد الله الخثعمي ومن حديث أبي بكرة، وأخرج الدارمي مثله من حديث أبي قتادة. قال العلماء اختلفوا في معنى قوله فسيراني في اليقظة فقيل معناه فسيراني في القيامة وتعقب بأنه بلا فائدة في هذا التخصيص لأن كل أمته يرونه يوم القيامة من رآه منهم ومن لم يره، وقيل المراد من آمن به في حياته ولم يره لكونه حينئذ غائبا عنه فيكون مبشرا له أنه لا بد أن يراه في اليقظة قبل موته، وقال قوم هو على ظاهره فمن رآه في النوم فلا بد أن يراه في اليقظة يعني بعيني رأسه وقيل بعين في قلبه حكاهما القاضي أبو بكر ابن العربي، وقال الإمام أبو محمد بن أبي جمرة في تعليقه على الأحاديث التي انتقاها من البخاري: هذا الحديث يدل على أنه من رآه صلى الله عليه وسلم في النوم فسيراه في اليقظة وهل هذا على عمومه في حياته وبعد مماته أو هذا كان في حياته وهل ذلك لكل من رآه مطلقا أو خاص بمن فيه الأهلية والاتباع لسنته عليه السلام اللفظ يعطى العموم ومن يدعي الخصوص فيه بغير مخصص منه صلى الله عليه وسلم فمتعسف قال وقد وقع من بعض الناس عدم التصديق بعمومه وقال على ما أعطاه عقله وكيف يكون من قد مات يراه الحي في عالم الشاهد قال وفي قول هذا القول من المحذور وجهان خطران أحدهما عدم التصديق لقول الصادق عليه السلام الذي لا ينطق عن الهوى والثاني الجهل بقدرة القادر وتعجيزه

ইমাম সৈয়ূতী (রহ:)’র ফতোয়া হতে গৃহীত বিস্তারিত বর্ণনা [আরবীর অনুবাদ]

পরম করুণাময় আল্লাহর নামে, যিনি অসীম দয়াময়।
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহতা’লারই (প্রাপ্য), আর তাঁর মনোনীত বান্দাবৃন্দের প্রতি সালাম জানাই।

প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)’কে আরবাব আল-আহওয়াল তথা আধ্যাত্মিক হাল-সম্পন্ন পুণ্যাত্মাদের দ্বারা জাগ্রত অবস্থায় দেখার প্রশ্নটি (আজকাল) ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। আমাদের যুগে একটি গোষ্ঠী যাদের ধর্মীয় জ্ঞানে কোনো ভিত্তি-ই নেই, তারা এটাকে তীব্রভাবে অস্বীকার করছে এবং এর প্রতি বিস্ময়ও প্রকাশ করছে; আর তারা এও দাবি করছে যে এটা একটা অসম্ভব (মুসতাহিল) ব্যাপার। অতএব, আমি এ কয়েকটি পৃষ্ঠা লিখেছি এবং এর শিরোনাম দিয়েছি ‘তানউইর আল-হালাক ফী এমকানে রুয়্যাত আল-নাবীই্য ওয়াল-মালাক।’ আমরা আরম্ভ করছি এতদসংক্রান্ত সহীহ হাদীস দ্বারা: বুখারী, মুসলিম ও আবূ দাউদ (রহমতুল্লাহে আলাইহিম আজমাঈন) হযরত আবূ হুরায়রাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণনা করেন যে প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এরশাদ ফরমান: “যে ব্যক্তি আমাকে স্বপ্নে দেখেছে, সে আমাকে জাগ্রত অবস্থায়ও (এয়াক্বাযা) দেখতে পাবে; আর শয়তান আমার চেহারা (মোবারক) ধারণ করতে অক্ষম।” ইমাম তাবারানী (রহমতুল্লাহে আলাইহে) অনুরূপ একটি বর্ণনা মালেক ইবনে আবদিল্লাহ (রহমতুল্লাহে আলাইহে) হতে গ্রহণ করেছেন, যেটা আবূ বাকরা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণিত হাদীস হতে এসেছে। হযরত আবূ ক্বাতাদাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণিত হাদীস হতে ইমাম দারিমী (রহমতুল্লাহে আলাইহে) অনুরূপ আরেকটি বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন। উলামাবৃন্দ বলেন: ‘সে আমাকে জাগ্রত অবস্থায়ও (এয়াক্বাযা) দেখতে পাবে’ - এই বাক্যটির অর্থের ব্যাপারে কোনো মতপার্থক্য (উলামাদের মধ্যে) নেই। কেউ কেউ অবশ্য বলেছেন এর মানে ‘সে শেষ বিচার দিবসে আমাকে দেখতে পাবে।’ কিন্তু এই মতটিকে অসার বলে সমালোচনা করা হয়। কেননা এটা তাখসীস তথা খাস্ বা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখকৃত বিষয়। নতুবা সবাই তো তাঁকে শেষ বিচার দিবসে দেখতে পাবেন - যাঁরা ইতোমধ্যে তাঁকে দেখেছেন এবং যাঁরা দেখেননি উভয়েই। এর অর্থ এও বলা হয়েছে: ‘যাঁরা তাঁর যাহেরী জিন্দেগীর সময় তাঁকে বিশ্বাস করেছিলেন কিন্তু অনুপস্থিতির কারণে দেখতে পাননি, তাঁদের প্রতি সুসংবাদ এই যে তাঁরা বেসালপ্রাপ্ত হবার আগেই তাঁকে দেখতে পাবেন...।’

উলামাদের একটি দল বলেছেন, এর অর্থ আক্ষরিক এবং যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)’কে আপন স্বপ্নে দেখবেন, তিনি নিশ্চিতভাবে তাঁকে জাগ্রত অবস্থায়ও দেখতে পাবেন। মানে নিজ চর্মচক্ষে তিনি হুযূর পাক (দ:)’কে দেখবেন; যদিও (উলামাদের) কেউ কেউ এর অর্থ করেন ‘অন্তঃচক্ষু দ্বারা’ দেখবেন। এই দুটো (মত)-ই শায়খ ক্বাজী আবূ বকর ইবনে আরবী (রহমতুল্লাহে আলাইহে) কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে। ইমাম আবূ মুহাম্মদ ইবনে আবী জামরা (রহমতুল্লাহে আলাইহে) আল-বুখারী হাদীসগ্রন্থের ওপর কৃত নিজ ব্যাখ্যামূলক পুস্তকে লেখেন: “এই হাদীসটি প্রমাণ করে, যে ব্যক্তি তাঁকে আপন স্বপ্নে দেখবেন, তিনি জাগ্রত অবস্থায়ও তাঁকে দেখতে পাবেন। (বিতর্ক শুধু এই নিয়ে যে) বাক্যটি কি প্রিয়নবী (দ:)’র যাহেরী জিন্দেগী ও বেসাল শরীফ উভয়ের বেলাতেই সার্বিকভাবে প্রয়োগকৃত হবে, নাকি স্রেফ তাঁর যাহেরী জিন্দেগীর সময়কালের মধ্যেই খাস/সুনির্দিষ্ট থাকবে; অধিকন্তু, তাঁকে যাঁরা দেখেছিলেন সামগ্রিকভাবে তাঁদের সবার বেলায় কি তা প্রযোজ্য হবে, নাকি তা স্রেফ আধ্যাত্মিক হালত-সম্পন্ন পুণ্যাত্মাবৃন্দ ও তাঁরই সুন্নাতের একনিষ্ঠ তাবেদার ব্যক্তিবৃন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। (হাদীসের) বাণীটি স্পষ্টতঃ আম/সার্বিক; আর তাই মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) যেটাকে খাস/সুনির্দিষ্ট করেননি সেটাকে যে ব্যক্তি খাস্ বলে দাবি করবে, সে সীমা লঙ্ঘনকারী (মুতা’আসসাফ) হবে” [ইমাম জামরা]। ইমাম জামরা (রহমতুল্লাহে আলাইহে) আরো বলেন, “কিছু লোক এই আম/সার্বিক বিষয়টিতে অবিশ্বাস করে নিজেদের (গলদ) চিন্তাধারা যতোদূর যায়, সেই অনুসারে বলেছিলো: জীবিত মানুষ কীভাবে এই বাহ্যিক জগতে বেসালপ্রাপ্তদের দেখতে সক্ষম হবেন?” এর উত্তরে ইমাম সাহেব (রহ:) আরো বলেন: “এই আপত্তি দুটো বিপজ্জনক সম্ভাবনার সুযোগ সৃষ্টি করে থাকে: প্রথমতঃ চিরসত্যবাদী প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) যিনি নিজের মনগড়া খেয়াল হতে কিছুই বলেননি, তাঁর সহীহ বাণী (হাদীস)’কে অবিশ্বাস করা; এবং দ্বিতীয়তঃ সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লার সর্বময় ক্ষমতার ব্যাপারে অজ্ঞ হয়ে পড়া।” [ইমাম সৈয়ূতী প্রণীত ‘আল-হাউয়ী লিল্ ফাতাউয়ী’, ২য় খণ্ড, ৪৩৭-৪৩৮ পৃষ্ঠা; মাকতাবা আল-আসরিয়্যাহ, বৈরুত, লেবানন কর্তৃক প্রকাশিত]

জাগ্রত অবস্থায় প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)’কে দেখার বিষয়টি ‘প্রতিষ্ঠিত সত্য।’

*সমাপ্ত* 









শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল, ২০১৯

শবে বরাত

 
  ইমরান বিন বদরী 

নাহমাদুহু ওয়া নুসল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম, আম্মা বা’দ। বর্তমান সমাজ এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে যার ফলে আমাদের মতো সাধারণ মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ছি। ভেবে পাইনা কার কথা শুনবো! কার কথাকে প্রাধান্য দেবো! মানুষ এমন এক ঘোলাটে পরিস্থিতিতে পড়ে ধর্মবিমুখ হয়ে পড়ছেন।
ইসলামে এটা নাই, ওটা নাই , এটা করলে বিদায়াত, ওটা করলে শির্ক - এমন একের পর এক ফতোয়ার দরুন সরলমনা মানুষ পথহারা পথিকের মত ধর্মীয় রীতিনীতিতে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ছেন। আজ আমার এই লেখা তাদেরই জন্য, যারা সরল মনে নেগেটিভ চিন্তাভাবনার বাইরে এসে স্বজ্ঞানে জানতে বা জানানোর জন্য পড়বেন। আশাকরি প্রত্যেকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবেন। বিতর্ক নয়, সম্মানের সাথে ক্ষুদ্র জ্ঞানে লেখার যোগ্যতা না থাকলেও সাহস করে একটু করে লেখতে চেষ্টা করলাম।
এবার আসুন, শব এবং বরাত (شب برات ) শব্দদ্বয় পবিত্র কুরআন এবং হাদীস শরীফে নেই কেন? কারণ এগুলো ফার্সি শব্দ। যেমন নামায, রোযা, খোদা, ফেরেশতা, ইত্যাদি ব্যবহৃত শব্দ। ফার্সী শব অর্থ রাত্রি এবং বরাত অর্থ ভাগ্য বা মুক্তি। সুতরাং শবে বরাত মানে হল ভাগ্য রজনী বা মুক্তির রাত। আর হাদীছ শরীফ এ শবে বরাতকে লাইলাতুন নিছফি মিন শা’বান বা অর্ধ শা’বান মাসের (১৪ তারিখের দিবাগত) রাত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সিহাহ সিত্তাহ বা বিশুদ্ধ ছয়খানা হাদিস গ্রন্থের কোনো কোনো হাদিস গ্রন্থে এই রাতের বিশেষত্ব নির্দেশক হাদিস বর্ণিত হয়েছে।
এছাড়াও অন্যান্য হাদিস গ্রন্থেও এই রাতের বিশেষত্বের উল্লেখ পাওয়া যায়। সিহাহ সিত্তারই দুটি কিতাব - তিরমিযী শরীফ ও সুনানে ইবনে মাজাহ’তে শুধু যে শবে বরাত’এর ফজীলত সম্পর্কিত হাদীস বর্ণিত আছে তা নয়, বরং ইমাম তিরমিযী (রহ:) তাঁর তিরমিযী শরীফে এবং ইমাম নাসাঈ (রহ:) তাঁর সুনানে পনের শাবানের ফজীলত নিয়ে আলাদা বাব বা অধ্যায়-ই রচনা করেছেন। শাবান মাসটি রমজানের পূর্ববর্তী মাস হওয়ার কারণে বরকত ও পুণ্যময় একটি মাস, এ জন্য রমজানের প্রস্তুতি গ্রহণের উদ্দেশ্যে রাসুল সল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এ মাসে অধিক হারে রোজা রাখতেন। মূলতঃ শা’বান একটা প্রজ্ঞাপূর্ণ বরকতময় মাস।
🔰 হাদীস শরীফে উম্মুল মুমীনিন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা হতে বর্ণিত:
مَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اسْتَكْمَلَ صِيَامَ شَهْرٍ إِلَّا رَمَضَانَ، وَمَا رَأَيْتُهُ أَكْثَرَ صِيَامًا مِنْهُ فِي شَعْبَانَ

