লেখক: শফীক্ব আল-মুজাদ্দেদী
(ফেসবুক বন্ধু)
হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম আবু হামিদ মুহাম্মদ ইবন মুহাম্মদ আল-গাজ্জালী (রহ.)-এঁর নামের সঙ্গে যুক্ত নিসবা "الغزالي " বাংলা ভাষায় সাধারণত দুটি রূপে লেখা হয়, গাজ্জালী এবং গাজালী। কোনটি অধিক শুদ্ধ ও ঐতিহাসিকভাবে গ্রহণযোগ্য; এ বিষয়ে প্রাচীন জীবনীকার ও ইতিহাসবিদদের মধ্যে দুটি প্রসিদ্ধ মত পাওয়া যায়।
• প্রথম মত: পৈতৃক পেশার দিকে নিসবা করে "গাজ্জালী"
অধিকাংশ ঐতিহাসিক ও তাবাকাতবিদের মতে, ইমাম গাজ্জালীর পূর্বপুরুষ পশম বা উল কেটে সুতা (غزل) প্রস্তুত ও বয়নের পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। আরবি "غزال " অর্থ পশম বা উল থেকে সুতা প্রস্তুতকারী। সেই পেশার সঙ্গে সম্পর্কিত নিসবা হিসেবেই তাঁদের পরিবার (পারিবারিক পেশাগত উপাধি) "আল-গাযযালী" (الغزالي) নামে পরিচিতি লাভ করে।
যেমন:
১. ইমাম ইবনুল আছীর (রহ:) [৫৫৫-৬৩০ হি./১১৬০-১২৩৩ খ্রি.]:
তিনি বলেন, "আল-গাযযালী" শব্দটি গাইন (غ) -এর পর শাদ্দাযুক্ত যাই ( ّز) সহ উচ্চারিত হয়। তাঁর মতে, এটি "গাযযাল" অর্থাৎ সুতা প্রস্তুতকারীর পেশাগত পরিচয় থেকে উদ্ভূত। তিনি আরও বলেন, খাওয়ারিজম ও জুরজান অঞ্চলের ভাষাগত রীতিতে পেশাভিত্তিক নিসবা প্রচলিত ছিল। যেমন, আল-আসসার থেকে আল-আসসারী। একইভাবে আল-গাযযালী-ও একটি পেশাভিত্তিক নিসবা।
তিনি আরও বলেন, কেউ কেউ এটিকে শাদ্দাহবিহীন "গাযালী" উচ্চারণ করে থাকেন, যা তুসের নিকটবর্তী তাঁর জন্মস্থান গাযালা গ্রামের দিকে নিসবা করে। কিন্তু তাঁর মতে, এই মতটি প্রসিদ্ধ অভিমতের পরিপন্থী'।
২. ইবনু খাল্লিকান (৬০৮-৬৮১ হি./১২১১-১২৮২ খ্রি.):
তিনি স্পষ্টভাবে বলেন যে, আল-গাযযালী (الغزالی) উচ্চারণই প্রসিদ্ধ ও অধিক গ্রহণযোগ্য। এটি গাযযাল (الغزال) অর্থাৎ সুতা প্রস্তুতকারীর পেশাগত পরিচয় থেকে উদ্ভূত নিসবা। তিনি উদাহরণ দেন, আল-কাসসার থেকে আল-কাসসারী এবং আল-আত্তার থেকে আল-আত্তারী-এর মতো।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, শাদ্দাহবিহীন গাযালী উচ্চারণের একটি মত থাকলেও তা তুলনামূলকভাবে কম প্রসিদ্ধ। তাঁর মতে:
والمشهور بتشديد الزاي نسبة إلى غزال، وهو الذي يغزل الصوف.
