ব্লগ সংরক্ষাণাগার

রবিবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

ডাক্তার জাকির নায়েকের গোমরাহীর ওপেন-হার্ট সার্জারী

[Open-heart surgery of Dr Zakir Naik's heresies - written by the Admin]

ভূমিকা

এই লেখার প্রারম্ভে বলা প্রয়োজন যে টেলি-প্রচারক ডাক্তার জাকির নায়েক সাহেব পেশায় একজন ডাক্তার এবং তিনি ধর্মবিষয়ের স্রেফ কমপ্যারেটিভ রিলিজিয়নে তথা বিভিন্ন ধর্মের পারস্পরিক তুলনামূলক বিচার-বিশ্লেষণ সম্পর্কে পড়াশুনা করেছেন। তাঁর নেই কোনো আরবী ভাষাজ্ঞান, নেই কালাম, ফেক্বাহ, হাদীস, তাসাউফ ইত্যাদি ইসলামী শাস্ত্রে কোনো দক্ষতা। তিনি নিজেই তা স্বীকার করেছেন। অতএব, তাঁর উচিত ছিলো কেবল তাঁর জানা কমপ্যারেটিভ রিলিজিয়ন বিষয়ে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখা এবং ওপরে উল্লেখিত ইসলামী বিদ্যাশাস্ত্রগুলোতে নাক না গলানো; ঠিক যেমনটি করেছিলেন তাঁর শিক্ষাগুরু ও সুন্নীপন্থী প্রচারক মরহূম আহমদ দীদাত সাহেব (দক্ষিণ আফ্রিকা)। কিন্তু তিনি তা না করে তাঁর অ-বিশেষজ্ঞ মতামত ওই সব বিষয়ে প্রদান করেছেন। ফলশ্রুতিতে মুসলিম দুনিয়ার বিভিন্ন ধর্মীয় সংস্থা ও আলেম-উলামা তাঁর গোমরাহী/পথভ্রষ্টতার ব্যাপারে হয়েছেন সোচ্চার। আমরা তাঁর ওই সব গোমরাহী আমাদের এই লেখাতে তুলে ধরবো এবং সেগুলোর ওপেন-হার্ট সার্জারী সুসম্পন্ন করবো, ইনশা’আল্লাহ।

ডাক্তার সাহেবের বিভ্রান্তিগুলো নানা ধরনের; মৌলিক আক্বীদা-বিশ্বাস থেকে শুরু করে ফিক্বহী সিদ্ধান্ত দিতে গিয়েও তিনি অনেক ভুল করেছেন। আল্লাহতা’লার গুণগত বৈশিষ্ট্য, শানে রেসালাত, শানে বেলায়াত - এমন কোনো দিক বাকি নেই যা’তে তিনি গোমরাহী প্রচার করেননি। বিপুল পরিমাণ টাকা ব্যয়ে তাঁর পরিচালিত ‘পীস টিভি’র সম্প্রচার দ্বারা তিনি শুধু নিজেই এসব অনৈসলামী মতবাদ প্রচার করেননি, বরঞ্চ কতিপয় অধার্মিক ও অর্থলোভী আলেম-উলামাকেও এই কাজে শরীক করেছেন। বলা বাহুল্য যে, ডাক্তার ও তাঁর সহযোগীবর্গ উগ্র ‘সালাফী’ মতবাদে বিশ্বাসী। এই বিভ্রান্তিকর দর্শন প্রথম পরিবেশন করেন মধ্যযুগে ইবনে তাইমিয়া নামের এক মুফতী। কিন্তু ওই সময় সুন্নীপন্থী উলামা-এ-হক্কানীবৃন্দ তা রদ বা রহিত করেন। এর প্রায় সাড়ে চার শ বছর পরে আরবের নজদ অঞ্চলের আরেক বিভ্রান্ত আলেম মুহাম্মদ ইবনে আবদিল ওয়াহহাব ওই গোমরাহ দর্শন পুনরায় পরিবেশন করেন। অতঃপর সৌদি আরবীয় রাজা-বাদশাহবর্গ তাঁর সেই ভ্রান্ত মতবাদ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সারা বিশ্বে সম্প্রসারণ করেন। সেই ধারাবাহিকতায় ডাক্তার জাকির নায়েক সৌদি সমর্থন নিয়ে ‘সালাফী’ মতবাদের ডিজিটাল সম্প্রচার আরম্ভ করেন। সৌদিদের সাথে তাঁর সখ্যতা ছিলো সর্বজনবিদিত [তবে বর্তমান যুবরাজ সালমান ’সালাফী’ দর্শনের বিরোধী বলে মনে হচ্ছে]। এমতাবস্থায় এ ব্যাপারে অনবধান মুসলিম তরুণ প্রজন্ম ডাক্তার জাকির নায়েকের প্রদত্ত এনেসথেটিকস্ দ্বারা বে-শোধ হয়ে তাঁকে সত্যিকার ইসলামী পণ্ডিত মনে করছে। আমরা এ রকম এক ক্রান্তিকালে সঠিক তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরার মহান লক্ষ্য সামনে নিয়ে লেখাটি আরম্ভ করছি। এতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে ডাক্তারের গোমরাহীপূর্ণ দর্শনের পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে আলেম-উলামাবৃন্দের ফতোয়া এবং আমাদেরও খণ্ডনমূলক দলিলাদি। তরুণ প্রজন্ম যারা সত্য জানতে উন্মুখ, তাদের জন্যে এই লেখাটি সত্যের আলোকবর্তিকা হবে বলে আমরা আশাবাদ ব্যক্ত করি।

আক্বীদা-বিশ্বাসগত বিভ্রান্তি

আমরা সর্বপ্রথমে ডাক্তার জাকির নায়েকের আক্বীদা-বিশ্বাসগত বিভ্রান্তি ও বিচ্যুতি (গোমরাহী) সম্পর্কে আলোকপাত করবো। এক্ষেত্রে বিভিন্ন মাসলাকের উলামাদের ফতোয়া তুলে ধরাই উত্তম হবে। এসব মাসলাকের কিছু কিছুর সাথে প্রকৃত সুন্নী জামাআতের আক্বীদা-বিশ্বাসগত মিল না থাকলেও ডাক্তারের ব্যাপারে এঁরা সবাই একমত। সেন্ট্রাল মসক্-ডট-কম শিরোনামের একটি ওয়েবসাইটে ভারতীয় দারুল উলূম দেওবন্দ হতে একটি ফতোয়া উপস্থাপন করা হয়েছে, যার অনুবাদ নিচে দেয়া হলো:

দারুল উলূম দেওবন্দ

প্রশ্ন: সম্মানিত মুফতীবৃন্দ, সালাম নেবেন। আমি আপনাদের জিজ্ঞেস করছি যে ডাক্তার জাকির নায়েক সম্পর্কে আপনাদের দৃষ্টিভঙ্গি কী? তাঁর আক্বীদা-বিশ্বাস কি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ? হাদীস ও তাফসীর-সংক্রান্ত তাঁর মতামত নির্ভরযোগ্য কি না? ফেক্বাহ’র ক্ষেত্রে তাঁর পথ ও মত কী? তিনি কোন্ ইমামের অনুসরণ করেন? আমরা কি তাঁর (টেলি-সম্প্রচারিত) আলোচনা শুনতে পারবো এবং সেই অনুযায়ী অনুশীলন করতে পারবো? অনুগ্রহ করে একটি সন্তোষজনক উত্তর দেবেন। আরজ গুজার - রিয়্যাদ আহমদ খাঁন, আতিয়্যা প্রিন্টার্স, উত্তর সু’ইয়া, এলাহাবাদ, ভারত।

উত্তর: ডাক্তার জাকির নায়েক সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন ওঠেছে, এটা সেগুলোরই একটা। তাঁর আক্বীদা-বিশ্বাস, ফিক্বহী মাযহাব ও ক্বুরআন-হাদীস সংক্রান্ত ব্যাখ্যাবলীর ওপরে একটি বিস্তারিত জবাব চাওয়া হয়েছে। অতএব, তাঁরই প্রভাষণ ও বক্তব্যের আলোকে একটি বিশদ জবাব এখানে দেয়া হলো।

حامدا ومصليا ومسلما ، الجواب وبالله التوفيق والعصمة      

ডাক্তার জাকির নায়েকের প্রভাষণগুলোতে পাওয়া যায় ইসলামের মৌলিক আক্বীদা-বিশ্বাস হতে বিচ্যুতি; আল-ক্বুরআনের তাফসীর তথা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে (বিকৃতিমূলক) সংযোজন ও বানোয়াট দৃষ্টিভঙ্গি পরিবেশন; বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রতি বিস্ময়ভাব; ইসলাম ধর্মের বিরোধিতায় পশ্চিমা চিন্তাভাবনার সাথে ঐক্য; এবং পূর্ববর্তী পুণ্যাত্মাবৃন্দ হতে মুখ ফিরিয়ে ফিক্বহী সিদ্ধান্তে সংখ্যাগরিষ্ঠ উম্মতের পথ ও মত হতে বিচ্যুতি। অধিকন্তু, তিনি অপতৎপর মুসলিম উম্মাহ’কে মুজতাহিদ ইমামমণ্ডলীর অনুসরণ হতে ফেরাতে; মানুষদেরকে দিয়ে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পরিত্যাগে; আর আলেম-উলামার প্রতি মানুষকে বীতশ্রদ্ধ করতে। এ ধরনের কিছু বিচ্যুতি নিচে পেশ করা হলো:

/- ডাক্তার জাকিরের আক্বীদা-বিশ্বাসগত কতিপয় বিষয় (বিশ্বাস অত্যন্ত সূক্ষ্ম; একটুখানি নড়ে গেলেও কখনো কখনো ঈমানের জন্যে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে)।

(ক) “আল্লাহতা’লাকে বিষ্ণু ও ব্রক্ষ্মা নামে ডাকা জায়েয বা বৈধ/অনুমতিপ্রাপ্ত।”

ডাক্তার জাকির একটি অনুষ্ঠানে বলেন, “আল্লাহতা’লাকে হিন্দু দেবতা বিষ্ণু মানে প্রভু ও ব্রক্ষ্মা মানে স্রষ্টা নামগুলো ধরে ডাকা জায়েয।এটা এ শর্তে যে কেউ বিষ্ণু সম্পর্কে বিশ্বাস করবেন না যে তাঁর চারটি হাত আছে এবং তিনি পাখির ওপরে চড়েন।” [ডাক্তার জাকির নায়েক প্রণীত ‘Islaam and Universal Brotherhood' (ইসলাম ধর্ম ও সর্বজনীন ভ্রাতৃত্ব), ৩৩ পৃষ্ঠা]

আল্লাহতা’লাকে আরবী নয় এমন শব্দ দ্বারা আহ্বান করার কোনো অনুমতি-ই নেই। সে সব নাম ধরে তাঁকে ডাকা জায়েয নেই, যেগুলো তাঁর জন্যে সুনির্দিষ্ট নয়। আল্লাহতা’লাকে বিষ্ণু ও ব্রক্ষ্মা নামে কীভাবে ডাকা যায়, যেখানে এগুলো হিন্দু ধর্মের স্পষ্ট প্রতীক?

(খ) “আল্লাহর কথা কী? এটাকে পরীক্ষা করার জন্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পথ গ্রহণ করা প্রয়োজন।”

ডাক্তার জাকির একটি অনুষ্ঠানে বলেন, “প্রত্যেকেই বোঝেন যে তাঁর সম্মানিত কেতাব-ই কেবল আল্লাহর বাণী হতে পারে। আপনারা যদি জানতে চান কোন্ কেতাবটি নিশ্চিতভাবে আল্লাহর বাণী, তাহলে চূড়ান্ত পরীক্ষা হচ্ছে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পথ গ্রহণ করা। তা অাধুনিক বিজ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেই বুঝবেন সেটা নিশ্চিতভাবে আল্লাহর বাণী।”

الجواب على ثلاثين جوابا على أن ذاكر الهندي وأصحاب فكره منحرفون ضلالا للشيخ يحى الحجورى   

এখানে আমরা জানতে পারি ডাক্তার জাকির নায়েকের গোমরাহীর ঔদ্ধত্য সম্পর্কে; আল্লাহর কেতাব হতে ‍মুখ ফিরিযে নেয়ার ব্যাপারে; তাঁর বিভ্রান্তিকর চিন্তাধারা ও আধুনিক বিজ্ঞানের প্রতি তাঁর বিস্ময় ভাব সম্পর্কেও - যা বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছেছে। এটা এমনই এক পর্যায়ের যে তিনি প্রতিটি মুহূর্তে পরিবর্তনশীল বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে ঐশী গ্রন্থাবলীর, বিশেষ করে পবিত্র আল-ক্বুরআনের বিচারের মাপকাঠি বা মানদণ্ড নির্ধারণ করেছেন। এটার সবচেয়ে বড় প্রমাণ আল্লাহর কালাম তথা বাণী হচ্ছে এর ‘এ’জা-য’ (অসহায় বানিয়ে দেয়া)। এর মাধ্যমে অাল্লাহ (ক্বুরঅানের) বিভিন্ন স্থানে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন।

(গ) “প্রত্যেক ব্যক্তিরই অধিকার রয়েছে ফতোয়া প্রদানের।”

ডাক্তার জাকির নায়েক নিজের রচিত ‘Islaam and Universal Brotherhood' (ইসলাম ধর্ম ও সর্বজনীন ভ্রাতৃত্ব) শীর্ষক পুস্তকের এক জায়গায় বলেন, “যে কারো ফতোয়া দেয়াটা জায়েয/অনুমতিপ্রাপ্ত; কেননা ফতোয়ার অর্থ হলো কারো মতামত ব্যক্ত করা।” [প্রাগুক্ত]

এই বক্তব্যে ডাক্তার জাকির নায়েক সাহেব ফতোয়া দেয়ার মতো এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজকে ‘মতামত প্রদানের’ মতো হাল্কা ভাষায় প্রকাশ করেছেন। হাফেয ইবনে কাইয়্যেম আল-জাওযিয়্যার মতানুসারে, (ধর্মীয় পদবীধারী) মুফতী হচ্ছেন শরীয়ত তথা ঐশী বিধানের ব্যাখ্যায় আল্লাহতা’লারই (বাণীর) একজন অনুবাদক; আর তিনি খোদার পক্ষে সই-স্বাক্ষর করার দায়িত্বপ্রাপ্তও।

لم تصلح مرتبة التبليغ بالرواية والفتيا إلا لمن اتصف بالعلم والصدق...وإذا كان منصب التوقيع عن الملوك بالمحل الذي لا ينكر فضله ولا يجهل قدره...فكيف بمنصب التوقيع عن رب الأرض والسماوات ، فحقيق بمن أقيم في هذا المنصب أن بعد له عدته ويتأهب له أهبته وأن يعلم فدر المقام الذي أقيم فيه . إعلام الموقعين ٩١/١

এই বিষয়টির বৈধতা ডাক্তার জাকির শুধু নিজের জন্যেই রাখেননি, বরং প্রত্যেকের জন্যেও এর অনুমতি দিয়েছেন। তিনি নিম্নবর্ণিত ক্বুরআনের আয়াত ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের হাদীস শরীফকে সম্পূর্ণভাবে অবজ্ঞা করেছেন -

 فاسألوا اهل الذكر إن كنتم لا تعلمون 

”তোমরা না জানলে জ্ঞানীদের কাছে জিজ্ঞেস করে শেখো।” [আল-আয়াত]

من أفتى بغير علم كان إثمه على من أفتاه . أخرجه أبو داؤد في سننه ٣٥٩ رقم ٣٦٥٩٣، باب تفسير القرآن عن رسول الله صلى الله عليه وسلم

”যে ব্যক্তি জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও ফতোয়া দেয়, সে ওই ফতোয়ার পাপের দায় বহন করবে।” [সুনানে আবূ দাউদ, রাসূল (দ:) হতে ক্বুরআন তাফসীর অধ্যায়]

/- ক্বুরআন মজীদের তাফসীর সংক্রান্ত ডাক্তারের নিজস্ব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ উপস্থাপন তথা অর্থের বিকৃতি সাধন খুবই সূক্ষ্ম। একজন মুফাসসির বা ব্যাখ্যাকারী আয়াতে করীমায় ব্যক্ত আল্লাহতা’লার উদ্দেশ্য নির্ধারণ করেন এই মর্মে যে আল্লাহ এ কথা বলতে চেয়েছেন। অতএব, কোনো অযোগ্য লোকের জন্যে এই শাস্ত্রে নাক গলানো ভীষণ বিপজ্জনক একটি ব্যাপার। কেননা একটি হাদীস শরীফে প্রিয়নবী (দ:) এরশাদ ফরমান - 

من قال في القرآن برأيه فأصاب فقد أخطأ. أخرجه الترمذى رقم٢٧٧٦
 

“যে ব্যক্তি নিজের (মনগড়া) সিদ্ধান্ত অনুসারে আল-ক্বুরআনের তাফসীর/ব্যাখ্যা করে, সে সঠিক অর্থ পেলেও ভুল করেছে বলে বিবেচিত হবে।” [তিরমিযী]

অপর একটি বর্ণনায় এসেছে - 

من قال في القرآن برأيه فليتبوأ مقعده من النار . أخرجه الترمذى ١٩٩/٥ رقم ٢٩٥١
 

“যে ব্যক্তি নিজের (মনগড়া) সিদ্ধান্ত অনুসারে আল-ক্বুরআনের ব্যাখ্যা করে, সে জাহান্নামকে নিজের আবাসস্থল বানিয়ে নেয়।” [তিরমিযী]

এই কারণেই মুফাসসির হওয়ার জন্যে অনেকগুলো শর্ত রয়েছে। যেমন - তাঁকে ক্বুরআন মজীদের আয়াতগুলো সম্পর্কে সম্যক অবগত হতে হবে; হুযূরের (দ:) আহাদীস সম্পর্কেও গভীর জ্ঞান থাকতে হবে; আরবী ভাষা ও ব্যাকরণ, বাক্যরীতি, ভাষার রূপতত্ত্ব, বাগ্মিতা ও স্বচ্ছতা ইত্যাদি সম্পর্কেও তাঁকে জানতে হবে [বঙ্গানুবাদকের নোট: বিশেষ করে রূহানী তথা আধ্যাত্মিক জ্ঞান থাকতে হবে, যাতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (দ:) কী বলেছেন তা তিনি বুঝতে পারেন]। ডাক্তার জাকিরের ক্ষেত্রে এসব শর্তের কোনোটাই প্রয়োজনীয় মাত্রায় পূরণ হয়নি; তিনি আরবী ব্যাকরণ জানেন না যা তাঁর জানা উচিত ছিলো; আর আহাদীস কিংবা আরবী ভাষায় বাগ্মিতা ও স্বচ্ছতা
সম্পর্কেও তিনি গভীর জ্ঞান রাখেন না [এগুলোর সবই পরবর্তী পর্যায়ে উদাহরণ সহকারে স্পষ্ট করা হবে]। পক্ষান্তরে, গোমরাহীর অতল গহ্বরে পতিত হওয়ার সকল কারণ ডাক্তার জাকিরের মাঝে পুরো মাত্রায় পরিদৃষ্ট হয়েছে; যথা - রাসূলুল্লাহ (দ:), সাহাবা কেরাম (রা:) ও তাবেঈন (রহ:)-বৃন্দ হতে বর্ণিত তাফসীর হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়া, যুগের চিন্তা-চেতনার প্রতি ঝোঁক এবং আল-ক্বুরআনের বিষয়বস্তুকে ভুল বোঝা ইত্যাদি। এমতাবস্থায় তিনি অনেকগুলো আয়াতে করীমাকে তাঁর ওই অজ্ঞতাপ্রসূত বিরোধিতা করার উপলক্ষ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এগুলোর কিছু উদাহরণ নিচে দেয়া হবে।