অর্থ: আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম’কে রমজান মাসের পর শাবান ছাড়া অন্য কোনো মাসে এতো রোজা রাখতে দেখিনি।
রেফারেন্স
১.কিতাবুস সওম-১৯৬৯/১৮৬৮ সহিহ বুখারী।
২.কিতাবুস সিয়াম-১১৫৭ সহিহ মুসলিম।
এছাড়াও অর্ধ বা মধ্য শাবান মাসের রাত্রির ফযীলত সম্পর্কে কিছু হাদীস বর্ণিত হয়েছে:
فقدت النبي صلى الله عليه وسلم فخرجت فإذا هو بالبقيع رافع رأسه إلى السماء, فقال: أكنت تخافين أن يحيف الله عليك و رسوله؟ فقلت : يا رسول الله, ظننت أنك أتيت بعض نسائك. فقال إن الله تبارك و تعالى ينزل ليلة النصف من شعبان إلى سماء الدنيا فيغفر لأكثر من عدد شعر غنم كلب)
উম্মুল মুমীনিন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন: এক রাতে আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে খুঁজে না পেয়ে তাঁকে খুঁজতে বের হলাম, আমি তাঁকে বাকী গোরস্তানে (জান্নাতুল বাক্বী) পেলাম। তখন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন: ‘তুমি কি মনে করো আল্লাহ ও তাঁর রসূল তোমার প্রতি জুলুম করবেন?’ আমি বললাম: ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমি ধারণা করেছিলাম যে আপনি আপনার অপর কোন স্ত্রীর সান্নিধ্যে চলে গিয়েছেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: ‘মহান আল্লাহ তা’লা মধ্য শা‘বানের (মানে ১৪ দিবাগত) রাত্রিতে নিকটবর্তী আসমানে অবতীর্ণ হন এবং কালব্ গোত্রের ছাগলের পালের পশমের চেয়ে বেশি লোকদের ক্ষমা করেন।
রেফারেন্স:
১.হাদীস শরীফটি ইমাম আহমাদ তার মুসনাদে বর্ণনা করেন (৬/২৩৮),
২.ইমাম তিরমিযি তার সুনানে (২/১২১,১২২)
ইমাম তিরমিযী উল্লেখ করেন,"হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু-ও এরূপ হাদিস বর্ণনা করেছেন বলে জানা যায়।
৩. অনুরূপভাবে, হাদীসটি ইমাম ইবনে মাজাহ তাঁর সুনানে (১/৪৪৪, হাদীস নং ১৩৮৯) বর্ণনা করেন।
❖ হযরত আবু মূসা আল আশ’আরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ‘আল্লাহ তা‘আলা মধ্য শাবানের রাত্রিতে আগমন করেন; মুশরিক ও ঝগড়ায় লিপ্ত ব্যক্তিদের ছাড়া তিনি তাঁর সমস্ত সৃষ্টিজগতকে ক্ষমা করে দেন।
রেফারেন্স: 
১.হাদীস শরীফটি ইমাম ইবনে মাজাহ তার সুনানে (১/৪৫৫, হাদীস নং ১৩৯০) বর্ণনা করেছেন।
, عن معاذ بن جبل, عن النبى (, قال : يطلع الله الى خلقه فى ليلة النصف من شعبان, فيغفر لجميع خلقه إلا لمشرك أو مشاحن ]رواه ابن حبان وغيره, ورجاله ثقات, وإسناده متصل غلى مذهب مسلم الذى هو مذهب الحمهورفى المعنعن, ولم يحزم الذهبى بأن مكحولالم يلق مالك بن يخامر كما زعم, وإنما قاله على سبيل الحسان, راجع ,سبر أعلام النبلاء
অর্থ: হযরত মুআয ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তাআলা অর্ধ-শা’বানের রাতে (শাবানের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাতে) সৃষ্টির দিকে (রহমতের) দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া আর সবাইকে ক্ষমা করে দেন।
রেফারেন্স: 
১.সহিহ ইবনে হিব্বান(৫৬৬৫ নং হাদিস)।
২.ইমাম বাইহাকী (রহঃ) শুআবুল ঈমান এ (৩/৩৮২, হাদিস ৩৮৩৩)।
এই হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, এ রাতে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে রহমত ও মাগফেরাতের দ্বারা ব্যাপকভাবে উন্মুক্ত হয়।
নাসিরুদ্দিন আলবানী সিলসিলাতুল আহাদসিস্ সাহিহা ৩/১৩৫-১৩৯ পুস্তকে এই হাদিসটি সমর্থন করার পর লেখেন,

وجملة القول أن الحديث بمجموع هذه الطرق صحيح بلاريب. والصحة تثبت بأقل منها عددا، مادامت سالمة من الضعف الشديد، كماهو الشأن فى هذاالحديث .
অর্থ: এ সব রেওয়াতের মাধ্যমে সমষ্টিগত ভাবে এই হাদিসটি নিঃসন্দেহে সহিহ প্রমাণিত হয়।
❖ হযরত আলী ইবনে আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন: রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “যখন মধ্য শা‘বানের রাত্রি আসবে, তখন তোমরা সে রাতের কিয়াম তথা রাতভর নামায পড়বে, আর সে দিনের রোযা রাখবে; কেননা সে দিন সূর্যাস্তের সাথে সাথে আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন এবং বলেন: ক্ষমা চাওয়ার কেউ কি আছে, যাকে আমি ক্ষমা করবো? রিযিক চাওয়ার কেউ কি আছে, যাকে আমি রিযিক দেবো? সমস্যাগ্রস্ত কেউ কি আছে, যে আমার কাছে পরিত্রাণ কামনা করবে আর আমি তাকে উদ্ধার করবো? এমন এমন কেউ কি আছে? এমন এমন কেউ কি আছে? ফজর পর্যন্ত তিনি এভাবে বলতে থাকেন।”
রেফারেন্স:
১.হাদীস শরীফটি ইমাম ইবনে মাজাহ তার সুনানে (১/৪৪৪, হাদীস নং ১৩৮৮) বর্ণনা করেছেন।

 অনেকে উল্লেখিত কিছু হাদীস শরীফকে দ্বয়ীফ (দুর্বল) বলে থাকেন। হাদীস দুর্বল হয় রাবীর দুর্বলতার (কম গ্রহণযোগ্য) কারণে; রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’এর কোনো কথা-ই দ্বয়ীফ বা দুর্বল নয়। মোল্লা আলী ক্বারী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, সকলেই একমত যে দুর্বল হাদীস ফজিলত হাসিল করার জন্য আমল করা জায়েজ আছে। (মওজুআতুল কবীর, ১০৮ পৃষ্ঠা)

অর্থাৎ, দুর্বল হাদীসের মূল বক্তব্য কুর'আন শরীফ অন্য কোনো সহীহ হাদীসের পরিপন্থী না হলে বা বিরোধিতা না করলে আমল করা যাবে।
রেফারেন্স:
**ইবনে তাইমিয়া কৃত ইকতিদায়ে ছিরাতে মুস্তাকীমে ২/৬২৬
**নাসিরুদ্দিন আল-আলবানী কৃত ছিলছিলাতুল আহাদীস আস্‌সাহীহা ৩/১৩৫-১৩৯
আরো অনেকে এ রাত্রিকে ফযীলতের রাত বলে মত প্রকাশ করেছেন।
এই রাতকে অন্য সব সাধারণ রাতের মতো মনে করা এবং এই রাতের ফজিলতের ব্যাপারে যতো হাদিস এসেছে, তার সবগুলোকে মওযু বা যয়ীফ মনে করা ভুল, ঠিক যেমনটি এ রাতকে শবে কদরের মতো বা তার চেয়ে বেশি ফজিলতপূর্ণ মনে করাটাও একটা ভিত্তিহীন ধারণা।

মোট কথা, এ রাত্রিতে ফযীলত রয়েছে।
❖ এ ছাড়াও সুস্পষ্ট হাদীস শরীফে এসেছে যে,
আবূ হুরাইরা (রা:) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “আল্লাহ তা‘আলা প্রতি রাতের শেষাংশে – শেষ তৃতীয়াংশে, নিকটবর্তী আসমানে অবতীর্ণ হয়ে আহবান জানাতে থাকেন ‘এমন কেউ কি আছে, যে আমাকে ডাকবে আর আমি তার ডাকে সাড়া দেবো? এমন কেউ কি আছে, যে আমার কাছে কিছু চাইবে আর আমি তাকে দেবো? আমার কাছে ক্ষমা চাইবে আর আমি তাকে ক্ষমা করে দেবো?”
রেফারেন্স:
১.সহীহ বুখারী, ১১৪৫।
২.সহীহ মুসলিম ৭৫৮।
❖ অন্যান্য দেশে এর নাম:
ইরান ও আফগানিস্তানে---- নিম শা'বান।
আরবী ভাষাভাষীর বলে--- নিসফ্ শা'বান।
মালয় ভাষাভাষীর বলে ----নিসফু শা'বান।
তুর্কি ভাষাভাষীর বলে -----বিরাত কান্দিলি।
ভারতীয় উপমহাদেশে বলা হয় ---শবে বরাত।
আরেকটি কথা না বল্লে নয়, তা হচ্ছে সূরা দুখানের ৩ এবং ৪ এর আয়াতের তাফছির নিয়ে বিখ্যাত তাফছিরকারকগণ একেক ধরনের তাফছির করেছেন। তাঁদের অধিকাংশ লাইলাতুল ক্বদরকে উল্লেখ করলেও কিছু কিছু তাফছিরকারকগণ লাইলাতুল মুবারাকা মানে মধ্য শাবানের রজনীকে উল্লেখ করেছেন। তার একটাই কারণ পবিত্র ''কালামুল্লাহ' ক্বদর রাতে যে নাজিল হয়েছে, তার প্রমাণ সূরা ক্বদরেই বর্ণনা রয়েছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ – سورةالقدر
অর্থ: আমি এ কোরআনকে ক্বদরের রাত্রিতে অবতীর্ণ করেছি। (সূরা ক্বদর: ১)

এ ছাড়াও আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন সূরা বাকারায়-

شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ- سورة البقرة
অর্থ: রমযান এমন একটি মাস যা’তে কোরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে। (সূরা আল বাকারাহ: ১৮৫)
পবিত্র কুরআন নাজিলের জন্য রমজান মাসকে নির্ধারিত করে দিয়েছেন আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন। আমি এর তাফছির নিয়ে মন্তব্য করতে চাইনা, তবে হাদিস শরীফের বর্ণনার ওপর শরীয়তের হুকুম না হলেও মহান আল্লার দরবারে নিজেকে অর্পণ করার জন্য এমন একটি মহতি কাজে নিরুৎসাহিত করার সেই দুঃসাহস আমার নেই। মুসলিম সমাজে সাধারণ মানুষ আজ ধর্মবিমুখ হয়ে পড়ছেন। যে কোনো ভালো কাজে এখন বিদায়াত ফতোয়া দিয়ে ধর্মীয় অনুরাগ ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে। যে কাজ ইসলামের মূলে পরিবর্তন নিয়ে আসে, মানুষকে আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের (দ:) দেখানো পথ থেকে দূরে নিয়ে যায়, মূল ছেড়ে দিয়ে নকল নিয়ে জীবনটা ভিন্ন পথে পরিচালনা করে, তা-ই বিদয়াত; আর তার হুকুমদাতা বিদআত সংঘটনকারী।

কিন্তু শবে বরাত পালন কেন বিদায়াত হবে - এটাতো যারা করে তাদের আরো উৎসাহিত করা দরকার, যাতে অন্ততঃ একটি রাতে হলেও বে-নামাজিরা নামাজি হয়। প্রত্যেক ভালো কাজের বিপরীতে খারাপ করার জন্য শয়তান অপতৎপর। তাই হয়তো কিছু লোক অজ্ঞতার কারণে অনেক অপছন্দনীয় কাজ করে। তাই বলে যারা সারা রাত নির্ঘুম আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে নফল নামাজ পড়েন, আল্লাহর পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত করেন, এসব কিছু কী বিদায়াত হবে?

সুতরাং ভালো কাজে যারা নিরুৎসাহিত করে, তাদের কথায় নিজেকে পরিচালনা না করে নিজের মেধা যা আল্লাহপাক আপনাকে দিয়েছেন তা দিয়ে বিচার করুন। সৎ কাজের আদেশ আর মন্দ কাজে নিষেধ করা-ই যেনো হয় আমাদের কাম্য।
আমি চেষ্টা করেছি মাত্র; আর সেই চেষ্টা সার্থক হবে তখনি, যখন এ লেখাটি আপনাদের বুঝতে সহজ হবে।

*সমাপ্ত*

বুধবার, ১৭ এপ্রিল, ২০১৯

শবে বারাআতের নাম নিয়ে বিভ্রান্তি: ভ্রান্তদের মিথ্যাচারের জবাব



- ড. এ. এস. এম. ইউসুফ জিলানী

শব ফার্সি আর বারআত আরবি, এ দুটি শব্দযুগলে শবে বারাআত। শবে বারাআত অর্থ ক্ষমা ও মুক্তির রজনী। হাদীস শরীফে এটাকে ليلة النصف من شعبان (লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান) অর্থাৎ অর্ধ শাবান তথা ১৫ শাবানের রাত বলা হয়েছে। আমাদের উপমহাদেশে সালাতকে যেমন নামায বলা হয়, সাওমকে যেমন রোযা বলা হয়, আল্লাহকে যেমন খোদা বলা হয়, তেমনি ليلة النصف من شعبان তথা শাবান রাতের ১৫ তারিখকে লা্ইলাতুল বারাআত বা শবে বারাআত বলা হয়। আল্লাহকে খোদা বলা যেমন বিদআত নয়, সালাতকে নামায বলা যেমন বিদআত নয় তেমনি শাবানের পনেরো তারিখের রাতকে শবে বারাআত নামকরণও বিদআত নয়। এমনটি হলে কুরআন-হাদিস অন্যভাষায় অনুবাদ করা এবং ইসলামি পরিভাষাসমূহের স্থানীয় ও আঞ্চলিক অনুবাদ বা নামকরণ বিদআত ও হারাম হয়ে যাবে এবং সকল মুসলমান বিদআতি ও হারামি বলে পরিগণিত হবে। যার পরিণতি হবে ভয়াবহ। এখন দেখি, বারাআত শব্দটি কুরআন ও হাদিসে আছে কি-না?

বারাআত অর্থ: কুরআন ও হাদিসে বারাআত শব্দের ব্যবহার

বারাআত শব্দটি আরবি। এটি بَرِءَ يَبْرَءُ ক্রিয়ার মাসদার বা উৎস। এর অর্থ ক্ষমা করা, মুক্তি পাওয়া। পবিত্র কুরআন করিমে এ শব্দটি দু’বার এসেছে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন:

براءة من الله ورسوله الي الذين عهدتم من المشركين
- অর্থাৎ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে অসন্তুষ্টি ও সম্পর্কচ্ছেদ ঐ মুশরিকদের প্রতি যাদের সাথে তোমরা চুক্তি করেছিলে।[সূরা তাওবা:১]
এ আয়াতে বারাআত শব্দটি মুক্তি অর্থে এসেছে।

اكفاركم خير من اولئكم ام لكم براءة في الزبر-
অর্থাৎ তোমাদের মধ্যকার কাফিরগণ কি তাদের অপেক্ষা উত্তম অথবা তোমাদের জন্য আসমানি কিতাবে ক্ষমা রয়েছে।সূরা কমর: 43] এ আয়াতে বারাআত শব্দটি ক্ষমা অর্থে এসেছে।

হাদিস শরিফেও বারাআত শব্দটি এসেছে। যেমন: রাসূলে আকরাম (দ.) বলেছেন:

كتب له براءتان براءة من النار و براءة من النفاق-


অর্থাৎ, তার জন্য দুটি মুক্তি রয়েছে। একটি দোযখ থেকে মুক্তি আর অপরটি মুনাফেকি থেকে মুক্তি। [তিরমিযি, সুনান, ১:৩৩।]

রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
 
من اذن محتسبا سبع سنين كتب له براءة من النار-


যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সাত বছর আযান দেয় তার জন্য দোযখের আগুন থেকে মুক্তি-ক্ষমা লেখা হয়। [ইবনে মাজা, সুনান, ৫৩]

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে বুঝা গেলো যে, বারাআত শব্দটি কুরআন ও হাদিসে রয়েছে। আর এর অর্থ হলো, ক্ষমা ও মুক্তি। যেহেতু শাবান মাসের অর্ধ রাত তথা ১৫ তারিখের রাতে ইবাদতকারী সকল মুসলমানকে আল্লাহ তায়ালা শবে কদরে জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও ক্ষমা করে দেন। [এ সম্পর্কে অনেক হাদিস রয়েছে] এ মর্মকে সামনে রেখে এ রাতকে লাইলাতুল বারাআত [ফার্সিতে শবে বারাআত] বলা হয়। এখন লাইলাতুন নিসফে মিন শাবানকে লাইলাতুল বারাআত বলা যাবে কিনা?

মোল্লা আলী কারী লিখেছেন:
 
ليلة النصف من شعبان و هي ليلة البراءة-


অর্থাৎশাবান মাসের ১৫ তারিখের রাত। আর তা হলো লাইলাতুল বারাআত। [মিরকাতুল মাফাতিহ, ৩: ১৯০]

তিরমিযি শরিফের টীকায় লিখিত আছে:

هي ليلة الخامسة عشر من شعبان و سمي ليلة البراءة-


অর্থাৎশাবান মাসের ১৫ তারিখের রাত। আর এর নাম রাখা হয়েছে লাইলাতুল বারাআত। [তিরমিযি, ১: ৯২, টীকা:৯]

ইমাম কুরতুবি বলেন:وانها تسمي ليلة البراءة
অর্থাৎ তা শাবান মাসের ১৫ তারিখের রাত। আর এ রাতকে লাইলাতুল বারাআত বলা হয়। [জামে লেআহকামিল কুরআন ১৬: ১২৭।]

এভাবে শরুহে হাদিস ও তাফসিরের অসংখ্য কিতাবে এ নামটি লাইলাতুল বারাআত নামে এসেছে। আর ফার্সি, উর্দু ও বাংলা ভাষায় এটাকে শবে বরাত বলা হয়; তাহলে অসংখ্য মুফাস্সির, মুহাদ্দিস, ওলামায়ে কেরাম ও কোটি কোটি মুসলমান লাইলাতুল বারাআত বলে সবাই বিদআতি হয়ে গেছেন কি? নাউজুবিল্লাহ। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশের আঞ্চলিক ভাষায় এর বিভিন্ন নাম রয়েছে। এ নামের ভিন্নতার কারণে কি শবে বরাত নামায়েজ হয়ে যাবে?
 
উপরিউক্ত আলোচনা থেকে বুঝা গেল যে, শবে বরাত নামটি বিদআত ও হারাম নয়। বরং কুরআন, হাদিস ও শরিয়তে এর ভিত্তি রয়েছে। তাই নাম নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে ও মিথ্যাচার করে শবে বরাত পালনে বাধা দেয়ার মানে কুরআন ও হাদিসকে অস্বীকার করারই নামান্তর!

সোমবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০১৮

মহিলাদের দ্বারা মাযার যেয়ারতের পক্ষে প্রমাণ

মূল: ড: জি, এফ, হাদ্দাদ
অনুবাদ: এডমিন

[Bengali translation of Dr G.F. Haddad's online article "Proofs for visitation of Graves by Women." Translator: Admin]
 “সবচেয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত হলো, মহিলাদের জন্যে মাযার-রওযা যেয়ারতের রুখসাতের তথা (বিধান) প্রয়োগের বিষয়টি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত।” - ইমাম ইবনে আবেদীন শা’মী [নোট-১: ইবনে আবেদীন কৃত ‘হা’শিয়া’ (১৩৮৬ হিজরী/১৯৬৬ খৃষ্টাব্দ সংস্করণ, ২:২৪২)]

শায়খ সাইয়্যেদ ইঊসুফ হা’শিম আল-রেফাঈ (রহমতুল্লাহে আলাইহে যিনি কুয়েতের সাবেক তেলমন্ত্রী ছিলেন, তিনি) তাঁর প্রণীত ‘আমাদের নজদী উলামা ভাইদের প্রতি নসীহত’ শীর্ষক পুস্তিকায় (ড: হাদ্দাদ কর্তৃক ইংরেজি ভাষান্তরিত) বলেন: “আপনারা মতৈক্যভিত্তিক স্পষ্ট ও মীমাংসাকারী শরঈ দলিল ছাড়াই মহিলাদেরকে পবিত্র বাক্বী’ (কবরস্থান) যেয়ারত করতে নিষেধ করেন!”

নিচের আলোচনায় খোদায়ী বিধিবিধানের মৌলনীতি (উসূল) ও সুন্নাহর দালিলিক প্রমাণ অনুসারে বাক্বী’ কবরস্থান যেয়ারতের অনুমতি প্রদর্শন করা হবে।

মহিলাদের দ্বারা মাযার-রওযা যেয়ারতের প্রতি যারা আপত্তি উত্থাপন করেন, তারা মূলতঃ তিনটি হাদীসকে নিজেদের প্রমাণ হিসেবে পেশ করে থাকেন; এগুলোর মধ্যে দুটি আবার যঈফ (দুর্বল সনদের) হাদীস: (ক) “আল্লাহ সে সমস্ত নারীদের প্রতি লা’নত/অভিসম্পাত দেন যারা মাযার/রওযা যেয়ারত করে” لعن الله زائرات القبور [নোট-২: হযরত আবূ হোরায়রাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) হতে দুর্বল সনদে ইবনে হিব্বান নিজ ‘সহীহ’ ৭:৪৫২ #৩১৭৮ পুস্তকে বর্ণিত; কেননা উমর ইবনে আবী সালামা ইবনে আবদির রাহমান দুর্বল, যেমনটি উল্লেখ করেছেন আল-আরনা’উত ও মা’রূফ ‘তাহরীর আল-তাক্বরীব’ ৩:৭৪ #৪৯১০ গ্রন্থে। আরো এসেছে দুর্বল সনদে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) হতে হযরত হাসান বিন সাবেত (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)’এর সূত্রে ইবনে আবী শায়বা (৩:৩১)’তে; কেননা এতে জনৈক বর্ণনাকারী আবদুর রাহমান ইবনে বাহমান হচ্ছেন মাজহূল তথা অপরিচিত। তবে খোদ হাদীসটি গ্রহণযোগ্য, যেহেতু এটা ‘হাসান লি-গায়রিহি’ তথা ‘সাক্ষী ও সমর্থনকারী সনদ এবং বিবরণসমূহের কারণে হাসান পর্যায়ের’, যেমনটি বিবৃত করেন আল-আরনা’উত ‘মুসনাদ’ ৫:১২৮ নং ২ পুস্তকে]; এবং (খ) “আল্লাহ সেসব নারীর প্রতি অভিসম্পাত দেন যারা কবর যেয়ারত করে এবং সেগুলোকে এবাদতের ও প্রদীপ/মোমবাতির স্থান হিসেবে গ্রহণ করে” لعن زائرا القبور، والمتخذين عليها المساجد والسرج [নোট-৩: হযরত ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে ইমাম তিরমিযী (রহ:)-বর্ণিত (হাসান পর্যায়ের) এবং আবূ দাউদ ও আল-নাসাঈ বর্ণিত ‘আল-সুনান’ ও আল-সুনান আল-কুবরা’ গ্রন্থ দুটোতে (১:৬৫৭ #২১৭৪), ইমাম আহমদ, ইবনে আবী শায়বাহ (২:১৫১, ৩:৩০), আল-তাহাবী কৃত ‘শরহু মুশকিল আল-আসা’র’ (১২:১৭৮-১৭৯ #৪৭৪১-৪৭৪২), আল-বাগাবী ‘শরহুস্ সুন্নাহ’ (২:৪১৬-৪১৭ #৫১০), ইবনে হিব্বান (৭:৪৫২-৪৫৪ #৩১৭৯-৩১৮০), অাল-হাকিম (১৯৯০ সংস্করণের ১:৫৩০) যিনি এটার দুর্বলতা ইঙ্গিত করেন, আল-বায়হাক্বী ‘আল-সুনান আল-কুবরা’ (৪:৭৮ #৬৯৯২), ইবনে আল-জা’আদ নিজ ‘মুসনাদ’ গ্রন্থে (২২৪ পৃষ্ঠায়), আল-তাবারানী ‘আল-কবীর’ (১২:১৪৮) পুস্তকে, এবং আল-হায়তামী ‘মাওয়ারিদ আল-যামআন (২০০ পৃষ্ঠায়) - এগুলোর সব একই দুর্বল সনদে বর্ণিত, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন আবূ সালেহ মওলা উম্মে হানী, যাকে দুর্বল বলেছেন ইবনে হাজর, যেমনটি উদ্ধৃত করেছেন আল-মুনযিরী নিজ ‘আল-তারগীব’ পুস্তকে (১৯৯৭ সংস্করণের ৪:১৯০) এবং অাল-অারনা’উত ‘সহীহ ইবনে হিব্বান’ ও ‘মুসনাদ’ (৫:১২৮ #২৯৮৪) পুস্তকে। তবে হাদীসটি স্বয়ং গ্রহণযোগ্য, কেননা আল-তিরমিযী ও আল-বাগাবী এটাকে ‘হাসান’ পর্যায়ের বলে ঘোষণা করেছেন; অধিকন্তু ইবনে আল-সাকান এটাকে সহীহ হাদীসের অন্তর্ভুক্ত করেন, যেমনটি বিবৃত করেন ইবনে মুলাক্কিন ‘তোহফাতুল মোহতাজ’ (২:৩১) পুস্তকে]; তৃতীয় হাদীসটি - (গ) “অাল্লাহ ওই নারীদের প্রতি অভিসম্পাত দেন যারা ঘনঘন কবর যেয়ারত করে” لعن الله زوارات القبور [নোট-৪: হযরত আবূ হোরায়রাহ রাদ্বিয়াল্লাহু হতে আল-তিরমিযী (হাসান সহীহ), ইবনে মাজাহ ও আহমদ; হযরত ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে আবূ সালিহ’র কারণে দুর্বল সনদে ইবনে মাজাহ; এবং হযরত হাসান বিন সাবিত রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে আবদুর রাহমান ইবনে বাহমানের কারণে দুর্বল সনদে ইবনে মাজাহ ও আহমদ। নোট: ইবনে মাজাহ’র সংস্করণে زوارات উল্লেখিত হয়েছে]।

শায়খ রেফাঈ (রহ:)’র কথানুযায়ী ওপরের বিবরণগুলো ইসলামে মহিলাদের দ্বারা মাযার-রওযা যেয়ারত নিষেধকারী ‘মতৈক্যভিত্তিক স্পষ্ট ও মীমাংসাকারী শরঈ দলিল হিসেবে সাব্যস্ত হয় না।’ সেই অনুযায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামা ঐকমত্য পোষণ করেন যে মহিলাদের দ্বারা মাযার/রওযা যেয়ারত করা জায়েয, যদি প্রলোভন ও পাপের বিপদ বর্তমান না থাকে [নোট-৫: যেমনটি বর্ণিত হয়েছে ইবনে হাজরের ‘ফাতহুল বারী’ (১৯৫৯ সংস্করণের ৩:১৪৮) পুস্তকে, আল-শওকানীর ‘নায়ল আল-আওতার’ (জানায়েয ও কবর সংক্রান্ত ফতোয়া অধ্যায়গুলো), এবং আল-মোবারকপুরীর ‘তোহফাতুল আহওয়াযী (৪:১৩৯)]

উপরোল্লিখিত বক্তব্য নিম্নের প্রামাণ্য দলিল দ্বারা সুপ্রতিষ্ঠিত:

১/ - প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এরশাদ ফরমান - كنت نهيتكم عن زيارة القبور ألا فزوروها অর্থাৎ, “আমি তোমাদেরকে প্রাথমিক যুগে কবর যেয়ারত করতে নিষেধ করতাম; এখন তোমরা কবর যেয়ারত করো” [নোট-৬: একটি দীর্ঘ হাদীসের অংশ হিসেবে বর্ণনা করেন হযরত বোরায়দা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) হতে ইমাম মুসলিম (রহ:), আল-তিরমিযী حسن صحيح (হাসান সহীহ), আবূ দাউদ, নাসাঈ, আবদুর রাযযাক্ব (৩:৫৬৯) ও অন্যান্যরা; হযরত আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) হতে সহীহ সনদে ইমাম আহমদ (রহ:), যেমনটি বিবৃত করেছেন আল-হায়তামী (৩:৫৮), মালেক (রহ:), আল-হাকিম (১৯৯০ সংস্করণের ১:৫৩১) যিনি ইমাম মুসলিমের মানদণ্ডে এটাকে সহীহ বলেছেন, আল-বায়হাক্বী কৃত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’ (৪:৭৭ #৬৯৮৪), এবং সহীহ সনদে আল-বাযযার, যেমনটি উল্লেখ করেছেন আল-হায়তামী (৩:৫৮); হযরত ইবনে মাসউদ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) হতে ইবনে মাজাহ, আদ-দারাক্বুতনী নিজ ‘সুনান’ (৪:২৫৯) পুস্তকে, আবদুর রাযযাক্ব (৩:৫৭২-৫৭৩), ইবনে হিব্বান (৩:২৬১), আল-হাকিম (১৯৯০ সংস্করণের ১:৫৩১) এবং আল-বায়হাক্বী নিজ ‘আল-সুনান আল-কুবরা’ (৪:৭৭ #৬৯৮৩), যা আল-আরনাউতের মতানুসারে (এ সূত্রের) সবগুলোই দুর্বল সনদের; হযরত আনাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) হতে ইমাম আহমদ ও আল-বাযযার, যাঁদের এসনাদে রয়েছেন আল-হারিস ইবনে নাবহান যিনি আল-হায়তামী (৪:২৭), আল-হাকিম (১৯৯০ সংস্করণের ১:৫৩১-৫৩২) ও আল-বায়হাক্বী (সুনানে কুবরা ৪:৭৭ #৬৯৮৪)’র দৃষ্টিতে দুর্বল বর্ণনাকারী]। এই নিঃশর্ত অনুমতি স্রেফ পুরুষদের জন্যে খাস তথা সুনির্দিষ্ট করার পক্ষে কোনো প্রামাণ্য দলিল-ই নেই।

২/ - হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা বলেন: “রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) কবর যেয়ারত নিষেধ করেন; অতঃপর এর অনুমতি দেন। আর আমার মনে হয় তিনি বলেছিলেন, ‘নিশ্চয় কবর যেয়ারত তোমাদেরকে আখেরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে’ [নোট-৭: আল-বাযযার কর্তৃক নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের সহীহ সনদে বর্ণিত, যেমনটি বিবৃত করেন আল-হায়তামী (৩:৫৮); বঙ্গানুবাদকের নোট: মুসলিমে অন্য সূত্রে বর্ণিত আরেকটি হাদীসের এবারতে এসেছে এভাবে - فإنها تذكركم الآخرة]।” হযরত মা আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা)’র অনুশীলিত রীতি ও অন্যান্য মন্তব্য নিশ্চিত করেছে যে তিনি প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)’র এই আজ্ঞাকে নিঃশর্ত জানতেন।

৩/ - হযরত আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) তাঁর ভাইয়ের ইন্তেক্বালের পরে মক্কা শরীফে এসে জিজ্ঞেস করেন, “আমার ভাইয়ের কবর কোথায় অবস্থিত?” তিনি কবরে গিয়ে সেখানে দুআ পাঠ করেন; আর এই ঘটনাটি তাঁর ভাইয়ের ইন্তেকালের এক মাস পরের [নোট-৮: ইবনে আবী মুলায়কা হতে বর্ণনা করেন আল-বায়হাক্বী নিজ ‘আল-সুনান আল-কুবরা (৪:৪৯) গ্রন্থে]। আরেকটি ভাষ্যে ইবনে আবী মুলায়কা বলেন, “হযরত আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা)’র ভাই মক্কা শরীফ হতে ছয় মাইল দূরে ইন্তেক্বাল করেন; তাই আমরা তাঁকে বহন করি যতোক্ষণ না মক্কা শরীফে পৌঁছুই এবং তাঁকে সেখানে দাফন করি। অতঃপর হযরত আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) আমাদের কাছে আসেন এবং আমাদেরকে ওরকম করার জন্যে তিরস্কার করেন। এরপর তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘আমার ভাইয়ের কবর কোথায় অবস্থিত?’ আমরা তাঁকে তা প্রদর্শন করলে তিনি তাঁর হাওদা (সওয়ার) থেকে নামেন এবং তাঁর ভাইয়ের কবরে (দাঁড়িয়ে) দুআ করেন” [নোট-৯: আবদুর রাযযাক্ব (৩:৫১৮) ও ইবনে আবদিল বার্র কর্তৃক নিজ ‘আল-তামহীদ’ (৬:২৬১) গ্রন্থে বর্ণিত]

৪/ - আবুদুল্লাহ ইবনে আবী মুলায়কা যখন হযরত আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা)’কে তাঁর ভাই আবদুর রাহমানের মাযার যেয়ারত করতে দেখেন, তখন তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস করেন: “প্রিয়নবী (দ:) কি এটা (মানে যেয়ারত) নিষেধ করেননি?” তিনি উত্তর দেন: “হ্যাঁ, তিনি নিষেধ করেছিলেন (প্রাথমিক যুগে); অতঃপর সেগুলোর যেয়ারত করতে আদেশ করেন” [নোট-১০: এটা সহীহ সনদে বর্ণনা করেন আবূ এয়ালা (৮:২৮৪), আল-হাকিম (১৯৯০ সংস্করণের ১:৫৩২), আল-বায়হাক্বী নিজ ‘আল-সুনান আল-কুবরা’ (৪:৭৮ #৬৯৯৩), এবং ইবনে আব্দিল বার্র নিজ ‘আল-তামহীদ’ (৩:২৩৪) পুস্তকে]। ইবনে আবদিল বার্র উল্লেখ করেন যে ইমাম আহমদ (রহ:) এই বর্ণনাকে মহিলাদের দ্বারা মাযার যেয়ারতের পক্ষে দলিল হিসেবে সাব্যস্ত করেন [নোট-১১: ইবনে আবদিল বার্র কৃত ‘আল-তামহীদ’ (৩:২৩৪)]

ওপরে উদ্ধৃত রওয়ায়াত/বর্ণনাগুলোতে মহানবী (দ:) ও তাঁর সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)’এর ব্যবহৃত বাক্য ও ক্রিয়ার কাল প্রতীয়মান করে যে এসব বিবরণ সুস্পষ্টভাবে নিষেধাজ্ঞা প্রকাশক বর্ণনাগুলোকে রহিত করে দিয়েছে। এটা আল-হাকিম নিশ্চিত করেন, যিনি বর্ণনা করেন নিম্নের হাদীসটি: “আল্লাহ সেসব নারীকে অভিসম্পাত দেন যারা ঘনঘন কবর যেয়ারত করে।” অতঃপর আল-হাকিম বলেন: “মাযার/রওযা যেয়ারত নিষেধকারী এ সমস্ত হাদীস রহিত হয়ে গিয়েছে; আর রহিতকারী হাদীসটি বর্ণনা করেছেন আলক্বামা ইবনে মারতাদ, যিনি তা গ্রহণ করেছেন সুলায়মান ইবনে বোরায়দা হতে, তিনি তাঁর পিতা হতে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) হতে, যিনি এরশাদ ফরমান: ‘আমি তোমাদেরকে কবর যেয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম; কিন্তু এখন তোমরা তা যেয়ারত করো’ [নোট-১২: আল-হাকিম (১৯৯০ সংস্করণ ১:৫৩০)]।”

৫/ - (শরীয়তের বিধিবিধান মানার ক্ষেত্রে) হযরত আয়েশা সিদ্দীক্বা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা)’র দৃঢ়তার কারণে এবং হয়তো ইবনে আবী মুলায়কা’র কথার সমর্থনের দরুন তিনি তাঁর ভাই আবদুর রহমানের কবর যেয়ারত করাটা অপছন্দ করতেন, যেমনটি প্রতীয়মান হয় আল-তিরমিযী’তে উদ্ধৃত তাঁর এতদসংক্রান্ত বক্তব্য হতে; তিনি বলেন: “আমি আপনার ইন্তেক্বালের সময় উপস্থিত থাকলে আমি কখনোই (মানে এখন) আপনার কবর যেয়ারত করতাম না” [নোট-১৩: আবদুল্লাহ ইবনে মুলায়কা হতে আল-তিরমিযী বর্ণিত]। অথচ এটা আরেকটা প্রামাণিক দলিল এ মর্মে যে তিনি প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)’র ওই (মাযার যেয়ারতের) নিষেধাজ্ঞাকে নিঃশর্ত বলে জানতেন না - তা যদি রহিত না হতো; কেননা তিনি এতদসত্ত্বেও তাঁর ভাইয়ের কবর যেয়ারত করেছিলেন।

৬/ - একবার মহানবী (দ:) জনৈক মহিলার পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন, যিনি একটি কবরের পাশে কান্নাকাটি করছিলেন। হুযূর পাক (দ:) তাঁকে বলেন: “আল্লাহকে ভয় করো এবং দৃঢ়/অটল থাকো।” ওই মহিলা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)’কে চিনতে না পেরে উত্তর দেন: “আমায় একান্তে থাকতে দিন!” অতঃপর তাঁকে জানানো হয় উনি মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)। মহিলা হুযূরে পাকের (দ:) দর্শনার্থী হতে আসেন এবং দরজায় কাউকে না পেয়ে (সরাসরি প্রবেশ করে) বলেন: “আমি আপনাকে চিনতে পারিনি, (এয়া রাসূলাল্লাহ)!” তিনি উত্তর দেন: “দৃঢ়তা প্রথমবার শোকাহতের সময় হতেই” [নোট-১৪: হযরত আনাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) হতে সিহাহ সিত্তা/ছয়টি বিশুদ্ধ হাদীসগ্রন্থে]। মহিলাদের যদি মাযার-রওযা যেয়ারতে নিষেধই করা হতো, তাহলে মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) ওই মহিলাকে প্রথমবারেই তা করা হতে বারণ করতেন।

৭/ - হযরত আয়েশাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) বলেন: “(বাক্বী কবরস্থানে) আমি কী বলবো, এয়া রাসূলাল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)?” হুযূর পাক (দ:) উত্তর দেন: “বলো: ওহে কবরবাসী ঈমানদার নর-নারী, আপনাদের প্রতি সালাম তথা শান্তি বর্ষিত হোক! আল্লাহ আপনাদের মতো পূর্ববর্তীদের প্রতি এবং আমাদের মতো পরবর্তীদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ মঞ্জুর করুন। নিশ্চয় আল্লাহর ইচ্ছায় আমরা আপনাদের সাথেই মিলিত হবো” [নোট-১৫: মুসলিম ও নাসাঈ বর্ণিত একটি দীর্ঘতর হাদীসের অংশ]

আল-বায়হাক্বী, ইবনে হাজর ও আল-নববী বলেন ওপরের বর্ণনাগুলো পরিদৃষ্ট করে যে, হযরত আয়েশাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) কর্তৃক তাঁর ভাইয়ের কবর যেয়ারতের সমর্থনে মহিলাদের দ্বারা মাযার-রওযা যেয়ারত অনুমতিপ্রাপ্ত/জায়েয; কেননা মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) ওই শোক প্রকাশকারিনী মহিলাকে কেবল দৃঢ় হতে আদেশ দিয়েছিলেন, কবর যেয়ারত করতে নিষেধ করেননি। আর তিনি হযরত আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা)’কে কবর যেয়ারতের সময় কী বলতে হবে, তা-ও শিক্ষা দিয়েছিলেন। [নোট-১৬: আল-বায়হাক্বী, ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, (৪:৭৮); ইবনে হাজর, ‘ফাতহুল বারী’, (১৯৫৯ সংস্করণের ৩:১৮৪); আল-নববী, ‘শরহু সহীহ মুসলিম’ (৭:৪১-৪২)]

৮/ - প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন: “আমি তোমাদেরকে কবর যেয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম, কিন্তু মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)’কে তাঁর মায়ের কবর যেয়ারত করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। অতএব, তোমরা কবর (মাযার/রওযা) যেয়ারত করো, কেননা নিশ্চয় তা তোমাদেরকে আখেরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে।” [নোট-১৭: হযরত বুরায়দা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) হতে আল-তিরমিযী বর্ণিত (হাসান সিহীহ হিসেবে)]

৯/ - আরেকটি ভাষ্যে এভাবে এসেছে: “আমি তোমাদেরকে কবর যেয়ারত করতে নিষেধ করতাম; কিন্তু এখন থেকে যেয়ারত করো; কেননা তা আখেরাতের কথা কাউকে স্মরণ করিয়ে দেয়।” [নোট-১৮: হযরত বুরায়দা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) হতে ইমাম আহমদের বর্ণিত একটি দীর্ঘতর হাদীসের অংশ]

১০/ - অপর একটি সংস্করণে বিবৃত হযেছে: “যে কেউ কবর যেয়ারত করতে চাইলে সে তা করতে পারবে; কেননা নিশ্চয় তা আখেরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।” [নোট-১৯: হযরত বুরায়দা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) হতে আল-নাসাঈ বর্ণিত একটি দীর্ঘতর হাদীসের অংশ]

১১/ - আরেকটি এবারতে এসেছে: “আমি তোমাদেরকে কবর যেয়ারত করতে নিষেধ করতাম; কিন্তু এখন থেকে যেয়ারত করো। কেননা তা দুনিয়াকে প্রত্যাখ্যান করতে সহায়তা করে এবং আখেরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।” [নোট-২০: হযরত ইবনে মাসউদ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) হতে ইবনে মাজাহ বর্ণিত হাদীস]

১২/ - অপর এক ভাষ্যে বিবৃত হয়েছে: “আমি তোমাদেরকে কবর যেয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম; অতঃপর আমার কাছে প্রতীয়মান হয়েছে যে তা অন্তরকে নরম করে, চোখে পানি আনে, আর পরকালের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। অতএব, তোমরা কবর যেয়ারত করো, কিন্তু গর্হিত কথাবার্তা (সেখানে) বোলো না!” [নোট-২১: হযরত আনাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) হতে ইমাম আহমদ বর্ণিত দীর্ঘতর হাদীসের অংশ বিশেষ]

১৩/ - এই বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত যে প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) হযরত উসমান ইবনে মায’উন (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)’এর মাযারের ওপর একটি পাথর (ফলক) স্থাপন করে বলেন: “এর দ্বারা আমি আমার (দুধ-) ভাইয়ের কবর চিহ্নিত করবো এবং পরবর্তীকালে আমার আত্মীয়-স্বজনের কেউ ইন্তেক্বাল করলে এখানেই তাকে দাফন করবো।” [নোট-২২: নাম না জানা এক সাহাবী (রা:) হতে ‘হাসান সহীহ’ সনদে বর্ণনা করেছেন আবূ দাউদ ও আল-বায়হাক্বী নিজ ‘আল-কুবরা’ পুস্তকে (৩:৪১২); দেখুন ইবনে হাজর কৃত ‘তালখীস আল-হাবীর’ (২:১৩৪); ইবনে আল-মুলাক্কিন প্রণীত ‘তোহফাতুল মোহতাজ’ (২:২৯); এবং ইবনে আল-কাইয়্যেম জাওযিয়্যার রচিত ‘যাআদ আল-মাআদ’ (১:৫০৬) গ্রন্থের আল-আরনা’উত সংস্করণ। হাদীসটির পুরো বিবরণে ব্যক্ত হয়েছে যে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) জনৈক ব্যক্তিকে হযরত ইবনে মাযউন (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)’এর মাযারের ওপর (ফলক চিহ্ন হিসেবে) একটি পাথর স্থাপন করতে বলেন; যখন ওই ব্যক্তি পাথরটি নড়াতে অক্ষম হন, তখন হুযূর পাক (দ:) নিজের জামার আস্তিন গুটিয়ে তাঁকে সাহায্য করেন, আর এমতাবস্থায় তাঁর ধবধবে সাদা হাত দৃশ্যমান হয়। মুহাজির সাহাবাবৃন্দের (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম) মধ্যে হযরত ইবনে মাযউন (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)-ই ছিলেন প্রথম, যাঁকে বাক্বী আল-গারক্বাদে দাফন করা হয়। মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)’র পুত্র ইবরাহীম (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)’কে তাঁর পাশে দাফন করা হয়] 

ওপরে উদ্ধৃত পাঁচটি রওয়ায়াত তথা বিবরণে মহিলাদের দ্বারা মাযার/রওযা যেয়ারতের সপক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায় এই মর্মে যে, আখেরাতের স্মরণ, কান্নাকাটি ও অন্তর নরম হওয়ার মতো ইতিবাচক প্রভাবগুলো স্রেফ পুরুষদের জন্যেই খাস্ বা সীমাবদ্ধ করা হয়নি, বরং তা মহিলাদের জন্যেও বিস্তৃত করা হয়েছে। অতএব, এসব বিবরণ মহিলাদেরকেও উদ্দেশ্য করেছে, যা সার্বিকভাবে গ্রহণীয়। এটা প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)’র কন্যা হযরত মা ফাতিমা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা)’র আচরিত রীতি দ্বারাও সমর্থিত, যেমনটি প্রতীয়মান হয়েছে নিচের দুটো বর্ণনায়:

১৪/ - ইমাম জা’ফর সাদিক্ব (রহমতুল্লাহে আলাইহে) নিজ এসনাদে বর্ণনা করেন ইমাম হাসান ইবনে আলী (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) হতে এই মর্মে যে, হযরত মা ফাতেমা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) প্রতি জুমুআ-বার [নোট-২৩: জা’ফর ইবনে মুহাম্মদ হতে, তিনি তাঁর বাবা হতে; ইমাম হাসান (রা:)’এর উল্লেখ ছাড়া আবদুর রাযযাক্ব কর্তৃক বর্ণিত (৩:৫৭২) যা মুনক্বাতী’ তথা সনদ কাটা] রাসূলুল্লাহ (দ:)’এর চাচা হযরতে আমীরে হামযা ইবনে আবদিল মুত্তালিব (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)’এর মাযার যেয়ারত করতেন; আর তিনি সেখানে দুআ করতেন এবং কাঁদতেনও [নোট-২৪: হাকিম (১৯৯০ সংস্করণের ১:৫৩৩, ৩:৩০) কর্তৃক বর্ণিত, যিনি এটাকে সহীহ বলেছেন; আল-বায়হাক্বী কৃত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’ (৪:৭৮), এবং ইবনে আবদ আল-বার্র রচিত ‘আল-তামহীদ’ (৩:২৩৪), যদিও আল-যাহাবী এটাকে তীব্রভাবে নাকচ করেন এবং আল-বায়হাক্বী এটার দুর্বলতার প্রতি ইঙ্গিত করেন]। আরেকটি ভাষ্যে এসেছে যে হযরত ফাতেমা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) ওই মাযারকে চেনার জন্যে একটি পাথর দ্বারা চিহ্নিত করেন [নোট-২৫: আল-আতরাম ও ইবনে আবদ আল-বার্র এটা বর্ণনা করেন, যেমনটি উল্লেখ করেছেন আল-ক্বুরতুবী নিজ ‘তাফসীর’ গ্রন্থে (১০:৩৮১); একটি দুর্বল সনদে আবদুর রাযযাক্ব-ও (৩:৫৭৪), কেননা বর্ণনাকারী হিসেবে আল-আসবাগ ইবনে নুবাতা প্রত্যাখ্যাত (মাতরূক্ব)]। অপর এক ভাষ্যে বিবৃত হয়েছে যে হযরত মা ফাতেমা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) ওই মাযার শরীফ রক্ষণাবেক্ষণ করতেন এবং প্রয়োজনে মেরামতও করতেন। [নোট-২৬: আল-হাকিম তিরমিযী, ‘নওয়া’দিরুল উসূল’ (আসল ১৫)]

১৫/ - মহিলাবৃন্দ হযরত রোক্বাইয়া (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা)’র বেসালপ্রাপ্তিতে কান্নাকাটি করছিলেন; এমতাবস্থায় হযরত উমর ফারূক্ব (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) তাঁদেরকে নিষেধ করতে চান। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) তাঁকে বলেন, “অপেক্ষা করো, হে উমর!” অতঃপর তিনি বলেন: “(মহিলারা), শয়তানের কর্কশ আওয়াজ সম্পর্কে সতর্ক হও! যতোক্ষণ এটা (মানে কান্নাকাটি) চোখ ও অন্তর হতে নির্গত হয়, তা (খোদায়ী) রহমত বা করুণা হতে আগত; আর যখন এটা জিহ্বা ও হাত হতে প্রকাশিত হয় [নোট-২৭: অভিসম্পাত এবং আরব খৃষ্টান ও অমুসলমানদের দ্বারা আজো আচরিত শোকজ্ঞাপক গাল-চাপড়ানোর প্রথার প্রতি উদ্দিষ্ট], তা শয়তান হতে আগত।” এমতাবস্থায় হযরত মা ফাতেমা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) হযরত রোক্বাইয়া (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা)’র কবরে কাঁদতে আরম্ভ করেন এবং হযরত রাসূলে পাক (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডল হতে অশ্রু নিজ মোবারক হাত দ্বারা মুছে দেন; অথবা বর্ণনাকারী বলেন, তাঁর মোবারক বাহু দ্বারা মুছে দেন। [নোট-২৮: হযরত ইবনে আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) হতে ইমাম আহমদ বর্ণিত; আল-তায়ালিসী (২:৩৫১) ও আল-বায়হাক্বী কৃত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’ (৪:৭০ #৬৯৪৬) যার এসনাদে রয়েছেন আলী ইবনে যায়দ ইবনে জুদান। আল-বায়হাক্বী এই হাদীসটিকে সহীহ বিবেচনা করেন, কেননা এটা সহীহ বিবরণসমূহ দ্বারা নিশ্চিত হয়েছে। একই এসনাদে এটা আংশিকভাবে বর্ণনা করেছেন আল-হাকিম (৩:১৯০; ১৯৯০ সংস্করণের ৩:২১০), যেখানে আল-যাহাবী বলেন: “এই সনদটি সালেহ তথা গৃহীত;’ তবে তাঁর ‘মীযান’ (৩:১২৯) পুস্তকে তিনি দাফনের সময় হযরত ফাতেমা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা)’র উপস্থিতির কারণে এই বর্ণনাকে ‘মুনকার’ তথা প্রত্যাখ্যাত শ্রেণিভুক্ত করেন]

হানাফী মাযহাবে মহিলাদের দ্বারা মাযার/রওযা যেয়ারত ততোক্ষণ পর্যন্ত জায়েয - যতোক্ষণ তাঁরা যথাযথ (শরঈ) পোশাক পরিধান করেন এবং অযথা অ-মাহরাম পুরুষের সংশ্রবে না আসেন; আর তাঁরা অনিয়মতান্ত্রিক আচরণ না করেন, যেমন - বিলাপসহ কান্নাকাটি। এই মাযহাবের মুখ্য রেফারেন্স-মূলক কেতাবগুলোর অন্যতম ‘ফতোয়া-এ-হিন্দীয়া’ (৫:৩৫০) পুস্তকে লিপিবদ্ধ আছে: “মহিলাদের দ্বারা মাযার/রওযা যেয়ারতের ব্যাপারে উলামাবৃন্দের মাঝে মতপার্থক্য বিদ্যমান। আল-সারাখসী বলেন যে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মত হলো এটা ভ্রান্তি নয়।” আল-মাবসূত পুস্তকে (২৪:১০) আল-সারাখসী বলেন: “আমাদের (হানাফী) মাযহাবে (মাযার যেয়ারতের পক্ষে) সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মত হলো এই যে, এটা (মানে রুখসাত তথা বিধান প্রয়োগের বিষয়টি) পুরুষ ও নারী উভয়েরই জন্যে প্রযোজ্য; কেননা বর্ণিত আছে যে হযরত মা আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) সব সময়ই মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)’র রওযা মোবারক যেয়ারত করতেন, আর হজ্জ্বে গেলে তিনি তাঁর ভাই হযরত আবদুর রাহমানের (রা:) কবর শরীফ যেয়ারত করতেন...।” এই ঘটনার সত্যতা ইবনে নুজাইম তাঁর ‘আল-বাহর আল-রায়ক্ব’ গ্রন্থে নিশ্চিত করেছেন। ইবনে আবেদীন এই পুস্তকের ওপর লেখা তাঁর মহা ব্যাখ্যামূলক ‘মিনহাত আল-খালেক্ব হাশিয়াত আল-বাহর আল-রায়ক্ব’ কিতাবে (২:২১০) উদ্ধৃত করেন আল-রামলী (রহ:)’র কথা, যিনি বলেন: “অনেকের আচরিত প্রথার অনুসরণে মহিলারা নিজেদের দুঃখ-বেদনা পুনরায় জাগিয়ে তুলতে, কিংবা বিলাপসহ কান্নাকাটি করতে মাযার/রওযা যেয়ারতে গেলে তা তাদের জন্যে জায়েয নেই। হুযূরে পাক (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)’এর ঘোষিত - ‘আল্লাহতা’লা কবর যেয়ারতকারিনী নারীদের প্রতি অভিসম্পাত দেন’ - মর্মে হাদীস শরীফটিকে এভাবেই বোঝা হয়ে থাকে। আর যদি মহিলাবৃন্দ গভীর ধ্যান, অনুগ্রহ লাভ ও বরকত-আশীর্বাদ অন্বেষণের লক্ষ্যে আউলিয়ার (রহ:) মাযার যেয়ারত করেন, তাহলে বয়স্কা নারী হওয়ার শর্তে তা তাঁদের জন্যে ভ্রান্তি (বলে বিবেচিত) হবে না। তবে তারা যুবতী নারী হলে তা মকরূহ/অপছন্দনীয় হবে (মানে তাদের অংশগ্রহণের দরুন ফিতনার উদ্ভব হতে পারে)। মহিলাদের দ্বারা মাযার/রওযা যেয়ারত অবৈধ না হওয়ার পক্ষে প্রমাণ হিসেবে যে হাদীসটি পাওয়া যায়, তা হযরত আনাস বিন মালেক (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেছেন, যা’তে প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলােইহে ওয়া সাল্লাম) একটি কবরের পাশে উপবিষ্ট ও ক্রন্দনরত জনৈক মহিলাকে অতিক্রম করছিলেন। তিনি তাঁকে বলেন, ‘আল্লাহকে ভয় করো এবং ধৈর্য ধরো’।” ফুক্বাহা তথা ফেক্বাহবিদমণ্ডলী এ থেকে সিদ্ধান্ত নেন যে বিষয়টি জায়েয, কেননা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) তাঁকে কবর যেয়ারত করতে বারণ করেননি; বিষয়টি যদি অবৈধ হতো, তাহলে প্রিয়নবী (দ:)’র জন্যে ওই মহিলাকে নিষেধ করা বাধ্যতামূলক হতো। [নোট-২৯: এই প্যারাগ্রাফটি সামান্য সম্পাদনাসহ শায়খ ফারাজ রাব্বানী হতে সংগৃহীত]

মহিলাদের দ্বারা মাযার/রওযা যেয়ারতের প্রতি আপত্তিকারীদের প্রামাণ্য দলিলস্বরূপ প্রদর্শিত তিনটি হাদীসের প্রথম দুটো (ক এবং খ)’কে যদি সহীহ হিসেবে আমরা বিবেচনাও করি, যেমনটি করেছিলেন হাতে গোনা কতিপয় আলেম, তবুও সেগুলো নিষেধাজ্ঞার প্রমাণ সাব্যস্ত হবে না নিচের দুটো কারণে: প্রথমতঃ ইসলামের সঠিক মতানুযায়ী সেগুলো রহিত হয়ে গিয়েছে, যেমনটি ওপরে প্রদর্শিত হয়েছে। দ্বিতীয়তঃ সেগুলো একে অপরের স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয় এবং দালিলিক প্রমাণ হিসেবে (বিরোধীদের) পেশকৃত তৃতীয় (গ) হাদীসটিও সেগুলোকে খোলাসা করে এই অর্থে যে, ওই লা’নত/অভিসম্পাত নিঃশর্তভাবে মাযার যেয়ারতকারিনী মহিলাদের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়, বরঞ্চ স্রেফ সেসব নারীদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য যারা (১) অতিমাত্রায় যেয়ারত করে এবং (২) যেয়ারতকালে কিছু শরীয়তগর্হিত কাজে লিপ্ত হয়, যেমনটি বিবৃত করেছেন সর্ব-ইমাম তিরমিযী, বাগাবী, তাহাবী, ক্বুরতূবী ও অন্যান্যরা [নোট-৩০: দেখুন - তিরমিযী নিজ ‘সুনান’ পুস্তকে, হযরত আবূ হোরায়রাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) হতে ‘যাওয়ারাত’-সংক্রান্ত হাদীস বর্ণনাশেষে; আল-তাহাবী কৃত ‘শরহে মুশকিল আল-আসার’ (১২:১৭৯-১৮৬); আল-বাগাবী রচিত ‘শরহে আল-সুন্নাহ’ (২:৪১৭, ৫:৪৬৪); এবং আল-ক্বুরতূবী নিজ ‘তাফসীর’গ্রন্থে (২০:১৭০), যেমনটি উদ্ধৃত করেছেন আল-শওকানী তার ‘নায়ল আল-আওতার’ কিতাবে (জানাযা ও কবর যেয়ারত অধ্যায়গুলো দ্রষ্টব্য)]। এই খাস বা সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা এ বাস্তবতা দ্বারাও সমর্থিত যে, সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য/বিশুদ্ধ/সহীহ নিষেধাজ্ঞাসূচক হাদীসে ঘোষিত হয়েছে: “আল্লাহতা’লা সেসব নারীদের প্রতি অভিসম্পাত দেন, যারা ঘনঘন কবর যেয়ারত করে থাকে।” এর দরুন (বোঝা যায়) নিষেধাজ্ঞাটি স্পষ্টতঃ খাস, মহিলাদের একটি বিশেষ দলের প্রতি উদ্দিষ্ট; তাঁদের সবার প্রতি নয়।

এই খাস নিষেধাজ্ঞা পুরুষদের প্রতিও যে প্রযোজ্য, তার সমর্থন রয়েছে একটি হাদীসে যা’তে বিবৃত হয়েছে: “আল্লাহ ইহুদী ও খৃষ্টানদের প্রতি লা’নত দেন! (কেননা) তারা তাদের পয়গম্বর (আ:)’বৃন্দের মাযার/রওযাকে এবাদতগাহ হিসেবে গ্রহণ করেছিলো” [নোট-৩১: হযরত আয়েশাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) হতে সর্ব-ইমাম বুখারী ও মুসলিমবর্ণিত]। এই পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নিষেধাজ্ঞা আরেকটি হাদীস শরীফে সমর্থিত হযেছে যা’তে ব্যক্ত হয়েছে: “আমি তোমাদেরকে আগে কবর যেয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম; এখন থেকে যেয়ারত করো। কিন্তু তোমাদের প্রভু খোদাতা’লা যেসব কথায় রাগান্বিত হন সেগুলো উচ্চারণ কোরো না!” [নোট-৩২: হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) হতে আল-বাযযার সহীহ সনদে বর্ণনা করেন, যেমনটি বিবৃত করেন আল-হায়তামী (৩:৫৮); হযরত ইবনে আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) হতে আল-আযদী নিজ ‘মুসনাদ’ পুস্তকে (১৯৪ পৃষ্ঠা); এবং হযরত আনাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) হতে ইমাম আহমদ, আবূ এযালা (৬:২৭২) ও ইবনে আবী শায়বা (৩:২৯)]

এই দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপনের সারমর্ম এই নয় যে আজকালের মুসলমান মহিলা নির্বিশেষে তাঁদের সবাইকেই মাযার/রওযা যেয়ারতের অনুমতি প্রদান; কেননা প্রলোভন ও পাপ আমাদের যুগে ব্যাপকভাবে বিরাজমান, আর মাযার যেয়ারতের শরঈ বিধিবিধানের প্রতি মাযার/রওযা যেয়ারতকারী পুরুষ ও যেয়ারতকারিনী নারী উভয় শ্রেণি-ই সামান্য আদবশীল নতুবা একেবারেই আদব-কায়দাশূন্য। আল-বায়হাক্বী (রহমতুল্লাহে আলাইহে)’র বক্তব্য তুলে ধরা এখানে অত্যুক্তি হবে না; তিনি বলেন: “মহিলাবৃন্দ যদি নিজেদেরকে জানাযা’র মিছিল থেকে দূরে রাখেন, কবরস্থানে না যান এবং কবর যেয়ারত না করেন, তাহলে তা তাঁদের ধর্মের জন্যে মঙ্গলজনক হবে; আর আল্লাহর তরফ থেকেই আগমন করে সাফল্য” [নোট-৩৩: আল-বায়হাক্বী, ‘আল-সুনান আল-কুবরা’ (৪:৭৮)]। আল-হাকিম আল-তিরমিযী তাঁর রচিত ‘নওয়া’দিরুল উসূল’ পুস্তকের ‘আসল-১৫’তে এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ পেশ করেছেন।

তবু শহর/নগর ও গ্রামের কবরস্থানে সমসাময়িককালের যেয়ারতকারী মুসলমানদের এই নেতিবাচক অবস্থা আল-বাক্বী কবরস্থান যেয়ারতকারিনী মহিলাদের ক্ষেত্রে মোটেই প্রযোজ্য হবে না; (কেননা) সেখানে মদীনা মোনাওয়ারার স্বাভাবিক শিষ্টতার রীতি আবেগের বহিঃপ্রকাশকে বাধা দেয় এবং এই দুইয়ের মাঝে ভারসাম্য রক্ষা করে। এমতাবস্থায় সেখানে মুসলমান পুরুষদের পাশাপাশি তাঁদের অবস্থাকে নিষেধের পরিবর্তে অনুমতি দেয়া উচিত, যেমনটি উলামা-এ-ইসলামের প্রদত্ত ফতোয়া দ্বারা সমর্থিত হয়েছে, যা প্রয়াত আবদুল আযীয বিন বা’য, মুহাম্মদ ইবনে ইবরাহীম ইবনে আবদ আল-লাতীফ, হাম্মা’দ আল-আনসারী ও তার ছাত্রবর্গ বকর আবূ যায়দ, আবূ বকর আল-জাযায়রীর মতো হাতে গোনা কতিপয় ওহাবী বিরোধিতাকারী এবং হারামাইন শরীফাইনের ধর্মীয় পদে সমাসীন অন্যান্যদের দাবির খেলাফ।

মদীনা মোনাওয়ারায় অবস্থিত মসজিদে নববী ও বাক্বী কবরস্থানসহ সর্বত্র নিঃশর্ত নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগের প্রসঙ্গটি, যেটা নিয়ে সৌদি বকর আবূ যায়দ নিজ ‘জুয’ ফী যিয়ারাত আল-নিসা’ লিল-ক্বুবূর’ [নোট-৩৪: লেখকের ‘আল-আজযা’আ আল-হাদীসিয়্যা’ পুস্তকে অন্তর্ভুক্ত] শীর্ষক পত্রে জোরাজুরি করেন, আর তাঁর অদ্ভুত দাবি এই মর্মে  যে (ক) মুর্দার খাটিয়ার সাথে জানাযার মিছিলে মহিলাদের অংশগ্রহণের নিষেধাজ্ঞাসম্বলিত রওয়ায়াত-গুলো মাযার/রওযা যেয়ারতের বেলায়ও প্রযোজ্য হবে এবং (খ) ’যাওয়ারাত’ শব্দটি অশুদ্ধ এবং তা নারী যেয়ারতকারিনীদের অর্থে ‘যুওয়ারাত’ পড়তে হবে, ঘনঘন যেয়ারতের অর্থে গ্রহণ করা যাবে না [নোট-৩৫: এমন কী আল-মু’আল্লেমীও আপন ‘এমারাত আল-ক্বুবূর’ পুস্তকের ১৫৬ পৃষ্ঠায় এটাকে ‘যাওয়ারাত’ পাঠ করেন এবং এর অর্থ করেন ‘যারা ঘনঘন ক্ববর যেয়ারত করে’], সেই প্রসঙ্গটি সম্পর্কে বলবো: এ ধরনের দাবি অযৌক্তিক ও একগুঁয়েভাবে প্রামাণ্য দলিল অস্বীকার করা ছাড়া কিছুই নয়, আর এ আচরণটি আদি গোত্রীয় ও অসঙ্গতির পরিচিত উৎসমূল - ইবনে তাইমিয়া ও ইবনে ক্বাইয়্যেম আল-জাওযিয়্যার অন্ধ অনুসরণ বটে। কিন্তু পরিচিত ব্যক্তিদের অনুসরণের চেয়ে অনুসরণ-অনুকরণের বেশি হক্বদারিত্ব (অধিকার) হচ্ছে সত্যের।

মারওয়ান ইবরাহীম আল-কায়সী’র লিখিত Morals and Manners in Islam: A Guide to Aadaab (লিস্টার, ইংল্যান্ড: দ্য ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ১৯৮৬; পুনর্মুদ্রণ ১৯৮৯ ও ১৯৯১) শীর্ষক পুস্তকে কবরস্থান যেয়ারত ও মাযার/রওযার নির্মাণ (স্থাপত্য-কৌশল) সম্পর্কে নিম্নবর্ণিত ত্রুটি-বিচ্যুতি বিদ্যমান:

১/ - লেখক (৭১ পৃষ্ঠায়) বলেন: “কোনো মুসলমানের কবরস্থান যেয়ারতের উদ্দেশ্য দুটি : ইন্তেক্বালপ্রাপ্তদের জন্যে দুআ করা এবং আখেরাতের কথা নিজেকে স্মরণ করিয়ে দেয়া।” অথচ তৃতীয় একটি উদ্দেশ্য হচ্ছে বরকত আদায়; আর চতুর্থ উদ্দেশ্যটি হচ্ছে প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) ও আসহাবে কেরাম (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহম) এবং আউলিয়া কেরাম (রহমতুল্লাহে আলাইহে)’এর মাযার/রওযার মতো বিশেষ বরকতময় স্থানগুলো যেয়ারত করে সেখানে নিজের প্রয়োজন পূরণের জন্যে আবেদন-নিবেদন ও প্রার্থনা জানানো (মানে তাওয়াসসুল পালন)। ইসলামী উলামামণ্ডলীর মাঝে এজমা’ তথা ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে)’র রওযা মোবারক যেয়ারত করার উদ্দেশ্যে সফর করা পছন্দনীয় এবাদত (ক্বুরবাত), যেমনটি সাব্যস্ত হয়েছে ইমাম ক্বাজী আয়ায (রহমতুল্লাহে আলাইহে)’এর ‘শেফা শরীফ’ গ্রন্থে; আর ইমাম শাফেঈ (রহমতুল্লাহে আলাইহে)’র কাছ থেকে সহীহ বর্ণনায় এসেছে যে তিনি নিজের প্রয়োজন মেটানোর উদ্দেশ্যে ইমাম আবূ হানীফা (রহমতুল্লাহে আলাইহে)’র মাযার যেয়ারত করে তাঁকে অসীলা করতেন। [নোট-৩৬: আল-খতীব কৃত ‘তারীখে বাগদাদ’ (১:১২৩) এবং ইবনে আবী আল-ওয়াফা প্রণীত ‘তাবাক্বাত আল-হানাফিয়্যা’ (৫১৯ পৃষ্ঠা)]

২/ - বইয়ের একই পৃষ্ঠায় ওই লেখক দুর্বল এক মন্তব্য করেন: “কবরস্থানে অবস্থানকালীন ইসলামী শিক্ষা/বিধানের লঙ্ঘন (নিষিদ্ধ)।” নিশ্চয় সেটা কোনো সময়ই বা কোনো স্থানেই অনুমতিপ্রাপ্ত নয়! আর এটাই হলো ফিক্বাহ-শাস্ত্রে বিজ্ঞ ‍ও অভিজ্ঞ উলামাবৃন্দের সতর্কতাপূর্ণ বাক্য-বিন্যাস হতে বিচ্যুতির বিপদ।

৩/ - ওই লেখক একই পৃষ্ঠায় আরো বলেন: “কবরস্থানে ‘ওহে কবরবাসী ঈমানদার নর-নারী, আপনাদের প্রতি সালাম তথা শান্তি বর্ষিত হোক! আল্লাহ আপনাদের মতো পূর্ববর্তীদের প্রতি এবং আমাদের মতো পরবর্তীদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ মঞ্জুর করুন। নিশ্চয় আল্লাহর ইচ্ছায় আমরা আপনাদের সাথেই মিলিত হবো’ - এই কথাটি বলা এবং ইন্তেক্বালপ্রাপ্তদের জন্যে দুআ করা ছাড়া আর কিছুই বলা যাবে না।” বইয়ের ১৭৯ পৃষ্ঠায় লেখক দাবি করেন: “কেউ ইন্তেক্বাল করার পর তাঁর জন্যে তালক্বীন (বিশেষ উপদেশজ্ঞাপক অনুশীলনী) করা একটি বেদআত।” আসলে লেখকের এসব কথাই ভ্রান্তি, কেননা দাফনের পরে ইন্তেক্বালপ্রাপ্তদেরকে তালক্বীন/নির্দেশনা দেয়া মোস্তাহাব (পছন্দনীয়) বা সুন্নাত, এমন কী শায়খ মুহাম্মদ ইবনে আবদিল ওয়াহহাব নজদীর লেখা ‘আহকাম তাম্মানী আল- মওত’ পুস্তকে পরিবেশিত তাঁর মতানুসারেও। এ ব্যাপারে বিস্তারিত দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপিত হয়েছে Encyclopedia of Islamic Doctrine ও Reliance of the Traveler (৯২১-৯২৪ পৃষ্ঠা, ৩২.১-২)। কোনো মানুষ বেসালপ্রাপ্ত হওয়ার বাস্তবতা এই নয় যে তিনি (দুনিয়ায়) জীবিতদের শুনতে পান না। তথাকথিত আধুনিকতাবাদীদের এটা একটা মুখ্য বৈশিষ্ট্য যে এলমে গায়ব/অদৃশ্য জ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত অনেক আক্বীদা-বিশ্বাস ও অনুশীলনীকেই তাঁরা অস্বীকার করেন।

৪/ - লেখক বইয়ের ১৭১ পৃষ্ঠায় আরো দাবি করেন: “কোনো মাযার/রওযাকে বরকত লাভের উদ্দেশ্যে স্পর্শ করা নিষিদ্ধ (হারাম)।” এই ধারণাটিও ভুল; সঠিক ফায়সালা হলো এটা মকরূহ [বঙ্গানুবাদকের নোট: সাহাবী হযরত আবূ আইয়ূব আনসারী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর ঘটনার সূত্রে এতে উলামাদের মাঝে মতান্তর বিদ্যমান], যদিও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহমতুল্লাহে আলাইহে)’এর মতো কিছু উলামার ফতোয়া অনুসারে প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)’র রওযা শরীফ স্পর্শ, এমন কী চুম্বন করাতেও কোনো ক্ষতি নেই। আল-যাহাবী এই বিষয়টির অস্বীকারকারীদের এমন কী খারেজীও আখ্যা দিয়েছেন।

৫/ - লেখক ১৮৪ পৃষ্ঠায় দাবি করেন: “কবরের ওপর খাড়াভাবে ফলক স্থাপনও আপনাআপনি নিষিদ্ধ।” খাড়াভাবে স্থাপিত ফলক বলতে যদি বোঝানো হয় কবরের ‘শাহিদান’ তথা সাইনপোস্ট’কে, তাহলে এই দাবি পূর্ব হতে পশ্চিম অঞ্চলজুড়ে যুগ যুগ ধরে অনুশীলিত রীতিসূত্রে পুরোপুরিভাবে প্রত্যাখ্যাত ও অমূলক বলে প্রমাণিত হবে।

৬/ - বইয়ের একই পৃষ্ঠায় লেখক বলেন: “কবরের ওপর কোনো আকৃতির স্থাপনা-ই নির্মাণ করা উচিৎ নয়....কবরগুলোকে জিপসাম (খনিজ পদার্থ) দ্বারা আস্তর করা যাবে না।” সত্যটি হলো, এই বিষয়ে উলামাবৃন্দের মাঝে মতপার্থক্য বিরাজমান; আর মাযার/রওযা নির্মাণ ও জিপসাম দ্বারা সেগুলো আস্তর করা জায়েয হওয়ার পক্ষে দুটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছিলো: সাধারণভাবে বলতে গেলে মাযার ভেঙ্গে পড়া থেকে রক্ষা করার লক্ষ্যে, এবং দ্বিতীয়তঃ তা কোনো পীর বা (হক্কানী) আলেম অথবা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)’এর বংশের কারো হলে জনগণের মনে শ্রদ্ধাভাব জাগ্রত করার উদ্দেশ্যে, যেমনটি উল্লেখিত হয়েছে ইবনে আবেদীন শামী’র ‘হাশিয়া’ পুস্তকে (১:৬০১)। শায়খ ইসমাঈল হাক্কী তাঁর ‘তাফসীরে রূহুল বয়ান’গ্রন্থে  إِنَّمَا يَعْمُرُ مَسَٰجِدَ ٱللَّهِ مَنْ ءَامَنَ بِٱللَّهِ وَٱلْيَوْمِ ٱلآخِرِ وَأَقَامَ ٱلصَّلَٰوةَ وَءَاتَىٰ ٱلزَّكَٰوةَ وَلَمْ يَخْشَ إِلاَّ ٱللَّهَ فَعَسَىٰ أُوْلَـٰئِكَ أَن يَكُونُواْ مِنَ ٱلْمُهْتَدِينَ (আল্লাহর মসজিদগুলো তারাই আবাদ করে, যারা আল্লাহ ও ক্বেয়ামতের প্রতি ঈমান আনে, নামায ক্বায়েম করে, যাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করে না; সুতরাং এটাই সন্নিকটে যে এসব মানুষ সৎপথপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে - ক্বুরআন মজীদ ৯:১৮, তাফসীরে নূরুল এরফান) - এই আয়াতটির ব্যাখ্যায় বলেন:

“ইমাম আবদুল গনী নাবলুসী (রহ:) নিজ ‘কাশফ আন্ নূর ‘আন্ আসহাবিল ক্বুবূর’ (কবরবাসীদের কাছ থেকে প্রকাশিত জ্যোতি - সানজেরী পাবলিকেশন, বাংলা সংস্করণ দ্রষ্টব্য) শীর্ষক পুস্তিকায় যা বলেছেন, তার সার কথা হলো পবিত্র খোদায়ী বিধানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সাথে যে উত্তম নতুন প্রচলন (বেদআতে হাসানা) খাপ খায়, তাকে সুন্নাহ বলে। অতএব, উলামা-এ-হক্কানী/রব্বানী, আউলিয়ায়ে কেরাম ও পুণ্যাত্মাবৃন্দের মাযার/রওযার ওপর গুম্বজ নির্মাণ করা, আর তাঁদের মাযারকে বস্ত্র বা চাদরাবৃত করা জায়েয, যদি সেটার উদ্দেশ্য হয় সাধারণ মানুষের মনে শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত করা, যাতে তাঁরা ওই মাযারের অধিবাসীর (ওলীর) প্রতি ঘৃণা পোষণ না করেন।”

ওপরের বিষয় যদি সঠিক না হয়, অথবা তা যদি সুন্নাহর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ না হয়, তাহলে ইমাম আবূ দাউদের ‘সুনান’ গ্রন্থে উদ্ধৃত আমাদের মা আয়েশাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা)’র বক্তব্য সম্পর্কে গভীরভাবে ভাবুন; তিনি বলেন: “(আবিসিনীয়) বাদশাহ নাজ্জাশী যখন বেসালপ্রাপ্ত হন, তখন আমাদেরকে (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের তরফ থেকে) জানানো হয় যে তাঁর মাযারের ওপর একটি নূর/জ্যোতি নিরন্তর দৃশ্যমান হচ্ছিলো।”

আল্লাহতা’লা আমাদের উপলব্ধি, অন্তর ও আমাদের কবরগুলোকে তাঁর দয়া ও ক্ষমাশীলতা দ্বারা আলোকিত করুন (আমীন)! ওয়া সাল্লাল্লাহু ’আলা সাইয়্যেদিনা মুহাম্মাদিন ওয়া ‘আলা আলিহি ওয়া সাহবিহি ওয়া সাল্লাম। 

                                                    *সমাপ্ত*