অর্থাৎ,
"প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ উচ্চারণ হলো যাই-এ শাদ্দাসহ (গাযযালী)। এটি 'গাযযাল' অর্থাৎ পশম কেটে সুতা প্রস্তুতকারীর প্রতি নিসবা।"
৩. ইমাম যাহাবী (৬৭৩-৭৪৮ হি./১২৭৪-১৩৪৮ খ্রি.):
ইমাম যাহাবী (রহ:) বলেন, আল-গাযযালী, আল-আত্তারী এবং আল-খাব্বাযী প্রভৃতি উপাধি মূলত বিভিন্ন পেশা বা বৃত্তির প্রতি নিসবা নির্দেশ করে। ফারসি ভাষায় প্রচলিত পেশাবাচক শব্দের সঙ্গে আরবি নিসবা-সূচক "ইয়া" যুক্ত করেই এসব উপাধি গঠিত হয়েছে।
৪. তাজউদ্দীন আস-সুবকী (৭২৭-৭৭১ হি./১৩২৭-১৩৭০ খ্রি.):
তিনি উল্লেখ করেন যে, ইমাম গাজ্জালীর পিতা ছিলেন একজন গাযযাল, অর্থাৎ পশম কেটে সুতা প্রস্তুতকারক। তিনি তুসে নিজের দোকানে সুতা বিক্রি করতেন। এ কারণেই "গাজ্জালী" নিসবাটি অধিক প্রসিদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য হয়েছে।
৫. ইমাম জালালুদ্দীন আস-সুয়ূতী (৮৪৯-৯১১ হি./১৪৪৫-১৫০৫ খ্রি.):
তিনি উভয় মত উল্লেখ করলেও স্পষ্টভাবে বলেন, প্রসিদ্ধ ও অধিক গ্রহণযোগ্য মত হলো গাযযাল পেশার দিকে নিসবা করে গাজ্জালী উচ্চারণ।
৬. ইমাম মুরতাদা আয-যাবিদী (১১৪৫-১২০৫ হি./১৭৩২-১৭৯০ খ্রি.):
তিনি উল্লেখ করেন যে, গাযালা তুসের একটি গ্রামের নাম। কোনো কোনো আলিম এই গ্রামের প্রতি নিসবা করে গাযালী উচ্চারণ করেছেন। তবে তিনি ইবনুল আছীরের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেন, প্রসিদ্ধ ও অধিক গ্রহণযোগ্য মত হলো গাযযালী, যা পেশাভিত্তিক নিসবা'।
• দ্বিতীয় মত: জন্মস্থানের দিকে নিসবা করে "গাজালী"
অন্য একটি মত অনুযায়ী, ইমাম গাজ্জালীর নিসবা তাঁর জন্মস্থান তুসের নিকটবর্তী গাযালা (غزالة) গ্রামের প্রতি। এ মত অনুসারে তাঁর নাম "আল-গাযালী" (الغزالي) হবে, যেখানে যাই (ز)-এ শাদ্দাহ থাকবে না।
১. ইমাম নববী (৬৩১-৬৭৬ হি./১২৩৩-১২৭৭ খ্রি.):
তিনি উল্লেখ করেন যে, যদিও সাধারণভাবে তাঁকে গাজ্জালী বলা হয়, তবু একটি বর্ণনায় ইমাম গাজ্জালী নিজেই বলেছেন:
"আমি গাজ্জালী নই; বরং গাজালী। কারণ আমার নিসবা তুসের নিকটবর্তী গাযালা গ্রামের প্রতি'।" অর্থাৎ এখানে তিনি বংশীয় পেশাগত উপাধি থেকে জন্মস্থানের নিসবা গ্রহণকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
২. সালাহুদ্দীন সাফাদী (৬৯৬-৭৬৪ হি./১২৯৬-১৩৬৩ খ্রি.)
তিনি একই ধরনের একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করেন। সেখানে বলা হয়েছে: "লোকেরা আমাকে গাযযালের (পেশাগত নিসবা) সঙ্গে সম্পর্কিত মনে করে। অথচ আমি গাযালী; কারণ আমার নিসবা গাযালা নামক গ্রামের প্রতি।"
সারসংক্ষেপ:
ঐতিহাসিক ও তাবাকাত গ্রন্থসমূহ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, "গাজ্জালী" উচ্চারণ ও বানানই অধিক প্রসিদ্ধ এবং অধিকাংশ জীবনীকার, ভাষাবিদ ও ইতিহাসবিদের নিকট অধিক গ্রহণযোগ্য। সিরিয়ার আরবি একাডেমির গবেষক মুহাম্মদ ইবন আবু শানাব শাদ্দাসহ "গাজ্জালী" বানানকেই ভাষাগতভাবে অধিক সঠিক বলে মত প্রকাশ করেছেন। যার প্রধান ভিত্তি হলো ইমাম গাজ্জালীর পারিবারিক পেশা, অর্থাৎ গাযযাল (পশম কেটে সুতা প্রস্তুতকারী)।