(ক) ডাক্তার জাকির নায়েক الرجال قوامون على النساء - আয়াতটির তাফসীর প্রসঙ্গে বলেন, “লোকে বলে (আয়াতোক্ত) ‘ক্বাওওয়াম’ শব্দটি এক স্তর উঁচু হওয়ার অবস্থাকে উদ্দেশ্য করে। তবে বাস্তবে ‘ক্বাওওয়াম’ শব্দটি উৎপন্ন হয়েছে ‘এক্বা’মাহ’ হতে। এক্বা’মাহ অর্থ উঠে দাঁড়ানো। অতএব, এক্বা’মাহ শব্দটির মানে হলো দায়িত্বের ক্ষেত্রে এক স্তর উঁচুতে অবস্থান, কিন্তু তা গুণগত বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে নয়।” [জাকির নায়েকের প্রভাষণসমূহ, ২৯৫ পৃষ্ঠা, ফরীদ বুক ডিপো]

ডাক্তার জাকির নায়েক নারী-পুরুষের সাম্যবিষয়ক পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থনে তাঁর নিজস্ব (মনগড়া) তাফসীর তৈরি করেছেন এবং এরই ফলশ্রুতিতে পুরুষদের গুণগত বৈশিষ্ট্যের পর্যায়কে তিনি নাকচ করে দিয়েছেন। প্রসঙ্গতঃ ইবনে কাসীর ওপরোক্ত আয়াতের তাফসীরে লেখেন - 

أى الرجل قيم على المرأة أى هو رئيسها وكبيرها والحاكم عليها ، مؤدبها إذا اعوجت 
  
অর্থ: স্ত্রীর সামনে তার স্বামীর মর্যাদা হচ্ছে একজন নেতা ও (শ্রদ্ধেয়) শাসকের মতো; প্রয়োজনের সময় স্বামী তার স্ত্রীকে যথাযথ পন্থায় শ্রদ্ধাশীলতার আদব-কায়দা শিক্ষা দেন। ইবনে কাসীর وللرجال عليهن درجة - এর তাফসীরে লেখেন - 

وللرجال عليهن درجة أى في الفضيلة في الخلق والمنزلة وطاعة الأمر والإنفاق والقيام بالمصالح والفضل في الدنيا والآخرة . ٦١٠/١

অর্থাৎ, “গুণগত বৈশিষ্ট্য, মর্যাদা, (খোদার) আনুগত্য ইত্যাদি ক্ষেত্রে স্বামী তার স্ত্রীর চেয়ে উঁচ্চস্তরের।

ডাক্তার জাকির নায়েকের (মনগড়া) তাফসীর হাদীস শরীফেরও খেলাফ। মহানবী (দ:) এরশাদ করেন:

لو كنت آمرا أحدا أن يسجد لأحد ، لأمرت النساء أن يسجدن لأزواجهن. أخرجه أبو داؤد 

অর্থ: আল্লাহ ভিন্ন কাউকে সেজদা করার অনুমতি থাকলে আমি নারীদের প্রতি তাদের স্বামীদেরকে সেজদা করতে আদেশ করতাম। [আবূ দাউদ]

স্বামীদের যদি তাদের স্ত্রীদের ওপরে মর্যাদা না থাকতো, তাহলে কেন রাসূলে পাক (দ:) নারীদেরকে তাদের স্বামীদের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মানের চিহ্নস্বরূপ সেজদার আদেশ করতে চেয়েছিলেন?

(খ) ডাক্তার জাকির নায়েকের প্রতি একটি প্রশ্ন করা হয়: “ক্বুরআন মজীদে বিবৃত হয়েছে যে মায়ের গর্ভে সন্তানটি ছেলে না মেয়ে তা একমাত্র আল্লাহতা’লাই জানেন। কিন্তু বিজ্ঞানের অনেক উন্নতি হয়েছে এবং আমরা বর্তমানে আলট্রা-সনোগ্রাফির মাধ্যমে সহজে এটা নির্দিষ্ট করতে পারি। এমতাবস্থায় অালোচ্য আয়াতটি চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক নয় কি?”

ডাক্তার জাকির উত্তর দেন, “এটা ঠিক যে এই আয়াতখানির বিভিন্ন অনুবাদ ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে একমাত্র আল্লাহ-ই জানেন মায়ের গর্ভে শিশুটি ছেলে না-কি মেয়ে। তবে আরবী আয়াতটি অধ্যয়ন করুন এবং এতে আপনারা দেখতে পাবেন যে ছেলে না মেয়ে অভিব্যক্তিটি আরবী শব্দে ব্যবহৃত হয়নি। বাস্তবতা হলো, ক্বুরআন মজীদে (স্রেফ) বলা হয়েছে মাতৃগর্ভে কী আছে। এই জ্ঞানটি শুধু আল্লাহর কাছে নিহিত। বহু মোফাস্সেরীন (তাফসীরবিদ) এটা ভুল বুঝেছেন এবং এর অর্থ করেছেন মায়ের গর্ভে শিশুটি ছেলে না মেয়ে, সে সম্পর্কে স্রেফ আল্লাহ-ই (ভালো) জানেন। এটা ভুল ব্যাখ্যা। এই আয়াতটি গর্ভস্থ ভ্রূণ ছেলে না মেয়ে, সে সম্পর্কে ইঙ্গিত করে না, বরঞ্চ শিশুটির প্রকৃতি সম্পর্কে ইশারা করে এ মর্মে, সে তার পিতামাতার জন্যে (খোদায়ী) রহমত/করুণা হবে, না শাস্তি?” [ডাক্তার জাকির নায়েক কৃত ইসলামের প্রতি ৪০টি আপত্তি, ১৩০ পৃষ্ঠা, আরীব পাবলিকেশন্স, দিল্লী]

ডাক্তার জাকির নায়েক তাঁর প্রদত্ত এই উত্তরে বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রতি বিস্ময় ভাবাচ্ছন্ন এবং স্পষ্ট অভিযোগটি হতে নিজের গা বাঁচানোর জন্যে সাহাবা-এ-কেরাম (রা:) ও তাবেঈন (রহ:)’বৃন্দের তাফসীরকে পাশ কাটিয়ে সর্বজনজ্ঞাত অর্থকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি সমালোচনা করেছেন এই বলে যে বহু মুফাস্সেরীন ভুল করেছেন। ডাক্তার জাকিরের ব্যাখ্যাকৃত অর্থটি হচ্ছে ‘মা’ মওসূল’। অনেক মোফাস্সেরীন এটাকে প্রথম অর্থের আওতাধীন সম্ভাবনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে দ্বিতীয় অর্থটিকে প্রত্যাখ্যান করাটা সঠিক নয়। ডাক্তার জাকির নায়েক যে গভীর ভাবনায় নিমগ্ন হন না এবং সাহাবা-এ-কেরাম (রা:) ও তাবেঈন (রহ:)’বৃন্দের বক্তব্য হতে মুখ ফিরিয়ে নেন, এ ঘটনায় তা স্পষ্ট প্রমাণিত। এটা এ কারণে যে ডাক্তার জাকির যে অর্থকে নাকচ করেছেন, সূরা রা’আদের ৮ম আয়াতটি তার দিকে ইঙ্গিত করেছে। এরশাদ হয়েছে - 

الله يعلم ما تحمل كل انثى وما تغيض الأرحام وما تزداد. الرعد ٨

অর্থ: আল্লাহ জানেন যা কিছু কোনো স্ত্রী প্রজাতির (মানে নারীর) গর্ভে থাকে এবং তাতে যা কিছু কমে বা বাড়ে। [আল-আয়াত]

বিখ্যাত তাবেঈ ও মুফাস্সির ইমাম ক্বাতাদা (রহ:)-ও একই অর্থ বর্ণনা করেন: 

فلا يعلم ما في الأرحام أذكر أم أنثى الخ

অর্থ: একমাত্র আল্লাহরই প্রকৃত জ্ঞান রয়েছে গর্ভস্থ সন্তানটি ছেলে না মেয়ে।

একইভাবে ইবনে কাসীর এটা উল্লেখ করেছেন নিজের তাফসীরগ্রন্থের ৬ষ্ঠ খণ্ড, ৩৫৫ পৃষ্ঠায়; আল্লামা নাসাফী তাঁর ‘তাফসীরে মাদারেক’, ৩য় খণ্ড, ১১৬ পৃষ্ঠায়; এবং শওকানী নিজ ফাতহুল ক্বাদীর পুস্তকের ৫ম খণ্ড, ৪৯৮ পৃষ্ঠায়। কিন্তু ডাক্তার জাকির নায়েক এই মহান মুফাস্সির-মণ্ডলীর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে উল্লেখিত অর্থকে ভ্রান্ত শ্রেণিভুক্ত করেছেন। তিনি নিজের কৃত অর্থকে তর্কাতীত হিসেবে গ্রহণ করেছেন এবং এটাকে একগুঁয়েভাবে সমর্থন করছেন।

সঠিক উত্তর:  
এই আয়াতের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো আল্লাহতা’লার অদৃশ্য জ্ঞানকে (এলম-এ-গায়েব) সপ্রমাণ করা; আর এলমে গায়ব বাস্তবে সেই নিশ্চিত জ্ঞানকে বোঝায়, যা কোনো প্রকাশ্য/স্পষ্ট কারণ বা অসীলা অথবা হাতিয়ার ছাড়া লাভ হয়। ডাক্তারদের দ্বারা হাতিয়ার/যন্ত্রপাতির সাহায্যে লব্ধ জ্ঞান সুনিশ্চিত জ্ঞান নয়; আর তা বিনা যন্ত্রপাতিতেও অর্জন করা হয় না। এটা যন্নি (অস্পষ্ট) এবং যন্ত্রপাতির সাহায্যেই কেবল অর্জিত হয়। অতএব, আল্ট্রা-সনোগ্রাফি’র সহায়তায় যে যন্নি জ্ঞান লাভ হয়, তা ক্বুরআনী আয়াতটির প্রতি আপত্তি উত্থাপন করে না।

(গ) يا ايها النبى إذا جائك المؤمنت يبايعنك على ان لا يشركن بالله شيئا. الممتحنة ١٢ ডাক্তার জাকির নায়েক এই আয়াতটি সম্পর্কে বলেন: “এখানে ‘বাই’য়াত’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। বাই’য়াত শব্দটি আমাদের সময়কার নির্বাচনের অন্তর্নিহিত অর্থ বহন করে। এটা এ কারণে যে মহানবী (দ:) আল্লাহতা’লারই প্রেরিত পয়গম্বর এবং সরকারপ্রধান। ‘বাই’য়াত’ মানে হলো তাঁকে সরকারের প্রধান হিসেবে গ্রহণ করা। ইসলাম ধর্ম ওই সময় নারীকে ভোট দেয়ার অধিকার দেয়।” [ইসলামে নারী অধিকার (The rights of women in Islaam), ৫০ পৃষ্ঠা, প্রণেতা - ডাক্তার জাকির নায়েক]

এখানেও ডাক্তার জাকির নায়েক ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়েছেন। তিনি নারীর ভোটাধিকার প্রমাণের মানসে বিবৃত করেছেন যে রাসূলে খোদা (দ:)’র কাছে মহিলাদের বাই’য়াত (আনুগত্যের শপথ) গ্রহণটি ছিলো বর্তমানকালের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচনেরই প্রাচীন একটি পদ্ধতি। গণতন্ত্রের বাস্তবতা (মানে সংখ্যাগরিষ্ঠের জয়) সম্পর্কে যাঁরা জানেন, তাঁরা স্পষ্ট বোঝেন যে ডাক্তার জাকিরের এ ব্যাখ্যাটি আসল ঘটনার একেবারেই পরিপন্থী এবং ক্বুরআন তাফসীরশাস্ত্রে তাঁরই বুদ্ধির স্রেফ অপচয় ছাড়া কিছু নয়। কেননা আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অনুসারে প্রত্যেকেরই রাষ্ট্রপতি (বা প্রধানমন্ত্রী) নির্বাচন করার ভোটাধিকার আছে। কেউ সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোট অর্জন করতে না পারলে রাষ্ট্রপতি/প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না। বাই’য়াত গ্রহণ যদি প্রকৃতপ্রস্তাবে ভোট পাওয়ার ব্যাপার হতো, তাহলে সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)’এর পক্ষে কি রাসূলুল্লাহ (দ:)’এর নেতৃত্বকে প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ ছিলো? 

(ঘ) يا أخت هارون ما كان أبوك امرأ سوء وما كانت أمك بغيا . مريم ٢٨ - সূরা মরিয়মের ২৮ আয়াত (হে হারূনের বোন! তোমার পিতা মন্দ লোক ছিলো না এবং না তোমার মাতা ব্যভিচারিনী) সম্পর্কে ভুল বুঝে যে সর্বজনবিদিত আপত্তি উত্থাপিত হয়ে থাকে এ মর্মে, হযরত মরিয়ম রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা পয়গম্বর হারূন আলাইহিস্ সালামের বোন নন এবং তাঁদের মধ্যে এক সহস্র বছরের ব্যবধান বিদ্যমান, সে সম্পর্কে ডাক্তার জাকির নায়েক বলেন, “খৃষ্টান মিশনারীবৃন্দ দাবি করেন যে রাসূলে পাক (দ:) পয়গম্বর ঈসা (আ:)’র মাতা মরিয়ম (রা:) ও পয়গম্বর হারূন (আ:)’এর বোন মরিয়মের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে পারেননি; অথচ ‘উখতু’ আরবী শব্দটির অর্থ সন্তানও হয়। এই কারণেই মানুষেরা মরিয়ম (রা:)’কে বলেছিলেন ‘ওহে হারূনের সন্তানেরা।’ বাস্তবিকপক্ষে এটা পয়গম্বর হারূন (রা:)’এর সন্তানদেরকে উদ্দেশ্য করেছে।” [ডাক্তার জাকির রচিত ‘ইসলামের প্রতি ৪০টি আপত্তি’ (Forty objections on Islaam)]

এটা আহাদীস (হাদীসশাস্ত্র) ও আভিধানিক ক্ষেত্রে ডাক্তার জাকিরের অজ্ঞতারই বহিঃপ্রকাশ। এর খণ্ডনে মুসলিম শরীফের হাদীসটি-ই যথেষ্ট। আরবী এবারত:

عن المغيرة بن شعبة قال : لما قدمت نجران سألونى ، فقالوا : إنكم تقرأون يا أخت هارون وموسى قبل عيسى بكذا وكذا ، فلما قدمت على رسول الله صلى الله عليه وسلم سألته عمن ذلك فقال : إنهم كان يسمون بأنبيائهم والصالحين قبلهم . مسلم ١٧١/٦ دار الجيل بيروت رقم ٥٧٢١  

প্রিয়নবী (দ:) ১৪০০ বছর আগেই এই আয়াতটি সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন। হাদীসটির সংক্ষিপ্ত বিবরণ হলো এই যে, পয়গম্বর ঈসা (আ:)’র মাতা মরিয়ম (রা:) পয়গম্বর মূসা (আ:)’র ভাই পয়গম্বর হারূন (আ:)’এর বোন ছিলেন না, বরঞ্চ পয়গম্বর ঈসা (আ:)’র মা মরিয়ম (রা:)’র ভাইয়ের নামও ছিলো হারূন; বিশেষতঃ এসব মানুষ নিজেদের নাম রাখতেন আম্বিয়া (আ::) ও পুণ্যবান ব্যক্তিত্বদের নামের অনুসরণে। এ থেকে আমরা জানতে পারি এটা কোনো নতুন উত্থাপিত আপত্তি নয়; আর এর উত্তর দেয়ার জন্যে কোনো মিথ্যে বানিয়ে নেয়ারও কোনো দরকার নেই (যা ডাক্তার জাকির নায়েক করেছেন)।

আহাদীস তথা হাদীসশাস্ত্র সম্পর্কে ডাক্তার জাকির নায়েক এতোখানি অজ্ঞ যে তিনি আহাদীস ও তাফসীরের বাস্তবতা তথা মর্মবাণী অনুধাবনের চেষ্টা করার পরিবর্তে মিথ্যে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ বানিয়ে নিয়েছেন।

(ঙ) وَٱلأَرْضَ بَعْدَ ذَلِكَ دَحَاهَا (এবং এরপর জমিনকে প্রসারিত করেছেন; আল-ক্বুরআন ৭৯:৩০) - এই আয়াতটি সম্পর্কে ডাক্তার জাকির বলেন, “এখানে ডিমের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত আরবী শব্দটি হচ্ছে ‘দাহাহা’। এটা উট পাখির ডিমকে উদ্দেশ্য করেছে। উট পাখির ডিমের আকৃতি পৃথিবীর মতোই গোলাকৃতি। অতএব, আল-ক্বুরআন নির্ভুলভাবে পৃথিবীর আকৃতি ব্যক্ত করেছে। (কেননা) ক্বুরআন যখন অবতীর্ণ হয়েছিলো, তখন ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত ছিলো যে দুনিয়া সমতল/চেপ্টা।” [জাকির নায়েকের প্রভাষণসমূহ, ক্বুরআন ও আধুনিক বিজ্ঞান, ৭৩-৪ পৃষ্ঠা]

এখানেও ডাক্তার জাকির নায়েক বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি একদম বিস্ময়াভিভূত। দুনিয়ার আকৃতি সম্পর্কে গবেষণা করতে গিয়ে তিনি ভ্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে আয়াতে করীমাটির ব্যাপারে নিজের মনগড়া ব্যাখ্যা পেশ করেছেন। আল-ক্বুরআনের বিষয়বস্তু (যা’তে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে তওহীদ ও রেসা’লাত এবং এতদসংশ্লিষ্ট সকল বিষয়), তা উপলব্ধি না করার দরুন-ই এটা হয়েছে। অতএব, (আয়াতোল্লিখিত) ‘দাহাহা’ শব্দটি আরবী ভাষায় বোঝায় প্রসারিত হওয়া। এই অর্থানুযায়ী ‘দাহাহা’ শব্দের অনুবাদ ও তাফসীর হলো, পৃথিবী ও এতে অবস্থিত যাবতীয় সৃষ্টির প্রসার [দেখুন তাফসীরে ইবনে কাসীর]। এই শব্দটি ও এর ধাতু ডিমের অর্থ বোঝায় না।

/- আহাদীস সম্পর্কে অজ্ঞতা

আহাদীসের রত্নভাণ্ডার সম্পর্কে মূর্খতার দরুন ডাক্তার জাকির এমন কিছু (মনগড়া) ফতোয়ার উদ্ধৃতি দিয়েছেন যা সহীহ হাদীসেরই পরিপন্থী। অধিকন্তু, অনেক ক্ষেত্রে বেশ কিছু সংখ্যক হাদীসের অস্তিত্ব থাকলেও ডাক্তার নায়েক বলেন যে সেগুলোর কোনো প্রমাণ-ই নেই (মানে তিনি দলিল অস্বীকার করেছেন)। নিচে ডাক্তার নায়েকের মূর্খতা অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে আহাদীস অস্বীকারের উদাহরণ পেশ করা হলো:

(ক) হায়য/ঋতুস্রাব অবস্থায় নারীদের ক্বুরআন তেলাওয়াতের অনুমতি:

একটি অনুষ্ঠানে (সম্ভবতঃ পীস টিভিতে) ডাক্তার জাকির হায়য-সম্পন্ন নারীদের সম্পর্কে বলেন, “আল-ক্বুরআন ও হাদীস শরীফে নামায/সালাত সম্পর্কে নিষেধ করা হয়েছে বটে, তবে এ কথা কোথাও মানা করা হয়নি যে মহিলারা ক্বুরআন তেলাওয়াত করতে পারবেন না।”

অথচ তিরমিযী শরীফে একটি স্পষ্ট হাদীসে এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা এসেছে - لا تقرأ الحائض ولا الجنب شيئا من القرآن 
অর্থাৎ, “হায়য ও জনাবাত/নাপাকী অবস্থায় কোনো নারীর ক্বুরআন তেলাওয়াত করা নিষেধ।”

অতএব, স্পষ্ট সহীহ হাদীসের উপস্থিতি সত্ত্বেও ডাক্তার জাকির নায়েক নিজের ভ্রান্ত দাবি উত্থাপন করেছেন এবং দলিল প্রত্যাখ্যান করেছেন।

(খ) অাহনা’ফ (পূর্ববর্তী মুজতাহিদ ইমাম)-বৃন্দের কাছে এ মর্মে কোনো প্রমাণ নেই যে (শরীরের) রক্ত প্রবাহের দরুন অযূ ভেঙ্গে যায়।

রক্ত প্রবাহের কারণে অযূ ভাঙ্গে কী ভাঙ্গে না, এই বিষয়ে একটি প্রভাষণে আলোচনাকালে ডাক্তার জাকির নায়েক বলেন, “কতিপয় ‘উলামা’, বিশেষ করে হানাফী ফেক্বাহবিদবৃন্দ, অভিমত ব্যক্ত করেন যে শরীরের রক্ত প্রবাহের দরুন অযূ ভেঙ্গে যায়। কিন্তু সালাত/নামাযে রত অবস্থায় কারো রক্ত ঝরলে তিনি কী করবেন? এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া হয়েছে (আহনা’ফ-বৃন্দের) একটি বিস্তারিত ফতোয়ায়। তবে তাতে এই দৃষ্টিভঙ্গির পক্ষে কোনো প্রামাণ্য দলিল নেই।” [জাকির নায়েকের বাস্তবতা, ২১৪ পৃষ্ঠা, মাকতাবাহ মদীনা, দেওবন্দ]

এখানে ডাক্তার নায়েক হানাফী ফেক্বাহ’র বিষয়ে ‘উলামা’বৃন্দের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করেছেন যে তাঁরা রক্ত প্রবাহের কারণে অযূ ভেঙ্গে যায় মর্মে (মনগড়া) ফতোয়া দিয়েছেন। অথচ এ বিষয়ে অনেক আহাদীস (হাদীসসমূহ) বিদ্যমান। অধিকন্তু, হযরতে সাহাবায়ে কেরাম (রা:)’এরও এই অনুযায়ী অনুশীলন ছিলো। নিচের বর্ণনাগুলো অধ্যয়ন করুন:

أخرج البخاري عن عائشة رضي الله عنها قالت : جائت فاطمة بنت أبي حبيش إلى النبي صلى الله عليه وسلم فقالت : يا رسول الله! إني امرأة أستحاض فلا أطهر ، أفأدع الصلاة؟ قال : لا ، إنما ذلك عرق وليست بالحيضة ، فإذا أقبلت الحيضة فدعى الصلاة وإذا أدبرت فاغسلي عنك الدم قال هشام : قال أبي ثم توضئي لكل صلاة حتى يجيئ ذلك الوقت. إذا رعف أحدكم في صلاتة فلينصرف فليغسل عنه الدم ثم ليعد وضوءه ويستقبل صلاته أخرجه الدار قطني.

সারমর্ম: নামায আদায়কালে কারো নাকে রক্তক্ষরণ হলে তাঁকে রক্ত ধুয়ে ফেলতে হবে এবং তারপর পুনরায় অযূ করতে হবে। [দা’রু ক্বুতনী]

عن زيد بن ثابت رضي الله عنه الوضوء من كل دم سائل . أخرجه ابن عدي في الكامل (نصب الراية للإمام الزيلعي ٣٧⁄١

সারমর্ম: রক্তক্ষরণের দরুন অযূ বাধ্যতামূলক হয়। 

এই রওয়ায়াতগুলো এবং অন্যান্য বর্ণনা থাকা সত্ত্বেও ডাক্তার নায়েক নিজের অজ্ঞতা স্বীকার করে নেননি, বরং এজতেহাদ দাবি করেছেন এ কথা বলে যে রক্তক্ষরণ দ্বারা অযূ ভেঙ্গে যায় মর্মে কোনো দালিলিক প্রমাণ-ই নেই। 

(গ) পুরুষ ও নারীর নামায পড়ার পদ্ধতির মাঝে পার্থক্যকরণ অনুমতিপ্রাপ্ত নয়

(উক্ত বইয়ের) আরেক স্থানে ডাক্তার জাকির পুরুষ ও নারীর মধ্যকার সালাতের পার্থক্যের প্রসঙ্গে বলেন, “পুরুষদের থেকে পৃথক কোনো পদ্ধতিতে নারীদের নামায আদায়ের আদেশসম্বলিত কোনো সহীহ ও প্রতিষ্ঠিত হাদীস বিদ্যমান নেই। উল্টো সহীহ বুখারীতে এমন একটি রওয়ায়াত/বর্ণনা এসেছে, যা’তে হযরতে উম্মে দারদা (রা:) বিবৃত করেছেন যে (নামাযের) ‘আত-তাহিয়্যাত’-কালীন বৈঠকে পুরুষদের মতোই নারীদের বসার পক্ষে একটি আদেশ বিদ্যমান।”

এখানে ডাক্তার জাকির দুটো সম্পূর্ণ ভ্রান্ত অভিমত ব্যক্ত করেছেন:

১. পুরুষ ও নারীর সালাত আদায় পদ্ধতির মাঝে কোনো পার্থক্য নেই; এবং
২. রাসূলুল্লাহ (দ:) আদেশ করেছেন নারীরা যেনো পুরুষদের মতোই (উক্ত বৈঠকে) বসেন।

প্রথম বক্তব্যটি পেশ করে ডাক্তার জাকির পুরুষ ও নারীর মধ্যকার সালাত পদ্ধতির পার্থক্যের ব্যাখ্যাসম্বলিত সমস্ত আহাদীস-ই অস্বীকার করেছেন। (পক্ষান্তরে) কিছু এতদসংক্রান্ত রওয়ায়াত নিচে প্রদান করা হলো:

أخرج البخاري عن النبي عليه السلام أنه قال يا أيها الناس! ما لكم حين نابكم شيئ في الصلاة ، أخذتم في التصفيق ، إنما التصفيق للنساء. ١٧٤⁄١ رقم ٦٨٤
عن وائل بن حجر قال لي رسول الله صلى الله عليه وسلم يا وائل بن حجر! إذا صليت فاجعل يديك حذاء أذنيك والمرأة تجعل يديها حذاء ثدييها. المعجم الكبير للطبراني
عن يزيد بن أبي حبيب أن رسول الله صلى الله عليه وسلم مر على امرأتين تصليان فقال : إذا سجدتما فضما بعض اللحم إلى الأرض ، فإن المرأة ليست في ذلك كالرجل . أخرجه أبو داؤد مرسلا والبيهقي موصولا
سئل ابن عمر كيف كن النساء يصلين على عهد رسول الله صلى الله عليه وسلم قال : كن يتربعن ثم أمرن أن يتحفزن . جامع المسانيد والسنن      

সারমর্ম: এ সকল হাদীস ও বর্ণনায় পুরুষ ও নারীদের সালাত-পদ্ধতির মধ্যকার পার্থক্য (স্পষ্ট) বিবৃত হয়েছে। এগুলো ছাড়াও আরো আহাদীস বিরাজমান। এই বিষয়ে বিশদ ব্যাখ্যাসম্বলিত বইপত্র অধ্যয়ন করা যেতে পারে। ডাক্তার নায়েকের (ভ্রান্ত) দ্বিতীয় অভিমত অনুযায়ী, বুখারী শরীফে রাসূল (দ:)’এর এ মর্মে একটি আজ্ঞা বিদ্যমান যে নারীকুল পুরুষদের মতোই সালাতে বসতে পারবেন। বস্তুতঃ এটা একটা অপব্যাখ্যা ছাড়া কিছু নয়। কেননা ডাক্তার নায়েক হযরতে উম্মে দারদা (রা:)’র যে বর্ণনাটির উদ্ধৃতি দিয়েছেন, তা নিম্নরূপ:

وكانت ام الدرداء تجلس في صلاتها جلسة الرجل وكانت فقيهة . بخاري ١١٤⁄١

সারমর্ম: এতে রাসূলুল্লাহ (দ:)’এর বাণীর কোনো উল্লেখ নেই, বরং ওই মহিলা সাহাবী’র আমল/কর্ম সম্পর্কে বর্ণনা রয়েছে। বর্ণনাকারী ইমাম বুখারী (রহ:) ওই মহিলা সাহাবী’কে ‘ফক্বীহ’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি নিজ এজতেহাদ অনুসারেই এ রকম আমল করতেন। উপরন্তু, ইমাম বুখারী (রহ:) এটার উল্লেখ ‘তা’লীক্বান’-এ করেন, যা’তে এসনাদ তথা বর্ণনাকারীদের কোনো পরম্পরার উল্লেখ-ই নেই।

/- মুজতাহিদ ইমামবৃন্দের অনুসরণ হতে পলায়মান এবং ফিক্বহী সিদ্ধান্তে সংখ্যাগরিষ্ঠের পথ হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়া

ডাক্তার জাকিরের ভাষণ ও প্রভাষণ হতে প্রতীয়মান হয় যে তিনি কোনো (মুজতাহিদ) ইমামের অনুসারী নন। বস্তুতঃ তিনি গায়রে মুক্বাল্লিদ ও লা-মাযহাবী হয়ে (সমস্ত কিছুকে) জায়েয ফতোয়াবাজির ফাঁদে আটকা পড়েছেন এবং রয়েছেন নিত্যনতুন বিষয়াদির প্রেমাসক্ত। তিনি নিজে নির্দিষ্ট কোনো ইমামের অনুসরণ-ই শুধু পরিহার করেননি, বরঞ্চ সর্বসাধারণকেও তাক্বলীদ পরিত্যাগ করার শিক্ষা দিচ্ছেন। কোনো ইমামের হোক, কিংবা হোক কোনো দৃষ্টিভঙ্গির বা সিদ্ধান্তের, ডাক্তার নায়েক যেসব ফতোয়া ব্যাখ্যা করেন, তা তিনি নিজের সাথে (সর্বদা) সংযুক্ত করেন। কখনো কখনো তিনি মুজতাহিদের প্রকৃতি ধারণ করেন এবং ফতোয়াসমূহের ব্যাখ্যা করেন; অথচ ফতোয়া বর্ণনা করার সময় ওই ফতোয়া-দাতা ইমামের নাম তাঁর উল্লেখ করা উচিৎ, যাতে শ্রোতামণ্ডলী ফতোয়াটি স্রেফ ক্বুরআন ও সুন্নাহ হতে প্রমাণিত বলে ভুল বোঝাবুঝির মুখোমুখি না হন। তাছাড়া মানুষেরা অন্যান্য বিষয়েরও অনুশীলন করেন, চাই তা প্রমাণিত হোক ক্বুরআন-হাদীস থেকে বা কোনো মুজতাহিদের দৃষ্টিভঙ্গি হতে, যেগুলো প্রকৃতপক্ষে সঠিক নয়। নিচের উদাহরণ থেকে বিষয়টি বোধগম্য হবে:

(ক) বিনা অযূ’তে ক্বুরআন মজীদ স্পর্শ করা জায়েয/অনুমতিপ্রাপ্ত।

(উক্ত বইয়ের) এক স্থানে ডাক্তার নায়েক বলেন, “বিনা অযূ’তে ক্বুরআন মজীদ স্পর্শ করা জায়েয হওয়া উচিত।”

ডাক্তার জাকির নায়েকের এই বক্তব্য لاَّ يَمَسُّهُ إِلاَّ ٱلْمُطَهَّرُونَ (অযূ-সম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ ব্যতিরেকে যেনো ক্বুরআন স্পর্শ না করে; সূরা ওয়া’ক্বি’আহ, ৭৯) - আয়াতটির খেলাফ এবং মুজতাহিদীন ইমামবৃন্দের ফতোয়ারও পরিপন্থী।

(খ) জুমুআ’র নামাযের খুতবাহ আরবী ভাষায় হওয়া উচিত নয়; বরং তা স্থানীয় ভাষায় হওয়া উচিত। 

(বইয়ের) আরেক জায়গায় জুমুআ’র নামাযের খুতবাহ প্রসঙ্গে ডাক্তার জাকির নায়েক বলেন, “আমি উপলব্ধি করি আমাদের দেশে জুমুআ’র খুতবাহ স্থানীয় ও মাতৃভাষাগুলোতে প্রদানের ওপর গুরুত্বারোপ করা উচিৎ।”

অথচ বাস্তবতা হলো, রাসূলুল্লাহ (দ:)’এর যুগ হতে অদ্যাবধি, প্রজন্ম হতে প্রজন্মান্তরে, জুমুআ’র নামাযের খুতবাহ আরবীতেই দেয়া হচ্ছে। বর্তমানে ডাক্তার জাকির দাবি করছেন যে ওই খুতবাহ স্থানীয় ভাষায় দেয়া উচিৎ, যাতে মানুষেরা বুঝতে পারেন। কিন্তু এই উপযোগী কৌশল (আরবীভাষী নন এমন ব্যক্তিদের বোঝার সুবিধা) প্রিয়নবী (দ:)’র যুগেও বর্তমান ছিলো। তথাপি তিনি আরবীতেই খুতবাহ দিতেন। তা অন্য কোনো ভাষায় প্রদানের আদেশ তিনি যেমন দেননি, তেমনি পরবর্তী সময়ে ভাষান্তরেরও হুকুম তিনি জারি করেননি। অনুরূপভাবে, সাহাবায়ে কেরাম (রা:), তাবেঈন (রহ:), তাবে’ তাবেঈন (রহ:) এবং তাঁদের পরবর্তীকালের পুণ্যাত্মাবৃন্দ (রহ:) আরবভূমি হতে দূর-দূরান্তে বসতি স্থাপন করেন। তাঁরা পূর্ব ও পশ্চিমে ইসলাম ধর্ম প্রচার করেন, কিন্তু তাঁরা সদাসর্বদা-ই খুতবাহ আরবী ভাষায় দেন। অথচ দ্বীন-ইসলাম প্রচারে তাঁদের তাকিদ আজকের দিনের মানুষের তাকিদের চেয়েও বেশি ছিলো। কিছু সাহাবা (রা:) ও তাবেঈন (রহ:) বিদেশি ভাষা ভালোই জানতেন, তবু তাঁরা খুৎবাহ আরবী ভাষাতেই দিতেন। মোদ্দা কথা হলো, খুলাফায়ে রাশেদীন (রা:) ও তাবেঈন (রহ:)’এর অনুশীলিত এ রীতি ও এটার ওপর তাঁদের অটল থাকা এবং সমগ্র উম্মত কর্তৃক এর অবিরত চর্চা করাই স্পষ্ট প্রমাণ করে যে খুতবাহ আরবী ভাষায় দেয়াটা অপরিহার্য। এটা এমনই এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে ইমাম মালেক (রহ:) বলেন, জুমুআ’র নামায সঠিক হবার জন্যে খুৎবাহ আরবীতে প্রদান করা জরুরি; এমন কী যদি পুরো জামা’আত বিদেশি/অনারব এবং আরবীতে অদক্ষ জনগোষ্ঠীও হয়, তা-ও তা করা বাঞ্ছনীয়। জামাআতের মধ্যে কেউই (ইমামসহ) আরবী বলতে না জানলে তাদের জন্যে যোহরের নামায পড়া তখন বাধ্যতামূলক হবে, আর জুমুআ’র নামায বাতিল হয়ে যাবে।

ولو كان الجماعة عجما لا يعرفون العربية ، فلو كان ليس فيهم من يحسن الإتيان بالخطبة عربية لم يلزمهم جمعة . حاشية الدسوقي على الشرح الكبير ٣٧٨⁄١ نقلا عن المقالات الفقهية     

শাহ ওলীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহেলভী বলেন, “(জুমুআ’র) খুৎবাহ আরবী ভাষায় দেয়া জরুরি, কেননা এটা পূর্ব ও পশ্চিমদেশীয় সকল মুসলমানের নিরন্তর আচরিত প্রথা/রীতি ছিলো।” [মুসাফফা শরহে মুওয়াত্তা, ১৫২ পৃষ্ঠা, ফারূক্ব-দিল্লী]

(গ) তিন তালাক্বের স্থলে এক তালাক্ব-ই কার্যকর হওয়া উচিৎ।

ডাক্তার জাকির নায়েক বলেন, “তিন তালাক্বের জন্যে বহু শর্ত রয়েছে। এগুলোর সবই (পূরণ অবস্থায়) পাওয়া অসম্ভব ব্যাপার। সৌদি আরব হতে ৩০০টি ফতোয়া বিদ্যমান। অতএব, তালাক্ব একটা-ই; আধুনিক পরিস্থিতিতে তালাক্ব একটা-ই হওয়া উচিৎ।” [জাকির নায়েকের প্রভাষণ, জাকির নায়েকের বাস্তবতা হতে সংকলিত; ৩৩১ পৃষ্ঠা]

অথচ সমস্ত সাহাবায়ে কেরাম (রা:), তাবেঈন (রহ:), চারজন মুজতাহিদ ইমাম, সংখ্যাগরিষ্ঠ উম্মত এবং সৌদির বর্তমান সব নামী-দামী ‘উলামা’ এ কথা বলেছেন যে, তিন তালাক্ব তখন-ই কার্যকর হবে যখন কেউ এক বসায় তিন তালাক্ব উচ্চারণ করবে; একবার বল্লে তা কার্যকর হবে না। এই সিদ্ধান্তে নির্ভরযোগ্য কোনো আলেম-ই দ্বিমত পোষণ করেননি; ব্যতিক্রম শুধু ইবনে তাইমিয়া ও তার ছাত্র ইবনে কাইয়্যেম আল-জাওযিয়্যা। কিন্তু সমগ্র উম্মত, যাঁদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত মহান তাবেঈন (রহ:) ও চার মাযহাবের ইমাম - সর্ব-হযরত আবূ হানীফা (রহ:), মালেক (রহ:), শাফেঈ (রহ:) ও আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ:), তাঁদের সিদ্ধান্তের মোকাবেলায় ওই দু জনকে কখনোই অনুসরণ করা যায় না। এ ধরনের একটি সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে ডাক্তার নায়েক উম্মাহ’কে বিভ্রান্ত করেছেন। তিন তালাক্বের ‘৩’ উচ্চারণ দ্বারা তা বলবৎ হওয়ার সিদ্ধান্তটি স্পষ্টভাবে ক্বুরআনের আয়াত, অগণিত আহাদীস ও সাহাবায়ে কেরাম (রা:)’এর আচরিত রীতিসমর্থিত। নিম্নের কিছু আহাদীস অধ্যয়ন করুন:


وقال الليث عن نافع كان ابن عمر إذا سئل عمن طلق ثلاثا قال لو طلقت مرة أو مرتين (لكان لك الرجعة) فإن النبي صلى الله عليه وسلم أمرني بهذا (أى بالمراجعة) فإن طلقها ثلاثا حرمت حتى تنكح زوجا غيره . بخاري ٧٩٢⁄٢ و ٨٠٣⁄٢
(বিখ্যাত তাবেঈ) ইমাম নাফেঈ (রহ:) বর্ণনা করেন, একবার সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রা:)’এর কাছে জনৈক ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়, যে তিনটি তালাক্ব দিয়েছিলো। হযরত ইবনে উমর (রা:) উত্তরে বলেন, “তুমি যদি এক বা দুই তালাক্ব দিতে (তাহলে ফিরিয়ে নিতে পারতে); কেননা রাসূলুল্লাহ (দ:) আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন (ওইভাবে) ফিরিয়ে নিতে। কিন্তু তুমি তিন তালাক্ব দিয়ে থাকলে ওই নারী হারাম হয়ে যাচ্ছে, যতোক্ষণ না সে অন্য কাউকে বিয়ে করছে।” [আল-বুখারী]
عن مالك بلغه : أن رجلا جاء إلى عبد الله ابن مسعود فقال : إني طلقت امرأتي ثمانى تطليقات ، قال ابن مسعود ، فماذا قيل لك؟ قال : قيل لي : إنها قد بانت مني ، فقال ابن مسعود صدقوا . الحديث . الموطا للإمام مالك ١٩٩
ইমাম মালেক (রহ:) হতে বর্ণিত হয়েছে যে জনৈক ব্যক্তি হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা:)’এর কাছে আসেন এবং বলেন, “আমি আমার স্ত্রীকে ৮টি তালাক্ব দিয়েছি।” হযরত ইবনে মাসউদ (রা:) জিজ্ঞেস করেন, মানুষেরা তোমার সাথে কী (আচরণ) করেছে? ওই ব্যক্তি উত্তর দেন, “আমার স্ত্রীর সাথে আমার বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটানো হয়েছে।” অতঃপর হযরত ইবনে মাসউদ (রা:) বলেন, “তারা (মানুষ) সত্য বলেছে (মানে তিন তালাক্ব কার্যকর হয়েছে)।” [ইমাম মালেক, ‘মুওয়াত্তা’]
حدثنا على بن محمد بن عبيد الحافظ نا محمد بن شاذان الحوهرى نا معلى بن منصور نا شعيب بن رزيق أن عطاء الخراسانى حدثهم عن الحسن قال نا عبد الله بن عمر أنه طلق امرأته تطليقة وهى حائض ثم أراد أن يتبعها بتطليقتين أخريين عند القرأين فبلغ ذلك رشول الله صلى الله عليه وسلم فقال يا ابن عمر ما هكذا أمرك الله إنك قد أخطأت السنة . والسنة أن تستقبل الطهر فيطلق لكل قرء قال فأمرنى رسول الله صلى الله عليه وسلم فراجعتها ثم قال إذا هى طهرت فطلق عند ذلك أو أمسك فقلت يا رسول الله أرأيت لو أنى طلقتها ثلثا أكان يحل لي أن أراجعها قال لا ، كانت تبين منك وتكون معصية. سنن الدار قطنى ٤٣٨/٢ زاد المعاد ٢٥٧/٢ مصنف ابن أبي شيبة بحواله عينى شرح كنز ١٤١ سنن الدار قطنى ٣١/٤ مطبوعه قاهرة
ইমাম হাসান (রা:) বর্ণনা করেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা:) আমাদের জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর স্ত্রীকে হায়য তথা ঋতুস্রাবকালে একটি তালাক্ব দেন। অতঃপর তিনি ইচ্ছা করেন বাকি দুই তালাক্ব স্ত্রী পবিত্র হলে দেবেন। মহানবী (দ:)’কে এ ব্যাপারে জানানো হয় এবং তিনি তাঁকে বলেন, “ওহে ইবনে উমর! আল্লাহ তোমাকে এ রকম করার নির্দেশ দেননি; তুমি (হায়য অবস্থায় তোমার স্ত্রীকে তালাক্ব দিয়ে) সুন্নাহ হতে বিচ্যুত হয়েছো। সুন্নাত হলো, তুমি তার পবিত্রতার সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করবে; আর প্রতিটি পবিত্র সময়কালে একটি তালাক্ব দেয়া উচিৎ।” হযরত ইবনে উমর বলেন, এরপর রাসূলে খোদা (দ:) আমাকে (তালাক্ব) ফিরিয়ে নেয়ার আদেশ করেন। আমি তা-ই করি। অতঃপর তিনি আমায় বলেন, “তোমার স্ত্রী পবিত্র হলে দুটি হতে যে কোনো একটি পন্থা তোমাকে বেছে নিতে হবে: হয় তাকে তালাক্ব দেবে, না হয় তাকে (স্ত্রী হিসেবে) রেখে দেবে।” হযরত ইবনে উমর (রা:) বলেন, আমি হুযূর পূর নূর (দ:)’কে জিজ্ঞেস করি, এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:)! আমি যদি তিন তালাক্ব দিতাম, তাহলে কি তা ফিরিয়ে নেয়া আমার জন্যে হালাল বা বৈধ হতো? রাসূলে খোদা (দ:) উত্তর দেন, “না, সে ক্ষেত্রে তোমার স্ত্রীর সাথে তোমার বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটতো এবং তোমার ওই কাজটি (তিন তালাক্ব) একটি পাপ হতো।” [সুনানে দারু ক্বুতনী]     
অতএব, আপনারা দেখতে পেলেন যে ওপরে উল্লেখিত আহাদীসে তিন তালাক্বে তিনটির পক্ষে ফতোয়া কার্যকর হওয়ার কথা-ই বলা হয়েছে। এ রকম বহু আহাদীস বর্তমান রয়েছে, যেখানে তিন তালাক্ব তিনটিকে বুঝিয়েছে, একটিকে নয়। 

জরুরি নোট: ডাক্তার জাকির তাঁর প্রভাষণে ৩০০ জন সৌদি আলেমের রেফারেন্স টেনেছেন। এরপর তিনি নিজের মনগড়া মতামত পেশ করেছেন। কিন্তু সৌদি আরবের নামী-দামী মুফতীবৃন্দ নিজেদের গবেষণায় তিন তালাক্বকে তিনটি বল্লেও তাঁদের মধ্যে কারা কারা ডাক্তার জাকিরের ওই রেফারেন্সের আওতায় পড়েছেন, তাঁদের নাম কিন্তু ডাক্তার জাকির নায়েক উল্লেখ করেননি। সৌদি উলামাদের দেয়া তিন তালাক্বের পক্ষে ফতোয়াটি নিচে দেখুন: 

بعد الاطلاع على البحث المقدم من الأمانة العامة لهيئة كبار العلماء والمعد من قبل لحنة الدائمة للبحوث والإفتاء في موضوع "الطلاق الثلاث بلفظ واحد" وبعد دراسة المسئلة وتداول الرأي واستعراض الأقوال التى قيلت فيها ومناقشة ما على كل قول من إيراد توصل المجلس بأكثريته إلى اختيار القول بوقوع الطلاق الثلاث بلفظ ثلاثا...الخ (مجلة التحوث الإسلامية المجلد الأول ، العدد الثالث سنة ١٣٩٧    
    
-যাইনুল ইসলাম ক্বাসেমী এলাহাবাদী
সহকারী মুফতী, দারুল ইফতা 
দারুল উলূম দেওবন্দ
২০/০৩/১৪৩২ হিজরী মোতাবেক ২৪/০২/২০১১ খৃষ্টাব্দ।

[দারুল উলূম দেওবন্দের ফতোয়া’র অনুবাদ এখানে সমাপ্ত]

ডাক্তার জাকির নায়েকের বিভ্রান্তি সম্পর্কে দেওবন্দী ফতোয়াটি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ফিক্বাহ-বিষয়ক হওয়ায় তাঁর আক্বীদা-বিশ্বাসগত বিভ্রান্তি ও বিচ্যুতির ব্যাপারে আমি আরো কিছু লেখার কথা মনস্থ করেছি। তবে পাঠকমণ্ডলীকে এ ব্যাপারে অবশ্যই নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হবে। কেউ অন্তরে পক্ষপাত নিয়ে এই আলোচনায় প্রবেশ করলে সত্যে পৌঁছুতে পারবেন বলে মনে হয় না। দ্বিতীয়তঃ আমি ডাক্তারের এবং সুন্নী উলামাবৃন্দের কিছু ভিডিও ক্লিপ প্রামাণ্য দলিল হিসেবে উপস্থাপন করবো। সেগুলো ইংরেজি ও উর্দূ ভাষায় ইউটিউবে বিদ্যমান। এমতাবস্থায় কেউ সেগুলো না বুঝে পক্ষপাতিত্বমূলক মনোভাব গ্রহণ করবেন না। 

১/ - মহানবী (দ:)’র শানে গোস্তাখি    
       
ডাক্তার জাকির তাঁর একটি ভিডিও’তে আল্লাহ’র সান্নিধ্য লাভের জন্যে অসীলা/মাধ্যম তালাশের ব্যাপারে মন্তব্য করতে গিয়ে বেসাল তথা পরলোকে আল্লাহর সাথে মিলনপ্রাপ্ত আম্বিয়া (আ:) ও আউলিয়া (রহ:)’র আধ্যাত্মিক মধ্যস্থতা বা তাঁদের রূহানী সাহায্য প্রার্থনার ব্যাপারে বলেন, “শাফায়াত/সুপারিশ প্রার্থনা ও অসীলা গ্রহণ ২৫টি আয়াতে নিষিদ্ধ করা হয়েছে; স্রেফ আল্লাহ যাঁদেরকে অনুমতি দেবেন, তাঁরাই আখেরাতে সুপারিশ করতে পারবেন। আজকের তারিখে আমি ‘মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলেইহে ওয়া সাল্লামের কাছেও (সাহায্য) চাইতে পারবো না। অন্যান্য ’বাবা’দের কথা ছাড়ুন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম’কেও মান্য করা আমার জন্যে হারাম! যে ব্যক্তি ‘মারা’ গেছেন, (যদিও) তাঁকে আমি ইজ্জত করি, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম’কে আমি ভালোবাসি!” ভিডিও লিঙ্ক: https://www.youtube.com/watch?v=x4e6mJk00y8; [নাউযুবিল্লাহ মিন যালেক] উর্দূতে তিনি শেষবার বলেছেন, “মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম’কো ভি মান্না হামারে লিয়ে হারাম হ্যায়।” পরে অবশ্য সমালোচনার মুখে তিনি মাফ চেয়ে বলেছেন এটা ‘স্লিপ অফ টাং’ বা মুখ ফসকে বেরিয়ে গিয়েছিলো; তিনি নাকি বলতে চেয়েছিলেন ‘মাঙনা’ যার অর্থ চাওয়া বা যাচ্ঞা করা। আমার বক্তব্য হলো, তাঁর কথার ধারাবাহিকতায় কিন্তু বেয়াদবি-ই প্রকাশ পেয়েছে এবং এ ধরনের কথা মুখ ফসকে কেউ বলেন না। কেননা তাঁর কথার মধ্যে ‘মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম কো ভি (রাসূল-কেও মান্য করা হারাম)’ শব্দটি বলে দিচ্ছে তিনি যা বলেছিলেন আসলে তা-ই বুঝিয়েছিলেন। ওই কথার সাথে ‘মাঙনা’ (চাওয়া) শব্দটি ব্যাকরণগতভাবে মিলে না; বরঞ্চ ‘মান্না’ (মান্য করা) শব্দটি-ই মিলে। তিনি এ কথা বলতে না চাইলে তাঁকে বলতে হতো ‘মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম’সে মাঙনা হামারে লিয়ে হারাম হ্যায়’, মানে ‘মহানবী (দ:)’র কাছে চাওয়া আমার জন্যে হারাম।’ মোদ্দা কথা হলো, রাসূল (দ:)’এর প্রতি মনের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ যাদের, কেবল তারাই এই ধরনের কথা বলতে পারে। ডাক্তার জাকির বলেন ‘জো শাখস্ মার চুকা হ্যায়, হাম উনসে ইজ্জত করতে হ্যায়, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম’সে মহব্বত করতে হ্যায়...” মানে যে ব্যক্তি মারা গেছেন, আমি তাঁকে ইজ্জত করি, রাসূলুল্লাহ (দ:)’কে মহব্বত করি।” দেখুন কীভাবে ডাক্তার নায়েক কথার মারপ্যাঁচে প্রিয়নবী (দ:)’কে ‘মৃত’ বলেছেন! অথচ ইসলামী আক্বীদা-বিশ্বাস হলো তিনি হায়াতুন্নবী (দ:) তথা রূহানীভাবে জীবিত। এই বিষয়ে আমরা ক্বুরআন-হাদীস ও বিজ্ঞ সুন্নী আলেম-উলামার উদ্ধৃতি দেবো, ইনশা’আল্লাহ।

আল্লাহতা’লা তাঁর পাক কালামে ঘোষণা করেন:

وَلاَ تَقُولُواْ لِمَنْ يُقْتَلُ فِي سَبيلِ ٱللَّهِ أَمْوَاتٌ بَلْ أَحْيَاءٌ وَلَكِن لاَّ تَشْعُرُونَ

অর্থ: আর যারা আল্লাহর পথে ক্বুরবানী হয়, তাদেরকে মৃত বোলো না, বরঞ্চ তারা জীবিত; তোমরা (এ ব্যাপারে) জানো না। [আল-ক্বুরআন, ২:১৫৪]

এই আয়াতটি জ্বেহাদে শহীদানের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। তাঁদের সম্পর্কে ’মৃত’ শব্দটি উচ্চারণ করতেও নিষেধ করা হয়েছে এতে। লক্ষ্য করুন, ‘নেহি’ তথা নিষেধসূচক ক্রিয়ায় এ কথা বলা হয়েছে। আল্লাহতা’লার যাবতীয় আদেশ-নিষেধ যেভাবে জারি হয়েছে, ঠিক সেভাবেই এই আজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে। অতঃপর বলা হয়েছে ‘বরঞ্চ তারা জীবিত, তোমরা তা জানো না; তথা অবহিত না।’ এই আয়াতটি ডাক্তার জাকিরের মূর্খতাপ্রসূত বক্তব্যের মূলোৎপাটন করে এবং প্রমাণ করে যে ধর্মীয় সাধনায় জীবন উৎসর্গকারী পুণ্যাত্মাবৃন্দকে ‘মৃত’ বলে সম্বোধন করা ও তাতে বিশ্বাস করা আল্লাহতা’লার সরাসরি আদেশের বিরুদ্ধাচরণ। জেনে রাখুন, শহীদানের মর্তবা-মর্যাদা পুণ্যাত্মাদের মধ্যে তৃতীয় সারির। প্রথমে আছেন আম্বিয়া (আলাইহিমুস্ সালাম)। দ্বিতীয়তঃ সিদ্দীকীন তথা সত্যনিষ্ঠ বুযূর্গানে দ্বীন/আউলিয়া কেরাম (রহ:)। শহীদানের পরে চতুর্থ স্তরে আছেন সালেহীন তথা নেককার বান্দা-মণ্ডলী। এটা আল্ ক্বুরআনেই বর্ণিত হয়েছে। এক্ষণে প্রশ্ন জাগে, আম্বিয়াকুল শিরোমণি হযরতে রাসূলে খোদা (দ:)’কে কীভাবে ‘মৃত’ বলা যায়? স্মরণে রাখা দরকার যে, তিনি একটি জ্বেহাদ-শেষে ফিরে এসে হাদীসে এরশাদ করেন: 


رجعنا من الجهاد الأصغر إلى الجهاد الأكبر

অর্থ: আমরা ছোট জ্বেহাদ থেকে প্রত্যাবর্তন করলাম বৃহৎ জ্বেহাদের দিকে (البيهقي ইমাম বায়হাক্বী)। আধ্যাত্মিক জ্ঞানে সমৃদ্ধ হক্কানী আলেম-উলামা এই ‘বৃহৎ জ্বেহাদ’ বলতে নিজের নফস্ তথা একগুঁয়ে জীব-সত্তার বিরুদ্ধে সংগ্রামকেই বুঝেছেন। এর মোকাবেলায় ময়দানের জ্বেহাদ-ও ক্ষুদ্রকায়। আম্বিয়া (আ:) ও আউলিয়া (রহ:) নফস তথা আত্ম-দমনের এ সাধনায় সারা জীবন উৎসর্গ করেন বিধায় তাঁরাও উপরোক্ত আয়াতে করীমার উদ্দিষ্ট পুণ্যাত্মাবৃন্দ। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, ডাক্তার জাকির নায়েকের ’সালাফী’ সহযোগীরা এই হাদীসটিকে ‘যয়ীফ’ বা দুর্বল বলে প্রমাণের অপচেষ্টা করে থাকেন। কিন্তু প্রাথমিক যুগের আলেম-উলামা এটাকে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করেছেন। অতএব, পাঠককুল তাদের ধোকায় পড়বেন না! এ ব্যাপারে আমাদের শেষ কথা হলো, আল্লাহর প্রিয় পুণ্যবান বান্দাদেরকে ’মৃত’ বলে সম্বোধন করা নিষেধ। আল্লাহতা’লা তাঁর পাক কালামে ‘বরঞ্চ তারা জীবিত’ বলে তাকিদ দেয়ায় বোঝা যায় তাঁরা রূহানী/আধ্যাত্মিকভাবে জীবিত। ইমাম জালালউদ্দীন সৈয়ূতী (রহ:)’র রচিত তাফসীরে জালালাইন শরীফে ওই আয়াতে করীমার ব্যাখ্যায় একটি হাদীসের উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে, যেখানে বর্ণিত হয়েছে যে তাঁদের রূহগুলো সবুজ পাখির আকৃতিতে আছেন এবং তাঁরা বেহেশতের সর্বত্র উড়ে বেড়াচ্ছেন।

সুন্নী উলামাবৃন্দ সূরা বাক্বারা’র উল্লেখিত ১৫৪ নং আয়াতটির ব্যাখ্যায় আরো ব্যক্ত করেন যে সেটা শহীদানের জিন্দা হওয়ার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আলোকপাত করলেও ওই বৈশিষ্ট্য একমাত্র শহীদানের জন্যেই খাস তথা নির্দিষ্ট নয়। আহাদীসে পাকে আম্বিয়া (আ:) ও আউলিয়া (রহ:)’র ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য বলে সাব্যস্ত হয়েছে। এ কারণেই আল্লাহর বেসালপ্রাপ্ত প্রিয় বান্দা-মণ্ডলীর তাওয়াসসুল, তাশাফফু ও এস্তেগাসাহ করা হয়ে থাকে। এই প্রসঙ্গে ইমাম ইঊসুফ নাবহানী (রহ:) প্রণীত ‘শওয়াহিদুল হক্ব’ গ্রন্থের উদ্ধৃতি অনুযায়ী ইমাম শেহাবউদ্দীন রামলী (রহ:) বলেন, “আম্বিয়া (আ:) ও আউলিয়া (রহ:)’কে তাঁদের বেসালপ্রাপ্তির পরও অসীলা/মধ্যস্থতাকারী স্থাপন করা যায়। আম্বিয়া (আ:)’র মো’জেযাত/অলৌকিকত্ব ও আউলিয়া (রহ:)’র কারামত/অলৌকিকত্ব তাঁদের বেসালপ্রাপ্তির পর শেষ হয়ে যায় না। হাদীস শরীফ ঘোষণা করে যে আম্বিয়া (আ:) (রূহানীভাবে) জীবিত এবং তাঁরা তাঁদের মাযার-রওযায় সলাত আদায় করেন এবং হজ্জ্বও সমাপন করেন। আরো জ্ঞাত হয়েছে যে শহীদান-বৃন্দও জীবিত এবং তাঁরা যোদ্ধাদেরকে সাহায্য করে থাকেন।” ডাক্তার জাকির পীস টিভিতে বহুবার মাযারস্থ আম্বিয়া (আ:) ও আউলিয়া (রহ:) সাহায্য করতে পারেন না মর্মে দাবি করেছেন। তিনি এ কথাও বলেছেন যে মাযারস্থ পুণ্যাত্মাবৃন্দের জন্যে দুআ করতে হবে; তাঁদের সুপারিশ চাওয়া যাবে না। এটা তাঁর মুরব্বি শায়খ নজদীর বক্তব্যেরই ভাঙ্গা রেকর্ড। যেহেতু শায়খ নজদীর খণ্ডনে সুন্নী উলামা-মণ্ডলীর বইপত্র বর্তমানে প্রচুর ভাষান্তরিত হয়েছে এবং হচ্ছে, সেহেতু এখানে এর বিশদ ব্যাখ্যায় যাবো না। আমি ডাক্তার নায়েকের বক্তব্যের খণ্ডনে কেবল একটি ইংরেজি ভিডিও ক্লিপ পেশ করছি, যা’তে সিরীয় শায়খ নিনোউয়ী সাহেবসহ অন্যান্য সুন্নী উলামা প্রামাণ্য দলিল উপস্থাপন করেছেন: https://www.youtube.com/watch?v=296piV1_pgw [তরুণ সুন্নী এ্যাকটিভিস্টদের প্রতি আমার অনুরোধ, সম্ভব হলে এতে বাংলা সাব-টাইটেল যুক্ত করবেন। অনেকে তাহলে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে পারবেন। ধন্যবাদ]

২/ - অসীলা সম্পর্কে ২৫টি আয়াতের ভুয়া দাবি

আগেই বলেছি, ডাক্তার নায়েক অসীলা গ্রহণের বিপক্ষে ক্বুরআন মজীদে ন্যূনতম ২৫টি আয়াতে করীমা রয়েছে বলে দাবি করে থাকেন। তাঁর সেই দাবিটি শ্রীলঙ্কায় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিলো কিছু বছর আগে। তিনি ওই সময় সে দেশ সফর করছিলেন। সফরশেষে এয়ারপোর্টে শ্রীলঙ্কার আহলে সুন্নাত সংস্থার নেতৃবৃন্দ তাঁকে পাকড়াও করেন। সুন্নী বীর হাফেয এহসান ক্বাদেরী সাহেব তাঁকে প্রশ্ন করেন, “আপনি দাবি করে থাকেন যে আল-ক্বুরআনে অসীলা গ্রহণের বিপক্ষে ২৫টি আয়াত বিদ্যমান। আপনি কি সেগুলোর মধ্যে স্রেফ একটি আয়াতের উদ্ধৃতি দেবেন?” ডাক্তার জাকির নায়েক উত্তরে বলেন, “আখেরাতে (শেষ বিচার দিবসে) শাফাঅাত/সুপারিশের বর্ণনা কেবল দু’বার এসেছে পবিত্র ঐশীগ্রন্থে।” হাফেয এহসান ক্বাদেরী সাহেব পাল্টা আঘাত হানেন, “সেটা তো শাফাআত/সুপারিশ প্রসঙ্গ। আমরা অসীলা/মধ্যস্থতা সম্পর্কে কথা বলছি।” এমতাবস্থায় ডাক্তার জাকির নায়েক গা বাঁচাতে বলেন তাঁর সংস্থায় ই-মেইলে করে প্রশ্নটি উপস্থাপন করতে। হাফেয এহসান ক্বাদেরী সাহেব তখন বলেন তাঁরা কয়েক বছর যাবৎ এ ব্যাপারে জানতে চেয়ে ই-মেইল করেও জবাব পাননি। ডাক্তার জাকির শ্রীলঙ্কায় ধরা খেয়ে ফেরার পরে তাঁরা আবারো ই-মেইল প্রেরণ করেন, কিন্তু ডাক্তারের পক্ষ থেকে কোনো সদুত্তর অদ্যাবধি মেলেনি, মিলবেও না কোনো দিন। এর ভিডিও ক্লিপ দেখুন: https://www.youtube.com/watch?v=z4v7NEA5DTs [এই ভিডিও’র বাংলা সাব-টাইটেলও জরুরি]। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, ডাক্তার নায়েক শাফাআত ও অসীলা‘র মধ্যকার পার্থক্যও জানেন না। তিনি আবার নিজেকে দাঈ (প্রচারক) বলে দাবি করেন! তাঁর পীস টিভি’তে কখনোই সুন্নী উলামাবৃন্দের মোকাবেলা তিনি ও তাঁর পক্ষীয় মৌ-লোভীরা করেননি! তা করলে অবশ্যঅবশ্য শ্রীলঙ্কায় ধরা খাওয়ার মতো অবস্থা হতো! বস্তুতঃ পীস টিভির অনুষ্ঠান এক সাজানো নাটক ছাড়া কিছু নয়। সুন্নী মুসলিম প্রচারক ও কমপ্যারেটিভ রিলিজিয়ন বিদ্যাশাস্ত্রের মাস্টার জনাব আহমদ দীদাত যে রকম সরাসরি বাইরে অডিটরিয়ামে মিশনারী পাদ্রীদেরকে বাহাস/বিতর্কে মোকাবেলা করতেন, ঠিক সেভাবে পীস টিভি’র কোনো অনুষ্ঠানে ডাক্তারের কৃত বাহাসের সরাসরি সম্প্রচার কখনোই দেখানো হয়নি। ডাক্তারের এই কর্মকাণ্ড ম্যাচ-ফিক্সিংয়ের মতোই ব্যাপার। আমরা সন্দেহ করি, মার্কিন পাদ্রী ক্যাম্পবেলের সাথে প্রথম বাহাসটিও এই রকম সাজানো নাটক ছিলো। জাকিরভক্ত কিছু তরুণ সব সময়ই দাবি করে থাকে যে ডাক্তার নায়েক অনেক খৃষ্টানকে মুসলমান বানিয়েছেন। কতোটা ফাঁকা এই দাবি! যদি তিনি সত্যিসত্যি তাদেরকে ’মুসলমান’ ধর্মান্তরিত করেও থাকেন, তবু প্রশ্ন জাগে কোন্ আক্বীদা-বিশ্বাসে দীক্ষা দিয়েছেন? হাদীসে এসেছে মুসলমানদের ৭৩টি দল হবে; বাহাত্তরটি হবে জাহান্নামী, একটি কেবল নাজাতপ্রাপ্ত [তিরমিযী]। এমতাবস্থায় ডাক্তারের ভ্রান্ত ‘সালাফী’ আক্বীদায় দীক্ষা নেয়া নও-মুসলিম লোকগুলো আরো বিভ্রান্তি-ই ছড়াবে। এসব যৌক্তিক প্রশ্ন কি মস্তিষ্ক-ধোলাইকৃত তরুণদের মাথায় আসে কখনো? প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে অসীলা-বিষয়ে হাফেয এহসান ক্বাদেরী সাহেব উর্দূতে একটি লেকচার দিয়েছেন যার ভিডিও ক্লিপ নিচে দেয়া হলো: https://www.youtube.com/watch?v=yg5eeHu74os।  

৩/ - এয়াযীদ-বন্দনা    

সবশেষে ডাক্তার জাকির নায়েক কর্তৃক পাপিষ্ঠ এয়াযীদের গুণকীর্তন সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু বলে এই লেখাটি শেষ করবো। তিনি ২০০৭ সালের ডিসেম্বর মাসে (মহর্রম চাঁদে) এয়াযীদকে ‘রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু’ (আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হোন) অভিহিত করেন। তিনি এক সমাবেশে ভাষণ দানকালে আরো বলেন, কারবালা’র ঘটনা রাজনৈতিক (মানে ধর্মীয় কোনো সংশ্লিষ্টতা এতে নেই)। ডাক্তারের এহেন দায়িত্বহীন ও খামখেয়ালিপূর্ণ বক্তব্য ওই সময় মুসলমান সমাজে উত্তেজনা সৃষ্টি করে। তখনকার সৌদি-ভিত্তিক আরব নিউজ নিম্নের খবরটি পরিবেশন করে: http://www.arabnews.com/node/307208। এয়াযীদের কুকীর্তি সম্পর্কে সবচেয়ে বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত রয়েছে পাকিস্তানভিত্তিক ‘আহলুস্ সুন্নাহ-ডট-কম’ ওয়েবসাইটে পেশকৃত লেখাটিতে, যার বঙ্গানুবাদ নিচে দেয়া হলো। লিঙ্ক: https://kazisaifuddinhossain.blogspot.com/2017/12/blog-post.html। আশা করি পাঠকমণ্ডলী আমার প্রদত্ত লিঙ্কগুলোর সদ্ব্যবহার করে সত্য উদঘাটনে সক্ষম হবেন। আল্লাহতা’লা আমাদেরকে বাতিলপন্থীদের ধোকা থেকে সুরক্ষিত রাখুন, আমীন। বে-হুরমাতে সাইয়্যেদিল মুরসালীন সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম।

                                      =সমাপ্ত=  
              

   




  

https://scroll.in/article/811508/muslim-clerics-in-india-unite-against-superstar-televangelist-zakir-naik;  http://www.dnaindia.com/india/report-storm-over-fatwa-against-scholar-zakir-naik-1204534;  https://www.correctislamicfaith.com/drzakirnaik.htm  



মঙ্গলবার, ২৬ জুন, ২০১৮

স্পেনের মুসলিম সভ্যতা।


=============== ইমরান বিন বদরী
ইসলামের সৌন্দর্য ও কল্যাণে আকৃষ্ট হয়ে সাহারা মরুভূমি ছাড়িয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা কায়েমের যে জোয়ার ওঠে সেই ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছিলো ইউরোপের মাটিতেও৷৮ম শতাব্দীতে স্পেনে কায়েম হয় মুসলিম শাসন৷মুসলমানদের নিরলস প্রচেষ্টায় স্পেন জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও সভ্যতার ক্ষেত্রে বিস্ময়কর উন্নতি লাভ করে৷ দীর্ঘ সাতশত আশি বছর মুসলিম শাসন অব্যাহত থাকে স্পেনে৷ মুসলিম ইতিহাসের দীপ্তিময় এক বিজয় পরবর্তী করুণ এক ইতিহাসের সাক্ষী আইবেরীয় অঞ্চলের রক্তমাখা এ স্পেনের মাটি। আজো যেন সেই ক্রন্দনরত মুসলমানদের করুণ অশ্রু আকাশ থেকে নিরবে বৃষ্টি হয়ে ঝড়ে পড়ে এ মাটিতে। আরব ভূখণ্ডে আমার নূর নবী সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইসলামের সেই আলো যখন পূর্ব-পশ্চিমে প্রসারিত হতে শুরু করছে, তখন ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে উত্তরে প্রসার করতেও দেরী করেননি। তৎকালীন সময়ে ভূমধ্যসাগরের পূর্ব পাড়ের ন্যায় পশ্চিমাংশেও মুসলমানদের আওতাধীন হয়েছিল।
আজ বলছি ভূমধ্যসাগরের পশ্চিমাংশে ইউরোপে মুসলমানদের প্রবেশ এবং স্পেন বিজয়ের ঐতিহাসিক ঘটনা। সেই সময় হজরত মুসা বিন নূসাইর ( موسى بن نصير) ছিলেন উমাইয়া খলিফা আল ওয়ালিদের অধীনস্থ একজন গভর্নর ও সেনাপতি। তিনি উত্তর আফ্রিকার মুসলিম প্রদেশ শাসন করাবস্থায় মুসলিমরা হিস্পানিয়ার (যদিওবা স্প্যানিশরা H অক্ষরটি অনুচ্চারিত রেখে ইস্পানিয়া উচ্চারণ করে থাকেন) তথা ( স্পেন, পর্তুগাল, আন্ডোরা ও ফ্রান্সের অংশবিশেষ ) জয়ের সময় অভিযানে নির্দেশনা দেন। এছাড়া আরেক বীর হজরত তারিক বিন জিয়াদের (طارق بن زياد ) অক্লান্ত পরিশ্রমে বিজয় হয়েছিলো ইউরোপের ইবেরীয় অঞ্চলটি। হযরত তারিক বিন জিয়াদ ছিলেন ৭১১ থেকে ৭১৮ সাল পর্যন্ত ভিসিগোথ শাসিত হিস্পানিয়ায় মুসলিম বিজয় অভিযানের একজন সেনানায়ক। গোথ জাতীরা মূলত জার্মানি ছিলো। এই গোথরা ইহুদী প্রেমী ছিল বলে জনসম্মুখে শোনা যায়। সেই সময় ইস্পানিয়ার ভিসিগোথ রাজা ছিলেন রডারিক। তৎকালীন সময়ে ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেনা কমান্ডার হিসেবে বিবেচনা করা হয় এই তারিক বিন জিয়াদকে। উমাইয়া খলিফা প্রথম আল ওয়ালিদের আদেশে তিনি একটি বিরাট বাহিনীকে মরক্কোর উত্তর উপকূল থেকে নেতৃত্ব দিয়ে জিব্রাল্টারে তিনি তার সৈন্যসমাবেশ করেছিলেন। আজকের জিব্রাল্টার নামটি আরবি জাবাল তারিক থেকে উৎপন্ন হয়েছে যার অর্থ "তারিকের পাহাড়"। তারিক বিন জিয়াদের নামে এটির নামকরণ হয়েছিল। তখন থেকে ইবেরিয় উপদ্বীপে ‘ইসলাম’ নামে নতুন এক শান্তির ধর্মের সাথে পরিচিত হয়। উপদ্বীপ বললাম এ অঞ্চলটির তিনদিকে সাগর বেষ্টিত বলে।
বর্তমান ইউরোপের প্রবেশদ্বার জিব্রাল্টার (যেটা ইংল্যান্ড এর একটি অঞ্চল) থেকে কর্ডোবা, গ্রানাডা, মালাগা, আলমেরিয়া, সারাগোসা, টারাগোনা, বার্সেলোনা, তলেডো যা একসময়কার রাজধানী বর্তমান রাজধানী মাদ্রিদের নিকটবর্তী শহর এবং পিরেনিজ পর্বতমালা পর্যন্ত গোটা স্পেন ছিলো মুসলমানদের বিজিত। আর সে সময়ে আন্দালুসিয়ার কর্ডোবা ছিলো সবগুলির প্রাণকেন্দ্র।
৭১১ খ্রিস্টাব্দে মুসলমানরা স্পেন আক্রমণের ২ থেকে ৩ শ বছরের মধ্যেই স্পেনের প্রায় ৮০ শতাংশেরও বেশী মানুষ ছিল মুসলিম হয়েছিলো যা সংখ্যায় ৫০ লক্ষেরও বেশী। যাদের বেশীরভাগই স্পেনের স্থানীয় অধিবাসী ছিলো।
উল্লেখ্য এ বিজয়ের পিছনে তারিক বিন জিয়াদের এক ঐতিহাসিক ভাষণ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিলো। কারণ জিব্রাল্টারে পৌঁছে সমস্ত নৌকা জাহাজ আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছিল তিনি। সে সময় একজন জিজ্ঞেস করে আপনি যে সব পুড়িয়ে দিলেন আমরা ফিরবো কিভাবে? উত্তরে তারিক বলেন, আমরা ফিরে যেতে আসিনি। হয় বিজয় অন্যথায় ধ্বংস নিশ্চিত। এরপর তাদের উদ্দেশ্যে তিনি ভাষণ দেন। আসুন তেজস্বীকর সেই ভাষণটি কেমন ছিলো একবার চোখ বুলিয়ে নিই।
স্পেনকে উমাইয়া শাসকের শেষ সেনাপতি হযরত বীর মুজাহিদ তারিক বিন জিয়াদ ভূমধ্যসাগরের উপকূলে আজকের জিব্রালটারে তার ঐতিহাসিক বক্তব্যের মাধ্যমে মুসলমানদের উজ্জিবীত করে বিজয় করেছিলেন। তিনি বক্তব্যে বলেছিলেন,
❶ ''হে আমার সহ যোদ্ধারা ! আমরা ইউরোপের বুক থেকে ফিরে যাওয়ার জন্য আসিনি, হয় খ্রিস্টান রাজা রডারিক ও আধুনিক অস্ত্রে সস্ত্রে সুসজ্জিত তার এক লাখেরও অধিক সৈন্য বাহিনীর সাথে জিহাদ করে এই ভূখণ্ডে ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীন করব আর না হয় জিহাদ করতে করতে শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করে আমাদের পূর্বসূরিদের সাথে গিয়ে মিলিত হব বিকল্প কোন পথ আমাদের সামনে খোলা নেই।
❷ ''হে বাহাদুর যুবক ভাইয়েরা! এখন পিছু হটবার ও পলায়ন করার আর কোন সুযোগ অবশিষ্ট নেই পিছনে অপেক্ষমান ক্ষুধার্ত ও উত্তাল সমুদ্র, সামনে দুর্ধর্ষ শত্রু সৈন্যদল সুতরাং এখন তোমাদেরকে ধৈর্য-হিম্মত ও সহিষ্ণুতা অবলম্বন করে আহকামুল হাকিমিনের রহমতের দিকে তাকিয়ে ইসলামের বিজয় নিশানা উড্ডীন করার লক্ষে বুজদিল পরিত্যাগ করে দুশমনের সাথে মুকাবিলা করতে হবে এবং ইসলামি তাহযীব-তামাদ্দুনকে ইউরোপের বুকে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে সম্মুখ পানে এগিয়ে যেতে হবে শাহাদাতের তামান্নায়।
❸ ''হে আল্লাহর রাহের সৈনিকরা! অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস রাখ আমি তোমাদেরকে নিয়ে যাচ্ছি যে পথে সে পথের যাত্রী সর্বপ্রথম আমিই হব। লড়াইয়ের মাঝে দুশমনের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম আমার তলোয়ারই কোষ মুক্ত হবে। আমি যদি জিহাদের ময়দানে শহীদ হয়ে যাই তাহলে তোমরা ধীশক্তিসম্পন্ন বুদ্ধিমান অন্য কোন যোগ্য ব্যক্তিকে তোমাদের সিপাহসালার বানিয়ে নেবে কিন্তু আল্লাহর রাহে জীবন উৎসর্গে বিমুখ হবে না তবেই বিজয় তোমাদের পদচুম্বন করবে… ।
তার দীর্ঘ এই ভাষন দিয়ে শুরু হল স্পেনের বুকে ইসলামী শাসনের সোনালি অধ্যায়।

ইতিপূর্বে আলোচনা করেছিলাম স্পেনে মুসলিমদের বিজয়ের গৌরবগাথাপূর্ণ ইতিহাস। আজ সেই সোনালী দিনের অন্ধকার কেন নেমে এসেছিল তাই আলোচনার বিষয়।
সেই গৌরবগাথা স্পেনের মুসলমানেরা পরবর্তীতে ইসলামের আদর্শ থেকে বিমূখ হয়ে পার্থিব লালসায় লিপ্ত হয়ে ভোগ-বিলাসে মত্ত হয়ে ভুলে যায় কুরআন সুন্নাহর প্রকৃত শিক্ষা । এদিকে স্পেনের ভিতরেও উচ্চাভিলাষী মুসলমানদের মাঝে পচন ধরার প্রাথমিক সূত্রগুলো তৈরি হচ্ছিল ধীরগতিতে । ধার্মিকতার অবক্ষয়ে সমাজের নেতৃস্থানীয় পর্যায় থেকে সামাজিক ও রাজনৈতিক বোধ এবং সচেতনতাবোধও ধীরে ধীরে হারাতে বসেছিলো। বিভাজনের কালোথাবা তাদের চারিদিকে ঘিরে আসতে শুরু করেছিলো । অন্যদিকে তৎকালীন ইউরোপের আকাশে স্পেনে মুসলমানদের বিরুদ্ধে আক্রোশ দিনদিন ফুঁসে উঠে ভয়াবহতায়। স্পেনের মুসলমানদের সামাজিক সংহতি ভঙ্গুরে খ্রিস্টান গোয়েন্দারা ইসলাম ধর্ম শিখে আলেমের লেবাস ধরে বিভিন্ন মসজিদে ইমামতিও নাকি করেছে । মূলত তাদের কাজ ছিলো স্পেনের মুসলমান সমাজ জীবনকে অস্থিতিশীল করে তোলা।
১৪৬৯ সালে রাজা ফার্ডিনান্ড ও ইসাবেলা স্পেনে মুসলিম সভ্যতার অস্তিত্বকে গুঁড়িয়ে দেয়ার জন্য পরস্পর বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৪৮৩ সালে রাজা ফার্ডিনান্ড ও ইসাবেলা একটি শক্তিশালী সৈন্যবাহিনী পাঠান মালাগা অঞ্চলে । যাদের প্রতি হুকুম ছিল শস্যক্ষেত্র জ্বালিয়ে দেয়া, সমৃদ্ধিশালী গ্রামগুলি ধ্বংস করে দেয়া এবং গবাদিপশুগুলিকে তুলে নিয়ে যাওয়া ইত্যাদি। মোটামুটি ঐ অঞ্চলের মানুষদেরকে অতিষ্ঠ করে তোলাই ছিলো উদ্দেশ্য । এভাবে স্পেনের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মুসলমানদেরকে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করে রাখেন।
যে স্পেন মুসলিম শাসনের আলোতে প্রায় ৭ শত বছরের অধিক সময় আলোকিত হয়েছিলো সেই স্পেনকে মুসলিম মুক্ত করার উদ্দশ্যে ১৪৯১ সালের দিকে গ্রানাডার মুসলমানদের সাথে আত্মসমর্পণের একটি শর্ত চুক্তিনামা নির্ধারিত হলো। শর্তে ধোঁকাবাজরা বলেছিলো:
১) ছোট-বড় সব মুসলমানের জীবনের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা দেয়া হবে।
২) তাদের মুক্তভাবে ধর্ম-কর্ম করতে দেয়া হবে।
৩) মুসলমানদের মসজিদ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলা অক্ষত থাকবে।
৪) আচার-ব্যবহার, রাজনীতি, ভাষা ও পোশাক-পরিচ্ছদ সবি অব্যাহত থাকবে।
৫) তাদের নিজেদের আইনকানুন অনুযায়ী তাদের প্রশাসকরা তাদের শাসন করবেন ..ইত্যাদি।
কিন্তু তাদের সূক্ষ পরিকল্পনা বুঝতে পেরে আত্মসমর্পণের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুললেন তখনকার সাচ্চা মুসলিম মুসা বিন আকিল। তিনি অসহায় গ্রানাডীয়দের বললেন, হে গ্রানাডাবাসী! এটা কোন চুক্তি নয়, এটা একটা সূক্ষ প্রতারণা। মুসলমান জাতীকে ধ্বংস করার পায়তারা করা হচ্ছে। আমাদের ভুমি আমাদের সমাজ আমাদের রাষ্ট্র আমাদের কেন চুক্তিনামা করতে হবে ! এ চুক্তিনামা আমাদের অঙ্গারে পরিণত করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। প্রজ্জলিত আগুনের জ্বালানি কাঠ হতে তোমরা এ অঙ্গীকারনামা ভুলেও করতে যেয়েওনা। সুতরাং এসো প্রতিরোধ ! আর প্রতিরোধ গড়ে তুলি এই জালিমদের বিরুদ্ধে।
কিন্তু না, কোণঠাসা হয়ে আসা মুসলমানদের গ্রানাডার দিন প্রায় শেষপর্যায়ে এসে উপস্থিত হয়েছিল। ১৪৯২ সালে অপারগতায় সমৃদ্ধিশীল এই মুসলিম গ্রানাডাবাসী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্যহলো।
পরবর্তীতে চক্রান্তের এই চুক্তি গ্রানাডীয় মুসলমানদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ডাইনি রানী ইসাবেলা ও ফার্ডিনান্ড তাদের মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করার নিমিত্তে একেরপর এক তাদের মধ্যে করা চুক্তি লঙ্ঘনের প্রতিযোগিতা শুরু করেদিলো। চতুর্দিকে শুরু হলো মুসলিম নিপীড়ন যা পরবর্তীতে ভয়াবহ রূপধারণ করেছিলো। গনহারে মানবহত্যা আর সীমাহীন বর্বরতার নির্মম নির্যাতনের শিকার হতে থাকলেন অসংখ্য মুসলমান। এমন পরিস্থিতি এসে দাঁড়ালো যে স্পেনের প্রতিটা গ্রাম যেন মুসলিম হত্যার মহড়া চলছে। প্রাণরক্ষার্থে যেসব মানুষ পর্বতগুহায় আশ্রয় নিয়েছিল তাদেরও সেখানে শেষরক্ষা হয়নি।
তৎকালীন রাজা ফার্ডিনান্ড তার হীন উদ্দেশ্য বাস্তবায়নকল্পে ঘোষণা করলেন যে, যেসব মুসলমান গ্রানাডার মসজিদগুলোতে আশ্রয় নেবে, তারা সেখানে নিরাপদ থাকবে এবং তাদের প্রতি কোন নির্যাতন নিপীড়ন করা হবেনা। এই মিথ্যেবাদীর এমন ঘোষণা শুনে অগত্যা লক্ষ লক্ষ মুসলমান আশ্রয় নিলেন মসজিদগুলোতে। আফসোস! সেদিন বোকা মুসলিম জাতীকে হিংস্র ফার্ডিনান্ডের লোকেরা সবগুলো মসজিদে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে মেরেছিলো। দিনটি ছিলো ১৪৯২ সালের ১লা এপ্রিল। মানবহত্যার এই মহা উৎসব নাকি তিনদিন তিনরাত চলেছিল।
এই নির্মম গণহত্যার পরও যেসব মুসলমান ভাগ্যক্রমে আন্দালুসিয়ায় রয়ে গিয়েছিলেন, বিশেষ করে নারী এবং অসহায় শিশুদের সহায়-সম্বলহীন অবস্থায় সমুদ্রপথে নির্বাসিত করেন। সেদিন ভূমধ্যসাগরের পশ্চিমাংশে বাচার চেষ্টায় নিরপরাধ মানবজাতির কান্নাকাটিতে আকাশ ভারী হয়ে গিয়েছিল। আজো সেইসব মানুষের বেদনাঅশ্রু আন্দালুসিয়ার জমিনে বৃষ্টির পানি হয়ে জড়ে পড়ে। সাগরে নির্বাসিত মানুষের সংখ্যাও ছিলো নাকি অনেক। ইতিহাসের করুণ লিখনিতে যানা যায় , তাদের মধ্যে খুব অল্পসংখ্যক লোকই জীবিত ছিলেন। বিপুলসংখ্যক মানুষ সমুদ্রের গহিন অতলে হারিয়ে যায়। এভাবেই মুসলমানরা ইউরোপের পশ্চিমাংশে স্পেনের আন্দালুসিয়াকে রাজধানী করে আধুনিক স্পেনের জন্ম দিয়েও আজ মুসলিম ইতিহাসের দুঃখ হয়ে বেঁচে আছে। আন্দালুসিয়ার নির্মম এ ট্র্যাজেডির কথা লিখতে খুবী কষ্টবোধ অনুভব করি। তবুও যে একজন মুসলিম হিসেবে মুসলমানদের এই করুণ পরিণতির সঙ্গে পরিচিত হওয়া চাই। আজকের এই স্পেন আজো মুসলিম উম্মাহর কাছে শোকের স্মারক হয়ে রয়েছেন। সে সময়কার মুসলমানরা যদি ইসলামের প্রকৃত পাবন্দী হয়ে নিজেরা আন্ত‍ঃকোন্দলে না জড়িয়ে দূরদর্শিতার পরিচয় দিতো আজকের এ ইউরোপ হয়তো এখনকার মুসলমানদের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হতো।
আফসোস! সেসময় মর্মান্তিকভাবে মসজিদে জীবন্ত দগ্ধ আর ভূমধ্যসাগরে নিক্ষেপিত নির্মমতার স্বীকার হয়ে অগনিত নিরহ মুসলিম হত্যার মধ্যদিয়ে সমাপ্তি হয়েছিলো স্পেনে মুসলমানদের স্বর্ণালী যুগের ইতিহাস। 

                               *সমাপ্ত*


ছবি পরিচিতি: মুসলমানদের হারানো ঐতিহ্য স্পেনের আন্দালুসিয়া প্রদেশের কর্ডোবার সেই ঐতিহ্যবাহী মসজিদ। যাকে স্প্যানিশ ভাষায় Mezquita Catedral de Cordoba বলা হয়। অর্থাৎ এটি এখন মসজিদ এবং গির্জা উভয়টি। যদিওবা বর্তমানে এখানে কোন উপাসনালয় নেই।
সেখানকার বেশ কয়েকজনের সাথে আলাপকরে যতটুকু জেনেছি যে স্পেনে মুসলিম সভ্যতার পূর্বেকার সময়ে বর্তমান এই মসজিদের পাশে ছোট একটা গির্জা ছিলো। মুসলিম শাসনামলে ঐ গির্জার পাশেই বিশালায়তনে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। যেটি স্পেনে প্রায় ৭৫০ বছরের মুসলিম শাসনামলে মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিলো। পরিতাপের বিষয় তৎকালীন মুসলমানদের দূরদর্শীতার ঘাটতি থাকায় মুসলমানদের স্পেনের মাটিতে করুণ পরাজয় হয়েছিলো।
সেই পরাজয়ের পর থেকে এই মসজিদে আর নামাজিরা সালাত আদায় করতে পারেনি। মসজিদকে তাদের উপাসনালয় "কাতেদ্রাল" এ রূপান্তরিত করা হয়। তবে বর্তমানে এখানে মুসলিম খ্রিষ্টান কেউ উপাসনালয় হিসেবে ব্যবহার করতে পারেননা। এটি এখন সম্পূর্ণ টুরিস্ট স্পট। প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে এখানে প্রবেশ করছেন।












মঙ্গলবার, ১৯ জুন, ২০১৮

আমীরে মু’আবিয়া (রা:) কেন তাঁর ছেলে এয়াযীদকে খলীফা মনোনীত করেন?


মূল: ইসলাম প্রশ্ন ও উত্তর ওয়েবসাইট
অনুবাদ: কাজী সাইফুদ্দীন হোসেন
আরবী ও অনলাইন সেট-আপ: মুহাম্মদ রুবাইয়াৎ বিন মূসা
[Bengali translation of Islam Question and Answer website’s religious verdict - 186682: Why did Mu‘awiyah (may Allah be pleased with him) appoint his son Yazeed as his successor to the caliphate?]
প্রশ্ন: আমাদের জানা মোতাবেক, ইমাম হাসান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক খেলাফতের শাসনভার আমীরে মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বরাবরে হস্তান্তরের পরে তাঁরা দু জনই একমত হন যে আমীরে মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর বেসাল শরীফ হলে খলীফা নির্বাচিত হবেন শূরা (পরামর্শক সভা)’র সিদ্ধান্ত অনুযায়ী। তাহলে কেন আমীরে মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর বেসালের পরে এয়াযীদ ক্ষমতা কুক্ষিগত করে? আরেক কথায়, এটা কি ওই সাহাবা দু জন যে সিদ্ধান্তের ওপর একমত হয়েছিলেন, তার স্পষ্ট লঙ্ঘন নয়? নাকি আমীরে মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর এই মর্মে আশঙ্কা ছিলো যে মুসলমানদের মধ্যে আবারো অশান্তি দেখা দেবে, যার কারণে তিনি নিজ পুত্র এয়াযীদকে উত্তরাধিকারীস্বরূপ খলীফা মনোনীত করেছিলেন?
উত্তর: আল্লাহরই প্রতি সমস্ত প্রশংসা।
প্রথমতঃ মহান এই সাহাবী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু একজন কাতেবে ওহী (ওহী লেখক); তিনি তাঁর ধৈর্য, জ্ঞান ও গুণের জন্যে সুপরিচিত ছিলেন, আর তাঁর অর্জন ও উন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছিলো প্রচুর। তাঁর প্রতি কলঙ্কলেপন বা কুৎসা রটনা করার কোনো অনুমতি-ই নেই। তিনি ছিলেন মুসলমান নেতৃবৃন্দের মধ্যে এমনই একজন, যিনি আপন সাধ্যানুযায়ী ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে শাসন করতেন। তাঁর সময়কার অশান্তি ও অন্তর্দ্বন্দ্ব হতে যা যা ঘটেছিলো, মিথ্যের ওপর ভিত্তি করে সে সম্পর্কে আলোচনা করা আমাদের উচিত হবে না। আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সকল সাহাবী-ই রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম সৎ ও ধার্মিক ছিলেন; তাঁদের «إِذَا اجْتَهَدَ الْحَاكِمُ فَأَخْطَأَ، كَانَ لَهُ أَجْرٌ، وَإِذَا اجْتَهَدَ فَأَصَابَ، كَانَ لَهُ أَجْرَانِ» যে কেউ এজতেহাদ তথা গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্ত দ্বারা সমস্যা সমাধান করতে চেষ্টা করে সফল হলে দুটি সওয়াব পাবেন, আর এজতেহাদ প্রয়োগে ভুল করলে সওয়াব পাবেন একটি।[১] [অনুগ্রহ করে আমাদের ১৪০৯৮৪ নং ফতোয়াটি দেখুন]
দ্বিতীয়তঃ হযরতে ইমামে আলী কাররামা আল্লাহু ওয়াজহুল করীম যখন বেসালপ্রাপ্ত হন এবং তাঁর পুত্র ইমাম হাসান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু তাঁর জানাযা পড়েন, তখন মানুষেরা তাঁর প্রতি আনুগত্যের শপথ নেন, আর তাঁরা সিরীয়াবাসীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করার জন্যে তাঁর কাছে জোরালো আবেদন জানান।
ثُمَّ رَكِبَ الْحَسَنُ فِي جُنُودِ الْعِرَاقِ عَنْ غَيْرِ إِرَادَةٍ مِنْهُ، وَرَكِبَ مُعَاوِيَةُ فِي أَهْلِ الشَّامِ. فلمَّا تَوَاجَهَ الْجَيْشَانِ وَتَقَابَلَ الْفَرِيقَانِ سَعَى النَّاسُ بَيْنَهُمَا فِي الصُّلْحِ فَانْتَهَى الْحَالُ إِلَى أَنْ خَلَعَ الْحَسَنُ نَفْسَهُ مِنَ الْخِلَافَةِ وَسَلَّمَ الْمُلْكَ إِلَى مُعَاوِيَةَ بْنِ أَبِي سُفْيَانَ
কিন্তু কারো বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার কোনো ইচ্ছা তাঁর না থাকলেও মানুষের পীড়াপীড়িতে তিনি এ কাজে বাধ্য হন, যার দরুন ইতিপূর্বে দেখা যায়নি এমন বিশাল এক সেনাবাহিনী গঠিত হয়। ইমাম হাসান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ওই সৈন্যবাহিনীসহ সিরিয়া অভিমুখে অগ্রসর হন। ইত্যবসরে তাঁর বাহিনীর ভেতরে মতপার্থক্য ও বিভেদ দেখা দেয়। ইমাম হাসান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু যখন বুঝতে পারেন তাঁর নেতৃত্বে সৈন্যবাহিনীটি একতাবদ্ধ নয়, তখন তিনি তাদের প্রতি বিরক্ত হন এবং আমীরে মু’আবিয়া ইবনে আবী সুফইয়ানের রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর কাছে শান্তিচুক্তির শর্ত দিয়ে পত্র লেখেন।[২]
আমীরে মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু তাঁর কাছে (দূত হিসেবে) আবদুল্লাহ ইবনে আমির ও আবদুর রাহমান ইবনে সামুরাহ’কে প্রেরণ করেন এবং এর ফলে একটি শান্তিচুক্তি বলবৎ হয়।
وَذَلِكَ سَنَةَ أَرْبَعِينَ، فَبَايَعَهُ الْأُمَرَاءُ مِنَ الْجَيْشَيْنِ، واستقلَّ بِأَعْبَاءِ الأمَّة، فسمِّي ذَلِكَ الْعَامُ عَامَ الْجَمَاعَةِ،
এই ঘটনা ৪০ হিজরী সালের, যাকে ‘আম আল-জামা’আহ’ (ঐক্যর বছর) বলা হয়; কেননা মানুষেরা হযরতে আমীরে মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু’র নেতৃত্বে একতাবদ্ধ হন।[৩]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই ঘটনা সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন এবং (একটি হাদীসে) ইমাম হাসান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু’র ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন এই কারণে যে তিনি নেতৃত্ব ছেড়ে দিয়েছিলেন এবং কখনোই তা আর কামনা করেননি; যার দরুন মুসলমানদের রক্তক্ষয় বন্ধ হয় এবং তিনিও আল্লাহর রেযামন্দি হাসিলে সমর্পিত হন। অতএব, ইমাম হাসান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু খেলাফত ত্যাগ করেন এবং এর কর্তৃত্বভার আমীরে মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু’র কাছে অর্পণ করেন, যাতে মুসলমান জনগণ একজন নেতার অধীনে ঐক্যবদ্ধ হতে পারেন।
ইমাম বুখারী রহমতুল্লাহি আলাইহি বর্ণনা (সাইটের ফতোয়া নং ২৭০৪ দ্রষ্টব্য) করেন যে আবূ বাকরাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
وَلَقَدْ سَمِعْتُ أَبَا بَكْرَةَ يَقُولُ: رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى المِنْبَرِ وَالحَسَنُ بْنُ عَلِيٍّ إِلَى جَنْبِهِ، وَهُوَ يُقْبِلُ عَلَى النَّاسِ مَرَّةً، وَعَلَيْهِ أُخْرَى وَيَقُولُ: «إِنَّ ابْنِي هَذَا سَيِّدٌ وَلَعَلَّ اللَّهَ أَنْ يُصْلِحَ بِهِ بَيْنَ فِئَتَيْنِ عَظِيمَتَيْنِ مِنَ المُسْلِمِينَ»
আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে মিম্বরে দেখতে পেলাম, তাঁর পাশে ছিলেন ইমাম হাসান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু; আর তিনি কখনো মানুেষের দিকে, আবার কখনো ইমাম হাসান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু’র দিকে মুখ মোবারক ফেরাচ্ছিলেন; অতঃপর তিনি বলেন, “আমার এই পুত্র সাইয়্যেদ (সর্দার) হবে, আর হয়তো আল্লাহ পাক তারই মাধ্যমে দুটি বিশাল মুসলমান সেনাবাহিনীকে একতাবদ্ধ করবেন।[৪]
وَلَمَّا تَسَلَّمَ مُعَاوِيَةُ الْبِلَادَ وَدَخْلَ الْكُوفَةَ وَخَطْبَ بِهَا وَاجْتَمَعَتْ عَلَيْهِ الْكَلِمَةُ فِي سَائِرِ الْأَقَالِيمِ وَالْآفَاقِ، وَحَصَلَ عَلَى بَيْعَةِ مُعَاوِيَةَ عامئذٍ الْإِجْمَاعُ وَالِاتِّفَاقُ،
আমীরে মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু খলীফা হয়ে কুফাহ নগরীতে প্রবেশ করেন এবং সেখানে এক ভাষণ দেন, যার ফলশ্রুতিতে সারা আরব জাহানের মানুষ তাঁর নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হন।
تَرَحَّلَ الْحَسَنُ بْنُ عَلِيٍّ وَمَعَهُ أَخُوهُ الْحُسَيْنُ وَبَقِيَّةُ إِخْوَتِهِمْ وَابْنُ عَمِّهِمْ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ جَعْفَرٍ مِنْ أَرْضِ الْعِرَاقِ إِلَى أَرْضِ الْمَدِينَةِ النَّبَوِيَّةِ
ইমাম হাসান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ও তাঁর ভাই ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এবং তাঁদের অন্যান্য ভাই ও চাচাতো ভাই আবদুল্লাহ ইবনে জা’ফর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ইরাক্ব হতে সফর করে মদীনা মোনাওয়ারায় যান।[৫]
জীবন সায়াহ্নে এসে আমীরে মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু নিজ পুত্র এয়াযীদকে ডেকে পাঠান এবং তাকে চূড়ান্ত নির্দেশনা দেন, আর মানুষেরা এয়াযীদের প্রতি আনুগত্যের শপথ নেন। তাঁদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন সর্ব-হযরত ইবনে উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ও ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু’র মতো অনেক সাহাবা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু; তবে ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ও আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়র রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এয়াযীদের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করতে রাজি হননি। [৬]
ইবনে বাত্তাল রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন,
فسلم الحسن الأمر إلى معاوية وصالحه وبايعه على السمع والطاعة على إقامة كتاب الله وسنة نبيه، ثم دخلا الكوفة فأخذ معاوية البيعة لنفسه على أهل العراقين، فكانت تلك السنة سنة الجماعة لاجتماع الناس واتفاقهم وانقطاع الحرب وبايع معاوية كلُ من كان معتزلا عنه، وبايعه سعد بن أبى وقاص وعبد الله بن عمر ومحمد بن مسلمة، وتباشر الناس بذلك، وأجاز معاوية الحسن بن على بثلاثمائة ألف وألف ثوب وثلاثين عبدا ومائة جمل، وانصرف الحسن بن على إلى المدينة وولى معاوية الكوفة المغيرة بن شعبة، وولى البصرة عبد الله بن عامر، وانصرف إلى دمشق واتخذها دار مملكته.
ইমাম হাসান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু আমীরে মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু’র কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন এবং তাঁর সাথে শান্তি স্থাপন করেন ও তাঁর আনুগত্য স্বীকার করেন এই প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে যে তিনি আল্লাহ’র কিতাব/ঐশীগ্রন্থ ও মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাত অনুসারে শাসন করবেন। অতঃপর তাঁরা কুফাহ নগরীতে প্রবেশ করেন এবং ইরাক্ববাসী আমীরে মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু’র প্রতি আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করেন। সেটা ছিলো ঐক্যের বছর, যখন মানুষেরা একতাবদ্ধ হন এবং একটি সমঝোতায় পৌঁছেন, আর যুদ্ধ-ও বন্ধ হয়। যে সকল সাহাবা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম এই গৃহযুদ্ধ হতে বিরত ছিলেন, তাঁরাও এসে আমীরে মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু’র হাতে বাইয়াত হন। সর্ব-হযরত সা’আদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু, আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ও মুহাম্মদ ইবনে মুসলিমাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু তাঁর প্রতি আনুগত্যের শপথ নেন, আর সর্বসাধারণ এ ব্যাপারে খুব খুশি হন। হযরত মু’আবিয়াহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ইমাম হাসান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু’কে তিন লক্ষ দিনার, এক সহস্র বস্ত্র, ত্রিশ জন গোলাম ও এক শটি উট উপহার দেন, আর ইমাম হাসান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু মদীনা মোনাওয়ারার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। আমীরে মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু কুফাহ’র প্রাদেশিক শাসনকর্তা হিসেবে আল-মুগীরাহ ইবনে শু’বাহ’কে এবং আবদুল্লাহ ইবনে আমিরকে বসরা নগরীর শাসনকর্তা হিসেবে নিয়োগ করেন। অতঃপর তাঁর শাসনাধীন রাষ্ট্রের জন্যে গৃহীত রাজধানী দামেশ্কের উদ্দেশ্যে তিনি রওয়ানা হন।[৭]
তৃতীয়তঃ উলামাবৃন্দ বিবৃত করেন যে ইমাম হাসান ইবনে আলী কাররামা আল্লাহু ওয়াজহুল করীম শর্তারোপ করেছিলেন এই মর্মে যে আমীরে মু’আবিয়াহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু কাউকে উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত বা নিয়োগ করতে পারবেন না; বরঞ্চ তা মুসলমানদের পরামর্শক্রমে নির্ধারিত হবে।
ইমাম ইবনে হাজর হায়তামী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন,
وَلما تصالحا كتب بِهِ الْحسن كتابا لمعاوية صورته
بِسم الله الرَّحْمَن الرَّحِيم هَذَا مَا صَالح عَلَيْهِ الْحسن بن عَليّ رَضِي الله عَنْهُمَا مُعَاوِيَة بن أبي سُفْيَان
صَالحه على أَن يسلم إِلَيْهِ ولَايَة الْمُسلمين على أَن يعْمل فيهم بِكِتَاب الله تَعَالَى وَسنة رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم وسيرة الْخُلَفَاء الرَّاشِدين المهديين وَلَيْسَ لمعاوية بن أبي سُفْيَان أَن يعْهَد إِلَى أحد من بعده عهدا بل يكون الْأَمر من بعده شُورَى بَين الْمُسلمين وعَلى أَن النَّاس آمنون حَيْثُ كَانُوا من أَرض الله تَعَالَى فِي شامهم وعراقهم وحجازهم ويمنهم وعَلى أَن أَصْحَاب عَليّ وشيعته آمنون على أنفسهم وَأَمْوَالهمْ وَنِسَائِهِمْ وَأَوْلَادهمْ حَيْثُ كَانُوا وعَلى مُعَاوِيَة بن ابي سُفْيَان بذلك عهد الله وميثاقه وَأَن لَا يَبْتَغِي لِلْحسنِ بن عَليّ وَلَا لِأَخِيهِ الْحُسَيْن وَلَا لأحد من أهل بَيت رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم غائلة سرا وَلَا جَهرا وَلَا يخيف أحدا مِنْهُم فِي أفق من الْآفَاق أشهد عَلَيْهِ فلَان وَفُلَان بن فلَان وَكفى بِاللَّه شَهِيدا وَلما انبرم الصُّلْح التمس مُعَاوِيَة من الْحسن أَن يتَكَلَّم بِجمع من النَّاس وَيُعلمهُم أَنه قد بَايع مُعَاوِيَة وَسلم إِلَيْهِ الْأَمر فَأَجَابَهُ إِلَى ذَلِك.
দু জনের মাঝে শান্তি স্থাপিত হলে ইমাম হাসান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু আমীরে মু’আবিয়াহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু’কে (উদ্দেশ্য করে) একটি দলিলে লেখেন: পরম করুণাময় ও অতিশয় দয়ালু আল্লাহর নামে (আরম্ভ)। এই হলো দলিল যার ব্যাপারে ইমাম হাসান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ও আমীরে মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু একমত। তিনি উনার সাথে একটি শান্তিচুক্তি করেছেন এই মর্মে যে ইমাম হাসান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু আমীরে মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু’র কাছে মুসলমানদেরকে শাসন করার ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন এই শর্তে যে তিনি আল্লাহ’র ক্বুরআন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাহ ও সঠিক পথপ্রাপ্ত খলীফাদের রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমের পদাঙ্ক-অনুসরণে রাষ্ট্র শাসন করবেন। উত্তরাধিকারী নির্বাচনে মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু’র কোনো হক্ক নেই; বরঞ্চ এই বিষয়টি মুসলমানদের পারস্পরিক আলাপ-আলোচনা ও শূরা (পরামর্শ)’র ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। [এই চুক্তির আওতায় এ-ও] নিশ্চিত করতে হবে যে সর্বসাধারণ সিরিয়া, ইরাক্ব, হেজায বা ইয়েমেনসহ আল্লাহর দুনিয়ার যেখানেই বসবাস করুন না কেন, তাঁদের জান ও মাল নিরাপদ থাকবে। আরো শর্ত থাকবে যে সাহাবা-এ-কেরাম রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ও ইমামে আলী কাররামা আল্লাহু ওয়াজহুল করীম-এর খানদান নিরাপদ থাকবেন, আর তাঁদের জান, মাল, নারী ও শিশু যেখানেই থাকুন না কেন, সবাই নিরাপদ থাকবেন। মু’আবিয়াহ ইবনে আবী সুফইয়ান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু আল্লাহর সামনে এই মর্মে তাঁর দৃপ্ত অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন; আর তিনি ইমাম হাসান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বা তাঁর ভাই ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু কিংবা আহলে বায়তে নববী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি গোপনে বা প্রকাশ্যে কোনো প্রকার আক্রোশ পোষণ করেন না; আর তাঁরা যেখানেই থাকুন, তিনি তাঁদেরকে হয়রানিও করবেন না।
এই বিষয়টির সাক্ষী অমুক-অমুক, তাদের পিতা অমুক-অমুক, আর আল্লাহতা’লাই সাক্ষী হিসেবে যথেষ্ট।
শান্তিচুক্তিটি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরে আমীরে মু’আবিয়াহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ইমাম হাসান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু’কে মানুষের সমাবেশে তাঁর এই ক্ষমতা হস্তান্তর ও আনুগত্যের শপথের কথা জানিয়ে ভাষণ দিতে অনুরোধ করেন এবং তিনি তাতে সম্মত হন।[৮]
এছাড়াও ড: আল-সাল্লাবী রচিত ‘আল-হাসান ইবনে আলী কাররামা আল্লাহু ওয়াজহু’ পুস্তকটি (২৫৩ পৃষ্ঠা) দেখুন। [বইটির ইংরেজি সংস্করণের শিরোনাম ‘Al-Hasan ibn Ali ibn Abi Talib:His Life and Times’]
চতুর্থতঃ আমীরে মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু যখন মানুষের মধ্যে মতভেদ, বিভক্তি ও অশান্তির ব্যাপ্তি দেখতে পান এবং তাদের অন্তর্দ্বন্দ্ব-প্রবণতার ব্যাপ্তিও অবলোকন করেন, তখন তিনি তাঁর বেসালের পরে তাদের বিভক্তি আরো ব্যাপকতর হবার আশঙ্কা করেন; তিনি আরো আশঙ্কা করেন যে এই মতপার্থক্য ও অশান্তি আরো বৃদ্ধি পাবে। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নেন এর সেরা সমাধান হলো তাঁর (বেসালের) পরে নিজের ছেলে এয়াযীদের প্রতি মানুষের আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করানো। তিনি এতদুদ্দেশ্যে জ্যেষ্ঠ সাহাবাবৃন্দ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম, জননেতৃবৃন্দ ও এলাকাগুলোর গভর্নরদের সাথে পরামর্শ করেন। এমতাবস্থায় তাঁরা সবাই এতে সম্মতি দেন। প্রতিনিধিদলগুলো এসে এয়াযীদের প্রতি আনুগত্যের শপথ নেয়, বহু সাহাবা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম-ও ওই শপথ নেন, যার দরুন হাফেয আবদুল গনী আল-মাক্বদিসী বলেন:
خلافته صحيحة ، بايعه ستون من أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم منهم ابن عمر
তার (এয়াযীদের) খেলাফত বৈধ ছিলো; রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবাবৃন্দের রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-সহ ৬০ জন সাহাবা (রা:) এয়াযীদের প্রতি আনুগত্যের শপথ নেন।
সহীহ বুখারী শরীফে (ওয়েবসাইটের ৭১১১ নং ফতোয়ায়) এ কথা প্রমাণিত যে হযরত ইবনে উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এয়াযীদের প্রতি আনুগত্যের শপথ নিয়েছিলেন। না’ফী রহমতুল্লাহি আলাইহি হতে বর্ণিত,
لَمَّا خَلَعَ أَهْلُ الْمَدِينَةِ يَزِيدَ بْنَ مُعَاوِيَةَ جَمَعَ ابْنُ عُمَرَ حَشَمَهُ وَوَلَدَهُ فَقَالَ : إِنِّي سَمِعْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ : ( يُنْصَبُ لِكُلِّ غَادِرٍ لِوَاءٌ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ) وَإِنَّا قَدْ بَايَعْنَا هَذَا الرَّجُلَ عَلَى بَيْعِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ ، وَإِنِّي لَا أَعْلَمُ غَدْرًا أَعْظَمَ مِنْ أَنْ يُبَايَعَ رَجُلٌ عَلَى بَيْعِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ ، ثُمَّ يُنْصَبُ لَهُ الْقِتَالُ ، وَإِنِّي لَا أَعْلَمُ أَحَدًا مِنْكُمْ خَلَعَهُ وَلَا بَايَعَ فِي هَذَا الْأَمْرِ إِلَّا كَانَتْ الْفَيْصَلَ بَيْنِي وَبَيْنَهُ
তিনি বলেন: মদীনাবাসী মুসলমান সাধারণ যখন ঘোষণা করেন যে তাঁরা এয়াযীদকে খলীফা হিসেবে আর গ্রহণ করবেন না, তখন হযরত ইবনে উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু নিজের ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধব ও সন্তানদেরকে জড়ো করে বলেন, আমি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’কে বলতে শুনেছি, “ক্বেয়ামত দিবসে প্রত্যেক বেঈমান তথা বিশ্বাসঘাতকের জন্যে একটি পতাকা স্থাপিত হবে।” আমরা এই ব্যক্তির প্রতি আনুগত্যের শপথ নিয়েছি আল্লাহতা’লা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আরোপিত শর্তানুযায়ী; আর আমি আল্লাহ পাক ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আরোপিত শর্তানুসারে আনুগত্যের শপথ গ্রহণকারী ওই ব্যক্তির চেয়ে বেশি বেঈমান কাউকে চিনি না, যে ওইভাবে শপথ নেয়ার পরে তার (মানে নেতার) বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরম্ভ করে। যদি আমি জানতে পারি যে তোমাদের (মানে আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের) মধ্যে কেউ তার (এয়াযীদের) প্রতি আনুগত্য প্রত্যাহার করেছো বা অন্য কারোর আনুগত্য স্বীকার করেছো, তাহলে সেটাই হবে আমার সাথে তার সম্পর্কের পরিসমাপ্তি।
ولعل السبب الذي دفع معاوية لأخذ البيعة ليزيد، أنه رأى أن يمنع الخلاف ، ويجمع الكلمة في هذه المرحلة الحرجة التي تعيشها الأمة ، مع نظره لكثرة المطالبين بالخلافة ، فرأى رضي الله عنه أن في توليته ليزيد صلاحا للأمة ، وقطعاً لدابر الفتنة باتفاق أهل الحل والعقد عليه .
হযতো এয়াযীদের প্রতি মানুষের আনুগত্যের শপথ গ্রহণের পক্ষে আমীরে মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু’র বক্তব্যের পেছনে এই কারণ হতে পারে যে তিনি ভেবেছিলেন এতে বিভক্তি রোধ হবে এবং উম্মতের ওই সঙ্কটকালে মানুষ ঐক্যবদ্ধ হবে। কেননা খেলাফতের অনেক দাবিদারের ব্যাপারে তিনি সচেতন ছিলেন। তাই তিনি ভেবেছিলেন এয়াযীদকে খলীফা মনোনীত করাটা উম্মতের স্বার্থ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সর্বোত্তম পন্থা, আর এটা অশান্তি দূর করার বেলায়ও একটি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা, যদি নীতিনির্ধারকমণ্ডলী এয়াযীদের ব্যাপারে একমত হন। [৯]
ইবনে খালদূন বলেন:
والذي دعا معاوية لإيثار ابنه يزيد بالعهد دون من سواه إنما هو مراعاة المصلحة في اجتماع الناس، واتفاق أهوائهم باتفاق أهل الحل والعقد عليه حينئذ من بني أمية، إذ بنو أمية يومئذ، لا يرضون سواهم، وهم عصابة قريش وأهل الملة أجمع، وأهل الغلب منهم. فآثره بذلك دون غيره ممن يظن أنه أولى بها، وعدل عن الفاضل إلى المفضول حرصاً على الاتفاق واجتماع الأهواء الذي شأنه أهم عند الشارع، وإن كان لا يظن بمعاوية غير هذا فعدالته وصحبته مانعة من سوى ذلك. وحضور أكابر الصحابة لذلك وسكوتهم عنه دليل على انتفاء الريب فيه، فليسوا ممن يأخذهم في الحق هوادة، وليس معاوية ممن تأخذة العزة في قبول الحق، فإنهم كلهم أجل من ذلك، وعدالتهم مانعة منه.
এয়াযীদকে অন্যদের তুলনায় অগ্রাধিকার দেয়া এবং খলীফা নিযুক্ত করার ক্ষেত্রে আমীরে মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু’কে যে বিষয়টি প্রণোদিত করেছিলো, তা হলো এই বিশ্বাস যে এতে মুসলিম উম্মাহ’র ঐক্য ও একজন নেতার অধীনে শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তাঁদের স্বার্থের সংরক্ষণ হবে, যা ওই সময়কার নীতিনির্ধারক বনূ উমাইয়া গোত্রের অনুমোদন সাপেক্ষ ব্যাপার ছিলো। কেননা বনূ উমাইয়া সে সময় নিজেদের গোত্রভুক্ত কাউকে ছাড়া (খলীফা হিসেবে) অন্য কাউকেই মেনে নিতো না। তারা ছিলো ক্বুরাইশ বংশের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী গোত্র, আর তাদের ছিলো ব্যাপক প্রভাব। তাই আমীরে মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এয়াযীদকে পছন্দ করেন তাঁদের চেয়েও, যাঁরা হয়তো মনে করেছিলেন তাঁরা তার চেয়ে বেশি যোগ্য। এই কারণেই আমীরে মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বেশি সৎ ও ধার্মিকদের চেয়ে কম সৎ ও ধার্মিক একজনকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন, কেননা তিনি মুসলমানদেরকে একজন নেতার অধীনে একতাবদ্ধ রাখতে আগ্রহী ছিলেন, যা ইসলামী শিক্ষায় একটি মহাগুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমীরে মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু’র ক্ষেত্রে এ ছাড়া আর অন্য কোনো উদ্দেশ্য চিন্তা করা সম্ভব নয়, কেননা তাঁর সৎ চরিত্র ও সাহাবী হওয়ার বাস্তবতা-ই অন্য কোনো উদ্দেশ্যকে নাকচ করে দেয়।
কতিপয় জ্যেষ্ঠ সাহাবা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম-এর সেখানে উপস্থিত থাকা এবং তাঁদের নিরবতা পালন করার ঘটনা ইঙ্গিত করে যে আমীরে মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু যা করেছিলেন, তার মধ্যে কোনো সন্দেহজনক কিছু ছিলো না। কারণ ওই সকল পুণ্যাত্মা ভুল কোনো কিছুর বিরুদ্ধে কথা বলার ক্ষেত্রে ভয় পাবার মতো কেউ ছিলেন না। আর আমীরে মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-ও সত্য কথা গ্রহণ না করার মতো দাম্ভিক লোকদের একজন ছিলেন না। তাঁদের সবাই এতো উন্নতচরিত্রের ছিলেন যে ওই রকম আচরণ তাঁরা করতেই পারতেন না, আর তাঁদের সততা ওই হীন কাজকে বাতিল করে দিতো। [১০]
ইবনে খালদূন আরো বলেন:
عهد معاوية إلى يزيد خوفاً من افتراق الكلمة
আমীরে মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু মুসলমানদের বিভক্তির আশঙ্কায় এয়াযীদকে খলীফা হবার ব্যাপারে নির্দেশনা দেন। [১১]
মুহিব্বুদ্দীন আল-খতীব রহমতুল্লাহি আলাইহি ‘আল-আওয়াসিম মিন আল-ক্বাওয়া’সিম’ গ্রন্থের ব্যাখ্যায় (২২৯ পৃষ্ঠা) বলেন:
عدل عن الوجه الأفضل لما كان يتوجس من الفتن والمجازر إذا جعلها شورى ، وقد رأى القوة والطاعة والنظام والاستقرار في الجانب الذي فيه ابنه
আমীরে মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু সেরাটা বেছে নেননি, কেননা শূরা (পারস্পরিক পরামর্শক সভা)’র বরাবরে এই বিষয়টিকে রেখে গেলে অশান্তি ও রক্তক্ষয় হবে বলে তিনি শঙ্কিত ছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন যারা তাঁর ছেলের পক্ষে থাকবেন, তাদের হাতেই থাকবে ক্ষমতা, বাধ্যতা বজায় রাখা, শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা (অর্থাৎ, তারা ক্ষমতাশালী হওয়ার দরুন নিয়ম-শৃঙ্খলা রক্ষা করতে পারবেন)। [উদ্ধৃতির সমাপ্তি]
পরিশেষে বলবো, বিভেদের সময় যখন অন্তর্দ্বন্দ্বে পরিস্থিতি অশান্ত ছিলো, তখন উম্মতের স্বার্থে যা শ্রেয়তর তা-ই আমীরে মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু করেছিলেন; আর তিনি ভেবেছিলেন মুসলমানদেরকে ঐক্যবদ্ধ রাখা ও অশান্তি দূর করাটা ওই শর্ত পূরণ করার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, যা আরোপ করেছিলেন ইমাম হাসান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু, যখনই তিনি খেলাফতের দাবি ছেড়ে দিয়েছিলেন এবং আমীরে মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু’র প্রতি আনুগত্যের শপথ নিয়েছিলেন। শরীয়ত সেই বিষয়-ই অর্জন করতে এবং পূর্ণতা দিতে চায়, যা মানুষের স্বার্থ সেরা উপায়ে সংরক্ষণ করে এবং যা ক্ষতিকর তাকেও নিবৃত্ত করে ও কমিয়ে আনে।
এই বিষয়ে সর্বোপরি যা বলা যায় তা হলো, মুসলমানদের খলীফা হযরতে আমীরে মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু সেরা উপায়টি বেছে নিতে চেষ্টা করেছিলেন। এক্ষেত্রে তিনি সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হলে দুটি সওয়াব পাবেন, আর ভুল করলে সওয়াব পাবেন একটি, ইনশা’আল্লাহ। এই বিষয়ে বা অন্যান্য বিষয়ে তাঁর অপূর্ণতা ও ঘাটতি (থেকে থাকলে তা একমাত্র) পরম করুণাময় ও অসীম দয়াবান আল্লাহতা’লা-ই ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে মাফ করে দেবেন। নিশ্চয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবাবৃন্দ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম-ই সমস্ত প্রশংসার অধিকারী মহান আল্লাহতা’লা কর্তৃক মাফ পাওয়ার সর্বাধিক যোগ্য।
আর আল্লাহ পাক-ই সবচেয়ে ভালো জানেন।
তথ্যসূত্র :
[১] (ক) আবু ইয়ালা : আল মুসনাদ, ১:১৯৪ হাদীস নং ২২৮।
(খ) আবু উয়ানা : আল মুসনাদ, ৪:১৬৮ হাদীস নং ৬৩৯৭।
(গ) বায়হাকী : দালায়িলুন নবুয়াত, ৭:১৮৫।
[২] ইবনে কাছির : আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮:২৩।
[৩] ইবনে কাছির : আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৬:২৪৬]
[৪](ক) বুখারী : আস সহীহ, বাবু কাওলিন নবীয়্যি লিল হাসান, ৩:১৮৬ হাদীস নং ২৭০৪।
(খ) ইবনে আবী শায়বা : আল মুসান্নাফ, ৬:৩৭৮ হাদীস নং ৩২১৭৮।
(গ) আহমদ : আল মুসনাদ, ৫:৩৭ হাদীস নং ২০৪০৮।
(ঘ) আবু দাউদ : আস সুনান, ৪:২১৬ হাদীস নং ৪৬৬২।
(ঙ) তিরমিযী : আস সুনান, ৬:১২১ হাদীস নং ৩৭৭৩।
(চ) বাযযার : আল মুসনাদ, ৯:১০৯।
(ছ) নাসায়ী : আস সুনান আল কুবরা, ২:২৮১ হাদীস নং ১৭৩০।
(জ) ইবনে হিব্বান : আস সহীহ, ১৫:৪১৯।
(ঝ) তাবারানী : আল মু‘জামুল আওসাত, ২:১৪৭ হাদীস নং ১৫৩১।
[৫] ইবনে কাছির : আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮:১৬-২০।
[৬] ইবনে কাছির : আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮:১৬-২০ ও ৮:১৭৫।
[৭] ইবনে বাত্তাল : শরহে সহীহ আল-বুখারী গ্রন্থের ৮:৯৭ উদ্ধৃতির সমাপ্তি।
[৮] ইবনে হাজর হায়তামী : আল-সাওয়াইক্ব আল-মোহরিক্বাহ ‘আলা আহলে আর-রাফয ওয়াদ-দালা’ল ওয়ায-যানদাক্বাহ’ পুস্তকের উদ্ধৃতি (২:৩৯৯) সমাপ্ত।
[৯] আলী ইবনে নায়িফ : ‘আল্ মোফাসসাল ফীর-রাদ্দে ‘আলা শুবাহাত আ’দা’ আল-ইসলাম’, ১৩:২২৮।
[১০] ইবনে খালদূন : মোক্বাদ্দিমাত (১০৯ পৃষ্ঠা) পুস্তকের উদ্ধৃতি সমাপ্ত।
[১১] ইবনে খালদূন : মোক্বাদ্দিমাত (১০৬ পৃষ্ঠা) পুস্তকের উদ্ধৃতি সমাপ্ত।
*সমাপ্ত*


বুধবার, ১৩ জুন, ২০১৮

খলীফা হযরত আলী (ক:) ও আমীরে মু’আবিয়া (রা:) প্রসঙ্গ: ফলো-আপ




আফসোস, আমাদের মুসলমানদের মধ্যে অজ্ঞতা কীভাবে ছড়িয়ে পড়েছে! আমি এখানে একটি হাদীস শরীফ উদ্ধৃত করছি, যার বাংলা অনুবাদ মোটামুটি এরকম: “যখন ফিতনা প্রকাশ পাবে কিংবা আমার সাহাবাবৃন্দকে বেদআতী লোকেরা সমালোচনা/গালমন্দ করবে, তখন যেনো জ্ঞান শিক্ষাপ্রাপ্ত আলেম সত্য প্রকাশ করে। অতঃপর সে এই কাজ না করলে তার প্রতি আল্লাহতা’লা, ফেরেশতাকুল ও ঈমানদারবৃন্দের লা’নত তথা অভিসম্পাত! আল্লাহ পাক তার কোনো (পুণ্য)-কর্ম বা ন্যায়পরায়ণতা-ই ক্ববূল/গ্রহণ করবেন না।” সাহাবাবৃন্দের (রা:) সমালোচনার জবাব না দিলেই যদি এরকম অভিশপ্ত হতে হয়, তাহলে যারা সরাসরি সমালোচনা করছে তাদের কী অবস্থা হবে? মুখে বলছেন ‘জিহ্বার রাস টেনে ধরতে হবে,’ আবার একই নিঃশ্বাসে বলছেন ‘আমীরে মু’আবিয়া (রা:) বাগী/বিদ্রোহী; এটা তাঁর এজতেহাদী গলতি/ভ্রান্তি নয়’ [যদিও মুজতাহিদের জন্যে ওই ভুল ১টি সওয়াব বহন করে]! অথচ তিনি একজন সাহাবী (রা:) এবং নিচে প্রদর্শিত হাদীস শরীফ মোতাবেক তাঁকে ও সাহাবামণ্ডলীকে (রা:) সমালোচনার তীর থেকে ’ডিফেন্ড’ করাটা আমাদের ঈমানী দায়িত্ব ও কর্তব্য। এখানে আল্লামা হুসাইন হিলমী (রহ:)-এর লেখা ‘সালাফিয়্যা’ পুস্তিকা হতে হাদীস শরীফটির স্থিরচিত্র তুলে ধরা হলো -

খলীফা হযরত আলী (ক:) ও আমীরে মু’আবিয়া (রা:) প্রসঙ্গ


হযরত আলী (কার্রামাল্লাহু ওয়াজহাহু) ও হযরত মু’আবিয়া (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)’র ব্যাপারে কারো পক্ষ নিয়ে অপর জনকে গালমন্দ করার কোনো সুযোগ-ই আমাদের নেই। শরীয়তে এটা একদম নিষেধ। তাঁদের মধ্যকার মতবিরোধ ছিলো এজতেহাদী। আমরা জানি, উলামায়ে আহলে সুন্নাত হযরত আলী (ক:)’কে এক্ষেত্রে সঠিক বলেছেন, আর তাঁরা হযরত আমীরে মু’আবিয়া (রা:)’র এজতেহাদী ভুল হয়েছিলো বলে জানিয়েছেন। কিন্তু সঠিক এজতেহাদের জন্যে ১০টি ও ভুলের জন্যে ১টি সওয়াব রয়েছে মর্মে হাদীস শরীফে বিবৃত হয়েছে। এমতাবস্থায় কোনো সাহাবী (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)’কে বাগী তথা বিদ্রোহী কীভাবে বলা যায়? সাহাবা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম)’র সমালোচনা ইসলামে নিষেধ নয় কি? মোদ্দা কথা হলো, দুইটি মহাভ্রান্ত ফের্কাহ মুসলমানদের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টিতে অপতৎপর। এরা উভয়েই পেট্রো-ডলারসমৃদ্ধ। একদল আহলে বায়ত (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম) ও হযরত আলী (কার্রামাল্লাহু ওয়াজহাহু)’র ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করতে অপতৎপর (খারেজী); অপর দল হযরত আমীরে মু’আবিয়া (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)’র মানসম্মান ভূলুণ্ঠিত করার অপচেষ্টারত (শিয়া)। দুটো দলই ওই দু জনের হক্ক তথা অধিকার পদদলিত করছে। মুসলমান সর্বসাধারণের এই ব্যাপারে সতর্ক হওয়া উচিত। কেননা ভ্রান্ত এ দুটো দল-ই উটের দুধ, দুম্বার গোস্ত ও খোরমা-খেজুরের (মানে পেট্রো-ডলারের) লোভে এই গর্হিত কাজে লিপ্ত রয়েছে। তাদের অবস্থান দেখেই যায় চেনা। বিশ্বাস করুন, ধীরে ধীরে এসব চামচাদের প্রতি আস্থা উঠে যাচ্ছে আমার। লজ্জা করা উচিত তাদের! দুনিয়ার লোভে দ্বীনদারি বিকিয়ে দিচ্ছে তারা! এই বিষয়ে পয়সার লোভ না করে ইনসাফের ভিত্তিতে বিচার-বিবেচনা করা উচিত। কেননা হযরত আলী (কার্রামাল্লাহু ওয়াজহাহু)’র ব্যাপারে হাদীসে এসেছে: ইমাম আবদুল্লাহ ইবনে আহমদ (রহমতুল্লাহে আলাইহে) তাঁর ‘মুসনাদ’ গ্রন্থের পরিশিষ্টে এবং এর পাশাপাশি আল-বাযযার, আবু এয়ালা ও আল-হাকিম (রহমতুল্লাহে আলাইহিম) হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِيكَ مَثَلٌ مِنْ عِيسَى عَلَيْهِ السَّلامُ أَبْغَضَتْهُ يَهُودُ حَتَّى بَهَتُوا أُمَّهُ ، وَأَحَبَّتْهُ النَّصَارَى حَتَّى أَنْزَلُوهُ بِالْمَنْزِلَةِ الَّتِي لَيْسَ بِهِ ” . ثُمَّ قَالَ : يَهْلِكُ فِيَّ رَجُلانِ , مُحِبٌّ مُفْرِطٌ يُقَرِّظُنِي بِمَا لَيْسَ فِيَّ ، وَمُبْغِضٌ يَحْمِلُهُ شَنَآنِي عَلَى أَنْ يَبْهَتَنِي.. ” .
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বলেন, ‘তোমার সাথে হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের এক সাদৃশ্য আছে; ইহুদীরা তাঁকে এতো ঘৃণা করেছিল যে তারা তাঁর মাকে অপবাদ দিয়েছিল; আর খৃষ্টানরা এতো ভালোবেসেছে যে তারা তাঁকে এমন মর্যাদার আসনে আসীন করেছে যা তাঁর নয়’ [রেফারেন্স: আবু মরইয়াম এবং আবু আল-বখতারী কিংবা আবদুল্লাহ ইবনে সালামা – এই দু’জনের কোনো একজন থেকে আবদুল্লাহ ইবনে আহমদ নিজ ‘আল-সুন্নাহ’ গ্রন্থে (পৃষ্ঠা ২৩৩-২৩৪ #১২৬৬-১২৬৮), আল-হারিস ইবনে আব্দিল্লাহ হতে ইবনে আব্দিল বারর তাঁর ‘আল-এস্তিয়াব’ কেতাবে (৩:৩৭), আল-নুওয়াইরী স্বরচিত ‘নিহায়াত আল-আরব’ পুস্তকে (২০:৫) এবং আবু আল-হাদিদ কৃত ‘শরহে নাজহ আল-বালাগা’ (১:৩৭২)]।” হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন: “আমার ব্যাপারে (আকীদাগত কারণে) দুই ধরনের লোক ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে – আমার প্রতি বিদ্বেষভাব পোষণকারী যারা আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা রটায়; দ্বিতীয়ত যারা অতি ভক্তিসহ আমার মাত্রাতিরিক্ত প্রশংসা করে।”[রেফারেন্স: এটা বর্ণনা করেছেন হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে আবু এয়ালা তাঁর ‘মুসনাদ’ গ্রন্থে (১:৪০৬ #৫৩৪) এবং ইমাম আহমদও দুইটি দুর্বল সনদে নিজ ‘মুসনাদ’ কেতাবে – যাকে চিরাচরিত উদারতায় ‘হাসান’ বলেছেন শায়খ আহমদ শাকির (২:১৬৭-১৬৮ #১৩৭৭-১৩৭৮); আল-হাকিম (৩:১২৩)-ও এর সনদকে সহীহ বলেছেন, তবে আয্ যাহাবী এর দুর্বলতার প্রতি ইঙ্গিত করেন এতে আল-হাকাম ইবনে আব্দিল মালিক থাকার কারণে; একই মত পোষণ করেন ইবনুল জাওযী নিজ ‘আল-এলাল আল-মুতানাহিয়া’ পুস্তকে (১:২২৭ #৩৫৭)। আল-হায়তামী স্বরচিত ‘মজমাউল যাওয়াইদ’ গ্রন্থে’ (৯:১৩৩) একই কারণে ওপরের সকল এসনাদের দুর্বলতার প্রতি ইঙ্গিত করেন, তবে তিনি উল্লেখ করেন যে আল-বাযযার এটা বর্ণনা করেছেন তাঁর ‘মুসনাদ’ গ্রন্থে’। অনুরূপ দুর্বল সনদে এটা বর্ণনা করেন আল-বায়হাকী নিজ ‘আল-সুনান আল-কুবরা’ পুস্তকে (৫:১৩৭ #৮৪৮৮) এবং ইমাম আহমদ তাঁর ‘ফযাইলে সাহাবা’ কেতাবে (২:৬৩৯ #১০৮৭, ২:৭১৩ #১২২১, ২:৭১৩ #১২২২)]। এ-ই হলো খারেজী ও শিয়াদের সম্পর্কে স্বয়ং হযরত আলী (ক:)-এর ফায়সালা! মুসলমান সর্বসাধারণ, এখন আপনারাই নির্ধারণ করুন কোন্ পথ বেছে নেবেন!

পুনশ্চ: [ফেইসবুকের মন্তব্য ফোরামে আপত্তিকারীদের জবাবে]

মওলা আলী (ক:) যখনই আমীরে মু’আবিয়া (রা:)-এর সাথে সালিশ মেনেছেন, অমনি খারেজী গোষ্ঠী তাঁকে অমান্য করে দল থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলো। ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু আমীরে মু’আবিয়া (রা:)-এর সাথে সম্পর্কিত। আর এ কেমন যুক্তি যে যাঁর প্রতি এতো মহব্বতের দাবি করা হচ্ছে, সেই মওলা আলী (ক:)-এর সতর্কবাণী-ই কৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে! আলোচ্য হাদীসটির বিশদ ব্যাখ্যা কেন এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে? This is a grave warning from Mawla Ali (Ra:)! তিনি (মওলা আলী কার্রামাল্লাহু ওয়াজহাহু) অবশ্যই আমাদের সুন্নীদের শিরোমণি। কিন্তু তাঁর কথার সূত্রে ধরেই আমীরে মু’আবিয়া (রা:) ফোকাল-পয়েন্টে এসেছেন। কেননা তাঁর (আমীরে মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর) ওই ঘটনা ছাড়া আলোচ্য হাদীসের সাথে কোনো কিছুই খাপ খায় না। অতএব, এই হাদীসের প্রতিপাদ্য বিষয় এড়িয়ে যেতে পারে একমাত্র উদ্দিষ্ট ভ্রান্ত গোষ্ঠী দুটোই, যাদের একটি মওলা আলী (রা:)-কে গালমন্দ করে, অপরটি অতিভক্তি দেখিয়ে সত্যের মাপকাঠি সাহাবাবৃন্দকে (রা:) হেয় প্রতিপন্ন করে। হাদীসটির বিশদ বিশ্লেষণ করলে তারা চিহ্নিত হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে, আমরা সুন্নীরা নিরপেক্ষভাবে উক্ত হাদীসের এই সতর্কবাণীর বিচার-বিশ্লেষণ করতে আগ্রহী। আমরা কোনোভাবেই হাদীসে উদ্দিষ্ট জনগোষ্ঠী নই। [দুঃখিত, এ যাবৎ বিরূপ মন্তব্যকারীদের কাউকেই আমি হাদীসটির বিশদ ব্যাখ্যায় যেতে দেখিনি]