অন্যদিকে, "গাজালী" উচ্চারণের পক্ষে যে বর্ণনা ইমাম নববী (রহ.) ও সাফাদী (রহ.) উদ্ধৃত করেছেন, তার সনদ শক্তিশালী নয়। ফলে এটিকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা কঠিন। এ কারণে অধিকাংশ মুহাক্কিকের নিকট গাযযাল পেশা থেকে উদ্ভূত "গাজ্জালী" নিসবাটিই অধিকতর শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য বলে প্রতীয়মান হয়।
তবে এটাও সঠিক যে, "গাজালী" মতটি প্রাচীন গ্রন্থসমূহে উল্লেখিত একটি ঐতিহাসিক মত। তাই একে সম্পূর্ণ অশুদ্ধ বলা যাবে না। গবেষণার আলোকে বলা যায়, "গাজ্জালী" অধিক প্রসিদ্ধ ও অধিক গ্রহণযোগ্য হলেও "গাজালী"-ও একটি স্বীকৃত, ঐতিহাসিক উচ্চারণ ও বানান।
মোদ্দা কথা: কেউ যদি উনার পেশাগত উপাধির দিকে নিসবা করেন তবে গাজ্জালী এবং জন্মস্থানের দিকে নিসবা করলে গাজালী। দুটোই শুদ্ধ। কোনটাকেই ভুল বলা যাবে না। তবে অধিক গ্রহণযোগ্য ও প্রসিদ্ধ হচ্ছে ❝গাযযালী❞।
শুধু ইমাম গাজ্জালী (রহ:) এঁর ক্ষেত্রে নয় বরং প্রায় শতাধিক ব্যক্তিদের নামের উপাধিতে এমন তারতম্য পরিলক্ষিত হয়। সেগুলো উল্লেখ করলে লেখার কলেবর বৃদ্ধি পেয়ে পাঠকদের ধৈর্য চ্যুতি হতে পারে বিধায় সংক্ষেপ করা। আর এগুলো উনাদের নাম নয় বরং নামের পরিচিত (উপাধি) বা নিসবা।
Note:
1. ইবনুল আছির, আবুল হাসান আলী ইবন আবীল কারম মুহাম্মদ ইবন মুহাম্মদ ইবন আব্দুল করিম ইবন আব্দুল ওয়াহেদ, আল লুবাব ফী তাহরীরিল আনসাব, (বৈরুত: দারু সাদির), খ. ২, পৃ. ৩৭৯।
2. ইবনে খাল্লিকান, আবুল আব্বাস শামসুদ্দীন আহমদ ইবন মুহাম্মদ ইবন ইব্রাহীম ইবন আবু বকর, (বৈরুত: দারু সাদির), খ. ১, পৃ. ৯৮।
3. ইমাম যাহাবী, সামসুদ্দীন আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবন আহমদ ইবন উসমান, সিয়ারু আলামিন নুবালা, (বৈরুত: মুয়াসসাতুর রিসালাহ, ৩য় মুদ্রণ, ১৯৮৫), খ. ১৯, পৃ. ৩৪৩।
4. সুবকী, তাজ উদ্দীন আব্দুল ওহাব ইবন তাকী উদ্দীন সুবকী, তাবাকাতুশ শাফেয়িয়্যাহ আল-কুবরা, (কায়রো: দারুল হিজর, ২য় মুদ্রণ, ১৪১৩হি.), খ. ৬, পৃ. ১৯৩।
5. ইমাম সুয়ূতী, আব্দুর রহমান ইবন আবু বকর জালালুদ্দীন, লুব্বুল লুবাব ফী তাহরীরিল আনসাব, (বৈরুত: দারু সাদির), পৃ. ১৮৬।
6. যাবিদী, মুহাম্মদ ইবন মুহাম্মদ ইবন আব্দুর রাজ্জাক হুসাইনী, তাজুল আরুস মিন জাওয়াহিরুল কামুস, বৈরুত: দারুল হিদায়াহ, খ.৩০, পৃ. ৯৭।
7. নববী, আবু যাকারিয়া মুহি উদ্দীন ইয়াহিয়া ইবন শারাফ, আত তিবইয়ান ফী আদাবি হামালাতিল কুরআন, (বৈরুত: দারু ইবন আল-হাযম, ৩য় মুদ্রণ, ১৯৯৪), পৃ. ২১৫।
8. সাফাদী, সালাহ উদ্দীন খলিল ইবন আইবেক ইবন আব্দুল্লাহ, আল-ওয়াফী বিল ওফায়াত, (বৈরুত: দারু ইহইয়াউত তুরাস, ২০০০), খ. ১, পৃ. ২১৩।
[এডমিনের ভাষ্য: এ লেখাটিতে সমস্ত গবেষণাই লেখকের। এডমিন এতে জড়িত নই, আর সম্পাদনাও করা হয়নি।]
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন